বকুলের মা`র হাত ধরে লঞ্চে উঠে হাঁপাতে থাকে জয়তুন।
বুকে চেপে ধরা একমাত্র ছেলে কুদ্দুস। তার কাছে সব কিছু কেমন যেন নতুন নতুন লাগে। কী করতে হবে নিজে নিজে বুঝতে পারে না সে। এদিক সেদিক তাকায়। অব্যক্ত অজানা কী-একটা তার মনের কোথায় সারাক্ষণ নাড়া দিয়ে চলেছে।
‘বও বও`, বকুলের মা উপদেশ দেয়। সাথে আনা ছোট মাদুরটি বিছিয়ে বলে, ‘এহানে পোলারে রাইখ্যা বস্তায় এলান দিয়া বও`। কাঁথা বালিশ থালা বাটি ডেকচি আরো কিছু দরকারি জিনিসপত্রে ভরা বস্তাটি টেনে বিছানার এক পাশে নিয়ে বলে, ‘ডাহায় যাইতে কাইল হেই বিয়ানে। হারা রাইত ঘুমাইতে ঘুমাইতে যামু। কেউ আবার টাইন্যা নিয়ে যায় নাহি। তুই ঘুমাইয়া উঠলে আমি ঘুমামু।`
এখনো জয়তুন কিছু বলতে পারে না। কত অজানা বিষয় মাথায় ভিড় করছে তার ইয়ত্তা নেই। লঞ্চ ছাড়তে অনেক দেরি মনে হয়। ডেকে অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে যে। ওর কথা বলা ছেলেটাও নতুন অবস্থায় নিজেকে এখনো মানিয়ে নিতে পারে নি। কোনো কথা না বলে এদিক সেদিক তাকিয়ে থাকে। আত্মীয় বা কয়েক জন পরিচিত ছাড়া কাউকে সে কোন দিন দেখে নি। কিন্তু লঞ্চ পর্যন্ত আসতে আসতে তার এত বেশি দেখাশুনা হলো যে ঠিক মত সব বুঝতে পারছে না। বরগুনার বাইরে এই প্রথম জয়তুন যাচ্ছে। তার মুখে কথা ফোটে না, শুধুই কানে বাজে।
আস্তে আস্তে অনেক লোক উঠে পড়ে। অনেকে তর্কাতর্কি করছে জায়গা নিয়ে। অনেকে আরাম করে বসে পড়েছে। কাউকে কাউকে দেখে মনে হচ্ছে টাকা পয়সাওয়ালা। কেউ মনে হয় চাকরি করেন। আবার অনেকের অবস্থা জয়তুনদের মতই। জয়তুন ইতস্তত চোখ বুলায়, অনুমান করে এটা সেটা।
বকুলের মা মুখে পান পুরে দিয়ে চিবায় একটু একটু। ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুলে লেপটানো চুন। ‘নে, পান নে‘, জয়তুনের দিকে অর্ধেক ছেঁড়া পানে চুন লাগিয়ে টিনের কৌটা থেকে একটু সুপারি তুলে দেয় বকুলের মা। হাতটা বাড়িয়ে পান নেয় সে। মুখে পুরতে পুরতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। জয়তুনের চোখে মুখে উদাস চাহনি।
‘অত চিন্তা করিস না। মোর লগে থাকবি। চিন্তা কী, আঁ?‘ আঙ্গুল থেকে একটু চুন দাঁত দিয়ে কেটে জিবে নেয় বকুলের মা। পানের পড়ন্ত রসকে সুড়ুৎ শব্দে মুখের মাঝে টেনে নেয়। ‘মুই যা খামু তুইও হেইডা খাবি। কাম একটা জোগাড় করে নিমু। মোর তো আছেই। তোর লইগ্যা কইয়া রাখছি মোগোর সামনের মেস বাসায়। হারুন ভাই খুব ভালো মানুষ।‘
কেমন এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে ওঠে জয়তুনের বুকটা।
বকুলে মা আবার বলে, ‘মোরে কইছে, নিয়া আইও বকুলের মা, মোগো মেসে একটা ভালো বুয়া লাগবো। যেডা আছে, হেডা কামের না।‘ মুই ঠিক মত যদি তোরে লাগাইয়া দিতে পারি, আর যদি তুই কাম কাইজ বুইঝ্যা লও, তাহলে তো কোন চিন্তাই নাই।‘ বকুলের মা জয়তুনের সাফল্যে আগাম খুশি হয়ে ওঠে।
ব্যাগ বস্তা ঠিক আছে কিনা একটু দেখে নেয় বকুলের মা। জয়তুনের আরো কাছে আসে, ‘লও, চুন নেবা না?‘। প্লাস্টিকের ছোট একটা কৌটা থেকে দু আঙ্গুল দিয়ে একটু জর্দা তুলে মুখ উপর দিক করে সেটুকু মুখে ফেলে। ‘এ কদ্দুস, কি ঘুমাইছনি?‘ জয়তুনের গায়ের সাথে থাকা ছেলেটাকে নাড়া দেয়। পানভর্তি পলিথিনের ব্যাগটা খুঁজতে থাকে। চুনের কৌটাও খোঁজে। ‘অকি, তুই দেহি মুখ লাড়িস না? তুই তো আবার পান খাস না। তয় অভ্যাস কর। জানো, পান খাইলে দুঃখ ভোলা যায়‘।
জয়তুনের চোখ জলে ভরে যায়।
আঁচলে চোখ মুছে পান ভরা মুখটা আস্তে আস্তে নাড়তে থাকে জয়তুন। বকুলের মায়ের পুরান জর্দার কৌটায় রাখা চুন থেকে একটু চুনও নেয় আঙ্গুলে। চিবোতে থাকে। কেটে যায় কিছুক্ষণ। পান চিবালে কষ্ট ভুলা যায়?–ভাবে সে।
লঞ্চে ওঠার পর থেকে যে একটা কষ্ট শুরু হয়েছে সেটা যাবে তো? পান চিবাতে চিবাতে তার মুখটা ভরে যায় রসে। একটু একটু করে গিলেও ফেলে তা। মাথাটা কেমন ঝিম মেরে ওঠে তার। নতুন কষ্টটা যেতে চাচ্ছে না তার কাছ থেকে। আবার পুরান দুঃখটাও হঠাৎ করে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে মনের ভিতর থেকে।
এমন দুঃখের সময় কুদ্দুসকে বুকে ধরলে একটু সুখ পাওয়া যায়। ছেলেকে কাছে টানে জয়তুন। এতক্ষণে কুদ্দুসেরও তন্দ্রা পেয়েছে। তন্দ্রালু ছেলে ওঁ আঁ শব্দ করে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় জয়তুন। একটা কেমন দীর্ঘ শ্বাস বেরোয় বুকের গভীর থেকে।
লঞ্চ ছাড়ার সময় হয়েছে। হুইসেল বাজায় কয়েকবার। ইঞ্জিনের শব্দ বাড়তে থাকে। লঞ্চটি কাঁপতে থাকে। এক সময় বেশ দুলে ওঠে। জয়তুন ভয় পায়। বকুলের মায়ের হাত চেপে ধরে। বকুলের মায়ের হাসি পায়। নিজের অভিজ্ঞতার সাথে জয়তুনের অনভিজ্ঞতার তুলনা করে চোখে মুখে সে অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। জয়তুনের মুখ ফোটে, ‘আল্লাহ্!‘ অস্ফুট স্বরে দোয়া পড়তে থাকে সে।
‘দোয়া পড়! দোয়া-দরুদ, আল্লাহুম্মা…‘। বকুলের মা উপদেশ দেয়। নিজেও কী যেন পড়তে থাকে।
… এভাবেই একসময় সদরঘাট। সায়েদাবাদে। হারুন ভাইয়ের মেসে। অতঃপর …
জয়তুন সব শিখে ফেলেছে। অনেক কিছু তার জানা। অন্যসব বুয়া। মেসের লোকজন। তাদের আসা যাওয়া। ভাবভঙ্গি। চোখের চাহনি। কিসের আকুতি। কাঁচা বাজার, পাকা বাজার। বস্তিতে থাকা। আগুনে পোড়া বস্তি। নতুন ঘরে ওঠা। কত রকম প্রতিবেশী। আট দশ বছর কেটে যাওয়া। ছেলের বড় হওয়া। যত পরিবর্তন, সব জানা তার।
জয়তুনের চিকন এক হারা শরীর দোহারা থেকে তেহারার মত পৃথুল হতে চলেছে। বয়স যৌবনকে ছেড়ে দেবার পাঁয়তারা করছে। কত আশা আকাঙ্খা হারিয়ে গেছে কোথায়। কত নিকটাত্মীয় পর হতে চলেছে। দূরের লোকজন আপন হয়েছে। সে হয়ত কিছু মনে রাখে কিছু রাখে না।
দুপুরের পর বিকেলের আগে একটু অবসর সময়। তখন সে কী-সব ভাবে মাঝে মাঝে। কিন্তু ঠিক মত সব বুঝতে পারে না। হঠাৎ জীবন জগৎটা তার কাছে অচেনা লাগে।
‘মা, ও মা…‘ হটাৎ চমকে ওঠে জয়তুন। ‘ভাত খামু‘। ছেলের কথায় নড়ে চড়ে ওঠে সে। ব্র্যাক স্কুল পড়ুয়া ছেলে এদিক সেদিক ঘুরে এখন ফিরলো। কতক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রয় সে। ঠিক বাপের মত দেখতে। নামও রেখেছিল বাপের নামের অক্ষরে। করিমের ছেলে কুদ্দুস। বুকটা একটু কেমন মোচড় দেয় জয়তুনের।
মেসের চুলাতেই তার নিজের রান্নাবান্না হয়ে থাকে। দিনের প্রায় পুরোটাই কাটে মেসের ব্যস্ততায়। ছেলেটাও বস্তিতে রাতে ঘুমানোর সময় আর স্কুলে থাকার সময় ছাড়া মায়ের ধারে কাছেই থাকে। মেসে এর ওর ফাই ফরমাস খেটে ভালোই কাটে তার। অনেকে ছেলের সাথে ঘনিষ্ট হয়ে মাকেও ঘনিষ্ট করতে চায়। জয়তুন বুঝেও না-বুঝার ভান করে। বিরক্ত হয়, উপভোগও করে অনেক সময়। পুরুষ মানুষের জ্বালা না-পেলে মেয়ে মানুষের জ্বলন কমে না মনে হয়।
হারুন ভাই মেস ছেড়েছেন কবে। তার ঘরে এখন বাস করে তরুন ভাই। বকুলের মা অসুস্থ হয়ে সেই কতদিন হলো দেশে ফিরে গেছেন। লোক মুখে শুনেছে জয়তুন, বকুলের মায়ের ভিক্ষা করে খাওয়ার কথা। শুধু হারুন ভাই আর বকুলের মা নয়, অনেকেই চলে গেছেন। নতুন নতুন কত জন এসেছেন। কিন্তু জয়তুনের যাওয়া হলো না কোথাও।
‘ওহানে কদ্দুস? এ কুদ্দুস্সা‘ ডাক শুনে ভাবনায় ছেদ পড়ে জয়তুনের। উঠে দাঁড়ায়। ‘হ, ভাই‘ উত্তর দেয় সে। তরুন ভাইয়ের ঘরের দরজায় আসে জয়তুন। ‘কী কন?‘ জিঙ্গেস করে সে। ‘তোর পোলাডারে লন্ডিতে পাডাইয়া দে’ তরুন ভাই বলে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির নাইট শিফটের এক লাইন ইন-চার্জ। ‘রাঙ্গা জামাডারে গায়ে না-দেলে সুইংয়ের মাইয়ারা একটা হাসিও দেয় না। কত বড় খারাপ মাইয়াগুলা‘। আক্ষেপ তরুন ভাইয়ের গলায়। জয়তুন রস বোধ করে। ঘরে ঢোকে। ‘আমনে আইজ গো পান খাইছেন?‘ দু জনে কেমন তাকিয়ে থাকে। জয়তুনের মুখে পান, তরুনের মুখে সিগারেট। দু জনের গালে হাসি।
‘ও মা, মোর একছের খিদা লাগজে‘, কুদ্দুস কষ্ট প্রকাশ করে। ‘এ কদ্দুস, তোর কি বেশী খিদা লাগজে? তাইলে একটা কেলা খাইয়া যা‘। ডাকে তরুন। ছেলের প্রতি বিরক্তি নিয়ে ভাত বাড়তে তরুনের ঘর থেকে বের হয় জয়তুন।
অমন করে আলো ছাড়া অন্ধকারেও যে আসতে যেতে হয়, এ ঘরে নয়তো ও ঘরে। ঠাণ্ডা গরম পরশ যে পেতে হয় না এর বা ওর তাতো নয়। অন্ধকারে পিচ্ছিল পথে গর্তেও পড়তে হয় ইচ্ছায় না-হলেও অনিচ্ছায়। বস্তির ঘরে ফিরে রাতে শুয়ে শুয়ে কত কী ভাবনা ভাবে জয়তুন। অনেকদিন পর আবার ফিরে আসে স্বামীর মুখচ্ছবি। জয়তুনের বুকের কোথায় যেন ব্যথা করে ওঠে। কাতরায়। ঘুমন্ত ছেলেটার গায়ে হাত বুলায়। দীর্ঘ শ্বাস আসে শুধু। ঘুম আসে না।
করিম তখন মৃত্যুজ্বরে বিছানায় পড়ে ছিল। একদিন ভোর রাতে জয়তুন স্বামীর বুকে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদছিল। চোখের জলে ভিজে করিম একটু আরাম বোধ করে। দুর্বল ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় কী সব বলে জয়তুনকে। সব কথা তার মনে নেই। কিন্তু একটা কথা তার সব সময় মনে শব্দ করে বেড়ায়। করিম একবার গলা খাঁকারি দিয়ে কেশে ওঠে বার কয়েক। জয়তুন তার বুক থেকে মাথা তুলে বসে। করিম হঠাৎ তার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে। বিড় বিড় করে বলে ‘জয়তুন, তুমি মোরে একটা কথা রাখবা, জয়তুন্ন্যা…?‘ জয়তুন স্বামীর কথায় আপ্লুত হয়ে পড়ে। বলে, ‘কও কও, তোমারে মুই কথা দেলাম, কও কী কথা?‘
করিম একটা হাত জয়তুনের পেটে বুলাতে বুলাতে বলে, ‘মুই যদি মইর্যা যাই‘ একটু দম নেয় সে, আবার বলে, ‘এই পেডে যে আছে হ্যারে নিয়াই তোমার জীবনডা শেষ করবা। আর কাউরে বিয়া করবা না। তাইলে পরকালে মোগো আবার বিয়া অইবে।‘ থামে করিম। জোর করে নিশ্বাস নেয়। জয়তুনকে আর কাছে নিতে পারে না। একটুখানি বাতাস টানতে পারলেও জয়তুনের এলোমেলো চুলটুকুও টানতে ব্যর্থ হয় সে। জয়তুন তাকে ধরতে পারলেও কাকে যেন আর ধরতে পারে না। সেই যে চলে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই–তা জয়তুন বুঝতেও পারলো না, মানতেও পারল না। স্বামীকে শক্ত করে ধরেই রইল। সকালে যখন আর অন্যরা এসে বললেন ওর প্রাণ নেই, তখনো সে শক্ত হাতে স্বামীকেই ধরে ছিল। করিমের দেহ তো রয়েছে, তাহলে গেলো কে? এর ঘোর আজও জয়তুনের কাটে নি।
স্বামীকে দেয়া কথা থেকে জয়তুন এক মূহুর্তও সরে নি। তার স্বামী কি নিজে জানত যে, সে বা তারা বেহেশতে যাবে? নিজের মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে নিজের লোভনীয় জায়গায় যাওয়া এবং নিজের প্রিয় স্ত্রীকেও সেখানে নিতে চাওয়া জয়তুনের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা সন্দেহ নেই। কিন্তু তার প্রিয় স্ত্রীটি বাকি জীবন কত কষ্টে দিন যাপন করবে সে বিষয়ে সে কতটুকু ভাল মনের পরিচয় দিল? জয়তুন একটি বারও তা পরীক্ষা করে নি। স্বামীর প্রতি শুধু গভীর ভালোবাসাই যত্ন করে রেখে দিয়েছে বুকের মাঝে।
বস্তিতে বাস করে হীরা জহরত দিয়ে গড়া বেহেশত অনুমান করার চেষ্টা করে জয়তুন মাঝে মাঝেই। কিন্তু হীরা জহরত সে কখনো দেখে নি। তাই বেহেশতটা ঠিক মত দেখতে পায় না। তখন স্বামীর চেহারাটাও কেমন ফ্যাকাসে মনে হয়। তার ভয় লাগে এ বেহেশত নিয়ে। ভাবনাটা ভেঙ্গে যায়। কিন্তু তারপরও বিশ্বাস টিকে থাকে। এ বিশ্বাস নিয়ে টিকে থাকতেই কত মহৎ হাতছানিতে সাড়া দেয়া হলো না তার। মানুষ তাকে দেখে ভাবে– অনেক কষ্ট আর একটা ছেলে শুধু তার। আর সে ভাবে তার আছে বেহেশতি বিয়ের বর, তার ভালোবাসার স্বামী।
একদিন বস্তির ও-পাশের মাঠে হাফিজিয়া মাদ্রাসার উদ্যোগে একটা ইসালে সওয়াব হলো। জয়তুন কাজ শেষে আর অন্যদের সাথে গিয়েছিল হুজুরের বয়ান শুনতে। হুজুরের অনেক কথার মধ্যে একটা কথা তার মনে লাগে খুব। হুজুর বলেছিলেন, ‘ও আমার মা বোন ভাইয়েরা, যে ব্যক্তি যেমন বিষয়-মানুষ মনের মাঝে লাগিয়ে রাখে সে ব্যক্তির হাশর হবে তেমন বিষয়-মানুষের সাথে’। কী সুন্দর সুর করে কথাগুলো বলেছিলেন তিনি। তখন বুকে কাঁপন ধরেছিল তার। স্বামীর সাথে তার যেন হাশর হয় এই কথা ভেবেই কী অদ্ভুত সুখ হয়েছিল তার। সে দিন ইসলামের নামে দান করার ফজিলত শুনে তার হাতে থাকা টাকাটাও দিয়েছিল জয়তুন হুজুরকে। মনে মনে একটা নিয়ত করেছিল। তার স্বামীর সাথে যেন তার হাশর হয়। ছেলের জামা কেনার টাকা হুজুরকে দিয়েই সে স্বস্তি পেয়েছিল। রাত গভীর হলে কয়েক রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে কত কান্না কাটি করে দোয়া করেছিল সে। ঐ দিন থেকে তার আশা বেড়ে গেছে অনেক গুণ।
জয়তুনের বিশ্বাস আর ভাঙ্গে না। বেহেশতে তাদের বিয়ে হবে। তার ভালোবাসা আর বিশ্বাস একাকার হয়ে আছে। মনে হয়, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা থেকে উৎপন্ন বিশ্বাস তার কাঁচা বয়সকেই পাকিয়ে দিয়ে যাবে। তারও শেষ নিশ্বাস চলে যাওয়ার পর আবার হয়ত তাকে নিশ্বাস নিতে ফিরে আসতে হবে। তখন হয়ত জয়তুন পুরুষ বেশে আর করিম নারী বেশে জনম নেবে। নাকি আগের মতই থাকবে বলা যায় না। হয়ত তারা ভাই-বোন, কিংবা পিতা-কন্যা, অথবা মা-ছেলে, কিংবা আর কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশী হয়ে জন্ম নেবে। নাকি তারা দূরে অজ্ঞাত স্থানে জন্ম নিয়ে কীভাবে যেন কাছাকাছি একত্রিত হবে। তাদের সম্পর্ক যাই হোক এক সাথেই তাদের হাশর হবে। লোকেরা তাদের দেখেও হয়ত চিনতে পারবে না। তারা নিজেরাও চিনবে না নিজেদের। তাদের বিয়ে বা বন্ধুত্ব নিয়ে তারা বা লোকেরা সবাই শুধুই হইচই করবে। এভাবেই হাশরের নামে একত্রিত হওয়া কিংবা কত নরক গমন আর কত স্বর্গারোহন তার হিসাব জয়তুনরা রাখতে পারে? এমন ধারণাও তাদের নেই। মানুষের অজ্ঞতার মত বেহেশতটাও জয়তুনের কাছে অস্পষ্ট রয়েই গেলো।
ঈদে মায়ের বাড়ি আসে জয়তুন ছেলেকে নিয়ে। অনেক দিন পরে আসা। স্বামীর কবরের জায়গাটা চোখে পড়ে তার। ক-দিন পর তার জমানো কিছু টাকা খরচ করে মিলাদ পড়িয়ে নেয় সে। হাফেজি পড়া ছাত্রদের দিয়ে কবর জিয়ারত করায়। নিজে দূরে দাঁড়িয়ে থেকে ভালোবাসার কষ্টে কিছুক্ষণ কাঁদে।
‘মাগো, ঘরে যাবা না, নানী বোলাইতেছে’। কুদ্দুসের কথা শুনে সম্বিত ফেরে তার। লোকেরা কখন সব চলে গেছে ভাবনার ঘোরে থাকায় জয়তুন টের পায় নি। ‘বা-জান‘ এবারে ডুকরে ওঠে সে। এক সময় ছেলের হাত ধরে আস্তে আস্তে ঘরে ফেরে সে।
আবার… ঢাকায় সায়েদাবাদের মেসে ফেরার সময় হলো।
ব্যাগ বস্তা নিয়ে ছেলের হাত ধরে লঞ্চে বসে থাকে জয়তুন। পাশের বুড়ি বয়সের এক জনের সাথে আলাপ জমে তার। ‘ডাহা শহর হইলো মোগো হাশরখানা। ঐহানে না-ওডলে মোগো বিচার শ্যাষ অইবে না, মা’– পান এগিয়ে দিতে দিতে বলে ঐ বুড়ি। জয়তুন হাত বাড়িয়ে নেয়। বুড়ি বলে, ‘এক শ বারের বেশী অইলো এই লঞ্চে চইররে ডাহায় আই আর যাই। আওয়ারও শ্যাষ অয় না আর যাওয়ারও শ্যাষ অয় না।’
বুড়ির কথাগুলো জয়তুনের বুকে কোথায় যেন সুইয়ের মত বেধে। ভাষা হারিয়ে ফেলে সে। ভাবে– আমরা কি শুধুই এ ভাবে আসা যাওয়া করি? জীবন সুখের হোক আর দুখের হোক–আসা যাওয়া ছাড়া আর কী? এর শেষ নেই? প্রথম যে-দিন বকুলের মায়ের সাথে লঞ্চে উঠেছিল সে স্মৃতি এবার মনে পড়ে তার। মনটা খুব উদাস লাগে।
জয়তুনের মাথাটা ঘুরছে যেন। এর মাঝেই স্বামী করিমের মুখচ্ছবি ভেসে আসে তার অন্তরে। করিমের মুখাবয়ব একেবারেই দুনিয়ার সাধারণ মানুষের মতই লাগছে। সেখানে তার আশেপাশে হিরা জহরতের মত কিছু দেখা যাচ্ছে না।
জয়তুনের কী সব অদ্ভুত ধারণা হতে থাকল– এত আসা যাওয়া, দুনিয়ায় হোক আর বেহেশতেই হোক– তা থেকে মুক্তির যদি একটা উপায় থাকত! বিয়েটা তার কাছে হঠাৎ মনে হলো– নিছক একটা মাখামাখি, মাতামাতি। কিছু ছেলে-পুলে কিংবা মায়ার বন্ধন। যদি এ বন্ধন ছেঁড়া যেত! এ জ্বালা যদি জুড়ানো যেত! যদি নেভানো যেত, ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা যেত! নির্বাণ হত!
এবার আকস্মিকভাবে দুনিয়ার জ্বালা আর বেহেশতের খেলা জয়তুনের কাছে একই রকম মনে হতে লাগলো…





