তাফসির এবং দ্বৈতবাদ
গোটা তাফসির শাস্ত্র স্বাভাবিকভাবেই দ্বৈতবাদ এর ভিত্তিতে কোরানি ভাবধারা মেলে ধরেছে। এই দ্বৈতবাদের স্বরূপ হলো: আল্লাহ্ এবং তাঁর সত্তা বা অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এই সৃষ্টিজগৎ— এমন ২টি স্বতন্ত্র সত্তার স্বীকারোক্তি। এই তত্ত্ব যেন আল্লাহ্র এর পক্ষে বলছেন :
হে সৃষ্টিজগৎ, আমি আছি আর তোমরাও আছ!
এবং বিপরীতে সৃষ্টিজগতও যেন স্বীকার করছে যে,
হে আল্লাহ্, আমরা আছি আর তুমিও আছ!
এভাবে অস্তিত্বের দ্বৈতসত্তা অর্থাৎ ১. আল্লাহ্র সত্তা এবং ২. সৃষ্টিজগতের সত্তা—একে অপরকে স্বীকৃতিজ্ঞাপন এবং পরস্পর সমান্তরাল হয়ে বিরাজমান বলে চিরন্তনতা লাভ করছে। এই অস্তিত্বের কী রহস্য—তা জানার কোনো প্রচেষ্টা তাফসির শাস্ত্রে নেই। ফলে গোটা কোরানের তাফসির পড়েও কেউ অস্তিত্ব বিষয়ক প্রশ্নের কোনো সমাধান খুঁজে পাবেন না।
পৃথিবী বিখ্যাত সকল তাফসিরের অবস্থা এমন। তফসিরে কাশ্শাফ, বায়জাভি, কাছির, কবির, জালালাইন, ফি জিলালিল কুরান, তাফহিমুল কোরান, বয়ানুল কোরান, মাআরেফুল কোরান, মাজহারি ইত্যাদি ব্যাখ্যাগ্রন্থ খুব জনপ্রিয়। এ সবের কোনো কোনোটি দু একটি আধ্যাত্মিক সুফি চিন্তা গ্রহণ করলেও তা যথেষ্ট নয়। ফলে তা সার্বিকভাবে দেখলে কিছুটা অসংলগ্ন মনে হবে।
ইসলাম আসলে একত্ববাদী বা তৌহিদপন্থী। দ্বৈতবাদ কোরানের মূল দর্শন তথা মৌলিক তত্ত্ববিরোধী। সাধারণভাবে পবিত্র কোরানের বর্ণনাভঙ্গি দ্বৈতবাদী। কিন্তু এর অন্তরালেই একত্ববাদ বা তৌহিদ লুকিয়ে রয়েছে, যা বিশেষ যোগ্যতার অধিকারীগণ ব্যাখ্যা করতে পারেন।
একত্ববাদী তাফসির
আল্লাহ্কে একজন মেনে যে একত্ববাদী ধারণা তা ইসলামে ব্যাপক পরিসরে রয়েছে। কিন্তু অস্তিত্বকে একক মেনে যে একত্ববাদী ধারণা তা খুব স্বল্প পরিসরে গৃহীত হয়েছে। কিছু গভীর তত্ত্বজ্ঞানী সুফি দার্শনিক এমন চেতনা লালন করে থাকেন। কিন্তু ইসলামি জগতে তাঁদের দ্বারা খুব বেশি সাহিত্য তৈরি হয় নি। তাফসির বা তাবিলও উল্লেখযোগ্যভাবে হয় নি। এ সংকট থেকে উত্তরণ খুব প্রয়োজন বৈকি।
আসলে ইসলামের একত্ববাদ বা তৌহিদতত্ত্ব নিয়ে মুসলিম জগতে তেমন আলাপ নেই। সালাফি-ওহাবিগণ যে একত্ববাদের কথা বলেন তা আসলে খুব হাল্কামানের কিছু কথা (বিষয়টি নিয়ে কিছু আলাপ রয়েছে আমার লেখা ‘কোরানে মানুষতত্ত্ব’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডে, আগ্রহী পাঠক দেখে নিতে পারেন)। তৌহিদ বিষয়টি যার কাছে খোলাসা নয়, তার কাছে কোরানের মর্মবাণী অনুধাবন কিভাবে সম্ভব? অথচ আধুনিক যুগে এ কাজটা খুব সহজেই করা যেতে পারে।
তৌহিদ বা একত্ববাদী কোরানি ব্যাখ্যার একট নজির গ্রন্থ হলো বাংলায় লেখা ‘কোরান দর্শন’ নামক ৩ খণ্ডের একটি চমকপ্রদ গ্রন্থ। যদিও প্রচলিত আলেম সমাজ তা সাদরে গ্রহণ করতে রাজি নন বলেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু তাঁদের অনীহায় কোরানি তৌহিদপন্থী সত্যের কিছু ব্যত্যয় ঘটে না।
‘তফসীরে কোরানুল করিম’ থেকে ‘কোরান দর্শন’
