জাগতিক না পারমার্থিক?

পারমার্থিক

এই বিশ্বজগতে যত রূপকাঠামো রহিয়াছে তাহার মধ্যে মানবদেহই সব চাইতে উন্নত বলিয়া পরিগণ্য হইবে ইহাতে সন্দেহ কী। আধুনিক যুগে অনেকেই মানবদেহের কারিগরি ত্রুটি লইয়া যতই আপত্তি করুন না কেন ইহার চাইতে উত্তম কোন পরিকাঠামো বা device বিশ্বগজতে আর কিছু রহিয়াছে বলিয়া আমরা জ্ঞাত নহি। প্রকৃতিতে এমন সুন্দরতম অবয়ব বা device কীভাবে বিকশিত হইল?—কিংবা কে এমন ডিভাইস এর ডিজাইনার?—তাহা লইয়া বহু বিতর্ক হইতেই পারিবে, কিন্তু এমন মহা সুন্দর অবয়ব বা device আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে বলিয়া মনে বিশ্বাস হয় না।

এইরূপ অবস্থায় আসিয়া ভাবুক মনে প্রশ্ন আসিয়া হাজির হইতে পারে যে, এই উত্তম অবয়ব বা ডিভাইসটি কি শুধুই জাগতিক নিয়মে জগতের শোভা বর্ধনে গঠিত হইয়াছে নাকি ইহাতে কোন পারমার্থিক তাৎপর্য  নিহিত রহিয়াছে? মানুষের বাস্তব জীবন যাহা লইয়া চলিলে জীবন সমৃদ্ধ হইয়া থাকে বলিয়া যেইরূপ ধারনা আধুনিককালে গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাই কি মানবজীবনের সার কথা? নাকি ইহাতে যোগ করিবার আরও বহুবিধ গুণাবলি সুপ্ত রহিয়াছে? বিশ্ব জগতের কোন পরম অর্থ গুপ্ত হইয়া মানবের মাঝে লুকাইয়া নাহি তো?

যদি জাগতিক জীবনে সাধারণ প্রয়োজন সমূহ কিংবা বিবিধ কৃত্রিম প্রয়োজনাবলি পরিপূরণ করিয়া মানবজীবন ধন্য হইয়া থাকে তাহা হইলে মৃতোত্তর জীবন বলিয়া কিছু না থাকিলেও চলিবে। পৃথিবীতে বহু মানুষ এইরূপ ভাবিয়া-করিয়া নিজেকে বিজ্ঞ বলিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিয়া থাকেন। এমতাবস্থায় অন্য কাহার মনে জিজ্ঞাসার উদয় হইতে পারিবে—তাহা হইলে এই বিশাল অস্তিত্বের এমন আয়োজন কেন করা হইয়াছে? এত সুন্দর অবয়বের মানুষ সৃষ্টির কী প্রয়োজন ছিল? ইহার কিছুই পরম ভাববহ নহে?

উপরোল্লিখিত প্রশ্ন সমূহ সকলের অন্তরে একইরূপ প্রভাব তৈরি করিবে না। কিন্তু জগতে বহু মানুষ রহিয়াছেন যাঁহারা ঐ সকল প্রশ্নে গুরুত্ব দিয়া ভাবিতে ইচ্ছুক না হইয়া পারিবেন না। ফলত ভাবুক অন্তরে নানান রকম অনুভূতির বিকাশ ঘটিয়া থাকে। তাঁহারা মানবজাতির সুদীর্ঘ কালে জমাকৃত সামষ্টিক অভিজ্ঞতা হইতে যে বোধানুভূতির পরিচয় পাইয়া থাকেন তাহা একজীবনের ভোগবাদী মানুষের ধারনা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। সাধারণ জাগতিকতার বিপরীতে একটি বিশিষ্ট পারমার্থিকতা দ্বারা বোধিত হইয়া তাঁহারা মানব জীবনকে অনন্য বলিয়া গ্রহণ করিয়া থাকেন। এমন সুযোগ তাহারা হেলায় নষ্ট করিতে চাহেন না। মানবজীবনের পরম অর্থ খুঁজিতে তাঁহারা কোন দ্বিধায় কিংবা ক্লান্তিতে ক্ষান্ত হইয়া পড়েন না। মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের সত্যিকার ধারক বাহক প্রচারক ইঁহারাই।

