“আমি মুক্ত!, আমি স্বাধীন!” আসলেই কি তাই?
আমি কি মুক্তির স্বাদ নিতে পেরেছি?
আমি স্বাধীন হতে চাই,
আমি জাত-ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ থেকে মুক্তি চাই,
কিন্তু এ সমাজ আমাকে কি সেই সুযোগ দিচ্ছে?
আমি যে চাই নিজেকে নিয়ে ভাবতে, আত্মকেন্দ্রিক হতে,
“আমি কে?” তা গবেষণা করতে,
সৃষ্টি-রহস্য ভেদ করে স্রষ্টার মাঝে ডুবে থাকতে।
আমি যে স্বাধীন হতে চাই; দুনিয়ার মায়া-বন্ধনের জালে জড়াতে নয়!
সত্যিই কি আমি তা করতে পারছি? এ সমাজই কি আমাকে সেই সুযোগ দিচ্ছে?
আমার অধিকার রয়েছে আত্মপরিচয় জানার, কিন্তু এ সমাজ কি আমাকে ‘আত্মকেন্দ্রিক’ হতে দিচ্ছে?
কখনো কি ভেবেছি, আমি কেন এই ধরায় এসেছি?
আমার আসার কি কোনো উদ্দেশ্য ছিল?
কে আমাকে পাঠিয়েছেন? কেনইবা পাঠিয়েছেন?
কি সেই রহস্য যে স্রষ্টা আমাকে বানালেন আর পাঠিয়ে দিলেন এই ধরায়?
আমি কি কারো কছে অঙ্গীকার করে এসেছিলাম, যা পূরন করতে ব্যার্থ হচ্ছি?
সত্যি করে বলতে, আমি কি জানি আমি আসলে কে?
কে আমি? কি আমার পরিচয়? আমি কি কখনো আমাকে দেখেছি?
বাহিরটি নয়, ভিতরটি—
বাহিরটি দেখতেও যে বস্তুর (আয়নার) সাহায্য নিতে হয়!
আমার ভেতরের আমি কে সে?
জানি না! কখনো জানার চেষ্টাই যে করি নি!!
তবে কেন করিনি?
নাকি আমাকে সেই চেষ্টা করতে দেওয়া হয় নি?
এ সমাজ কি আমাকে সেই সুযোগটুকু দিয়েছে?
নিজেদের মস্ত-বড় পন্ডিত বলে পরিচয় দেই!
বলি আমি সবার রাজা! অনেক ক্ষমতা আমার!!
আচ্ছা মৃত্যুর চেয়েও কি আমরা অনেক ক্ষমতাবান?
তা ছাড় একটু অসুস্থ হলেই তো হাউমাউ করে কেঁদে উঠি।
তখন যায় কোথায় আমাদের ক্ষমতা?
এই যে ‘আমার’, ‘আমার’ করি; আসলে ‘আমার’ কি আছে, যেটা সত্যই আমার?
এই দেহ; প্রাণ-ই তো আমার নয়, তবে ‘আমার’ কি আছে, যা সত্যই আমার?
এই যে বলি খুব মিষ্টি করে; বলতে ভালই লাগে–
“প্রয়োজনে স্রস্টার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করবো, স্রস্টাকে সবকিছু উজাড় করে দিব।”
স্রস্টার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করবো; সেই প্রাণের মালিক তো আমি নই;
তবে এমন কি আছে যা সত্যই আমার– যে স্রষ্টাকে দিব?
ফুল দিয়ে তাঁর পূজো করবো, টাকা দিয়ে উপাসনালয় গড়বো, মাটি, পানি, বায়ু-–
আমার কি আছে, যা তাঁকে দিব? এগুলো যে সব তাঁর-ই!
আচ্ছা মরার পরে কোথায় যাবো? কার কাছে যাব?
যার কাছে যাবো তাঁকে কি চিনি বা জানি? দেখেছি কি কখনো?
যার কাছে যাবো তাঁকে কি বলব? কি নিয়ে যাবো তাঁর কাছে?
কি আছে আমার যে তাঁকে দিব? সবই যে তাঁর!
সব যদি তাঁরই তাহলে ‘আমার’, ‘আমার’ বলে চিল্লালাম যে এতোদিন!
ভেবেছি কি কখনো?
ভাবিনি! — কেন ভাবিনি?
