আমি মনে করি আবু জেহেলকে দেখার দুইটি ভঙ্গি আছে।প্রথমটি হলো সুফি জ্ঞানের আলোকে অন্তর্মুখী হয়ে বিষয়টিকে দেখা; দ্বিতীয়টি হলো কোরানে এই নামটি যে কারণে উপমা-অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া। এই ক্ষুদ্র লেখায় আমি দুইভাবেই দেখার একটি সহজ চেষ্টা করছি। সত্যতা ও ভাবের গভীরতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য কিছু দীর্ঘ উদ্ধৃতিও ব্যবহার করেছি।
সুফির চিন্তায়
জাহেল অর্থ, ‘বুদ্ধিজড়তা’। আইয়ামে জাহিলিয়াত মানে, এমন এক সময়কাল যখন অজ্ঞতা প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। এটিকে কেবল ইতিহাসের একটি সময়কালে আটকে দিলে চলবে না। কলিযুগও ঠিক তেমনই। বরং জাহেল প্রসঙ্গে আধ্যাত্মিক অনুভূতির ঘাটতিকে এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
‘‘কেতাবের বক্তব্য বুঝতে না-পারলে, তার তাৎপর্য আত্মগত বা চরিত্রগত না-করলে, পবিত্র গ্রন্থের যে মহানত্ব তার প্রভাবে বা সংস্পর্শে নিজেও মহান রূপে গড়ে না উঠলে গ্রন্থ কেতাব তখন নিছক এক বোঝা স্বরূপ। যা বহন করেও বাস্তবে কিছু ঘটে না। এমন ব্যক্তি যেন উচ্চতর মানবীয় গুণহীন একটা গাধাতুল্য। যেমন, কেউ পানির বোতল পিঠে নিয়ে ঘুরছে অথচ পিপাসায় মরার উপক্রম হয়েছে কিন্তু বোতল খুলে পানি খাওয়ার বুদ্ধি নাই- তার মতো অজ্ঞ বা জাহেল আর কে?
সামাজিক জীবনে দরকারি বিষয়ে জ্ঞানী না-হওয়ার প্রসঙ্গটি কোরানে বর্ণিত ‘অজ্ঞতা বা জাহেলিয়াত’ পরিভাষার অন্তর্গত নয়।
‘আপনি যদি উহাদের ছলনা হইতে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি উহাদের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হইব’। (১২ ইউসুফ: ৩৩ ইফাবা)
উপরিউক্ত বাক্যে যে আবেদন রয়েছে তার তাৎপর্য এই যে, আবেদনকারী এখনো ছলনাময়ীদের কবলে পড়েনি এবং তাই তিনি এখনো অজ্ঞ বা জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য নন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে তাদের ছলনা থেকে রক্ষা না করলে অজ্ঞ বা জাহেলরূপে তাঁর প্রকাশ ঘটবে। ইউসুফ নবির সাথে জড়িত ঐ ঘটনাটি আসলে সকলের জন্যা আদর্শ। আপাতদৃষ্টে, এটি সামাজিক জীবনের একটি প্রসঙ্গ হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কিন্তু ব্যক্তির একান্ত আধ্যাত্মিক চেতনা বা অনুভবের সাথে জড়িত। এরূপে যা মানবীয় সম্ভাবনাকে জ্ঞানময় না-করে অজ্ঞতায় পর্যবসিত করে তাই জাহিলিয়াত’’।
– কোরানে মানুষতত্ত্ব, পরম্পরা ৫ (রচয়িতা: হিলালুজ্জামান হেলাল)
ব্যক্তি আবু জেহেল
আবু জেহেল ছিলেন গভীর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তদানীন্তন কোরাইশ প্রবীণ নেতারাও তাকে তার দক্ষতা বা উপলব্ধির জন্য বিশেষভাবে বিবেচনা করত। সে তাদের গোপন বৈঠক বা শলা-পরামর্শ গৃহ ‘দারুন নাদওয়ার’ এ যোগ দিতেন। এ সম্মেলনে প্রবেশের জন্য বয়স লাগত কমপক্ষে ৪০ বছর অথচ তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। তার উপাধি ছিল আল-হাকাম অর্থাৎ ‘বিজ্ঞবিচারকের পিতা’ বা জ্ঞানীর বাপ। মূলত তার বিজ্ঞতা ছিল পার্থিব ক্ষেত্রে। ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যাত্ম জগতে তার বিজ্ঞতার পরিবর্তে ছিল শুধুই বিভ্রান্তি। ফলে রসুলুল্লাহ তাকে আবু জেহেল উপাধি দেন। (সীরাতুল মুস্তফা ২য় খণ্ড, পৃ-৯০) এর অর্থ ‘অজ্ঞলোকের বাপ বা পিতা’। তার আসল নামের বিপরীতে শেষোক্ত চারিত্রিক উপাধাটিই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। এটা এক আশ্চর্য ব্যাপার- হাকিম হয়ে গেলেন জাহেল!