মানবকুল পার্থিব জগতে বাস করিয়াও যে পারমার্থিক তাৎপর্য পরিগ্রহ করিয়া থাকেন তাহা বলাই বাহুল্য বটে। ইহা লইয়া নানান রকম তর্ক করিয়া বৃথা বুদ্ধি নাশ করিয়া কাহার কোন জাগতিক কিংবা পারমার্থিক উপকার হইয়াছে বলিয়া বিশ্বাস হয় না। মানুষের মাঝে স্বল্প সংখ্যক গুণবান ব্যক্তি ইহার প্রত্যক্ষকরণ সম্ভব করিতে পারেন। অন্যরা অনুমানে উপলব্ধি করিতে সচেষ্ট হইয়া থাকেন। সংখ্যাধিক মানুষের প্রত্যক্ষানুভূতিতে নাই বলিয়া কুশলী তর্কবিদগণ ইহাকে বিভ্রান্তিকর ভাবিয়া ইহার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। এই জাতীয় আচরণ যতই চমৎকার বলিয়া প্রতিভাত হউক না কেন তাহা নিতান্তই চার্বাকবৎ, শুধুই পার্থিব পান্ডিত্যপূর্ণ অবিদ্যা—পারিমার্থিক নহে। অথচ আমরা বলিতেছি যে, মানুষ একই সঙ্গে পার্থিব এবং পারমার্থিক—এই যুগল রূপের এক অভিন্ন সত্তা।

এই ধরাধামে কত মুণি ঋষি অলি দরবেশ নবি রসুল আসিয়াছেন তাহার ইয়ত্তা নাই। তাঁহারা সকলেই মানুষের মাঝে উক্তরূপ বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। এই বিজ্ঞান চিরন্তন, নিত্য সনাতন। যাঁহারা গুণীজনের সঙ্গ করিয়া উপযুক্ত পরিচর্যা করিবেন তাঁহারা ইহা প্রত্যক্ষ করিবেন—ইহাতে কোনরূপ সংশয় নাই।

উক্তরূপ বোধ হইতে উদ্ভূত চিন্তা দ্বারা চালিত হইয়া আন্তর্জালিক (internet) সুবিধাকে ব্যবহার করিয়া যে নবাগত পারমার্থিক প্রকাশধারা সূচিত হইতে চলিয়াছে তাহাকে স্বাগতম। গভীর হৃদয়াবেগ মিশ্রিত অনুভব থেকে এই কর্মযজ্ঞের সহিত জড়িত সকলকে অভিনন্দন।

পুষ্পিতা

৪ মার্চ ২০২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ২)

সামতেন মারা যাওয়ার পরে আমরা তিব্বতের রাজধানী লাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ঘোড়ায় চড়ে তিন মাসের দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। সেখান...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

কহিতে পারিব কি? – ২

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জীবনই অবদমনের একেকটা গোডাউন! ব্যক্তিগত সংস্কার, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বৈশ্বিক বিভিন্ন চাপে বিকশিত হওয়া দূরে থাক, জীবন মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে না...
default
পারমার্থিক

জাগতিক না পারমার্থিক? – ২

ইসলাম ধর্মে জাগতিকতা আর পারমার্থিকতা অর্থাৎ ইহকালীন কর্মযজ্ঞ  আর পরকালীন প্রাপ্তব্য-বিভূতি --এতদুভয়ের মধ্যে বিশেষ কোন তফাৎ কিংবা দূরত্ব নাহি। উপযুক্ত ভক্তগণ সম্যকরূপে সাধনা করিয়া...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

সফরনামা ।। শিল্পী খন্দকার নাছির আহাম্মদ

শিল্পী পরিচিতি খন্দকার নাছির আহাম্মদ ১৯৭৫ সালে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কারুশিল্প বিভাগ থেকে বি.এফ.এ সম্পন্ন করেন চারুকলায় অধ্যায়নরত অবস্থায় ১৯৯৮,...
ই-এক্সিবিশন
পারমার্থিক
1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow