Home Blog

জাগতিক না পারমার্থিক? – ৩

বাস্তব আর সত্য –ইহাদের মাঝে একটি অঘোষিত বিবাদ রহিয়াছে বলিতে হয়। জগতে যত বাস্তব বিষয় রহিয়াছে তাহার সকলই সত্য বলিয়া প্রতীতি হয় না। অবশ্য উচ্চঅধিকারীগণের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্ট হইলেও নিম্নঅধিকারীগণের নিকট তাহা বোধগম্য হইতে চাহে না। বিবাদটি এইখানেই লুকাইয়া থাকে।

সূর্য পূর্ব দিগন্তে উদিত হইয়া থাকে বলিয়া যে বাস্তব দৃশ্য পৃথিবীর সকলেই নিশ্চিত দেখিয়া থাকি, তাহা কি সত্য বলিয়া স্বীকার করা যায়? উচ্চঅধিকারীগণ এমন তথ্য অধিকার করিয়াছেন যে, পৃথিবীর নিজ অক্ষরেখায় আবর্তনের ফলে সূর্য পূর্বদিগন্তে উদিত হইয়া ক্রমান্বয়ে পশ্চিম গগণে আসিয়া ধীরে ধীরে অস্তমিত হয় বলিয়া প্রতিভাত হইয়া থাকে মাত্র, বাস্তবের এই দৃশ্য পৃথিবীবাসী সকলেই নিত্য প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন, অথচ প্রত্যক্ষ-বাস্তব হইয়াও ইহা সত্য নহে। অর্থাৎ সুর্য নিজে উদিতও হয় না, অস্তও যায় না। বরং যাহারা চক্ষু দ্বারা প্রত্যক্ষ করেন, তাহারা জ্ঞান দ্বারা সত্যায়ন করিতে পারেন না বলিয়াই অনুরূপ ধারণা প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে। প্রতিদিনকার এই জ্বলন্ত বিভ্রম কি প্রকৃতির সৃষ্টি নাকি মানুষের অজ্ঞতা?

মানুষের অজ্ঞতা কি প্রকৃতির সৃষ্টি নাকি মানুষের দায়িত্বহীনতা? দায়িত্বহীন মানুষ তার অজ্ঞতাকে লালন করিয়া থাকে বটে, কিন্তু তার মাঝে বহমান অজ্ঞতার উৎপত্তি কীভাবে হইলো? জন্মের পর পরই মানুষ নানাবিধ অসহায়ত্বের শিকার হইয়া থাকে। যাহার মধ্যে মস্তিষ্কের স্মৃতিভাণ্ডার শুন্য থাকা অন্যতম। জন্মের পরের এই শুন্য স্মৃতিভাণ্ডার হইতেই অজ্ঞতা প্রকাশ পাইয়া থাকে। অজ্ঞতা হইলো সেই অসহায়ত্বের একটা অংশ। এই অসহায়ত্ব এবং অজ্ঞতাই তাকে একটা সম্ভাবনার দ্বারে দাঁড় করাইয়া রাখে। ভবিষ্যতে সে কীরূপ পরিগ্রহ করিবে তাহা অস্পষ্ট হইয়া বাস্তব সামাজিক জীবনের ভিত্তি রচনা করিয়া দেয়। যেন সে সমাজ হইতে প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ নিজের মাঝে যুক্ত করিয়া নেয়। এই বাস্তব কাঠামো তাকে বাধ্য করিয়া রাখে যাহাতে তাহার সত্যবোধ জাগিবে নাকি সাধারণ বাস্তবতায় জীবন অতিবাহিত করিবে তাহা আবিষ্কার করিতে তৎপর হইতে পারে। কোরান বর্ণিত ‘উলিল আমর’ তথা জ্ঞানী-গুণীজনের তত্ত্বাবধানের যাপিত জীবনে বিষয়টি সহজেই সুরাহা প্রাপ্ত হইতে পারে বলিয়া বোদ্ধা কোরান পাঠক দাবি করিয়া থাকেন।

দেখা যায়, কোরান মজিদে দৃঢ় প্রত্যয় বা একিন বিষয়ে ৩ রকম ধারণা ব্যক্ত করা হইয়াছে। তাহা যথাক্রমে ‘চাক্ষুস প্রত্যয়’ (আইনুল একিন- তাকাছুর ১০২:৭), ‘জ্ঞানের প্রত্যয়’ (এলমুল একিন- তাকাছুর ১০২: ৫) আর ‘যথার্থ প্রত্যয়’ (হাক্কুল একিন- ওয়াকেয়া ৫৬: ৯৫, হাক্কা ৬৯: ৫১)। নিম্নঅধিকারীগণ চাক্ষুস প্রত্যয় লাভ করিতে পারিলেও জ্ঞানের প্রত্যয় ও যথার্থ প্রত্যয় শুধু মাত্র উচ্চঅধিকারীগণের জন্য নির্ধারিত। প্রকৃতি মানুষকে যে সকল সাধারণ গুণাবলি প্রদান করিয়াছে তাহার অতিরিক্ত অর্জনে যাঁহারা সচেষ্ট শুধুমাত্র তাঁহারাই উচ্চঅধিকার লাভে সক্ষম বলিয়া প্রমাণিত। সাধারণ প্রকৃতিসম্পন্ন মানুষকে কিছু অসাধারণ চেতনা বা কর্মে নিযুক্ত থাকিয়াই এমন বৈশিষ্ট্যাবলি অধিকার করিতে হয়, যাহা একান্ত তাঁহারই। সুতরাং এইরূপ ব্যক্তিমানুষের সংখ্যা প্রায়শ স্বল্পই হইয়া থাকে। বাস্তবে অনেককে যেইরূপ দেখায় সত্যিকার অর্থে তাহারা তাহা নন। বাহ্যিক বেশভূষা দেখিয়া ব্যক্তি বা বস্তুর চরিত্র নির্ণয় দূরহ ব্যাপার বটে। বলিতে হয়, সকল চাক্ষুস সত্য যথার্থ সত্য হয় না। একইভাবে, সকল যথার্থ সত্য চাক্ষুস সত্য বা বাস্তব হইবেই –এমন নহে। সত্যের সাথে বাস্তবতার কিংবা বাস্তবতার সাথে সত্যের একটা দৃশ্যমান সংঘাত যেন চিরন্তন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁহার মৃত্যুর মাস দুয়েক পূর্বে একটি প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন, সেটির নাম ‘সত্য ও বাস্তব’। উহাতে কবিবর আমাদের পূর্বোল্লিখিত ধারণাই অভিব্যক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার মতন এত বড় একজন মানুষ তাঁহার সমগ্রজীবনের উপলব্ধিকে ভাষায় প্রকাশ করিয়াছেন, অকপটে বলিয়াছেন– সত্য আর বাস্তব এক নহে। অবশ্য ইহা সাহিত্য-শিল্প বিষয়ে বলা হইলেও নানাবিধ ক্ষেত্রেও ঐ তত্ত্ব কার্যকরি বটে।

পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে কিন্তু বাস্তব আর সত্য ততটা পার্থক্যবহ নহে। সুতরাং সত্যের চেয়ে টাকা বড়, ক্ষমতার বাস্তবতা বড়। এমনকি সত্যের চেয়ে ব্যক্তির বাস্তবতা বড়। ফলে সকলের ভোটের মান সমান। তাহাই ভোটের গোপনীয়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা হইয়াছে। কোন ভোট কে প্রদান করিলেন তাহা যেন উপলব্ধ না-হয় তাহাই রক্ষা করিবার তরে গোপন ব্যালট ব্যবস্থা। একজন গুণী বা জ্ঞানী কিংবা উচ্চঅধিকারী মানুষের ভোট আর একজন অতি সাধারণ নিম্নঅধিকারী ব্যক্তির ভোট কার্যত সমান বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। যাঁহাকে ভোটে নিবাচন করা হইলো তাঁহাকে তাৎক্ষণিক জবাব দিহিতার পরিবর্তে একটা বিশেষ সময়কাল পর্যন্ত স্বাধীনতা দিয়া নানান রকম দায়মুক্তির সুবিধা প্রদান করিয়া নিজেরাও তাঁহার কর্মের দায়মুক্তি নিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায়, কারণ, কে তাহাকে ভোট দিয়াছেন তাহার কোন প্রমাণ নাই। ভাবিয়া দেখিলে বুঝিতে পারিব যে, আমাদের দেশে যাাঁহারা কথিত গণতান্ত্রিক গোপন ভোটে নির্বাচিত হইয়া লুটপাটসহ বিস্তর অপকর্ম সাধন করিয়া থাকেন তাহাদের ঐ সকল অপকর্মের দায় কি ঐ সকল ভোটারের নাহি– যাহারা  সেই সব লুটেরা নেতাকে নির্বাচিত করেন? সত্য ইহাই যে, ভোটারের দায় আছে। কিন্তু বাস্তবতা ইহাই যে, ভোটারগণ দায়মুক্ত! এবং শেষ পর্যন্ত ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ পরিত্যক্ত!

ধর্মীয় পরিমণ্ডলে বিষয়টি আরও রুঢ় রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। মহামতি ইমাম হোসাইন সত্য হইলেও তাঁহার সমর্থকগণ অতিশয় অল্প, বিপরীতে যাহারা সত্য পরিপন্থি তাহারা বিশাল সংখ্যায় জগৎ দখল করিয়া রাখিয়াছে। কারবালার প্রান্তরে হোসাইনের মস্তক কর্তন করিয়াই সেই বিশাল এজিদ বাহিনী ক্ষান্ত হন নাই, বহু সংখ্যক ঘোড়া ছুটাইয়া ঐ সকল ঘোড়ার খুরে তাঁহার পবিত্র দেহখানিকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়া মাটিতে মিশাইয়া দিয়াছেন। যে হোসাইনকে হজরত মুহাম্মদ ‘আলে-মুহাম্মদ’ ঘোষণা করিয়াছেন (দ্রষ্টব্য : বুখারি ৩য় খণ্ড, হাদিস নং ১৩৯৮, পৃ. ৫২, ইফাবা) সেই তাঁহাকেই নজিরবিহিন নির্মম পাশবিকতায় নিহত করিবার পরক্ষণেই নামাজ পড়িয়া সেই ‘আলে-মুহাম্মদ’ এঁর নামে দরুদ পড়িয়াছেন। আজও মুসলিম সমাজে সকলেই নামাজে বসিয়া ‘আলে-মুহাম্মদের’ জন্য দরুদ পড়েন কিন্তু ‘আলে-মুহাম্মদ’ এঁর সত্য বুঝিয়া তাঁহাকে ভক্তি করিতে পারেন না। আহা! কি বাস্তবতা!

উচ্চঅধিকারীগণ বাস্তব আর সত্যের মাঝে ঘটিয়া চলা এমন জটিলতার নিরসন করিতে পারিলেও নিম্নঅধিকারীগণ তাহাতে নিজেরাই জটিল বিবাদে জড়াইয়া পড়েন। ইতিহাস শিল্প সাহিত্য দর্শন বিজ্ঞান ধর্ম –কোন ক্ষেত্রই এই বিবাদ থেকে নিষ্কৃতি পায় না।

জগতে কী আজব লীলা চলিতেছে– সত্য হইয়াও বাস্তব হয় না আবার বাস্তব হইয়াও সত্য হয় না!

পুষ্পিতা

২৩ জুন ২০২৬     

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ৩)

DEATH IN THE MODERN WORLD

আধুনিক পৃথিবীতে মৃত্যু


যখন আমি প্রথম পশ্চিমে এলাম, তখন মৃত্যুর প্রতি যে মনোভাব দেখলাম তাতে আমি খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি দেখলাম, মানুষ মৃত্যুর কথা এড়িয়ে চলে, যেন এটি এখনো পাওয়া যায়নি এমন কোনো প্রযুক্তিগত সাফল্য। আধুনিক পশ্চিমা সমাজে মৃত্যুর বিষয়ে বাস্তবিক কোনো উপলব্ধি নেই—মৃত্যুর মধ্যে কী ঘটে বা মৃত্যুর পর কী ঘটে সে সম্পর্কে।

আমি শিখেছি যে আজকের মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় এবং মনে করে মৃত্যু মানে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া ও সবকিছু হারিয়ে ফেলা। এর মানে হলো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মৃত্যুকে ভয়াবহ ও আতঙ্কজনক বলে মনে করে। এমনকি মৃত্যুর কথা বলা বা তার কথা উল্লেখ করাও অনেকের কাছে অসভ্য ও অশোভন বলে বিবেচিত হয়, এবং অনেকে বিশ্বাস করে যে কেবল মৃত্যুর কথা বললেই তার ঝুঁকি আমাদের ওপর এসে পড়তে পারে।

আবার অনেকে মৃত্যুকে খুব সরলভাবে উপেক্ষা করে—যেন এটি কেবল আমাদের পাশ দিয়ে চলে যাবে। অন্যরা মৃত্যুকে নিষ্ঠুর, চিন্তাহীন শত্রুর মতো দেখে; মনে করে এটি অজানা কোনো কারণ থেকে হঠাৎ এসে আমাদের সকল পরিশ্রমকে ধ্বংস করে দেবে এবং আমাদের যেটুকু সঠিক মনে হয় তা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে।

আমি যখন এ বিষয়ে ভাবলাম, তখন মনে পড়ল তিব্বতের এক মহান আচার্যের কথা। তিনি বলেছিলেন, “মানুষ প্রায়ই জীবনের নানা কাজকর্মে ভুলে যায় যে মৃত্যু আছে; তবু মৃত্যু সব সময় তাকিয়ে থাকে।”

মানুষ প্রায়ই মৃত্যুর কথা ভেবে বলে, “আচ্ছা, মৃত্যু তো সবারই হয়। এটা তেমন বড় কিছু নয়, স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি ঠিকই থাকব।” কিন্তু এই ধারণা ভালো শোনালেও, সেটি টেকে শুধু তখন পর্যন্ত—যতক্ষণ না কেউ সত্যিই মৃত্যুর মুখোমুখি হয়।

মৃত্যু সম্পর্কে এই দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে—একটি হলো মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়ানো, আর অন্যটি হলো এটাকে এমন কিছু ভাবা যা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। অথচ উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই মৃত্যুর প্রকৃত অর্থ বোঝা থেকে কত দূরে!

