সুস্থির শরীর মনে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে ছিলেন তো এবার চোখ খুলুন। খেয়াল করুন আপনি সচেতন। আবার চোখ বন্ধ করুন, এবার আপনি কিছু অবলোকন করছেন না কিন্তু খেয়াল করুন, আপনার ভিতর চৈতন্য সক্রিয় রয়েছে। আপনার শ্রবনেন্দ্রীয়ের দিকে মনোযোগ দিন, দেখুন- হয়তো পাখির কিচির মিচির শব্দ, মানুষের কথোপকথন, গোলমাল, যানবাহনের শব্দ বা মিউজিক কোনো না কোনো শব্দ আপনার কানের ভিতর প্রবেশ করছে আর আপনার ভিতর বসে কেউ তা শুনছে, এমনকি যদি কোনো শব্দ না থাকে তখনো আপনি কিছু শুনছেন, সেটা হলো- নিঃশব্দ।
শুধু শব্দ কেন- দৃশ্য, স্পর্শ, স্বাদ, গন্ধ সব কিছু আপনি টের পান। মানুষে মানুষে অনুভবের পরিমান বা ধারনাগত তারতম্য থাকতে পারে কিন্তু আমরা বিষয়গুলোকে যে বোধ করতে পারছি তার মানে আমরা চেতন। মনে মনে আমরা কতকিছু ভাবি, নতুন-পুরাতন কত স্মৃতি আমাদের মনের জানালায় উঁকি মারে, আমরা সেসব স্মরণ করতে পারি কারন আমাদের ভিতর একটা চেতনা আছে। এমন কি আমরা যদি কোনো কিছু স্মরণ করতে নাও পারি, সেটাও আমরা বুঝতে পারি। তার মানে তখনও আমরা চেতন।
আমরা কখনো সুখ উপলব্ধি করি কখনো দুঃখ, কারন আমাদের চেতনা রয়েছে। তাই বলে চেতনার কোনো সুখ দুঃখ নেই। প্রতিনিয়ত কত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত হচ্ছে কিন্তু চেতনার কোনো পরিবর্তন নেই। সুখ, দুঃখ বা পরিবর্তন এসব চেতনার বিষয় নয়। চেতনার হ্রাস-বৃদ্ধি নেই, হ্রাস বৃদ্ধি হয় মনের সতর্কাবস্থার ‘মাত্রার’ বা বোধ করবার ‘ক্ষমতার’। পরিবর্তন হয় মনের, শরীরের। হতাশা বা স্বস্তি, জন্ম বা মৃত্যু- চেতনা এসবের বাইরে অর্থাৎ চেতনার জন্ম মৃত্যু নেই বরং চেতনার মধ্যে সব উদ্ভাসিত হয় মাত্র। চেতনা সর্বকালিন সার্বক্ষণিক বিরাজিত, এর জন্য কোনো প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় না। ছিল আছে থাকবে। এই চেতনাই নাকি ‘আমি’।
আমার এই চেতনার মাঝেই উদ্ভাসিত হচ্ছে আমার বিশ্বব্রহ্মান্ড যার সাথে আমার সকল অভিজ্ঞতা জড়িত। বলা যায়, এখানেই সৃষ্টি হচ্ছে আমার স্থান ও কাল। আমি যদি গভির ঘুমে বা কোমায় থাকি তখনো আমার চেতনা বিদ্যমান থাকে। আমার জন্ম হলো। শিশু থেকে কৈশর, যুবক থেকে প্রৌঢ় তারপর যথারীতি মৃত্যু কিন্তু চৈতন্য কোনোরূপ পরিবর্তন ছাড়াই চির বিরাজমান। জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, আনন্দ-বেদনায় মন আলোড়িত হয় কিন্তু চৈতন্য সকল কিছুর প্রভাবমুক্ত, চিরস্থির, চিরশান্ত। চেতনার আলোয় সকল কিছু প্রজ্জ্বলিত, সকল কিছু আলোকিত কিন্তু তাকে আলোকিত করার দরকার পড়ে না। সে নিজেই আলোকময়।
আমাদের শরীর, মন, অনুভুতি, উপলব্ধি, ইগো সবকিছু ভিন্ন অর্থাৎ এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে অনেক শরীর অনেক মন কিন্তু চৈতন্য ‘এক’। ঐ এক চৈতন্যই আমাদের অনেক শরীর অনেক মনে প্রজ্জ্বলিত থেকে আমাদের অনেক করে তুলেছে। আমরা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অনুভব করছি। প্রকৃতঃপক্ষে সকল স্বাতন্ত্র্যের মূলে ঐ এক চৈতন্য। কি অদ্ভুত তাই না? আচ্ছা, চৈতন্য কি কোনো কিছু প্রত্যাশা করে? না। কোনো কিছুতে ভীত? না। কখনো কি অস্থির হয়? না। কোনো কিছুর অভাব বোধ করে? না।আমরা আর একটু গভীরে যাবার চেষ্টা করি।
এর কোনো আদি নেই, অন্ত নেই এবং অদ্বিতীয়। প্রশ্ন হতে পারে নিজের চোখের সামনে কতকিছু দেখছিঃ বাড়ি-গাড়ি, আকাশ-পাতাল, গাছ-পালা, গোরু-ছাগল, মানুষ জন, জমি খেত-খামারি কত কিছু, এক কীকরে হলো? সারা পৃথিবীময় কত সংঘাত, যুদ্ধ, মারা-মারি, হানাহানি, অভাব অভিযোগ লেগেই আছে, আরো ভবিষ্যতে কত কিছুই না হতে পারে, তাহলে চির শান্ত কীকরে হলো? আমাদের জন্ম হচ্ছে, বড় হচ্ছি আবার মারাও যাচ্ছি, তাহলে আদি নেই অন্ত নেই মানে? একটা চেতনা থেকেই যদি সকল ভাব বস্তু বা অভাব বস্তুর উদ্ভব হয় বা আরো স্পষ্ট এবং সংক্ষিপ্তাকারে বললে- যদি সবই একক চৈতন্যের প্রকাশ ও বিকাশ হয়ে থাকে তাহলে স্রষ্টা- সৃষ্টি সম্পর্কে কী বলা যাবে? স্রষ্টা- সৃষ্টি কি এক নাকি ভিন্ন?
এখানে এসে চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষ দু’দিকে পা বাড়ায়। আস্তিক্য ও নাস্তিক্য। সাধারণভাবে সবাই জানে, নাস্তিক কোনো বিশ্বাসে বিশ্বাসী নয়- তাদের চাই প্রমান। আসলে কি তাই নাকি তারাও একটা বিশ্বাস লালন করেন। সেটা হলো- ঈশ্বর বলে কেউ নাই। কিন্তু সেটা তারা প্রমান করতে পারেন না যার অর্থ শেষাবধি ঐ এক ধরণের ‘বিশ্বাস’। নিরেশ্বরবাদিতার বিশ্বাস। তারা পদার্থ বিজ্ঞান থেকে বলবে, এই বিশ্ব জগত সৃষ্টি হয়েছে অসীম ভর বিশিষ্ট কণা থেকে। কিন্তু এই কণা কোথা থেকে এলো বা কে সৃষ্ট করেছে তার কোনো সদুত্তোরদাতা এখনো পাওয়া যায় না।
তাদের দৃষ্টিতে ঈশ্বর ছাড়াই মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রধান যুক্তিগুলো হলো:
১. কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন (Quantum Fluctuation)
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মতে, ‘শূন্য’ মানে আসলে কিছুই না থাকা নয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, শূন্যস্থানের মধ্যেও শক্তি ক্রমাগত ওঠানামা করে। বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং তার বই ‘The Grand Design’-এ বলেছেন- মহাকর্ষের মতো একটি সূত্র (Law of Gravity) থাকার কারণে মহাবিশ্ব শূন্য থেকে নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে পারে এবং করবেই। একেই বলা হয় Spontaneous Creation বা স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টি।
২. কারণ ও প্রভাবের ভিন্ন ধারণা
আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় মনে হয় প্রতিটি জিনিসের একজন নির্মাতা বা কারণ থাকে। কিন্তু মহাবিশ্বের উৎপত্তির ক্ষেত্রে ‘সময়’ নিজেই বিগ ব্যাং-এর সাথে শুরু হয়েছে। অর্থাৎ, বিগ ব্যাং-এর ‘আগে’ বলে কিছু ছিল না। স্টিফেন হকিংয়ের মতে, ‘বিগ ব্যাং’-এর আগে কী ছিল তা জানতে চাওয়া অনেকটা দক্ষিণ মেরুতে দাঁড়িয়ে আরও দক্ষিণে যাওয়ার পথ খোঁজার মতো যার কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই সৃষ্টির জন্য কোনো ‘স্রষ্টা’ বা বাইরের চালিকাশক্তির প্রয়োজন পড়ে না।
৩. মাল্টিভার্স বা বহু-মহাবিশ্ব তত্ত্ব
অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, আমাদের মহাবিশ্ব একা নয়। হয়তো অসংখ্য মহাবিশ্ব বুদবুদের মতো তৈরি হচ্ছে। আমরা এমন একটি মহাবিশ্বে আছি যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো এমনভাবে সেট হয়ে গেছে যে প্রাণ টিকে থাকতে পারে। একে বলা হয় ‘Anthropic Principle’। এটি অনেকটা লটারিতে জেতার মতো—লাখ লাখ মহাবিশ্বের মধ্যে একটিতে প্রাণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
৪. বিবর্তন ও জটিলতা
জটিল কিছু মানেই যে তার একজন নকশাকার (Designer) থাকতে হবে, বিজ্ঞানে তা সবসময় সত্য নয়। যেমন- ডারউইনের বিবর্তনবাদ দেখিয়েছে যে, অতি সামান্য কোষ থেকে মিলিয়ন বছরের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে অত্যন্ত জটিল মানুষ তৈরি হতে পারে। একইভাবে, মহাজাগতিক বিবর্তনের মাধ্যমে ধূলিকণা ও গ্যাস থেকে নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছে।
৫. গাণিতিক অনিবার্যতা
ম্যাক্স টেগমার্কের মতো বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্ব আসলে একটি গাণিতিক কাঠামো। গণিতের নিয়মগুলো যেমন চিরন্তন এবং স্বয়ংসিদ্ধ, মহাবিশ্বও তেমনি গাণিতিক নিয়মের ফলশ্রুতি। এখানে কোনো সচেতন সত্তার হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে না।
সারকথা:
বিজ্ঞান বলে যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য পদার্থবিদ্যা, গণিত এবং শক্তির মিথস্ক্রিয়া যথেষ্ট। তবে, ‘কেন এই নিয়মগুলো (যেমন মহাকর্ষ) এমন নিখুঁত হলো?’ বা ‘একেবারে শূন্য থেকে কেন কিছু সৃষ্টি হলো?’- এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর এখনো অজানা।
আস্তিক নাস্তিকের প্রশ্নের যেন শেষ হতে চায় না। এখন আস্তিক বলবে, আচ্ছা ঈশ্বর নেই তা যেহেতু তুমি প্রামাণ করতে পার না তাহলে মেনে নাও ঈশ্বর আছে এবং তিনিই সকল কিছুর স্রষ্টা। তখন আবার নাস্তিক প্রশ্নবাণ ছুড়ে মারবে,- ঈশ্বর সবকিছুর স্রষ্টা মানলাম। এখন তোমার ঈশ্বর কোথা থেকে এলো, কে সৃষ্টি করেছে তাকে? তাহলে এই দ্বন্দকে পাশে সরিয়ে রেখে আর একটা চিন্তা করা যায় কিনা। পৃথিবীর অনেক চিন্তাশীল জ্ঞানী ব্যাক্তিগণ এই দ্বন্দে না জড়িয়ে সুন্দর একটা চিন্তা দর্শনের কথা বলেছেন, আমরা সেই চিন্তাকে নিয়ে চিন্তা করে দেখতে চাই। আর সেটাই হলো- কনশাসনেস বা চৈতন্য যা নিয়ে আমরা শুরু করেছি। ঈশ্বর আছেন কি না তানিয়ে আর যুদ্ধে না গিয়ে এখান থেকে শুরু করে দেখি, রাস্তা কোথায় নিয়ে যায়। হয়তো এই দ্বান্দিক অবস্থার নিরসন হলে হতেও পারে আর তা হলো- ঈশ্বর আছে কিনা না ভেবে ‘আমি আছি কিনা’ এখান থেকে শুরু হোক:
চলবে ……






