মানুষ সাধারণ জগতে বাস করিয়াও অসাধারণ হইতে পারেন। জগতের সকল নবি রসুলের এই কথা সকল মানুষের পক্ষে মানিয়া লওয়া সম্ভবপর নহে। তাঁহারা নিজেরাই যে অসাধারণ মানুষ সেই বিষয়টি নিয়ে খোদ তাঁদের অনুসারী উম্মতগণের অধিকাংশই অবিশ্বাসী। আর আধুনিক উচ্চশিক্ষিতগণের নিকট বিষয়টি অনেক জটিল বটে, ধাঁধার মতন।
সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ায় বুদ্ধির সূক্ষ্মতা বা গভীরতা বোধগম্য। এইরূপ অবস্থায় কেহ অতিবুদ্ধিমান কিংবা অসাধারণ জ্ঞানী বলিয়া উল্লেখিত হইতে পারেন। কিন্তু নবি রসুলগণ যেই অর্থে অসাধারণ বলিয়া অভিহিত হইবেন কিংবা অতিমানব বলিয়া গণ্য হইবেন তাহা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তাঁহারা ইমানি সক্ষমতায় আশ্চর্যরকম কৃতিত্বের অধিকারী হইয়া থাকেন, যাহা বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলে অনুধাবনযোগ্য নহে।
কোরানি ভাবধারায় (প্রচলিত মতানুযায়ী নহে), একজন মুমিন ব্যক্তি জগতের একটি আশ্চর্য জিনিস। একই রকম মানবদেহ লইয়া তাঁহারা কেনইবা অন্যদের চাইতে ভিন্নরকম বলিয়া গণ্য হইবেন তাহা সহজে বুঝিতে পারার সাধ্য সকলের হইবে না। কিছু চতুরলোক নিজদিগকে মুমিন ব্যক্তি বলিয়া দাবী করেন কিংবা অন্যান্য যেই সকল মানুষকেও অনুরূপ মুমিনরূপে গণ্য করিয়া থাকেন সেই তাহারাই হয়তো মুমিন নহেন। কেননা, শুধু কিছু ধারণায় বিশ্বাস স্থাপন করিলেই কেহ মুমিন হইয়া যায় বলিয়া কোরানে স্বীকৃত হয় নাই। বরং মুমিন ব্যক্তির এমন সকল গুণাবলি বর্ণিত হইয়াছে যে, তাহা অর্জন করা কোনো মানুষের পক্ষে সারাজীবনব্যাপী এক নিরলস সাধনার ব্যাপার, শুধু বিশ্বাসের বিষয় নহে।
কিন্তু কি মিথ্যাচার! বহু মানুষ নিজেকে মুমিন বলিয়া দাবী করিয়া থাকেন!
মুমিনের যেই রূপ পরিচয় কোরানে বর্ণিত হইয়াছে, তাহা বিশেষভাবে খেয়াল করিলে বুঝিতে অসুবিধা নাই যে, মুমিনের দাবিদার বলিয়া যাহারা রহিয়াছেন তাহারা স্বঘোষিত কিংবা সরকারি মুমিন হইতে পারেন—কোরান বর্ণিত মুমিন নহেন।
কোরানে মুমিনকে ‘সফল’ বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে। তাঁহার সালাত-কর্ম স্থায়ীভাবে কায়েম হইয়াছে, ফলে তিনি খুব সহজ বিনয়-নম্রতার সাথে সালাতে স্থিত থাকেন, সালাতের বাহিরে কোনোরূপ অসার ক্রিয়াকলাপে তাঁহার সংস্রব নাহি। তিনি অবশ্যই জাকাতদাতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন। যৌনবিষয়ে তাঁহার কোনো রকম বিকারগ্রস্থ অবস্থা নাই—সীমালংঘন দূরে থাকুক। আমানত, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি নিশ্চয়তাজ্ঞাপক চরিত্র। এবং তিনি উচ্চতম স্বর্গের উত্তরাধিকারী—ইহকালেই এই সকল কথা তাঁহার জন্য প্রযোজ্য। (দেখুন: ২৩ নং সুরা মুমিনুন এর প্রথম ১১টি বাক্যের সংক্ষিপ্তসার)
উপরোল্লিখিত কোরানি বর্ণনা কি যে কেহই নিজের জীবনে দাবি করিতে পারেন? শুধু ৮-১০টি বিষয় মুখস্ত করিয়া তাহা অন্তরে পোষণ করিলেই কি ঐ সকল গুণাবলি অর্জিত হইয়া যাইবে? নিছক বিশ্বাস দিয়াই মুমিন হওয়া যাইবে না—এমন প্রতীতিই কোরানসম্মত। (হিলালুজ্জামান হেলাল রচিত ‘কোরানে মুমিনতত্ত্ব’ নামক গ্রন্থে ইহা লইয়া অনেক বিষয় আলোচিত হইয়াছে। আগ্রহী পাঠক দেখিয়া লইতে পারেন।)
কোরানি বর্ণনা-ভাবধারাটি একটু ভাবিয়া দেখুন তো—মুমিন ব্যক্তি অবশ্যই জাকাতদাতা হইবেন। তাহা হইলে গরীব মানুষ কেমন করিয়া মুমিন হইতে পারিবেন? যাঁহারা সম্পদশালী নহেন প্রথাগতভাবে তাঁহারা তো জাকাত দিবেন না, যাকাত না-দিয়াই কোনো ব্যক্তি কিভাবে মুমিন হইবেন? কিংবা অন্যভাবে বিষয়টি ভাবিয়া দেখুন—মুমিন অবশ্যই জাকাতদাতা এবং গরীব মানুষও মুমিন হইতে পারেন, তাহা হইলে যাকাত কি ধন-সম্পদের সাথে জড়িত বিষয়? কোরানে অনেকবার ‘সালাত-জাকাতের’ কথা পাশাপাশি রহিয়াছে—তাহা কি শুধুই ধনী মানুষের জন্য? গরীব মানুষের ইসলামে জাকাত নাই—কোরান মতে তাহা কিন্তু সত্য হইতেই পারিবে না। আবার, মুমিন ব্যক্তি যেইহেতু একজন জাকাতদাতা সেইহেতু গরীব মানুষের যাকাত রহিয়াছে। এইখানে আসিয়া কোরানের সাথে প্রথাগত ইসলামি সমাজের গুরুতর পার্থক্য সূচিত হইয়াছে।
বস্তু সম্পদ না-থাকিলেও মানস সম্পদ গরীব মানুষেরও থাকে। আধুনিকালে যাহা মেধাসম্পদ বলিয়া গণ্য হইতেছে তাহাই মানস সম্পদ। যিনি আর্থিকভাবে অসচ্ছল তিনিও ইহা অধিকার করিতে পারেন। জাকাত এর বিধান যদি মনের এই সকল বিষয়রাশির উপর প্রয়োগ করা যায় তাহা হইলে প্রয়োজন মতো এবং সহজভাবেই বস্তুসম্পদের উপরও জাকাত কর্ম প্রযোজ্য হইয়া উঠিবে। বস্তু সম্পদ এবং মানস সম্পদ উভয়য়ের উপর যাকাত কর্ম সাধিত হইলে একজন মানুষ আর সাধারণ থাকিতে পারেন না। দিনে দিনে তিনি সাধারণ হইতে অসাধারন এমনকি অতি মানব হইয়া উঠিবেন। কিন্তু জাকাত কর্মকে নিছক বস্তু সম্পদের সাথে সম্পর্কিত করিয়া কোরানি ভাবধারা উল্টাইয়া যে ইমানি কার্যক্রম এ যাবৎকাল চলিয়া আসিতেছে তাহা নিতান্তই কোরান বিরোধী বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। ফলত ইমানের কোনো সুন্দর স্বরূপ প্রস্ফূটিত হইতে পারিতেছে না।
কোরানের মৌলিক চেতনা ও কর্মসমূহ ভুলভাবে পরিপালনের ফলে দিনে দিনে ভুল ফলাফল তৈরি করিয়া ব্যক্তি-সমাজ সকল ক্ষেত্রেই অনর্থক জটিলতা ঘটিয়া চলিতেছে। মানুষের ইমান আর কোরানের সাথে সঙ্গতি রক্ষা করিতে পারিতেছে না। সমাজের জ্ঞানী মানুষ যদি এই বিষয়ে মনোযোগ না-দিয়া দিনাতিপাত করিতে থাকেন তাহা হইলে ব্যক্তি-সমাজের সমূহ ক্ষতি হইয়াই চলিবে।
পুষ্পিতা
১৮ অগাস্ট ২০২৬


















