আমেরিকায় ধর্ম: সুযোগ, সংকট ও প্রভাব (পর্ব – ১)

অ্যামেরিকাতে ধর্মীয় চর্চা বেশ বৈচিত্র্যময়। এদেশ খ্রিস্টধর্ম প্রধান ধর্ম হলেও ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইহুদি ধর্ম এদেশের প্রধান অ-খ্রিস্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং বিশাল একটি আমেরিকান গোষ্ঠী নিজেদের নাস্তিক, সংশয়বাদী বা ‘কোনো ধর্মে বিশ্বাসী নয়’ হিসেবে পরিচয় দেন।

মার্কিন প্রথম সংশোধনী ও ধর্ম (First Amendment and Religion):

মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দুটি মূল বিধানের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে: ‘প্রতিষ্ঠা ধারা’ (Establishment Clause)—যা সরকারকে কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা কিংবা এক ধর্মকে অন্যটির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া থেকে বিরত রাখে; এবং ‘মুক্ত অনুশীলনের ধারা’ (Free Exercise Clause)—যা সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই ব্যক্তিদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারকে সুরক্ষা প্রদান করে।

অ্যামেরিকাতে ধর্ম চর্চার সুযোগ, সুবিধা ও অসুবিধা এবং জীবনে ধর্মের প্রভাব

অ্যামেরিকায় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান চর্চার সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত বিস্তৃত। দেশটি সংবিধানগতভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়ার ফলে মানুষ নির্বিঘ্নে নিজস্ব উপাসনালয় তৈরী, ধর্মীয় সংগঠনে নিরবিগ্নে, বাঁধাহীন অংশগ্রহণ, ধর্মীয় চর্চা করা এবং বিশ্বাস প্রকাশ করতে পারে।

ধর্ম কি?

ধর্মের সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। কারো কারো মতে ধর্ম একটি বিশ্বাসব্যবস্থা এবং একটি সামাজিক মানবন্ধন যা মানুষকে জীবনের মূল্যবোধ ও উদ্দেশ্য কী শিখায়, ভাল–মন্দের পার্থক্য বোঝায়, এবং সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক তুলে ধরতে সাহায্য করে। এছাড়াও ধর্ম শেখায় মানব সভ্যতাকে উপাসনা, নৈতিক শিক্ষা, আচার‑অনুষ্ঠান, এবং একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলা– যেখানে মানুষ একই বিশ্বাস ভাগ করে।

আবার অনেকের কাছে ধর্ম মানে ঈশ্বর-চর্চা বা আত্ম-চর্চা বা অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস, আবার কারও কাছে এটি নৈতিকতা ও জীবনদর্শনের পথ। মোটা দাগে, ধর্ম হচ্ছে মানুষের জীবনের অর্থ, শান্তি, পরিচয় ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামো।

আমার মতে, ধর্ম হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার জন্য আধ্যাত্মিকতা চর্চা করার অনুশীলন পদ্ধতি। ধর্ম চর্চা এমন এক আদর্শ অনুশীলন পদ্ধতি, যে পদ্ধতি অনুসরণ করে একজন মানুষ তার জীবনের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছাতে পারে। আমার জীবনের ক্ষুদ্র সময়ে অ্যামেরিকার বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে এবং পৃথিবীর নানান প্রান্তে থেকে আশা বিভিন্ন ধর্মীয় লোকজনের সাথে পরিচয় হবার সুযোগ হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমি প্রতিটা ধর্মকে একক হিসেবেই পেয়েছি।

আমি দেখেছি সকল ধর্মগুরুগণ ঠিক একই কথা বিভিন্ন ভাবে ব্যাক্ত করেছেন মাত্র তা ছাড়া আর কিছুই নয়। ধর্ম চর্চা নিয়ে আমদের সমাজে যত গোলযোগ সব আমাদের নিজস্ব সৃষ্টি। ধর্ম চর্চার মহান পদ্ধতিগুলো আমরা ধর্মগুরু, নবী-রাসুল, মহাপুরুষগণের মাধ্যমে পেয়েছি। একেকজন ধর্মগুরু, কালক্রম বা পরিবেশ ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এবং মানুষের যোগ্যতার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ছন্দে-ঢঙ্গে তাঁদের অনুশীলন পদ্ধতি তাঁদের অনুসারী, অনুরাগীদের দেখিয়ে দিয়েছেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন, শিখিয়ে গেছেন। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, মানুষ কোনো কালেই তাদের সময়ের উপস্থিত ধর্মগুরুগণের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারে নি। প্রতিজন ধর্মগুরুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি তাদের ধর্মগুরুর পদ্ধতি ধরে রাখতে পেরেছেন। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সময়ে আমাদের ধর্ম চর্চা পদ্ধতি কতটুকু সঠিক?

চলবে…

আরও লেখা

আমিই ‘সে’

আমিই ‘সে’ সুস্থির শরীর মনে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে ছিলেন তো এবার চোখ খুলুন। খেয়াল করুন আপনি সচেতন। আবার চোখ বন্ধ করুন, এবার আপনি...
পরিচিন্তন

দিল দুনিয়া আর দরবেশী (পর্ব – ১)

আধ্যাত্মিকতা ও ব্যবসাকে আমরা অনেক সময় দুই ভিন্ন জগত বলে ভাবি।  মনে করা হয়, আধ্যাত্মিকতা মানে জগত থেকে সরে দাঁড়ানো আর ব্যবসা মানে কেবল...
পরিচিন্তন

আবু জেহেল আসলে কে ছিলেন?

আমি মনে করি আবু জেহেলকে দেখার দুইটি ভঙ্গি আছে।প্রথমটি হলো সুফি জ্ঞানের আলোকে অন্তর্মুখী হয়ে বিষয়টিকে দেখা; দ্বিতীয়টি হলো কোরানে এই নামটি যে কারণে...
পরিচিন্তন

জ্ঞান যখন নারীর মুখ, কিন্তু কণ্ঠস্বর নয়

জ্ঞানকে জাগতিকই হোক বা আধ্যাত্মিক পথের সন্ধানেই হোক গুরুত্ব দেয়া হয়। বহু ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিতে এই প্রজ্ঞা, জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা...
পরিচিন্তন
spot_imgspot_img