বিশ্বের সব মহান আধ্যাত্মিক ধারা—খ্রিস্টধর্মসহ—স্পষ্টভাবে আমাদের বলেছে যে মৃত্যু শেষ নয়। তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে ভবিষ্যৎ জীবনের ধারণা আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, যা এই বর্তমান জীবনকে পবিত্র অর্থে পূর্ণ করে। কিন্তু এসব শিক্ষার পরেও আধুনিক সমাজ অনেকটা আধ্যাত্মিক মরুভূমির মতো হয়ে গেছে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ মনে করে এই জীবনই সবকিছু। মৃত্যুর পরের জীবনের প্রতি কোনো সত্যিকারের বা গভীর বিশ্বাস না থাকায় অধিকাংশ মানুষ এমন জীবন যাপন করে যার কোনো চূড়ান্ত অর্থ নেই।

আমি উপলব্ধি করেছি যে মৃত্যুকে অস্বীকার করার ভয়াবহ প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো পৃথিবীকেই প্রভাবিত করে। যখন মানুষ মূলত বিশ্বাস করে যে এই জীবনই একমাত্র জীবন, তখন তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কোনো দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় না। ফলে তারা নিজেদের তাৎক্ষণিক স্বার্থে পৃথিবীকে লুটে নিতে বাধা অনুভব করে না এবং এমন স্বার্থপরভাবে জীবনযাপন করে যা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হতে পারে।

আর কত সতর্কবার্তা আমাদের দরকার? যেমনটি বলেছিলেন ব্রাজিলের সাবেক পরিবেশমন্ত্রী, যিনি অ্যামাজন রেইনফরেস্টের জন্য দায়িত্বশীল ছিলেন—

“আধুনিক শিল্পসমাজ এক ধরনের উন্মত্ত ধর্মের মতো। আমরা পৃথিবীর সব জীবন ব্যবস্থা ধ্বংস করছি, বিষাক্ত করছি, ভেঙে ফেলছি। আমরা এমন ঋণের কাগজে স্বাক্ষর করছি যা আমাদের সন্তানেরা পরিশোধ করতে পারবে না। আমরা এমনভাবে আচরণ করছি যেন আমরা পৃথিবীর শেষ প্রজন্ম। হৃদয়ে, মনে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন না এলে পৃথিবীর পরিণতি শুক্রগ্রহের মতো হবে—দগ্ধ ও মৃত।”

মৃত্যুর ভয় এবং মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে অজ্ঞতা আমাদের পরিবেশ ধ্বংসের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে, যা আমাদের সবার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলছে। তাই কি এটি আরও উদ্বেগজনক নয় যে মানুষকে শেখানো হয় না মৃত্যু কী, বা কীভাবে মরতে হয়? কিংবা মৃত্যুর পর কী আছে—সেই বিষয়ে কোনো আশা দেওয়া হয় না?

এটা কি আরও বেশি বিদ্রূপাত্মক নয় যে তরুণরা প্রায় সব বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত, কিন্তু সেই বিষয়টিতে নয়—যা পুরো জীবনের অর্থের চাবিকাঠি, এবং সম্ভবত আমাদের টিকে থাকারও চাবিকাঠি?

আমি প্রায়ই বিস্মিত হই যে আমি যেসব বৌদ্ধ গুরুদের চিনি, তারা তাদের কাছে আসা মানুষদের একটি খুব সহজ প্রশ্ন করেন—শিক্ষাদানের জন্য তারা একটি প্রশ্ন করেন:“তুমি কি বিশ্বাস করো যে এই জীবনের পরেও আরেকটি জীবন আছে?”

এখানে মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হয় না যে তারা এটিকে কেবল একটি দার্শনিক ধারণা হিসেবে বিশ্বাস করে কি না; বরং জিজ্ঞাসা করা হয় তারা এটি তাদের হৃদয়ের গভীরে অনুভব করে কি না। গুরু জানেন, যদি মানুষ এই জীবনের পরেও আরেকটি জীবনে বিশ্বাস করে, তবে জীবনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে এবং তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার এক স্পষ্ট অনুভূতি জন্ম নেবে।

গুরুরা মনে করেন, যদি মানুষের মধ্যে পরজীবনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস না থাকে, তবে একটি বড় বিপদ সৃষ্টি হয়। তখন মানুষ এমন এক সমাজ গড়ে তোলে যা কেবল স্বল্পমেয়াদি ফলাফলের দিকে মনোযোগী, নিজের কাজের পরিণতি নিয়ে খুব বেশি ভাবনা করে না। এটাই কি সেই প্রধান কারণ নয় যে আমরা এমন এক নিষ্ঠুর পৃথিবী তৈরি করেছি—যেখানে আমরা এখন বাস করছি, যেখানে সত্যিকারের সহমর্মিতা খুবই কম?

কখনো কখনো আমার মনে হয় যে উন্নত বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলো বৌদ্ধ শিক্ষায় বর্ণিত দেবলোকের মতো। বলা হয়, দেবতারা অসাধারণ বিলাসবহুল জীবন যাপন করে, কল্পনাযোগ্য সব ধরনের সুখে মেতে থাকে, কিন্তু জীবনের আধ্যাত্মিক দিক সম্পর্কে কোনো চিন্তা করে না।

সবকিছু ঠিকঠাক চলতে থাকে, যতক্ষণ না মৃত্যু কাছে আসে এবং হঠাৎ অবক্ষয়ের লক্ষণ দেখা দেয়। তখন দেবতাদের স্ত্রী ও প্রিয়জনরা আর তাদের কাছে যেতে সাহস পায় না; দূর থেকে তাদের দিকে ফুল নিক্ষেপ করে এবং অনায়াস ভঙ্গিতে প্রার্থনা করে—যেন তারা আবার দেবতা হয়ে জন্ম নেয়। কিন্তু তাদের সুখের কোনো স্মৃতি বা সান্ত্বনা তখন তাদের যে কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়, তা থেকে রক্ষা করতে পারে না; বরং তা কেবল কষ্টকে আরও তীব্র করে তোলে। ফলে সেই মৃত্যুপথযাত্রী দেবতারা শেষ পর্যন্ত একাকী ও দুঃখের মধ্যে মৃত্যুবরণ করে।

দেবতাদের এই পরিণতি আমাকে মনে করিয়ে দেয় আজকের সমাজে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষদের সঙ্গে আমাদের আচরণের কথা। আমাদের সমাজ যৌবন, যৌনতা ও ক্ষমতার প্রতি আসক্ত, আর আমরা বার্ধক্য ও অবক্ষয়কে এড়িয়ে চলি।

এটা কি ভয়াবহ নয় যে মানুষের কর্মজীবন শেষ হয়ে গেলে এবং তারা আর “উপকারী” না থাকলে আমরা তাদের পরিত্যাগ করি?

এটা কি উদ্বেগজনক নয় যে আমরা তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিই—যেখানে তারা একাকী ও পরিত্যক্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে?