– কোরানে মানুষতত্ত্ব পরম্পরা ৫ (রচয়িতা: হিলালুজ্জামান হেলাল)
আবু জেহেলের আসল নাম, আমর ইবনে হিশাম। তিনি হযরত ওমরের মামা ছিলেন।
আমার ভাবনা: আধুনিককালের আবু জেহেল
সুফি মতে, আধ্যাত্মিক জ্ঞানহীন মানুষ প্রত্যেকেই একেকজন ছোট বা বড় ‘আবু জেহেল’ বিশেষ। ফলে সাধকগণ ব্যতীত বাকিরা এই খেতাবের অংশীদার। এক্সট্রিমিস্টদেরকে কেবল যদি লিবারেলরা এই তকমা দেন তাহলে যেমন চলবে না, আবার লিবেরেলদেরকেও এক্সট্রিমিস্টরা এই তকমা দেওয়ার এখতিয়ার রাখেননা। মানে কেবল এই দুই ব্যক্তিবর্গের মাঝে এই তকমা সীমাবদ্ধ নয়।
আমাকে আকৃষ্ট করে আবু জেহেলের দুনিয়াবি জ্ঞানের যে ভাণ্ডার ও তার যে মোহনীয় গুণ সেই ব্যাপারটি। এই যে এত বোঝাপড়া যে মানুষটির, যে সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জাতির জন্য, যার বেশ ফ্যান ফলোয়ার, এবং তার যে চারিত্রিক দাপট সেটাই আমাকে আকৃষ্ট করে। কারণ আমি আমার আশেপাশে এমন মানুষ দেখি। যারা আসলেও হাকিম, জ্ঞানীর বাপ। এমন কিছু জ্ঞানীর বাপে আমিও মুগ্ধ। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো লম্বা সময় ধরে একটা লিগেসি বানিয়ে তারা শুষে নিচ্ছেন পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর সৃষ্টির পবিত্র সম্ভাবনাকে, হয়তো অজান্তেই।
কোরান দর্শনে ‘জিন’ পর্যায়ের মানুষদের প্রসঙ্গে বলা আছে যে তারা আগুনের তৈরি। কেননা আগুনের শিখা মাথা নোয়াতে জানেনা। মাথা না নোয়ালে সিজদাহ হবে না। সিজদায় না গেলে আত্মসম্পর্মণ হলো না। অতএব, সে মুসলিম হলো না। তার মাঝে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেলো না। বুদ্ধিধার ও চিন্তার যে প্লেজার ও অহম সেটা জিনের বৈশিষ্ট্য। তৌহিদ-জ্ঞান বিবর্জিত এমন একজন ব্যক্তি বেশ ভালো মানের একজন আবু জেহেল বলতে হবে। যেকোনো ধারণার সাথে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তিনি ডান বাম, লাল নীল, আস্তিক নাস্তিক সবই হতে পারেন।
''জিন: জাতি হিসাবে ইহারা মানুষ হইতে মর্যাদায় নিম্নমানের। ইহারা সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তি বিশিষ্ট আগুনের তৈয়ারী জীব। আদমের সন্তান হিসাবে মানুষের মধ্যে ফেরেস্তা এবং জিনভাব উভয়ই বিদ্যমান। সুতরাং যাহাদের মধ্যে জিনভাব বেশী প্রবল তাহাদিগকেও জিন বলা যাইতে পারে।''
– কোরান দর্শন , শব্দ সংজ্ঞা, সুফি সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতি
জন্ম যে ঘরে, সে ঘরের ধর্ম পালন করা হয় কথাটা সকলেই বোঝে। বুঝেও ধর্মীয় নানা ভীতি ও অহমের চোটে ব্যাপারটিকে অনেকেই মানতে চাননা বা বলতে চাননা। কিন্তু এ প্রসঙ্গেও উল্লেখ আছে,
''যখন তাহাদিকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহা তোমরা অনুসরণ কর’, তাহারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদিগকে যাহাতে পাইয়াছি তাহার অনুসরণ করিব।‘ এমনকি, তাহাদের পিতৃপুরুষগণ যদিও কিছুই বুঝিত না এবং তাহারা সৎপথেও পরিচালিত ছিল না, তথাপিও?''
– ২ বাকারা: ১৭০, ইফাবা
সুফি সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতি এর কোরান দর্শন থেকে আয়াতটির ব্যাখ্যা: ''পিতৃপুরুষদিগকে অনুসরণ করিবার অভ্যাস ধর্মজীবনে সত্যলাভের পথে শক্তিশালী একটি বাধা। মানুষ পিতৃপুরুষের দোহাই দিয়া ধর্মের মধ্যে মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিতে ভালোবাসে। এইজন্য জনগণ পূর্বপুরুষদের অনুসৃত মিথ্যা ত্যাগ করিয়া উপস্থিত মহাপুরুষ হইতে সত্যপথ গ্রহণ করিতে চাহে না। অথচ পিতৃপুরুষগণ যাহা অনুসরণ করিয়া গিয়াছে তাহা বুদ্ধি প্রয়োগ করিয়া করে নাই। অর্থাৎ ভোগকে উপভোগে পরিণত করিবার বুদ্ধি প্রয়োগ করে নাই, বরং মনুষ্য জীব হিসাবে জৈবিক ভোগের ধারাই অনুসরণ করিয়াছে। ‘কোনো বিষয়েই বুদ্ধি খাটায় নাই’ অর্থাৎ কোনোও একটি বিষোয়মোহ হইতেও মুক্তিলাভের বুদ্ধি খাটায় নাই। সেইজন্য হেদায়েতও পায় নাই।''
অতএব, বাপ দাদার ধর্ম মেনে যে এক্সট্রিমিস্ট আবু জেহেল আছে বলে অনেকে ভাবছেন তাদেরকে চেনা সহজ। যারা নাস্তিকদের আবু জেহেল বলতে চান তাদেরকেও চেনা সহজ। কিন্তু আধুনিককালে এসে মনের রাজত্ব দখল করতে আগত বিজ্ঞ, সূক্ষ্ম চিন্তার ব্যক্তিদেরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আবু জেহেল। এবং ভারী বিপদজনক আবু জেহেল তারা। কেননা মানব মনের প্রেম, ভক্তিভাব ও পরম্পরাগত বিষয়গুলোকে অনেকাংশে তারা হাস্যরসে পরিণত করেছেন। উঠতি তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মাঝে এই প্রেমের প্রতি অনাগ্রহ প্রায়শই নজরে পড়ে। হৃদয়টা মেলে ধরতে কোথায় যেন একটা লজ্জাবোধ হয়।
আমি মনে করি এই বুদ্ধিজীবী আবু জেহেলরা সম্ভাবনাময় সন্তানদের মূলত দ্বন্দে ফেলে রাখেন। আমার মনে করায় ত্রুটি থাকতে পারে, আমার মনে করায় রদবদল আসতে পারে। কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে এবং আমার বিগত জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি যা অনুভব করছি সে অনুযায়ী এমন একটা ভাবনায় আসার ক্ষেত্রে আমার খুব জোরালো মনোভাব আছে।
তাই আমি মনে রাখতে চাই,
‘’তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদিককে এড়াইয়া চল।”
– ৭ আরাফ: ১৯৯ ইফাবা
সুফি সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতি এর কোরান দর্শন থেকে আয়াতটির ব্যাখ্যা: ''মহানবী জনগণলে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছেন যে, দুর্বল আল্লাহ হইতে তাহারা যাহাদিগকে সাহায্যার্থে ডাকিয়া থাকে (তাহা বিষয়াশক হউক বা মানুষ হউক) তাহারা কাহাকেও মুক্তিপথের সাহায্য দানে সমর্থ নহে এবং তাহারা আপন নফসকেও সাহায্য করে না, করিতে পারে না। কারণ তাহারা ধর্ম বিষয়ে অজ্ঞান এবং ভ্রান্ত।