মৃত্যু তো পরের কথা, এ তো সুদূর ব্যাপার– তা ছাড়া;
বেঁচে থেকেই এখন কি করছি?
নিজেকে কি এতোটুকু রূপান্তর করতে পেরেছি?
‘পরিবর্তন!’–
যুগ হয়েছে পরিবর্তন, কিন্তু তার স্বভাব?
এখনো কেন করি ভেদাভেদ?
অতীতে ছিল রাজা আর প্রজা–
আজ তো কেবল নাম আর ধরন বদলেছে,
কিন্তু পরিবর্তন কি সত্যিই এসেছে?
কেন এই ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ?
কোথায় পালিয়েছে ‘মনুষ্যত্ব’,’একত্ব’ আর ‘সমত্ব’?
পালিয়েছে নাকি তারিয়ে দিয়েছি?
রেগে যাচ্ছ নাকি?-
যুগ তো পরিবর্তন হয়েছে, আরেহ আমরাই তো করেছি।
কিন্তু আমি কি এই ‘আমাকে’ পরিবর্তন করতে পেরেছি?
পারি নি? –পেরেছি?
হ্যাঁ করতে পেরেছি–!!
বাহির করেছি পরিপাটি কিন্তু অন্তুরমুখির এ কি দুরবস্থা!
দেখেছি কি কখনো?
আমি না ধার্মিক? হ্যাঁ নিজেকে তাই বলেই-তো ভাবি!
যখন প্রার্থনা করি বা কাউকে সাহায্য করি তখন ভাবি স্রষ্টা দেখছেন!
অথচ যখন অন্যায় করি তখন কি করে ভুলে যাই যে স্রষ্টা তখনও দেখছেন?
আমি কি করছি তা কি আমি জানি?
যা করছি- তা কেন করছি তা কি আমি বুঝি?
আমি কি জেগে আছি; নাকি জেগে থেকেও ঘুমন্ত?
আমি কি ‘আত্মসচেতন’ হতে পেরেছি?
আমি কি সত্যিই স্বাধীন হতে পেরেছি?
এ জীবন আমার অথচ চলছে সমাজের নিয়মে; যেখানে চলার কথা স্রষ্টার নিয়মে।
স্রষ্টার দেওয়া আইন-বিধান পাশে রেখে-
মানবসৃষ্ট নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করায় আজ সমাজ অধপতনের দিকে নয় কি?
আমারা কি সমাজের সিস্টেমের মধ্যে বন্ধী নই?
এই সিস্টেম থেকে মুক্তি পেতে অন্যত্র আশ্রয় পাবো কি?
আমি না চাইলেও আমাকে মানবসৃষ্ট বিদ্যালয়ে যেতেই হবে,
কাজ করতেই হবে, সংসারের জালে আটকে থাকতেই হবে।
হ্যাঁ এমন সমাজেই আমরা আছি; যেটা একটা ‘সিস্টেমের বন্দিশালা’!
আমি না চাইলেও আমাকে ‘সিস্টেম’ মানতেই হবে;
তবে কি আমরা সিস্টেমের দাস হয়ে যাচ্ছি না?
তবে যে বলি, আমরা কেবল স্রষ্টার দাস!
তবে কি তা কেবল মিথ্যা আওড়ানো?
আমরা কি ভ্রমের মধ্যে থেকে এতকিছু সয়ে যাচ্ছি?
নাকি আমাদেরকে ভ্রমনাশক অ্যালকোহল গেলানো হচ্ছে?
নাকি আমরাই ভোগী হয়ে যাচ্ছি এবং দাস হয়ে যাচ্ছি বস্তুবাদের?
আচ্ছা– আমাদেরকে কেউ ভোগ করতে বাধ্য করছে না তো?
আমরা কি কোনো ফাঁদের মধ্যে আছি, কুয়োর ব্যাঙের মতো?
আচ্ছা পৃথিবী কি কারো ব্যাক্তিগত সম্পদ?
আমার অধিকার রয়েছে পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাওয়ার-
তাহলে কে আমার অধিকার হরণ করলো?
মানুষ যদি স্বাধীন- তবে পাসপোর্ট কি জন্য তৈরি করা হলো?
পশু-পাখির তো পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না!
তবে আমরা কি রাষ্ট্র নামক বন্দীশালায় বন্দি?
মানবতার কথা বলো–
মানুষের যে অধিকার রয়েছে স্রষ্টার সৃষ্টিতে স্বাধীনভাবে বিচরণ করা!