এখন কি সময় হয়নি আবার নতুন করে ভাবার—আমরা কীভাবে ক্যান্সার বা এইডসের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষদের সঙ্গে আচরণ করি? আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি যারা এইডসে মারা গেছেন, এবং আমি দেখেছি কীভাবে তাদের প্রায়ই সমাজচ্যুত মানুষের মতো আচরণ করা হয়েছে—এমনকি তাদের বন্ধুদের কাছ থেকেও ভালো আচরণ পায় নি। রোগটির সঙ্গে যুক্ত সামাজিক কলঙ্ক তাদের হতাশায় নিমজ্জিত করেছে এবং তাদের এমন অনুভব করিয়েছে যেন তাদের জীবন ঘৃণ্য এবং পৃথিবীর চোখে তা ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।

এমনকি যখন আমাদের পরিচিত বা প্রিয় কেউ মৃত্যুপথযাত্রী হয়, তখনও মানুষ প্রায়ই বুঝতে পারে না কীভাবে তাদের সাহায্য করতে হবে। আর যখন তারা মারা যায়, তখন আমরা প্রায়ই উৎসাহিত হই না মৃত ব্যক্তির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবতে—তিনি বা তিনি মৃত্যুর পর কী অবস্থায় আছেন তা নিয়ে। মৃত ব্যক্তির অস্তিত্ব কীভাবে চলতে থাকে, বা আমরা কীভাবে তাকে সাহায্য করতে পারি—এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার কোনো চেষ্টা আজকাল প্রায়ই অর্থহীন বা হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু এসব আমাদের যে কঠিন সত্যটি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে তা হলো—আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন আমাদের মৃত্যুর প্রতি এবং মৃত্যুপথযাত্রার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

সৌভাগ্যবশত, এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ধর্মশালার আন্দোলন মৃত্যুপথযাত্রীদের বাস্তবিক ও মানসিক যত্ন দেওয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবিক ও মানসিক যত্নই যথেষ্ট নয়; যারা মৃত্যুর পথে, তাদের ভালোবাসা ও যত্নের পাশাপাশি আরও গভীর কিছু প্রয়োজন। তাদের প্রয়োজন মৃত্যু এবং জীবন—উভয়েরই প্রকৃত অর্থ আবিষ্কার করা। তা না হলে আমরা কীভাবে তাদের চূড়ান্ত সান্ত্বনা দিতে পারি?

অতএব মৃত্যুপথযাত্রীদের সাহায্যের মধ্যে আধ্যাত্মিক যত্নের সম্ভাবনাও থাকতে হবে, কারণ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধ্যমেই আমরা সত্যিকার অর্থে মৃত্যুকে বুঝতে এবং তার মুখোমুখি হতে পারি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমে মৃত্যু ও মৃত্যুপথযাত্রা সম্পর্কে আলোচনা যেভাবে উন্মুক্ত হয়েছে, তা আমাকে আশাবাদী করেছে। এলিজাবেথ কুবলার-রস এবং রেমন্ড মুডির মতো পথিকৃতরা এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। মৃত্যুপথযাত্রীদের যত্নের বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করে এলিজাবেথ কুবলার-রস দেখিয়েছেন যে নিঃশর্ত ভালোবাসা ও আরও আলোকিত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মৃত্যুও শান্তিপূর্ণ—এমনকি রূপান্তরমূলক অভিজ্ঞতা হতে পারে।

রেমন্ড মুডির সাহসী গবেষণার পর যে নিকট-মৃত্যু অভিজ্ঞতা (near-death experience) নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে, তা মানবজাতির সামনে এক শক্তিশালী আশা তুলে ধরেছে—জীবন মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায় না; সত্যিই “জীবনের পরেও জীবন” আছে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, কেউ কেউ এই উপলব্ধির প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারেনি। তারা মৃত্যুকে অতিরঞ্জিতভাবে রোমান্টিক করে তুলেছে। আমি এমন কিছু দুঃখজনক ঘটনার কথা শুনেছি যেখানে তরুণরা আত্মহত্যা করেছে, কারণ তারা ভেবেছিল মৃত্যু সুন্দর এবং তাদের জীবনের হতাশা থেকে মুক্তির পথ।

কিন্তু আমরা যদি মৃত্যুকে ভয় পাই এবং তার মুখোমুখি হতে অস্বীকার করি, অথবা তাকে রোমান্টিক করে দেখি—উভয় ক্ষেত্রেই মৃত্যুকে তুচ্ছ করা হয়। মৃত্যুকে নিয়ে হতাশা কিংবা উচ্ছ্বাস—দুটিই এক ধরনের পালিয়ে থাকা। মৃত্যু না বিষণ্নতার বিষয়, না উত্তেজনার বিষয়; এটি কেবল জীবনের একটি সত্য।
দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের অধিকাংশ মানুষই কেবল মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছালে জীবনের মূল্য বুঝতে শুরু করে। তখন আমার প্রায়ই মহান বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভবার কথাগুলো মনে পড়ে—“যারা মনে করে তাদের হাতে অনেক সময় আছে, তারা মৃত্যুর সময়েই কেবল প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তখন তারা গভীর অনুতাপে পুড়ে যায়। কিন্তু তখন কি খুব দেরি হয়ে যায় না?”
আধুনিক পৃথিবী সম্পর্কে এর চেয়ে ভয়ংকর মন্তব্য আর কী হতে পারে—যে অধিকাংশ মানুষ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত না হয়েই মারা যায়, কারণ তারা জীবনের জন্যও প্রস্তুত ছিল না।

ভাব বিনিময়ের সূক্ষ্ম শিল্প (পর্ব-৩)

দ্বিতীয় অধ্যায়

নিজের সাথে ভাব-বিনিময়

আধুনিককালের দুঃখ হলো, একাকীত্ব। অনেক মানুষের মাঝে থেকেও আমরা খুব একা অনুভব করি। এমনকি আমরা কারো সাথে থেকেও একাকী বোধ করি। কেমন যেন একটা খালি খালি ভাব। এটা একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে। তাই আমরা অনেকের সাথে যুক্ত হয়ে এই দুঃখ লাঘবের চেষ্টা করি। আমরা বিশ্বাস করি যে অনেকের সাথে থাকলে পরে আমাদের এই একাকীত্ব ভাবটি কেটে যাবে।

এই সংযোগ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার জন্য প্রযুক্তি আমাদের কাছে নানান ধরণের যন্ত্র সরবরাহ করেছে। কিন্তু মুশকিলটা হলো এইসমস্ত বিষয়ে সংযুক্ত থাকার পরেও আমরা একাকীত্ব বোধ করি। আমরা ই-মেইল চেক করি, মেসেজ পাঠাই, মাঝে মাঝে একই দিনে কয়েকবার স্ট্যাটাস আপডেট করি। আমরা নিজেদের ভাবনা শেয়ার করতে চাই। পাশাপাশি অন্যেরটা গ্রহণ করতেও চাই। আমরা হয়তো সারাটাদিন ধরেই সংযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু একাকীত্ব কমিয়ে আনার জন্য কোনো চেষ্টা করি না। 

আমরা সবাই ভালোবাসার জন্য ক্ষুধার্থ, কিন্তু এই খিদা মেটানোর জন্য ভালোবাসার উৎপাদন কীভাবে করতে হবে সে নিয়ে আমরা কিছুই জানিনা। যখন আমাদের একা লাগে তখন আমরা চেষ্টা করি যেন একাকীত্বের এই দুর্বিষহ অবস্থাটি আমরা প্রযুক্তির নানা উপাদান ব্যবহার করে কমিয়ে ফেলতে পারি। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয় না। আমাদের ইন্টারনেট আছে, ই-মেইল আছে, ভিডিও কনফারেন্স আছে, মেসেজ করা এবং পোস্ট দেওয়া, নানাধরনের এপ্স, চিঠি এবং ফোন কল সবই আছে আমাদের। তারপরেও আমাদের যোগাযোগে কোনো উন্নতি এসেছে তা আমরা হলফ করে বলতে পারবো না। 