নূর-মোহাম্মদ মানুষ-মোহাম্মদকে বলিতেছেন: ধর্ম বিষয়ে এইসকল ভ্রান্ত লোককে হেদায়তের দিকে ডাকিলেও তাহারা শুনে না, যেহেতু তারা ধর্মরাশির গুরুত্ব উপলব্ধি করে না। সত্যিকার অর্থে তাহারা বধির, অন্ধ। তুমি দেখিতেছ যে, তাহারা তোমার দিকে তাকাইয়া আছে কিন্তু তাহারা তোমার বাহ্য মানবাকৃতি ছাড়া কিছুই দেখিতেছে না। তাহারা অসালাতী। তাই তাহারা অন্তর্দৃষ্টিহীন জ্ঞানান্ধ।
অতএব এইসকল অন্ধজনের প্রতি স্নেহের ক্ষমার দৃষ্টিদান কর। স্নেহের সহিত তাহাদিককে ধর্ম দর্শন দিক্ষা দাও তথা সালাত শেখাও। যেসকল মূর্খজন সালাতের শিক্ষা গ্রহণ করিতে রাজি হইবে না তাহাদিগ হইতে সরিয়া থাক। তাহাদিগকে লইয়া অকারণ সময় নষ্ট করিয়া লাভ নাই’’।
একজন অসালাতী জাহেল ব্যক্তি সামাজিক চোখে খারাপ মানুষ যেমন হতে পারেন, তেমনি ভালো মানুষও হতে পারেন। ব্যক্তি পর্যায়ে সাধনার ক্ষেত্রে মনের দ্বিধা দূর করার জন্য যে সঙ্গ প্রয়োজন, নিজের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য বাচালতাহীন যে সমপর্ণের হাল প্রয়োজন তার জন্য নিজ নিজ আবু জাহেলকে চিনতে পারা একটি জরুরি বিষয়।
এই কারণে দেখা যায়, সাধকেরা বুদ্ধিজীবি মানুষদের পারতপক্ষে এড়িয়ে চলেন। ভক্তিকে আধুনিক মানুষ ভুলভাবে দেখতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় পেষণ ও পীড়নের পাঠে তারা এতই মজবুত যে এই পরম প্রেমের মাঝেও তারা মগজধোলাই দেখতে পান। একমাত্র রসের আলাপকারীরাই জানেন যে অন্তর শীতল হয় কেবল সাধুসঙ্গে। সভা বা সেমিনারে তাত্ত্বিক তৃপ্তি পাওয়া যায়। সেটিও মন্দ নয়। কিন্তু সেটিই যদি পারমার্থিকভাবকে খোঁজার একমাত্র জায়গা হয়ে থাকে তাহলে বিপদ আছে বৈকি!
সুফি দৃষ্টিতে, যেখানে জ্ঞান আছে কিন্তু বিনয় নেই, বুদ্ধি আছে কিন্তু সমর্পণ নেই, বিশ্লেষণ আছে কিন্তু হৃদয়ের রস নেই—সেখানেই আবু জেহেলীয়তার জন্ম হতে পারে।
আবু জেহেল কেবল ইতিহাসের একটি চরিত্র নন; তিনি মানুষের অন্তর্জগতে পুনরায় জন্ম নেওয়া এক মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রবণতার নাম। যেখানে বুদ্ধি আছে কিন্তু বিনয় নেই, জ্ঞান আছে কিন্তু আত্মসমর্পণ নেই, ভাষা আছে কিন্তু হৃদয়ের রস নেই সেখানেই আবু জেহেলীয়তা জন্ম নিতে পারে। তাই সাধনার পথে সবচেয়ে জরুরি কাজ বাইরের আবু জেহেলকে চিহ্নিত করা নয়, বরং নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই অহং, জড়তা ও বুদ্ধির মোহকে চিনে ফেলা।
যে মুহূর্তে মানুষ নিজের অন্তর্গত জাহেলিয়াতকে দেখতে শেখে, সেই মুহূর্ত থেকেই তার জ্ঞান হৃদয়ে অবতীর্ণ হওয়ার পথ খুলে যায়।






