সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশ্তী রচিত কোরান দর্শন থেকে সূরা বাকারা এর ৬৫-৬৬ নং আয়াত
৬৫। এবং তোমাদের মধ্য হইতে যাহারা সপ্তম দিবসে সীমালঙ্ঘন করিয়াছে নিশ্চয় তোমরা তাহাদিগকে জান। সুতরাং তাহাদিগের জন্য বলিলাম: “অধম বানর হইয়া যাও।
ব্যাখ্যা: যাহারা সপ্তম দিবসের সীমা লংঘন করে তাহারা যে অবশ্য বানর হইয়া যায় অর্থাৎ নিম্নমানের সৃষ্টিতে অধঃপতিত হয় এ বিষয়টি সর্বযুগের বিধান। এ বিধান বনি ইসরাইলগণ অর্থাৎ সর্বযুগের মহামানবগণ স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। সাধারণ মানুষের জন্য ইহা অজ্ঞাত বিষয়।
৬৬। সুতরাং আমরা ইহাকে (অর্থাৎ বানর হইয়া যাওয়ার ঘটনাকে) একটি দৃষ্টান্ত বানাইলাম: এই ঘটনায় উপস্থিত ব্যক্তিগণের জন্য এবং ইহার পরবর্তীদের জন্য। এবং মোত্তাকিদের জন্য একটি ওয়াজ (অর্থাৎ বক্তব্য বা সাবধান বাণী)।
ব্যাখ্যা: বানরে পরিণত করিবার ঘটনা কোন একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইহা সর্বযুগে ঘটিতেই আছে। সর্বযুগের মোত্তাকিদের জন্য বিষয়টি উল্লেখযোগ্য একটি বক্তব্য। ইহার কারণ কেবল মোত্তাকিগণই এইরুপ অধঃপতন হইতে সাবধানতা অবলম্বন করিয়া থাকে। [দ্রষ্টব্য(৭:১৬৩)]
সূরা আরাফ এর ১৬৪-১৬৬ নং আয়াত
১৬৩। এবং তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর সমুদ্র তীরবর্তী জনপদবাসীদের সম্বন্ধে; যখন তাহারা সাব্বাতে সীমালঙ্ঘন করিত (বা করে) তখন তাহাদের বড় মাছগুলি তাহাদের সাব্বাতকালে মাথা উঁচু করিয়া তাহাদের নিকট আসিত (বা আসে)। এবং যে সময় সাব্বাত পালন করিত না তাহাদের নিকট আসিত না। এইরুপ হইয়া থাকে। তাহারা যে প্রবৃত্তিপরায়নতা করে উহা দ্বারাই তাহাদিগকে আমরা পরিক্ষা করিয়াছিলাম।
১৬৪। এবং যখন তাহাদেরকেই এক উম্মত বলিয়াছিল: “কেন তোমরা এমন একটা কাওমকে হেদায়ত কর যাহাদিগকে আল্লাহ বিনাশ করিবেন অথবা কঠোর শাস্তি দিবেন?” তাহারা (অর্থাৎ প্রচারকরা) বলিলেন: তোমাদের রবের দিকের মজুরীর জন্য (অর্থাৎ অপারগতার কৈফিয়তের জন্য) এবং যেন তাহারা তাকওয়া করে (সেই জন্য)।”
১৬৫। তারপর যখন তাঁহার সহিত সংযোগের বিষয় ভুলিয়া গেল, আমরা উদ্ধার করিলাম তাহাদিগকে যাহারা অসীম মন্দ হইতে নিষেধ করিত, এবং জুলুমকারীদিগকে নিকৃষ্ট একটা শাস্তি দ্বারা ধরিয়াছিলাম, যে ইন্দ্রিয়পরায়নতা তাহারা করে উহা দ্বারা।
১৬৬। সুতরাং যাহা হইতে নিষেধ করা হইয়াছিলো, যখন তাহারা তাহাতে বিরুদ্ধাচারী হইল, তখন আমরা তাহাদিগের জন্য বলিয়াছিলাম: “তোমরা বিতাড়িত বানর হইয়া যাও”।
ব্যাখ্যা ( ১৬৩-১৬৬): সাব্বাত দিবসে সালাত ব্যতীত যে কোন কাজ করা নিষেধ। এই সময়ে যাহাই করা হোক না কেন তাহা সালাতমন্ডিত করিয়া সম্পাদন করিতে হইবে।
ইহুদীদিগের জন্য তাহাদের সাব্বাত দিবস শনিবারের সাংসারিক কার্য করা আইনত নিষিদ্ধ ছিল। তাহাদের আইন অনুসারে সাব্বাতের ধ্যানবিধি ভঙ্গ করিলে প্রাণদন্ডের বিধান ছিল। ইহার কারন তাহাদের ধর্মগ্রন্থের বিধান মতে সেইদিন সালাত ব্যতীত কেহ কোন কাজ করিলে সেই ব্যাক্তি মানুষের দল হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িবে।
সালাত দায়েমী অর্থাৎ সার্বক্ষণিক। মুক্তির লক্ষ্যে জীবনের প্রতিটি বিষয়ের উপর সালাত করিতে হইবে। দায়েমী সালাত শিক্ষা দেবার জন্যই নবীগণ সপ্তাহে একদিন পরিপূর্ণভাবে সালাতে আত্মনিয়োগ করিবার ব্যবস্থা দান করিয়াছেন। সাত দিনের মধ্যে সেই দিনকে সাব্বাত বা সপ্তম দিবস বলে। ইহা সম্পুর্নরুপে সাধনার দিবস হিসেবে নির্ধারিত থাকে। এই দিনটি বাকি ছয় দিনের উপর প্রভাব বিস্তার করে বিধায় ইহার গুরুত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব অসীম।
বিশিষ্ট তিনজন নবী সাপ্তাহিক সপ্তম দিবস নির্ধারিত করিয়াছেন শনিবার, রবিবার এবং শুক্রবার। সাতটি বারের মধ্যে কোন বারই বিশেষ বুজর্গী বা গুরুত্ব বহন করে না। গুরুত্ব বহন করে সেই কাল যাহাতে আত্নদর্শনের সালাত করা হয়।
লোহিত সাগরের তীরে এলাত নামক স্থানে হজরত দাউদ নবীর রাজত্বকালে সাব্বাত দিবসে মাছ ধরিবার অপরাধে একদল ইহুদী বানর হইয়া গিয়াছিল। সেই উপাখ্যানের কথাই এখানে উল্লিখিত হইয়াছে। বিষয়টি স্থান ও কালে আবদ্ধ শুধুমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট ঘটনা নয়, বরং ইহা সার্বজনীন এবং সর্বকালীন একটি বিষয়। সংস্কার সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য যাহারা এই সমুদ্র তীরবর্তী হয় অর্থাৎ সালাত পালনে ব্রতী হয় তাহাদিগের মধ্যে এইরুপ অবস্থা ঘটিয়া থাকে।
ইন্দ্রিয়পথে আগমনকারী বিষয়সমূহের কোনটি কখন আসিল অথবা অতীত হইয়া গেল অসালাতী অবস্থায় তাহা সুষ্পষ্ট দৃশ্যমান হয় না। সালাতকালে সেই বিষয়গুলি স্বরুপ স্পষ্টভাবে ফুটিয়া উঠে যেগুলি আমরা বড় করিয়া দেখি। সাব্বাত পালনকালে বড় বড় মাছগুলি মাথা উঁচু করিয়া আত্নপ্রকাশ করে। অর্থাৎ যে বিষয়গুলি সম্বন্ধে মন অবচেতন ছিল সেইগুলির উপর সালাত বা ধ্যান প্রোয়োগের কারনে সেইগুলি মাথাচাড়া দিয়া স্পষ্ট হইয়া উঠে। এইগুলি যাকাত না করিয়া ধরিয়া রাখিলে শেরেকের অপরাধে অপরাধী হইতে হয়। সাব্বাতের সালাতের সাহায্যে আল্লাহতা’লা মানুষকে পরীক্ষা করিয়া থাকেন। আপন সালাতের মধ্যে গোলযোগ সৃষ্টির কারণে পরজন্মে বানর হইয়া যাওয়ার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া যে কথাগুলি প্রকাশ করা হইয়াছে তাহাতে সালাতের ফলশ্রুতি ব্যক্ত হইয়াছে।
যে ইন্দ্রিয়ের যে – বিষয়গুলির উপর সালাত করা হয় সেইগুলির মোহ যাহাতে মনের মধ্যে জাগিয়া না উঠে বরং তাহা সম্পূর্ণ জাকাত করা হইয়া যায় সেই চেষ্টাই সালাতীকে করিতে হইবে। সালাত করিলে আগমনকারী বিষয়গুলি সুষ্পষ্ট হইয়া জাগিয়া উঠে। সালাত না করিলে কখন কোন বিষয় মন- মস্তিষ্কে প্রবেশ করিল অথবা না করিল তাহা অজ্ঞাতই থাকে এবং এইরুপ অজ্ঞাত এবং অসাবধান অবস্থায় বহু শিরিক মস্তিষ্কে অজ্ঞাতে জমা হইয়া যায়। সাব্বাত পালন করিয়া যাহারা দায়েমীভাবে সালাতী হইয়াছেন তাহাদের নিকট তাহাদের বড় বড় মাছগুলি মাথা উঁচু করিয়া প্রতিদিন আসিতেই থাকে। সুতরাং তাহাদের অজ্ঞাতে শেরেক পয়দা করিতে পারে না। অপরপক্ষে সীমা লংঘনকারী সাব্বাতীগন তাহাদের ধ্যানের মধ্যে আগত বিষয়গুলির মোহ জাকাত করে না।
মুসা নবীর সৃষ্ট উম্মতগুলির মধ্যে কোন এক উম্মতের লোকেরা তাহাদের ইমামগনকে জিজ্ঞাসা করিল: “কেন আপনারা এমন সব লোকদিগকে হেদায়ত করেন (অর্থাৎ ধর্মদেশনা দ্বারা পথ দেখাইবার চেষ্টা করেন) যাহাদিগকে আল্লাহ সালাত গ্রহন না করিবার কারনে বিনাশ করিবেন এবং কঠিন শাস্তি দিবেন?” প্রতি উত্তরে তাঁহারা বলিলেন: “তোমাদের গুরুর আশ্রয়ের দিকে যাইবার যে অসুবিধাগুলি তাহাদের আছে সেইগুলি নিরসনের পথ দেখাইবার জন্যই আমরা হেদায়ত করি যাহাতে তাহারা গুরুর প্রতি কর্তব্যপরায়ন হইতে পারে। তাহারা নিজেরা আপন ভবিষ্যত কর্মপন্থা সঠিক গ্রহণ করিবার যোগ্য নহে,কারণ তাহারা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ভবিষ্যৎ- দ্রষ্টা নয়।”
সংসার পরিস্থিতির নানারুপ জটিলতার মধ্যে আবদ্ধ হইয়া মানুষ সালাতের অনুশীলনে অক্ষম হইয়া থাকে, সেখান হইতে উদ্ধার করিবার চেষ্টা করা গুরুগনের নৈতিক দায়িত্ব।
ইহার পরেও যাহারা হেদায়ত গ্রহণ না করিয়া গুরুর সহিত সংযোগ ভুলিয়া থাকে তাহারা তাহাদের প্রবৃত্তিপরায়নতা দ্বারা শাস্তির মধ্যে ধরা পড়িয়া থাকে। অপরপক্ষে যাহারা অসীম মন্দ হইতে মানুষকে নিষেধ করে তাহাদিগকের উদ্ধার করা হয় যেহেতু তাহারা আমানু। অসীম মন্দ এবং অসীম অপবিত্রতা একই কথা। ( দ্রষ্টব্য : ১৫৭)।
- টাইপিং সহযোগী মৈত্রী – তাসলিমা খাতুন