আমাদের অনেকেরই মুঠোফোন আছে। আমরা অন্য মানুষদের সাথে তা দিয়ে সংযোগে থাকতে চাই। কিন্তু এই ফোনের প্রতি খুব বেশি আস্থা করা আমাদের উচিৎ হবে না। আমার একটাও ফোন নেই, কিন্তু তার জন্য বহির্বিশ্বের সাথে সংযোগ নেই বলে মনে হয় না। বরঞ্চ, মুঠোফোন নেই বলে আমার নিজের জন্য, এবং বাকিদের জন্যেও আমার অনেক সময় রয়েছে। আপনি বিশ্বাস করেন যে মুঠোফোন আছে বলেই অন্যদের সাথে যোগাযোগ আছে। কিন্তু আপনার আলাপের বিষয়বস্তু যদি অকৃত্রিম না হয়, তাহলে একটা যন্ত্র দিয়ে কারো সাথে কথা বলার মানে এই না যে সেখানে কোনো ধরণের যোগাযোগ ঘটছে। যোগাযোগের জন্য আমরা প্রযুক্তিকে বেশিমাত্রায় বিশ্বাস করি। এইসমস্ত যন্ত্রের পিছনে আছে আমাদের মন। মন হলো যোগাযোগের সবথেকে মৌলিক যন্ত্রটি। মন যদি অবরুদ্ধ থাকে তাহলে কোনো যন্ত্রের ক্ষমতা নেই আমাদেরকে নিজের সাথে বা অপরের সাথে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতে পারে। 

অন্তর্নিহিত সংযোগ

আমাদের মাঝে অনেকেই মিটিং করে বা ই-মেইলের মাধ্যমে অন্যদের সাথে যোগাযোগ করে অনেক সময় কাটিয়ে ফেলি। ফল হিসেবে আমরা নিজেরাও টের পাই না যে আমাদের নিজেদের মাঝে কি চলছে। আমাদের ভিতরে হয়তো ঝড় বইছে। তাহলে তখন কীভাবে আমরা আরেকজন মানুষের সাথে যোগাযোগ নিশ্চিত করবো?

আমরা মনে করি যে, আমাদের প্রযুক্তিগত যত যন্ত্র তা দিয়ে আমরা সংযোগ স্থাপন করি কিন্তু এটা একটা মায়ার খেলা। দৈনন্দিন জীবনে আমরা নিজেদের কাছ থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে আছি। আমরা হাঁটি, চলি ফিরি কিন্তু আমরা জানিনা যে আমরা হাঁটছি। আমরা এখানেই আছি কিন্তু আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না যে আমরা সামগ্রিকভাবে এখানেই আছি। আমরা জীবন্ত কিন্তু আমরা জানিনা যে আমরা বেঁচে আছি। গোটা দিন ধরে আমরা নিজেদের কেবল হারিয়েই চলেছি। 

বাকিসব থামিয়ে নিজের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হলো একটা বৈপ্লবিক বিষয়। আপনি বসে গেলেন, এবং নিজেকে ক্রমাগত হারিয়ে যেতে দেওয়ার অবস্থাটা থেকে উদ্ধার করলেন। যা কিছু করছিলেন তার সব থামিয়ে দিন, বসে পড়ুন এবং নিজের সাথে সংযোগ করুন। একেই বলে স্থির চিত্তে জাগ্রত অবস্থা। স্থির চিত্ত হলো বর্তমান মুহূর্তের সম্পূর্ণ জাগ্রত রূপ। এইজন্য আপনার কোনো আইফোন বা কম্পিউটারের প্রয়োজন নেই। আপনার কেবল প্রয়োজন বসে যাওয়া, এবং দম নেওয়া ও ছাড়া। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনি নিজের সাথে সংযোগ ঘটাতে পারবেন। আপনি জানতে পারবেন আপনার দেহের মাঝে কি ঘটছে, আপনার অনুভূতিরা কি বলছে, আপনার আবেগগুলোর কি পরিস্থিতি এবং আপনার কি উপলব্ধি হচ্ছে।

নবির দেশে 

কোভিডের নিষেধাজ্ঞার পর কাবার আঙিনা উন্মুক্ত হয়েছে বেশিদিন হয়নি তখনো। মানুষের উপচে পড়া ভিড়! তার ওপর ডিসেম্বর মাস, আরব-আকাশে সূর্যতাপ অতোটা নির্দয় থাকে না। সবমিলিয়ে রুদ্ধশ্বাস ভিড়!  

মাহরামবিহীন ওমরার্থী আমরা দুজন নারী। শ্রদ্ধেয় তাপস দত্ত দাদা এতো সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, কোনো বেগই পেতে হয়নি আমাদের!  

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সাফা-মারওয়ায় স্বল্প গতির দৌড়ে কষ্ট অনুভূত হয়নি কোনো। 

পাঁজরের হাড় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে হজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে গিয়ে। খুব ইচ্ছে ছিল কাছ থেকে পাথরটি দেখার, স্পর্শ করার চাওয়া পূর্ণ হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।

 নবিজির জন্মস্থান বলে উল্লেখিত ঘরের দরজায় গাল থেকে বসে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অদ্ভুত  অনুভূতি!  

হেরা গুহায় ঢুকে আমাকে অভিভূত করে রেখেছে একটি ভাবনা! 

এখন  ওঠার জন্য সিঁড়ি  কাটা আছে। 

দেড় হাজার বছর আগে তো তা ছিল না! পাথর বেয়ে বেয়ে মা খাদিজা খাবার নিয়ে এখানে কীভাবে উঠতেন! কতটা নিবেদিত প্রাণ হলে প্রতিদিন কষ্টসাধ্য এই কাজটি করতে পেরেছেন! ঘরে ছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ স্ত্রী বিবি খাদিজা(রা.); বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মসজিদ কাবাও ছিলো পাশে।  তারপরও  দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে  তিনি কাবা শরিফ থেকে ২মাইল দূরে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ১হাজার ফুট উচ্চতায় এসে ধ্যান করতেন! তার মানে নীরব, একাকী সাধনা কতোটা প্রয়োজন! দীর্ঘদিন ধরে নবিজি এখানে ধ্যান মগ্ন থাকতেন । 

তিনি যদি আমাদের প্রিয় হন, অনুসরণীয় হন, আদর্শ হন, তাহলে আমাদের জীবনে ধ্যানের চর্চা কোথায়?!  সেটা নেই কেন?! কে / কারা কোন উদ্দেশ্যে ধ্যানের বিষয়টাকে সরিয়ে দিয়েছে?!  

এমন অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো মনে!  

মদিনায় গিয়ে মন শীতল হয়ে গেছে। মক্কাকে মনে হয়েছে কাবাকেন্দ্রিক এক বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র! সেখানে মোহাম্মদ (সা.) গৌণ!  