একেবারে আধুনিক যুগে এসে সুফি খাজা সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতী (১৯১৪-২০০৬) পবিত্র কোরানের একটা উদাহরণমূলক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনের প্রথম পর্যায়ে ‘তফসীরে কোরানুল করিম’ নামে ধারাবাহিকভাবে কোরানের তাফসির প্রকাশ শুরু করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাঁর দ্বারা লিখিত গ্রন্থটি চরম প্রতিকূলতার শিকার হয়। তাঁর লেখা আরো কয়েকটি বইয়ের মতো এ তাফসির গ্রন্থটিও সরকারিভাবে নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়।
পরবর্তীতে তিনি নতুন করে কোরানের ব্যাখ্যা লিখতে শুরু করেন এবং তা ‘কোরান দর্শন’ নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখা এই তাফসিরটি তাবিলধর্মী ব্যাখ্যা বলা যায়। তাফসিরের প্রচলিত নীতিমালা ছেড়ে এক নতুন চেতনার আলোকে তিনি তাঁর ব্যাখ্যা প্রস্তুত করেছেন। তাঁর গৃহীত নীতিমালার মূল কথা হলো:
১. পবিত্র কোরান সৃষ্টি-জ্ঞাপক গ্রন্থ এবং তা মানব জীবনের একটি প্রতিচ্ছবি প্রকাশ করে। আর মানব জীবন হঠাৎ করে শুরুও হয় না, শেষও হয় না। তা দীর্ঘকাল ব্যাপী চলতেই থাকে। ফলে জন্ম জন্মান্তরের ভিতর দিয়ে মানুষ আল্লাহ্র দিকে ছুটে চলে। সৃষ্টির বন্ধন থেকে মুক্ত হলেই তার যাত্রা শেষ হয়। এমন ভাবধারায় কোরানের বাণী সমৃদ্ধ।
২. আধ্যাত্মিকতা ছাড়া নিছক বস্তুগত চেতনা মূল্যহীন। কোরানে তাই আত্মিক বক্তব্যই প্রধানরূপে প্রকাশ পায়।
৩. গুরুবিনে সব বৃথা। একজন জ্ঞানী মানুষের নিকট সমর্পিত ভাব নিয়ে জীবনকে নতুন করে দেখতে হয়। যা কোরানি ভাবধারা প্রকাশের একটি অন্যতম অবলম্বন।
৪. বিরামহীনভাবে সালাত কর্মে লেগে থাকা। কোরানের ভাষায় ‘দায়েমি সালাত’ এর চর্চার মাধ্যমেই প্রাপ্ত যোগ্যতার আলোকে কোরানি বক্তব্যের মর্ম বুঝা যায়।
৫. কোরানের বক্তব্য মূলক ভাষায় প্রকাশ করা হয় নি। বরং মূলক শব্দের অন্তরালে রূপক ভাবধারা লুকিয়ে রয়েছে। উপযুক্ত যোগ্যতা দ্বারা এবং জ্ঞানী গুরুর তত্ত্বাবধানে যা উদ্ধার করা উচিত।
৬. সাংকেতি চিহ্ন ‘মদ’ এর ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই চিহ্নটি শুধু পড়ার সময় একটু টেনে টেনে পড়ার জন্য নয়। বরং কোনো শব্দের উপর মদ ব্যবহার করে তার অর্থকে বিশেষায়িত করা হয়েছে। যা অস্বীকৃত হলে কোরানি বক্তব্য বুঝা যায় না।
উপরিউক্ত মৌলিক ভিত্তিকে সাথে নিয়েই কোরানের তাফসির বা তাবিল করা যায়। তাহলে কোরান স্বমহিমায় তার ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ করবে। তা না-হলে কোরান ‘জীবন দর্শন’-এর বদলে ‘জীবন বিধান’ হয়ে যায়। তখন এক কথার সাথে আরেক কথার মিল থাকে না। সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ কিংবা সন্ত্রাসের মন্ত্র বলেও কোরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায়। কোরানের স্ববিরোধিতার দরুণ নাসেখ-মানসুখ তত্ত্ব আবিষ্কার করতে হয়। এবং এর আওতায় অনেক আয়াত বা বাক্যকে বাতিল করে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। যা রাজকীয় তফসিরে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু কোরান সকল দুষ্ট অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
