জ্ঞান যখন নারীর মুখ, কিন্তু কণ্ঠস্বর নয়

জ্ঞানকে জাগতিকই হোক বা আধ্যাত্মিক পথের সন্ধানেই হোক গুরুত্ব দেয়া হয়। বহু ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিতে এই প্রজ্ঞা, জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা হয় নারীকে।

সংস্কৃত ‘প্রজ্ঞা’ শব্দটিই স্ত্রীবাচক। বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞা (Prajñā) বা জ্ঞান স্ত্রীবাচক শব্দ। আরবি ভাষায় হিকমাহ (hikmah) শব্দটিও স্ত্রীবাচক, যা জ্ঞানকে নারীত্বের সাথে ভাষাগতভাবে যুক্ত করে। ইসলামি দর্শনে হিকমাহ জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও নৈতিক প্রজ্ঞার প্রতীক। তবে কেবল ভাষাগত অলীক ধারণায় নয়, সুস্পষ্টভাবেই নারীর সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে জ্ঞান। নারী এখানে কেবল জ্ঞানের ধারক নয়, বরং নিজেই জ্ঞান।

বহু ঐতিহ্যে জ্ঞানকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। হিন্দু দর্শনে জ্ঞান সরাসরি নারীরূপে পূজিত। সরস্বতী কেবল বিদ্যার দেবী নন, তিনি সৃজনশীলতা, ভাষা ও চেতনার উৎস। ‘শক্তি’ ধারণায় নারীত্বই সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি। যেখানে জ্ঞান, শক্তি ও অস্তিত্ব একে অপরের সাথে নীবিড়ভাবে যুক্ত। কালী ও দুর্গা শুধু শক্তি নয়, ‘মহামায়া’—যিনি জগতকে ধারণ করেন এবং জ্ঞান দেন।

বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞা মুক্তির অপরিহার্য উপাদান। প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রে প্রজ্ঞাকে ‘সমস্ত বুদ্ধদের জননী’ বলা বলা হয়। অর্থাৎ জ্ঞানই বোধিলাভের জন্মদাত্রী। প্রজ্ঞা ও করুণা (karuṇā)—এই দুইয়ের মিলনেই ঘটে বোধিলাভ। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে প্রজ্ঞাকে নারীত্বের সাথে এবং উপায় (upāya) কে পুরুষত্বের সাথে যুক্ত করে দার্শনিক ভারসাম্য তৈরি করা হয়েছে।

হিব্রু বাইবেলে ‘Book of Proverbs’-এ জ্ঞানকে নারী রূপে (Lady Wisdom) চিত্রিত করা হয়েছে। গ্রিক দর্শনে অ্যাথেনা প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের প্রতীক। খ্রিস্টীয় ও গনস্টিক ঐতিহ্যে সোফিয়া (Sophi) ঈশ্বরীয় জ্ঞানের প্রতীক। কিছু ব্যাখ্যায় ভার্জিন মেরিকে ডিভাইন উইশডম এর ধারক হিসেবে দেখা হয়।

সুফি দর্শনে নারীকে প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে দেখার একটি গভীর ও বহুস্তরীয় ঐতিহ্য আছে। এখানে নারী কেবল জৈবিক সত্তা নয়—বরং ‘মারফত’, ‘আত্মজ্ঞান’ ও ‘সত্য-উপলব্ধি’-র প্রতীক। সুফি তত্ত্বে ‘জ্ঞান’ (Ma‘rifa) অর্জন মানে আল্লাহর সঙ্গে অন্তর্গত সংযোগ। এই জ্ঞানকে প্রায়ই নারীরূপে কল্পনা করা হয়—প্রেমিকা, প্রিয়তমা বা রূপসী সত্তা হিসেবে। আত্মা (সালিক) এখানে প্রেমিক, সত্য/ঈশ্বরীয় জ্ঞান এখানে প্রেমিকা। এই জ্ঞানকে ‘অর্জন’ নয়, ‘প্রেমের মাধ্যমে উপলব্ধি’ করা হয়। রুমির কবিতায় যে প্রিয়তমা সে ঈশ্বরীয় জ্ঞান ও সত্যের প্রতীক। ইবনে আরাবি তার Fusus al-Hikam এ নারীর সৌন্দর্যকে ঈশ্বরের সর্বোচ্চ প্রকাশ বলেছেন। কারণ নারী সৃষ্টিশীলতা ও জ্ঞানের পূর্ণ প্রতিফলন।

বাউল ধারাও এক্ষেত্রে এক। বাংলার বাউল ও সুফি গানে ‘মনের মানুষ’, ‘সই’, ‘প্রেমিকা’—এসবই আসলে আত্মজ্ঞান বা প্রজ্ঞার রূপক। লালন ফকিরের গানেও নারী কখনো গুপ্ত জ্ঞান কখনো বা আত্মার প্রতীক হিসেবে এসেছে।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে জ্ঞানের সাথে দেবতাদের চেয়ে বেশি দেবীদের যুক্ত করা হয়। যেমন গ্রিক দেবী অ্যাথেনা ও মেটিস। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত গ্রিসে মেটিস জ্ঞানের দেবী হিসাবে পূজিত হয়েছেন। জাদুবিদ্যা ও পুনর্জন্মের জ্ঞান নিয়ে রয়েছেন মিশরীয় পুরানের অন্যতম প্রধান দেবী আইসিস। হিন্দু ধর্মে জ্ঞানের দেবী স্বরসতী ছাড়াও রয়েছেন শৈব ও শাক্তধর্মের ঐতিহ্যে দেবীতারা, যিনি দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় মহাবিদ্যা।

অন্যদিকে, ইয়িন-ইয়াং দ্বৈত তত্ত্বে নারীত্ব ও পুরুষত্বকে মহাবিশ্বের দুই মৌলিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়। এখানে ইয়িন নারীসুলভ ও অনুভূতি, অর্ন্তজগতের প্রতীক। ইয়িন-ইয়াংয়ের দ্বৈততার পারস্পরিক ক্রিয়াতেই সৃষ্টি ও ভারসাম্য বজায় থাকে। কনফুসীয় ও তাওবাদী সৃষ্টি কাহিনী এ ধারণা সমর্থন করে। কবি নজরুল যেমনটা বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।

মনোবিশ্লেষণেও এই ধারণার প্রতিধ্বনি আছে। মনোবিশ্লেষক কার্ল জং এর মতে পুরুষের অবচেতনের যে নারীত্ব (anima) তাই হলো অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞার উৎস। এখানে নারীত্ব মানে কেবল লিঙ্গ নয়, বরং মানসিক গুণ—অর্ন্তদৃষ্টি, গভীরতা, ধারনক্ষমতা। তবে আধুনিক দৃষ্টিতে এই গুণগুলো লিঙ্গনিরপেক্ষ—মানবিক গুণ হিসেবেই বিবেচিত।

যুগে যুগে জ্ঞানের এই নারীকরণ পুরুষের নারীর প্রতি চাহিদার সাথেও সম্পর্কিত। সমাজে প্রচল এর মূল ধারণাটি হলো, নারী পুরুষকে রূপান্তরিত করতে পারে। হয় ডাইনির মতো নেতিবাচকভাবে, নতুবা প্রজ্ঞার মাধ্যমে ইতিবাচকভাবে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যেখানে নারীকে জ্ঞানের উৎস, ধারক, এমনকি স্বয়ং জ্ঞান হিসেবে কল্পনা করা হয়, সেখানে বাস্তব সমাজে কেন তাকে জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে রাখা হয়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো সামনে আসে। দি সেকেন্ড সেক্স গ্রন্থে সিমোন দ্য বুভোয়ার দেখান, নারীকে প্রতীকী মর্যাদা দিলেও বাস্তবে তাকে অধীনস্থ রাখা হয়েছে। ফলে প্রতীকী সম্মান ও বাস্তব বৈষম্যের এই দ্বৈততা স্পষ্ট।

এই দ্বৈততা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—নারী কি কেবল জ্ঞানের প্রতীক হয়ে থাকবে? নাকি প্রতীকের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনে সমতা প্রতিষ্ঠা করবে।

আরও লেখা

আমিই ‘সে’

আমিই ‘সে’ সুস্থির শরীর মনে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে ছিলেন তো এবার চোখ খুলুন। খেয়াল করুন আপনি সচেতন। আবার চোখ বন্ধ করুন, এবার আপনি...
পরিচিন্তন

দিল দুনিয়া আর দরবেশী (পর্ব – ১)

আধ্যাত্মিকতা ও ব্যবসাকে আমরা অনেক সময় দুই ভিন্ন জগত বলে ভাবি।  মনে করা হয়, আধ্যাত্মিকতা মানে জগত থেকে সরে দাঁড়ানো আর ব্যবসা মানে কেবল...
পরিচিন্তন

আমেরিকায় ধর্ম: সুযোগ, সংকট ও প্রভাব (পর্ব – ১)

অ্যামেরিকাতে ধর্মীয় চর্চা বেশ বৈচিত্র্যময়। এদেশ খ্রিস্টধর্ম প্রধান ধর্ম হলেও ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইহুদি ধর্ম এদেশের প্রধান অ-খ্রিস্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং বিশাল একটি...
পরিচিন্তন

আবু জেহেল আসলে কে ছিলেন?

আমি মনে করি আবু জেহেলকে দেখার দুইটি ভঙ্গি আছে।প্রথমটি হলো সুফি জ্ঞানের আলোকে অন্তর্মুখী হয়ে বিষয়টিকে দেখা; দ্বিতীয়টি হলো কোরানে এই নামটি যে কারণে...
পরিচিন্তন
spot_imgspot_img