মক্কায় উগ্রতা আছে, মদিনায় আছে শীতলতা।  

আবু জেহেলের বাড়ি এখন গণ শৌচাগার। এখানেও প্রশ্ন: আবু জেহেল কি কেবল একজন ব্যক্তি? নাকি একটি অবস্থা, একটি মানসিক স্তর, যে স্তরে অবস্থানকারী অসংখ্য আবু জাহেল চারপাশে বিরাজমান! 

এই প্রশ্নের উদয় এবং উত্তর পরম শ্রদ্ধেয় হিলালুজ্জামান হেলাল ভাইয়ের গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘কোরানে মানুষ তত্ত্ব’ বইয়ে অত্যন্ত  সুন্দর করে দেওয়া আছে।  তর্ক করার জন্য হলেও বইটি পড়তে পারেন আগ্রহীরা।

ইচ্ছে করে

ইচ্ছে করে ইট পাথরের দেয়াল ছেড়ে

চলে যাই দূর বনে,

যেখানে খোলা আকাশের নিচে

নদী বয়ে চলে আপন মনে।

ইচ্ছে করে পাখি হয়ে যাই

নেই কোনো পড়ালেখা,

সারাদিন রাত বনে বাদাড়ে

ঘুরব একা একা।

ইচ্ছে করে দয়ালের কাছে

বসে থাকি কিছুক্ষণ,

পরমত্বের বাণী

শুনি দিয়ে এই তনুমন।

ইচ্ছে করে মুক্ত হতে পেরিয়ে

যেতে এ দেহ কারাগার,

থাকবে নাতো কোনো জায়গা

হিংসা, অহং,দুঃখ আর লোভ-লালসার।

ইচ্ছে করে জীবনের সেই পরম অর্থ খুঁজি,

ভুলের মধ্য দিয়েই আসল সত্যটা কে বুঝি।

তৃষ্ণার্ত মন

হটাৎ পানির তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে গেল। বিছানার ডান পাশে ছোট্ট একটি টেবিল, তার ওপরে শিল্পকার্য করা পিতলের একটি জগে পানি রয়েছে। বাড়ির উঠোনের পিছনের দিকে ব্যবহারযোগ্য একটি কুয়ো রয়েছে; কিছুদূর হেঁটে গেলে, প্রায় ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে একটি নদী—খুবই সচ্ছল পানি, স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছায় বয়ে যাচ্ছে। অথচ কি আশ্চর্য হাতের কাছে এত কিছু থাকার পরও মন বলছে, আমি খুবই তৃষ্ণার্ত; আহ আশেপাশে যদি একটি সাগর থাকতো। এই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে খোঁজা শুরু হলো— আশেপাশে কি সাগর আছে যেখানে গেলে আমার এই তৃষ্ণা মিটবে?

কে যেন মনকে প্রশ্ন করল, তুমি কেন সাগর খুঁজে বেড়াচ্ছ এবং কেন ভাবছো যে সাগরের জলে তোমার তৃষ্ণা মিটবে, যেখানে তোমার হাতের কাছে পানির সকল ব্যবস্থা রয়েছে? তুমি কি ভুলে গেছো সাগরের নোনা জলে কখনো তৃষ্ণা মিটবে না, বরং আরও তৃষ্ণা বাড়াবে? তুমি কি এটাও ভুলে গেছো যে তোমার আশেপাশে হাজার কিলোমিটার হেঁটে বেড়ালেও সাগর খুঁজে পাবে না? তোমার এই অবান্তর চাওয়ার কারণ কি? ঠিক তখন মন কোন উত্তর দিতে না পেরে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে গেল।

তোমার আজব লীলে

তোমার আজব লীলে –

পাপীরে দেহি স্বর্গে হাসে,

পূর্ণবান কান্দে দোযগে বসে!

অন্ধরে দেহি সব দেখে,

চুক্ষুবান চোখ লইয়াও আন্ধা!

কাঁধওয়ালা কাঁধ নিয়াও শুন্য,

আরেক হালায় রশি ছাড়াই বান্ধা!

মুখ থাকতে কয় না কথা,

মুখ ছাড়া ভাষাহারা!

মুন্ডু লইয়াও মুন্ডুহীন,

আরেক হালায় দিশাহীন!

সময় থাকতে হুশ হয় না,

হুশ হইলে সময় ফুরায় না!

কারে কমু এই কথা,

নিজেই বুঝি না কি কই!

তোমার আজব লীলে।

ভাব বিনিময়ের সূক্ষ্ম শিল্প (পর্ব – ২)

স্থির চিত্তে গ্রহণ করা

কথোপকথনের কোন প্রক্রিয়াটি আপনার জন্য ভালো আর কোনটি মন্দ তা কীভাবে বুঝবেন? একটি স্বাস্থ্যকর আলাপের জন্য স্থির চিত্তের শক্তি প্রয়োজন। স্থির চিত্ত আমাদেরকে বিচারকের ভূমিকা থেকে সরিয়ে জাগ্রত হালে ফেরত আনে। এই জাগ্রত হাল হলো দেহ ও দমের স্বস্তিময় এক নহর। এই জাগ্রত হাল আমাদেরকে নিজের কাছে পৌঁছে দেয়। কেবল নিজেকে ভাবার জায়গা থেকে বের করে আমাদের চারপাশের অস্তিত্বের প্রতি চেতন করে তোলে। এই চেতনাবোধটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে যে, আপনি এতক্ষণ মনোজগতে যে চিন্তার জাল বুনছিলেন সেটা স্বাস্থ্যকর নাকি অস্বাস্থ্যকর। সেটা কি করুণাময়, নাকি নিষ্ঠুর।

কথোপকথন হলো পুষ্টিগুণের উৎস। আমরা সবাই একাকী অনুভব করি, এবং কারো না কারো সাথে কথা বলতে চাই। কিন্তু যখন আপনি অন্য একটি মানুষের সাথে কথা বলেন তখন হতে পারে সেই অপর মানুষটি যা বলছেন তা হয়তো বিষময়। হতে পারে তার কথাগুলো ঘৃণাপূর্ণ, ক্রোধ এবং হতাশাপূর্ণ। যখন আপনি শুনবেন যে অন্যরা কি বলছে, আপনি কিন্তু সেই বিষগুলোকে ধারণ করছেন। এর মাধ্যমে বিষগুলোকে আপনি আপনার চেতনে ও দেহে নিয়ে আসছেন। এজন্য স্থির চিত্তের কথাটা বলা। তাই স্থির চিত্তে শোনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। 

বিষময় একটা কথোপকথনকে এড়িয়ে যাওয়া হয়তো খুব কঠিন ব্যাপার, বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে। আপনার চারপাশে এই ঘটনাপ্রবাহ চলছে, তাই সতর্ক থাকবেন। এই বিষের দুঃখে পতিত না হতে চাইলে আপনাকে স্থির চিত্তে জাগ্রত হালের একজন অধিকারী হতে হবে। করুণা শক্তির আবরণে নিজেকে মুড়িয়ে এই দুঃখ-দুর্দশা থেকে আপনাকে নিজের রক্ষা করতে হবে। যেহেতু এমন কথা আপনাকে শুনতেই হবে তাই এই বিষময় খাদ্যকে গ্রহণের পরিবর্তে আপনি সক্রিয়ভাবে নিজের মাঝে আরো করুণাভাবের উদয় ঘটাতে পারেন। যখন আপনি এভাবে শুনতে শিখবেন, করুণা আপনাকে রক্ষা করবে। এমনকি যিনি কথাগুলো বলছেন তার দুঃখবোধকেও কমিয়ে আনবে। 