বর্তমানে ৩ খণ্ডে কোরান দর্শন পাওয়া যায়। বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে কোরান দর্শন প্রকাশ হচ্ছে। অবশ্য কোথাও কোথাও অনাকাঙ্ক্ষিত মুদ্রণ ত্রুটি রয়েছে।
প্রথম খণ্ডে মোট ৭টি সুরা রয়েছে। যথা: ফাতেহা, বাকারা, নেসা, আনাম, আরাফ, আনফাল এবং বারাত বা তওবা।
২য় খণ্ডে রয়েছে মোট ১৭টি সুরা। যথা: রা’দ, হিজর, কাহাফ, মরিয়ম, নূর, ফোরকান, আনকাবুত, ফাতির, ইয়াসিন,
সাফফাত, মু’মিন, হা-মিম আস সাজদা, শূরা, যুখরুফ, দুখান, জাছিয়া এবং আহকাফ।
৩য় খণ্ডে রয়েছে মোট ৪৫টি সুরা। যথা: মুহাম্মদ, ফাতাহ, ক্বাফ, তূর, নজম, কামার, আর-রাহমান, ওয়াকেয়া, হাদীদ,
হাশর, জু’মা, মুলক, মা’রেজ, নূহ, জিন্ন, মুদাস্সির, কিয়ামাত, দাহার/ইনসান, তাকবির,
ইনফিতার, মুতাফফিফীন, ইনশিকাক, তারিক, আ’লা, আল-ফজর, শামস, লাইল, ইনশিরাহ,
তীন, আলাক, কাদর, বায়িনা, যিলযাল, আদিয়া, তাকাসুর, ফীল, কুরায়শ, মাউন, কাওছার,
কাফিরুন, নাসর, লাহাব বা মাসাদ, এখলাস, ফালাক এবং নাস।
১১৪টি সুরার মধ্যে মোট ৬৯ টি সুরার মর্মার্থ প্রকাশ পেয়েছে কোরান দর্শনে। বাকি ৪৫টি সুরা তিনি বাদ রেখেছেন। হয়ত তাঁর কোনো যোগ্য উত্তরসূরি কোনো সময় তা সম্পন্ন করতে পারেন।
কোরান দর্শন থেকে সুরা বাকারা অংশটুকু ইংরেজিতে Philosophy of the holy Quran নামে ভাষান্তর করেছেন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র Shaik Sadi Ahmed. উপযুক্ত ব্যক্তি কর্তৃক কোরান দর্শন বিভিন্ন ভাষায়, বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায়, অনুদিত ও বেশি করে প্রচার হওয়া কাম্য।
অস্তিত্বের একত্ববাদ বুঝার জন্য এমন তত্ত্বভিত্তিক কোরানি ব্যাখ্যা খুব প্রয়োজন। জীবন-জগৎ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা অর্জন, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি লাভ, বিশ্বজনীন মানবতাবোধ, জগতের সকল মহামানবদের আপনজন মনে করতে পারা, চরম আধ্যাত্মিক বিকাশ সাধন, সুন্দর সমাজ গঠন ইত্যাদি লক্ষে কোরানের এই ব্যাখ্যা গ্রন্থটি খুব মূল্যবান বলে না-মেনে উপায় নেই।
কোরানি ব্যাখ্যার সাথে আহলে-বাইতের সম্পর্ক
কোরানের ব্যাখ্যার সাথে রসুলুল্লাহর আহলে তাঁর বাইতের সম্পর্ক খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আধ্যাত্মিকতা, দায়েমি সালাতের প্রতিষ্ঠা, গুরুরূপে দায়িত্ব পালন ইত্যাদির সাথে তাঁর সরাসরি সম্পর্কিত। বিষয়টি খুব সহজে বোধগম্য একটি হাদিসের আলোকে বুঝতে চেষ্টা করা যায়। ‘হাদিসে সাকালাইন’ বলে বিখ্যাত একটি হাদিস রয়েছে, যদিও হাদিসটি রাজনৈতিক কারণে তেমন চর্চা করা হয় না। কিন্তু এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ববহ হাদিস। হাদিসের মূল অংশ:
… রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম একদিন মক্কা মদীনার মধ্যবর্তী ‘খুম্ম’ নামক স্থানে দাড়িয়ে আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। .. .. .. আমি তোমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দু’টো জিনিস [সাকালাইন] রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব। .. .. .. তারপর বললেন, আর [দ্বিতীয়টি] হলো ‘আমার আহলে বায়ত’। আর আমি আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমি আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমি আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি [৩ বার]। (মুসলিম ৫ম খণ্ড, হাদিস ৬০০৭, পৃ. ৩৮৪, ইফাবা)
অন্য আরেকটি হাদিস :
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদের কাছে এমন কিছু বস্তু রেখে যাচ্ছি তোমরা যদি সেসব ধারণ করে রাখ, তবে আমার পরে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না তোমরা। এর একটি আরেকটির চেয়ে মহান– তা হল আল্লাহর কিতাব। আকাশ থেকে যমীন পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুদৃঢ় রজ্জু; আর আমার পরিবার — আমার আহলে বায়ত। হাওযে কাওছারে আমার কাছে আগমন করা পর্যন্ত এরা বিচ্ছিন্ন হবে না কখনও। তোমরা লক্ষ্য রাখবে এতদুভয়ের ব্যাপারে তোমরা আমার পর কিরূপ ব্যবহার করছ। (তিরমিজি ৬ষ্ঠ খণ্ড, হাদিস ৩৭৮৮, পৃ. ৩৩৩, )
উপরিউক্ত হাদিসদ্বয় মূল্যায়ন করলে যা স্পষ্ট হয় তা হলো: মুসলিম পরিবেশে সাধারণভাবে ‘কোরান আর হাদিস’ বলে যে কথা প্রচলিত আছে ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ দ্বারা তা কিন্তু বলা যায় না। বরং কথাটা হবে, ‘কোরান আর আহলে-বায়েত’। পরবতীতে ‘আহলে বায়েতে’ এর স্থলে ‘হাদিস’ কথাটা রাজনৈতিক কৌশলে চালু হয়েছে, এবং বর্তমানে তা আবার ‘সহি-হাদিস’ হিসাবে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। অথচ সহি হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত যে, ‘কোরান আর আহলে বায়েত’ একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে কারণে রসুলুল্লাহ্ আ. তাঁর গাদিরে খুমের ভাষণে ‘কিতাব-কোরান’ এর পাশে ‘আহলে-বায়েত’-কে যুক্ত করে তাঁদের সম্বন্ধে আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, বিষয়টিতে জোর দেওয়ার জন্য তিনি তা ৩ বার গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং আহলে বায়তকে বাদ দিয়ে কোরানের ব্যাখ্যা কিংবা ভাবধারা প্রকাশ মোটেই সঠিক হতে পারে বলে সুফিগণ মনে করেন না। যদিও রাজনীতি প্রভাবিত আলেমগণ শুরু থেকেই তা মেনে নেন নি। এবং রসুলুল্লাহ্র নির্দেশ অমান্য করে আহলে বাইতকে তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা আজও প্রদান করা হয় নি।
সবচেয়ে ভয়াবহ কথা, রাজনৈতিক কারণে আহলে বাইত নিগৃহীত হওয়ায় তাঁদের থেকে কোরানের তাফসির সংগ্রহ করা যায় নি। ফলে তাফসির করার যোগ্যতা এবং অধিকার কোনোটিই না-থাকা সত্ত্বেও বহু পণ্ডিত কোরানের তাফসির লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। আহলে বাইতকে বাদ রেখে ধর্মীয় আলেমগণ তাফসিরের এমন সব নীতিমালা তৈরি করেছেন যাতে রাজ-পরিবারসহ কিছু সুবিধাভোগী মানুষের তা কাজে লাগে। এতে পবিত্র কোরান যেমন তার মহিমাচ্যুত হয়ে পড়েছে, তেমনি বিশ্বজনীনতা খুইয়ে তা হয়েছে সাম্প্রদায়িক, নাসেখ-মানসুখে ভরা (এক আয়াত অপর আয়াত দ্বারা বাতিল করার ধারণা), বাস্তব-আধ্যাত্মিকতাহীন এক কিচ্ছা কাহিনীতে ভরপুর একটি গ্রন্থ।
সামাজিক পরিবেশ থেকে যখন আহলে বাইতের সদস্যগণ খতম হয়ে গেলেন কিংবা সামাজিক অবস্থান থেকে আড়ালে চলে গেলেন, তখন থেকেই তাফসির লেখার ধুম পড়ে গেল। তাই দেখা যায় আব্বাসি যুগে বহু তাফসির লেখা হয়েছে কিংবা লেখানো হয়েছে।
তাফসির ও বিজ্ঞান
বস্তু বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে অনেকে ধর্মের কথা বলতে খুব আগ্রহ বোধ করেন। এরই একটি রূপ হলো বিজ্ঞানভিত্তিক তাফসির। বস্তুবিজ্ঞানের নানান তথ্যকে কাজে লাগিয়ে কোরানের বেশ কিছু বাক্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করে অনেকে কোরানের মহিমা তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
জগতের সকল মহান ধর্মীয় কাঠামোয় বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ইসলাম ধর্মেও তা খুব স্বাভাবিকভাবেই থাকবে। কোরানে তার বহু নিদর্শন রয়েছে। প্রাচীন বা আধুনিক আরবিতে ব্যবহৃত এলেম/ ইল্ম্ (-عِلْم জ্ঞান/বিজ্ঞান- science) আলেম (عالِم -বিজ্ঞানী- scientist) কিংবা হিকমা/ হেকমত (حِكْمَة- প্রজ্ঞা- wisdom) বা হাকিম (حَكيم -প্রজ্ঞাবান- wise) শব্দগুলো কোরানের পাঠকের নিকট খুব পরিচিত শব্দ। আর ‘আলিমুল হাকিম’ নামটি কোরানে বহুল ব্যবহৃত/ প্রচারিত আল্লাহ্র পরিচিতি। তাহলে বুঝা যায়, কোরানি ভাষায় সর্বত্র বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই বিজ্ঞান কি আধুনিক যুগের বস্তু বিজ্ঞান?
মানুষ স্থূলভাবে বিজ্ঞান/ বৈজ্ঞানিক বলতে নিছক বস্তুবিজ্ঞানকেই বুঝে থাকে। ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বললে কি রসায়ন পদার্থবিদ্যার মতো কিছু বুঝায়? একটি প্রসঙ্গ মনে রাখা উচিত, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি এক নয়। মূলগতভাবে বিজ্ঞান সর্বযুগে একই, কিন্তু প্রযুক্তি পরিবর্তনশীল।
ধর্মজগতে সুদীর্ঘকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসা ‘বিজ্ঞান’ কথাটি আধুনিকযুগে এসে এক রকম ছিনতাই এর শিকার হয়ে নতুন একটি রূপ পরিগ্রহ করেছে। ফলে বিজ্ঞান আর ধর্ম আলাদা হয়ে পড়েছে, তাদের মাঝে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। যাঁরা ধর্ম নিয়ে কাজ করেন তাঁরা তাঁদেরই ধর্মগ্রন্থের শব্দ বা পরিভাষা ‘বিজ্ঞান’ বোঝেন না। আবার যাঁরা আধুনিক বিজ্ঞানের দাবিদার তাঁরাও এখন জানেন না যে, ‘বিজ্ঞান’ শব্দটিই এসেছে ধর্মজগত থেকে। (উপনিষদে আছে : অন্নময় কোষ, প্রাণময় কোষ, মনোময় কোষ, ‘বিজ্ঞান’ময় কোষ, আনন্দময় কোষ। দেখুন: তৈত্তিরীয় উপনিষদ, পৃ. ৪৯৫-৫০৭—স্বামী লোকেশ্বরানন্দ। বৌদ্ধ গ্রন্থাবলিতে ‘বিজ্ঞানবাদ’ নামে একটি ঘরানার বহু তাত্তিক আলাপ রয়েছে। দেখুন: গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন —ড. সুকোমল চৌধুরী, পৃ. ৩৪৬-৫৯)
এই রকম এক পরিস্থিতিতে অনেক পণ্ডিতব্যক্তি কোরানের কোনো কোনো বাক্যকে বিজ্ঞানের সূত্র ইত্যাদি বলে গর্ববোধ করেন—এটা ত্রটিপূর্ণ। যেমন, ড. মরিস বুকাইলি নামে একজন পশ্চিমা লেখক The Bible, the Qur’an and Science (প্রকাশকাল ১৯৭৬, বইটির ‘বিজ্ঞান কোরান ও বাইবেল’ নামে বাংলায় অনুবাদ রয়েছে) নামে একটি সাড়া জাগানো বই লেখেন। এতে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ব্যবহার করে কোরানের বহু শব্দের/বাক্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টে তা কোরানের পক্ষে যাওয়ায় তা নিয়ে মুসলিম জগতের সবাই খুব খুশি। পবিত্র কোরান আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত হওয়ার আনন্দে পাঠকগণ গর্বিত। সত্যিকার অর্থে, কোরানের বক্তব্য বিষয় বস্তুগতভাবে মেলানোর জিনিস নয়, বরং কোরানে আধ্যাত্মিক নুরানি প্রসঙ্গ কিভাবে বিবৃত হয়েছে তা খুঁজে পাওয়াই আনন্দের বিষয়। কোরানের আধুনিক বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হওয়ার প্রয়োজন নেই। মানবীয় আধ্যাত্মিক জগৎকে এড়িয়ে গিয়ে বস্তুজাগতিক প্রয়োজনে ইসলাম বা কোরানকে ব্যবহার করার নামে আধুনিক বিজ্ঞানের আশ্রয় গ্রহণ মোটেই কোনো ভালো কথা নয়। সুতরাং ‘বিজ্ঞান ভিত্তিক তাফসির’— কথার মাঝে বড় ধরণের ঝুঁকি রয়েছে, তাতে কোরানের দর্শন চাপা পড়ে আবার সেই বিভ্রান্তির তাফসির এর নতুন রূপ হতে থাকবে।
শেষ কথা
পবিত্র কোরানকে তার স্বমহিমায় মেলে ধরতে আরো প্রয়াস প্রয়োজন। এ জন্য দরকার নিবেদিত প্রাণ কিছু মানুষ। এবং ‘সকল মতপার্থক্য সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’- এর মত পরিবেশ। রাজকীয় (রাজা-পছন্দের) তাফসির থেকে সুফি-তাবিল ভিত্তিক ব্যাখ্যায় ফিরে আসা একটি দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ কাজ বটে। যে ভাবে ‘কোরান দর্শন’ আংশিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে তা একদিন পূর্ণতায় পৌঁছাবে, আশা করা যায়। তখন কোরান বিষয়ে মানুষের অনুসন্ধিৎসা যথার্থ আলোর দেখা পাবে। এবং মানবজাতির এটা এক অধিকারও বটে। কোরানের আলোয় আলোকিত হওয়ার একটা অবারিত সুযোগ হয়ত তখন আমরা পাব।
আমরা ‘সাধারণ তাফসির’ থেকে ‘কোরানের দর্শন’-এ ফিরে আসার সেই নুরানি প্রতিক্ষায় রইলাম।
০৪/০৩/২০১৯ [প্রথমবার লেখার সময়কাল]
দিনাজপুর
helalji@gmail.com
[লেখাটি নতুনভাবে পরিবর্ধিত করা হলো। ০৯/০৮/২০২৬]


