তা কে বা কারা কিসের লোভে হরণ করে নিল?
আমাকে কে বা কারা কিসের ভয়ে ‘নাগরিক’ নামক দাস বানালো?
‘নাগরিক’– সে তো দাস!
রাষ্ট্রের দাস, সমাজের সিষ্টেমের দাস!!
তাই নয় কি?
আচ্ছা রাষ্ট্রের প্রয়োজন কার জন্য?
কিসের প্রয়োজনে তৈরি হলো বর্ডার?
পৃথিবীর কোথাও স্রষ্টার জায়গা-জমি বলতে কিছু বাকি আছে কি?
“স্রষ্টানীতি” কে বা কারা বাদ দিল?—
মানবতার নামে যে রাজনীতি-কুটনীতি চলছে বিশ্ব জুড়ে–
তা থেকে অদ্যও মুক্তি পাব কি?
আমারা বিশ্ব মানচিত্র থেকে সব দাগ মুছে দিচ্ছি না কেন?
কি প্রয়োজন আছে সেই দাগের?
কি প্রয়োজন আছে পাসপোর্টের?
কোন প্রয়োজনে এতো রাষ্ট্র সৃষ্টির?
ঐক্য হলে সকল মানুষ-
আর কি প্রয়োজন পরবে রাষ্ট্র, পাসপোর্ট, সেনাবাহিনীর?
বন্ধু হলে সবাই– তবেই-না যুদ্ধ থামবে!
রাষ্ট্র সৃষ্টি করা মানেই– শত্রু তৈরি করা নয় কি?
এত দিনে বুঝলাম–
ধর্ম, বর্ণ এবং জাত এই তিন কানাকে নিয়েই যত কোলাহল!
তুমি মুসলিম কিংবা হিন্দু; বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান;
যা বলেই দাবী কর-না কেন–-
এ যে তোমার বাপ-দাদার ধর্ম!
তোমার বাপ-দাদা যেই ধর্মের লোক ছিলেন–
সেই ধর্মই তুমি অজ্ঞানে গ্রহণ করেছ মাত্র;
তাই নয় কি?
রেগে যাচ্ছ?–
আচ্ছা ধার্মিক বড় নাকি মানুষ?
ধর্মের জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য ধর্ম?
মানুষ সেই– যার মনুষ্যত্ব রয়েছে!
মানুষ কি কখনো ধর্ম, বর্ণ, জাত নিয়ে মারামারি করতে পারে?
ধর্ম, বর্ণ, জাত–
এই তিন কানাকে বন্দি করবে কে?
কবে আসবেন সেই বীরপুরুষ?–
যে এই তিন কানাকে সঠিক পথ দেখাবেন।
মানুষের কাছে এখন সত্যের চেয়ে শাস্ত্র বড়!
যার কাছে শাস্ত্র– সত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়;
তাকে ‘সত্যের পথিক’ বানাবে কে?
শান্তির নামে অশান্তি; যেখানে সবই মিথ্যা–
সেখানে কোনো এক মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নিলেই হলো?
আমরা দুনিয়া বা বস্তুর প্রতি দুর্বল নই কি?–
এই যে এতো যন্ত্রণা ভোগ করি, তার জন্য আমরাই দ্বায়ি নই কি?
নাকি যন্ত্রণায় বসবাস করেও বুঝি না কেন আছি যন্ত্রণায়?
এর থেকে “মুক্তি” পাবার উপায় আছে কি?
‘মুক্তি’ — ‘মুক্তি’ যে এখন নিজেই বন্দি!
তাহলে উপায়! — উপায়ও নিশ্চয়ই আছে।
সেটা বের করার দায়িত্ব কার?
আমার? না… আমাদের?
যেদিন মানুষ তার “আধ্যাত্মিক” অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে;
আধ্যাত্মিক উন্নয়ন মূলক কাজে অংশগ্রহন করবে–
নিজেকে পাঠ করে “আত্মসচেতন” হবে;
সেদিনই তার বোধে আসবে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য।
নিজেকে চিনবে, জানবে— জানবে স্রষ্টাকে!
সেইদিন হয়তো সে বুঝবে এখন আমাকে “মুক্ত” হতেই হবে।
ধারাবাহিকতায়– একটা সময় সে বলবে– “আমি এখন মুক্ত।”





