দ্বিতীয় অধ্যায়
নিজের সাথে ভাব-বিনিময়
আধুনিককালের দুঃখ হলো, একাকীত্ব। অনেক মানুষের মাঝে থেকেও আমরা খুব একা অনুভব করি। এমনকি আমরা কারো সাথে থেকেও একাকী বোধ করি। কেমন যেন একটা খালি খালি ভাব। এটা একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে। তাই আমরা অনেকের সাথে যুক্ত হয়ে এই দুঃখ লাঘবের চেষ্টা করি। আমরা বিশ্বাস করি যে অনেকের সাথে থাকলে পরে আমাদের এই একাকীত্ব ভাবটি কেটে যাবে।
এই সংযোগ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার জন্য প্রযুক্তি আমাদের কাছে নানান ধরণের যন্ত্র সরবরাহ করেছে। কিন্তু মুশকিলটা হলো এইসমস্ত বিষয়ে সংযুক্ত থাকার পরেও আমরা একাকীত্ব বোধ করি। আমরা ই-মেইল চেক করি, মেসেজ পাঠাই, মাঝে মাঝে একই দিনে কয়েকবার স্ট্যাটাস আপডেট করি। আমরা নিজেদের ভাবনা শেয়ার করতে চাই। পাশাপাশি অন্যেরটা গ্রহণ করতেও চাই। আমরা হয়তো সারাটাদিন ধরেই সংযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু একাকীত্ব কমিয়ে আনার জন্য কোনো চেষ্টা করি না।
আমরা সবাই ভালোবাসার জন্য ক্ষুধার্থ, কিন্তু এই খিদা মেটানোর জন্য ভালোবাসার উৎপাদন কীভাবে করতে হবে সে নিয়ে আমরা কিছুই জানিনা। যখন আমাদের একা লাগে তখন আমরা চেষ্টা করি যেন একাকীত্বের এই দুর্বিষহ অবস্থাটি আমরা প্রযুক্তির নানা উপাদান ব্যবহার করে কমিয়ে ফেলতে পারি। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয় না। আমাদের ইন্টারনেট আছে, ই-মেইল আছে, ভিডিও কনফারেন্স আছে, মেসেজ করা এবং পোস্ট দেওয়া, নানাধরনের এপ্স, চিঠি এবং ফোন কল সবই আছে আমাদের। তারপরেও আমাদের যোগাযোগে কোনো উন্নতি এসেছে তা আমরা হলফ করে বলতে পারবো না।
আমাদের অনেকেরই মুঠোফোন আছে। আমরা অন্য মানুষদের সাথে তা দিয়ে সংযোগে থাকতে চাই। কিন্তু এই ফোনের প্রতি খুব বেশি আস্থা করা আমাদের উচিৎ হবে না। আমার একটাও ফোন নেই, কিন্তু তার জন্য বহির্বিশ্বের সাথে সংযোগ নেই বলে মনে হয় না। বরঞ্চ, মুঠোফোন নেই বলে আমার নিজের জন্য, এবং বাকিদের জন্যেও আমার অনেক সময় রয়েছে। আপনি বিশ্বাস করেন যে মুঠোফোন আছে বলেই অন্যদের সাথে যোগাযোগ আছে। কিন্তু আপনার আলাপের বিষয়বস্তু যদি অকৃত্রিম না হয়, তাহলে একটা যন্ত্র দিয়ে কারো সাথে কথা বলার মানে এই না যে সেখানে কোনো ধরণের যোগাযোগ ঘটছে। যোগাযোগের জন্য আমরা প্রযুক্তিকে বেশিমাত্রায় বিশ্বাস করি। এইসমস্ত যন্ত্রের পিছনে আছে আমাদের মন। মন হলো যোগাযোগের সবথেকে মৌলিক যন্ত্রটি। মন যদি অবরুদ্ধ থাকে তাহলে কোনো যন্ত্রের ক্ষমতা নেই আমাদেরকে নিজের সাথে বা অপরের সাথে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতে পারে।
অন্তর্নিহিত সংযোগ
আমাদের মাঝে অনেকেই মিটিং করে বা ই-মেইলের মাধ্যমে অন্যদের সাথে যোগাযোগ করে অনেক সময় কাটিয়ে ফেলি। ফল হিসেবে আমরা নিজেরাও টের পাই না যে আমাদের নিজেদের মাঝে কি চলছে। আমাদের ভিতরে হয়তো ঝড় বইছে। তাহলে তখন কীভাবে আমরা আরেকজন মানুষের সাথে যোগাযোগ নিশ্চিত করবো?
আমরা মনে করি যে, আমাদের প্রযুক্তিগত যত যন্ত্র তা দিয়ে আমরা সংযোগ স্থাপন করি কিন্তু এটা একটা মায়ার খেলা। দৈনন্দিন জীবনে আমরা নিজেদের কাছ থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে আছি। আমরা হাঁটি, চলি ফিরি কিন্তু আমরা জানিনা যে আমরা হাঁটছি। আমরা এখানেই আছি কিন্তু আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না যে আমরা সামগ্রিকভাবে এখানেই আছি। আমরা জীবন্ত কিন্তু আমরা জানিনা যে আমরা বেঁচে আছি। গোটা দিন ধরে আমরা নিজেদের কেবল হারিয়েই চলেছি।
বাকিসব থামিয়ে নিজের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হলো একটা বৈপ্লবিক বিষয়। আপনি বসে গেলেন, এবং নিজেকে ক্রমাগত হারিয়ে যেতে দেওয়ার অবস্থাটা থেকে উদ্ধার করলেন। যা কিছু করছিলেন তার সব থামিয়ে দিন, বসে পড়ুন এবং নিজের সাথে সংযোগ করুন। একেই বলে স্থির চিত্তে জাগ্রত অবস্থা। স্থির চিত্ত হলো বর্তমান মুহূর্তের সম্পূর্ণ জাগ্রত রূপ। এইজন্য আপনার কোনো আইফোন বা কম্পিউটারের প্রয়োজন নেই। আপনার কেবল প্রয়োজন বসে যাওয়া, এবং দম নেওয়া ও ছাড়া। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনি নিজের সাথে সংযোগ ঘটাতে পারবেন। আপনি জানতে পারবেন আপনার দেহের মাঝে কি ঘটছে, আপনার অনুভূতিরা কি বলছে, আপনার আবেগগুলোর কি পরিস্থিতি এবং আপনার কি উপলব্ধি হচ্ছে।


