আপনি কেবল নিজের চিন্তা, কথা এবং কর্ম শুষে নিচ্ছেন এমন নয়। আপনার সাথে যাদের যোগাযোগ তাদের চিন্তা, কথা এবং কর্মগুলোও শুষে নিচ্ছেন। এটা এক ধরনের ভোগ। তাই যখন আপনি কিছু পড়ছেন, কারো কথা শুনছেন তখন আপনার সতর্ক থাকা দরকার যেন এর বিষ বা ভোগের যে ভোগান্তি(দুঃখ) তা যেন আপনার স্বাস্থ্যহানি না ঘটায়, যেন তা আপনার জীবনে দুঃখ বয়ে না আনে। পাশাপাশি আপনার জীবনে থাকা একজন বা অনেকজনের জীবনেও যেন তা দুঃখ বয়ে না আনে। 

সত্য-কে এঁকে বোঝাতে গেলে বুদ্ধ একটি গল্প শোনাতেন। তিনি একটা জরাগ্রস্ত গরুর ছবি দেখিয়ে গল্পটি বলতেন। গরুটির চর্মরোগ ছিলো। সে মাটি, গাছ, পানি থেকে আসা অসংখ্য পোকামাকড় ও মাইক্রোঅর্গানিজম দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিল। পচনশীল চামড়া নিয়ে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না। স্থির চিত্ত হলো আমাদের সেই পরিষ্কার চামড়া। কেননা চিত্ত স্থির না থাকলে আমরা বিষময় বিষয়রাশির মাঝে নিজেদেরকে ডুবিয়ে রাখি যে কেবলই ক্ষয় করে। 

আপনি আপনার গাড়ি নিয়ে শহরের রাস্তায় বের হওয়ার মতন সহজ কাজটির মধ্য দিয়েও খাদ্য গ্রহণ করছেন। যেসকল বিজ্ঞাপন আপনার নজরে এলো যার দরুন আপনি ভোগ্যপণ্য নিতে মনে মনে বাধ্য হচ্ছেন সেটিও আপনার খাবার। এমনকি আপনি এমনভাবেও দেখতে পারেন যে এগুলো অতিরিক্ত ও বিষাক্ত ভোগের ফলাফল। স্থির চিত্তে গ্রহণ করার মনোবৃত্তি দিয়ে আমাদের নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে। তাই স্থির চিত্তে কোনো বিষয়কে গ্রহণ করতে পারাটা খুব দরকার। আমরা এমনভাবে ভাবের আদান-প্রদান করতে পারি যা শান্তির সাথে সংহতিপূর্ণ এবং নিজের প্রতি করুণাময় ও অন্যদের প্রতি আনন্দদায়ক।

সঠিক খাবার ছাড়া সম্পর্ক টিকে না

আমাদের মাঝে অনেকেই যোগাযোগ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ভোগান্তির(দুঃখের) শিকার। আমরা মনে করি যে আমাদের কেউ বুঝতে পারে না। বিশেষ করে যাদের আমরা ভালোবাসি তাদের প্রতি এই অভিমানটা আমাদের কাজ করে। একটা সম্পর্কে, আমরা একে অন্যের জন্য পুষ্টিকর উপাদান হিসেবে কাজ করি। তাই আমাদের সেই ধরণের খাদ্য বাছাই করতে হবে যা আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষটিকে দিতে চাই। এমন ধরণের খাবার যা আমাদের এই পারস্পারিক সম্পর্ককে আরো সমৃদ্ধ করবে। এরমাঝে সবকিছু অন্তর্ভুক্ত—ভালবাসা, ঘৃণা এবং দুঃখ—চলমান থাকার জন্য এই সমস্ত খাবার দরকারি। সম্পর্কে ভোগান্তি(দুঃখ) চলমান থাকার অর্থ হলো, আমরা আমাদেরকে খাদ্য হিসেবে দুঃখ নিয়ে চলেছি। যতবার আমরা অস্থির চিত্তে কথা বলছি, ততবারই আসলে নিজেদের দুঃখ খাওয়াচ্ছি। 

স্থির চিত্তে জাগরণের মাধ্যমে আমরা নিজেদের এই দুঃখবোধের প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারবো। তখন আমরা টের পাবো যে কি ধরণের খাবার এতদিন আমরা নিজেদের দিয়ে আসছি এভাবে বেঁচে থাকার জন্য। এই দুঃখ লাঘবের জন্য পুষ্টির উৎসজ্ঞান যখন আমাদের প্রাপ্তি হবে তখন আমরা আগের খাবারের সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারবো। তখন ধীরে ধীরে আমাদের দুঃখবোধ জীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকবে। 

প্রায়সময়েই দেখা যায় একটা রোম্যান্টিক সম্পর্ক খুব সৌন্দর্যের সাথে শুরু হলেও যেহেতু আমাদের জানা নেই কীভাবে এই সম্পর্ককে লালন করতে হয় তাই সম্পর্কটি একসময় মরে যেতে থাকে। ভাব-বিনিময় এমন একটি ঘটনা যা এই মৃতপ্রায় সম্পর্ককে জীবনদান করতে সক্ষম। আপনার মস্তিষ্কে এবং মনে আপনি যতগুলো চিন্তাভাবনা গড়ে তুলছেন তা নিয়ে চীনে একটা কথা প্রচলিত আছে। তারা বলে ‘‘রহস্য যত তোমার পেটের মাঝে’’—তো এই পেটের মাঝের খাবার হলো সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার রসদ। যখন কোনো চিন্তা আপনার মাঝে সন্দেহ জাগায়, ক্রোধান্ধ করে তোলে, ভয় পাওয়ায়, অস্বস্তি দেয় তাহলে এই চিন্তাটা না আপনাকে, না আপনার সঙ্গীকে লালনপালনে সক্ষম। সম্পর্কটা যদি জটিল হয়ে থাকে, তার কারণ হলো আমরা আমাদের বিচারি মনোভাবকে এবং আমাদের ক্রোধকে লালন করেছি, আমাদের করুণাময় সত্তাটিকে নয়।  

একদিন প্লাম ভিলেজের ফ্রেঞ্চ রিট্রিট সেন্টারে মানে যেখানে আমি থাকি সেখানে একটা আলোচনাসভায় বক্তৃতা দিচ্ছিলাম যে, কীভাবে প্রেমময় ভাব-বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের সম্পর্কগুলোকে লালন করতে পারি। আমি সেদিন ভালোবাসার মানুষদেরকে ফুলের সাথে তুলনা করেছিলাম। ফুলের যেমন বেড়ে উঠতে পানির প্রয়োজন হয়, তেমনি করে ভালোবাসার সম্পর্কে প্রেমময় ভাব-বিনময় পানির মতই কাজ করে। আমার কাছের সারিতেই একজন ভদ্রমহিলা বসেছিলেন যিনি পুরোটা সময় জুড়ে কাঁদছিলেন। সেদিনের আলোচনাসভা শেষ হতেই আমি তার স্বামীর কাছে গিয়ে বললাম, ‘‘প্রিয় বন্ধু, তোমার ফুলগাছের কিছু পানির প্রয়োজন দেখা যাচ্ছে।’’ তার স্বামীও সেদিনের আলোচনায় ছিলেন এবং প্রেমময় ভাব-বিনিময় সম্পর্কে জেনেছিলেন। কিন্তু এতকিছু জানার পরেও আমাদের একজন পরম বন্ধুর প্রয়োজন পড়ে যিনি আমাদের ক্ষণে ক্ষণে মনে করিয়ে দেবেন। দুপুরের খাবারের পর স্বামীটি তার স্ত্রীকে নিয়ে গাড়িতে করে গ্রামের রাস্তায় একটু ঘুরতে বের হলেন। তারা হয়ত মাত্র এক ঘন্টা বা তার কিছু কম সময়ের জন্য বাইরে ছিলেন। কিন্তু সেই অল্প সময়টুকুতে ভদ্রলোকটি শুদ্ধ বীজে পানি দেওয়ার প্রতিই নিজের মনকে নিবিষ্ট করেছিলেন। 

যখন তারা ফিরে এলেন ভদ্রমহিলাকে দেখে মনে হলো তার মাঝে একটা বিশাল পরিবর্তন এসে গিয়েছে। তিনি দারুন খুশি এবং আনন্দিত। এ দেখে তাদের সন্তানেরা খুব অবাক হয়। কারণ সকালে যখন তাদের বাবা মা ভ্রমণে বেরিয়েছিল তখন তাদের মাঝে দুঃখ এবং অস্বস্তিকর ভাবটা স্পষ্ট ছিল। মাত্র এক ঘন্টায় নিজেকে এবং অন্য মানুষকে রূপান্তর করানো যায়, কেবলমাত্র স্থির চিত্তে শুদ্ধবীজে পানি প্রদানের মাধ্যমে। স্থির চিত্তকে কর্মের মাধ্যমে ফলিয়ে দেখার আছে; এটি কেবল তত্ত্বাকারে থেকে যাওয়ার বিষয় নয়। 

লালন করা এবং সারিয়ে তোলার যে ভাব-বিনিময় সেটাই আমাদের সম্পর্কের খাদ্য। মাঝে মাঝে একটি কঠোর ব্যবহার বহু বছর ধরে অপর মানুষটিকে ভোগাতে পারে। আমরা নিজেরাও সেই কারণে বহু বছর ধরে দুঃখ পেয়ে থাকি। একটি ক্রোধের বা ভয়ের মুহূর্তে, আমরা বিষময় বা ধ্বংসাত্মক কিছু বলে ফেলতেই পারি। আমরা যদি বিষটা গিলে ফেলি তাহলে তা আমাদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাবে এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ককে মেরে ফেলবে। আমরা হয়তো টেরও পাবো না যে ঠিক কি কারণে কোন বিষের কারণে সম্পর্কটি দিনদিন মারা যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাছে প্রতিষেধক আছে। স্থির চিত্তের করুণা, এবং প্রেমময় ভাব-বিনিময়। ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব নামক সম্পর্কগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য খাদ্য প্রয়োজন। স্থির চিত্তের মাধ্যমে আমরা শুদ্ধ চিন্তার উদয় ঘটাতে পারি। আমাদের সম্পর্কগুলোকে সমৃদ্ধ করার জন্য তাই যুতসই খাদ্য প্রদানের মাধ্যমে মুখের ভাষা ও কর্মকে আমরা বিকশিত করে তুলতে পারি। 

চলবে… …

১ম পর্ব

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ২)

সামতেন মারা যাওয়ার পরে আমরা তিব্বতের রাজধানী লাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ঘোড়ায় চড়ে তিন মাসের দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। সেখান থেকে আমরা মধ্য ও দক্ষিণ তিব্বতের পবিত্র স্থানগুলোতে তীর্থযাত্রা অব্যাহত রাখলাম। এগুলো সেই সব সাধু, রাজা ও পণ্ডিতদের পবিত্র স্থান, যারা সপ্তম শতাব্দী থেকে তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম নিয়ে এসেছিলেন। আমার গুরু ছিলেন নানা ধারার বহু গুরুর অবতারস্বরূপ, এবং তার খ্যাতির কারণে আমরা যেখানে যেতাম সেখানেই তাকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হতো।

আমার জন্য সেই যাত্রা ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং আজও তা অসংখ্য সুন্দর স্মৃতিতে ভরা। তিব্বতিরা খুব ভোরে উঠে, যাতে দিনের সব প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা যায়। সন্ধ্যা নামলে আমরা ঘুমাতে যেতাম এবং ভোর হওয়ার আগেই জেগে উঠতাম। প্রথম আলো ফুটতেই মালপত্র বোঝাই করা ইয়াকগুলো রওনা হয়ে যেত। তাঁবুগুলো গুটিয়ে ফেলা হতো, আর শেষের দিকে নামানো হতো রান্নাঘরের তাঁবু ও আমার গুরুর তাঁবু। একজন আগেভাগে গিয়ে ভালো কোনো ক্যাম্প করার জায়গা বেছে নিত। তারপর আমরা দুপুরের দিকে সেখানে থামতাম এবং বাকি দিনের জন্য ক্যাম্প করতাম। আমি নদীর ধারে ক্যাম্প করতে খুব পছন্দ করতাম—জলের শব্দ শুনতে কিংবা তাঁবুর ভেতরে বসে ছাদের ওপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনতে।

আমরা ছিলাম ছোট একটি দল, মোটামুটি তিরিশটি তাঁবু নিয়ে। দিনের বেলায় আমি আমার গুরুর পাশে সোনালি রঙের একটি ঘোড়ায় চড়ে যেতাম। চলার পথে তিনি শিক্ষা দিতেন, গল্প বলতেন, সাধনা করতেন এবং বিশেষ করে আমার জন্য কিছু সাধনার পদ্ধতিও তৈরি করতেন। একদিন আমরা যখন ইয়ামদ্রোক ত্‌সো নামের পবিত্র হ্রদের কাছে পৌঁছালাম এবং তার পানির ফিরোজা রঙের দীপ্তি দেখতে পেলাম, তখন আমাদের দলের আরেক লামা—লামা সেতেন—মৃত্যুর দিকে এগোতে শুরু করলেন।

লামা সেতেনের মৃত্যু আমার জন্য আরেকটি গভীর শিক্ষা হয়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন আমার গুরুর আধ্যাত্মিক স্ত্রী খাণ্ড্রো সেরিং চোদ্রনের শিক্ষক। অনেকেই তাকে তিব্বতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী সাধিকা হিসেবে সম্মান করতেন—একজন আড়াল থাকা গুরু, যার স্নেহময় ও সরল উপস্থিতির মধ্য দিয়েই ভক্তি ও শিক্ষা প্রকাশ পেত।

লামা সেতেন ছিলেন অত্যন্ত মানবিক এবং অসাধারণ সদয় স্বভাবের মানুষ। তার বয়স ছিল ষাটের বেশি; তিনি ছিলেন লম্বা, ধূসর চুলের অধিকারী, এবং তার মধ্যে ছিল স্বাভাবিক কোমলতা। তিনি ধ্যানচর্চায়ও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তার কাছে থাকলেই আমার মনে শান্তি ও প্রশান্তির অনুভূতি জাগত। মাঝে মাঝে তিনি আমাকে বকাঝকা করতেন, তখন আমি তাকে একটু ভয়ও পেতাম; কিন্তু মাঝে মাঝে কