আমরা সবাই একা। এই পুরো পৃথিবীটা অধিক জনসংখ্যায় হয়তো উপচে পড়ছে কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিটি মানুষ এখানে একা। এমনকি খুব ভিড়ের মাঝে থেকেও তুমি একা। এই একাকীত্ব অসহ্যকর এবং আমি জানি যে তুমি এ থেকে মুক্তি পেতে চাও। তাই তুমি অহেতুক সম্পর্ক তৈরি করো যেন নিজেকে আর নিজের একাকীত্বকে ভুলে থাকতে পারো। অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও তোমার মনে হয় তুমি একা নও।
‘‘মানুষ দারুনভাবে একা”। এই একাকীত্বকে সঙ্গী করে তুমি কেবল দুটি কাজই করতে পারো: হয় তুমি তোমার নিজের মনের মতন একটা দুনিয়া তৈরি করতে পারো, অথবা তুমি সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশ করতে পারো। নিজের মনের মতন দুনিয়া তৈরির অর্থ হলো নানাবিধ সম্পর্ক তৈরি করা যেন তা একাকীত্বকে ভুলিয়ে দেয়। এবং সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশের অর্থ হলো এই একাকীত্বকে গ্রহণ করতে পারা এই অর্থে যে এটাই তোমার প্রকৃতি। এর থেকে দূরে ভাগার চেষ্টা করো না, একে এড়িয়ে চলো না, একে গ্রহণ করো, আলিঙ্গন করো। এটাই তোমার প্রকৃতি। এর থেকে পালিয়ে তুমি কোথাও যেতে পারবে না। তুমি তোমার অসংখ্য জীবনে এই কাণ্ড করেছ এবং ব্যর্থ হয়েছ। ব্যর্থতা ছাড়া এই ক্ষেত্রে তোমার আর কোনো অর্জনই নেই। সন্ন্যাস অর্থ হলো এমন একজন যিনি তার একাকীত্বকে গ্রহণ করতে পেরেছেন। এখন তিনি শিস বাজান না, গান করেন না, কোনো সম্পর্কেও জড়ান না। এখন তিনি নিজের প্রতি সম্পূর্ণরূপে তুষ্ট।
এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করো, তুমি যদি নিজের থেকে পালাতে চেয়ে দৌড়ানো শুরু করো তবে সে দৌড়ের আর শেষ নেই। এবং ততটাই তুমি একাকীত্বের ভয়ে কাবু হয়ে যেতে থাকবে। আর যত তুমি নিজেকে গ্রহণ করতে শিখবে দেখবে যে সেখানে একাকীত্ব নেই, বরং একটা একাকী ভাব রয়েছে। একাকীত্ব এবং একাকী ভাবের মাঝে একটি বিশেষ পার্থক্য আছে। একাকীত্ব মানে হলো সেখানে তুমি অন্য কারো উপস্থিতির প্রয়োজন বোধ করছ। একাকী ভাবের অর্থ হলো, ‘এক’ এর সাথে সংযুক্ত থাকাটায় যখন যথেষ্ট। একাকীত্ব যন্ত্রণাদায়ক কিন্তু একাকী ভাব পরমানন্দের। যখন শংকর বলছেন যে তিনি একা, তখন তিনি নিজের সাথে সংযুক্ত। কিন্তু যখন তুমি বলছ তুমি একা, তখন আসলে তুমি একাকীত্বকে বোঝাচ্ছ।
একাকীত্ব মানে অন্যের উপস্থিতির জন্য আকুলতা আর একাকী ভাব হলো নিজের সংস্পর্শে আনন্দে থাকা। এই একাকী ভাবে তুমি আসলে তোমার নিজের প্রেমে পড়েছ। ধ্যানের অর্থই হলো নিজের প্রেমে পড়া। ধ্যানের অর্থ হলো নিজের সাথে এমন এক সম্পর্ক স্থাপন করা যে সেখানে অন্যের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনই পড়ে না। ধ্যানের অর্থ হলো নিজের মাঝেই পূর্ণতা বোধের প্রাপ্তি। তোমার জগত, সামগ্রিক জগতটা তখন তোমার মাঝে। এখানে আর কোনো খামতি নেই। তুমি সম্পূর্ণ, তুমি সমগ্র, তুমি স্বর্গীয়, তোমার আর কোথাও যাওয়ার দরকারই নেই। এই অভ্যন্তরীণ হালটাকেই বলে ‘সন্ন্যাস’।
আমরা আমাদের আশেপাশে এই বিশাল জগত তৈরি করে নিয়েছি কারণ একাকীত্ব আমাদের দারুনভাবে আহত করে। এই একাকীত্বের শূণ্যতাকে আমরা টাকা দিয়ে, বন্ধুত্ব দিয়ে, পরিবার দিয়ে, ধর্ম দিয়ে, জাতপাত দিয়ে, রাষ্ট্র দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু একে ক্ষতস্থান হিসেবে চিহ্নিত করাটাই ভুল, এ কোনো ক্ষত নয়।
গত রাতে একজন সন্ন্যাস আমার কাছে এসে বলল যে ধ্যান শুরু করার পর থেকে তার হৃদয়ের মৃত্যু ঘটেছে। কোনোরকম সম্পর্ক স্থাপনের কোনো ইচ্ছে তার জাগ্রত হয় না, নারী পুরুষের প্রেমভাব না এমনকি বন্ধুর জন্যেও কোনো ইচ্ছে তার জাগ্রত হয় না। সে খুব দুঃখী ছিলো… কেননা সে পশ্চিমা দেশ থেকে আসা এবং সেখানে এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে প্রেমভাব চলে গেলে সেই মানুষের জীবনের আর কোনো অর্থ থাকে না। আবেগ অনুভূতি হারিয়ে গেলে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবে, এবং জীবন তখন নিরর্থক মনে হবে। তাই সে খুব দুঃখী।
প্রাচ্যে আমরা গভীর গবেষণা করেছি। আমরা জেনেছি যে আমরা যদি অখণ্ডরূপে নিজের মাঝে থাকতে পারি তাহলে সমস্ত সম্পর্ক বিলীন হয়ে যায়। এবং এটা একটা সৌভাগ্যের বিষয়, দুঃখ পাওয়ার মতন কোনো ঘটনা এটা নয়। যখন একজন মানুষ নিজের মাঝে থিতু হতে পারে যৌনতা তার ভিতর থেকে উবে যায় এবং অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের যে ইচ্ছে সেটাও মিলিয়ে যায়। কৃতজ্ঞতাবোধের অনুভূতি এত তীব্র হয় যে কারো সাথে সম্পর্ক তৈরির ইচ্ছের আর জায়গা হয় না। সেই মানুষটা আর কারো সাথে সম্পর্ক করার জন্য ভিক্ষুকের মতো ঘুরে মরে না। সে আর এইকথা বলে না যে ”তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না”। এখন সে একাই বাঁচতে সক্ষম। এবং যে ব্যক্তি একা বসবাস করতে পারেন তিনিই প্রকৃত অর্থে বেঁচে আছেন! অন্য যেকোনো ধরণের বেঁচে থাকা আসলে একটা ছলনা, একটা মায়া। তুমি যদি একাই থাকতে না পারলে তাহলে তুমি অন্যদের সাথে কিভাবে থাকবে?
তাই আমি সেই অল্পবয়সী সন্ন্যাসীকে বললাম, ‘’তুমি ভয় পেও না, অসুখী বোধ করো না। তোমার বোধের সংজ্ঞাটা এখানে ভুল হয়েছে। পশ্চিমের সংজ্ঞাটা ভুল। আনন্দে থাকো, পরমানন্দে থাকো। তুমি চিন্তাও করতে পারবে না যে কোনো সম্পর্ক করার বোধ যে আর তোমার মাঝে উদয় হয় না তার মানে তুমি কতই না সৌভাগ্যবান।’’
সম্পর্ক তোমাকে কেবলই যন্ত্রণা এবং ক্লেশ দিবে। এটা স্বাভাবিক কেননা যখন দুইটি অসুখী মানুষ একসাথে হচ্ছে তারা কি করে একে অপরকে সুখ দিবে? এইখানে গণিতটা একেবারেই স্পষ্ট: যখন দুজন অসুখী মানুষ একসাথে হয় তাদের অসুখীর পরিমাণ কেবল দ্বিগুণ হয় তা নয়, বরং বহুগুণে বেড়ে যায়। তুমি আরেকজন মানুষের খোঁজ করছ কেননা তুমি সুখী নও। যেহেতু তুমি একা সুখী নও, তাই তুমি অন্যের খোঁজ করছ। অথচ সেই অন্য মানুষটিও সুখী নয়, এবং সেও তোমার মতন একই প্রত্যাশা নিয়ে তোমার দিকে চেয়ে আছে। দুজন অসুখী মানুষ সুখের আশায় একে অন্যের দ্বারস্থ হচ্ছে। কিন্তু তারা সুখ পাচ্ছে না। এটা অসম্ভব কারণ দুজন ভিক্ষুক একে অন্যের কাছে ভিক্ষা করছে কিন্তু তাদের কারো ভিক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা নেই। দুজনেই যে ভিক্ষুক! দুজনেই একে অন্যের কাছে প্রত্যাশা করে চলেছে। যখনই তুমি কাউকে ভালোবাসো তুমি প্রত্যাশা করো যেন এর বিনিময়ে সেও তোমাকে ভালোবাসা দেয়। মানুষজন অহরহই আমাকে বলে যে, ‘‘ভালোবাসাতো কেবল দিয়েই গেলাম কিন্তু কিছুইতো পেলাম না’’ কিভাবে তুমি ভালোবাসবে? ভালোবাসা কেবলমাত্র পরমানন্দের উচ্চতর হাল থেকে প্রবাহিত হয়। পরমানন্দের চূড়া থেকে ভালোবাসার নদী বয়ে আসে। তুমি তো সুখী নও, তুমি পরম সুখের ধারে কাছেও নেই, তুমি একজন ভিক্ষুক এবং অন্য মানুষটিও ভিক্ষাবৃত্তি করছে। তোমাদের কারোরই সামর্থ্য নেই একে অন্যকে কিছু দেওয়ার। অথচ তোমরা অপেক্ষা করতে থাকো যদি একটু ভালোবাসা দান-খয়রাতে পাওয়া যায়! যেইনা তোমার অপেক্ষা শুরু হলো তোমার হতাশাও তখন থেকেই শুরু।
যদি একজন মানুষ তার নিজের ভিতর থেকে সুখ না পেতে পারে তাহলে দুনিয়ার কেউ তাকে সুখী করতে পারবে না।
– The Great Transcendence বই থেকে একাংশ বাংলায় সুপ্রভা জুঁই






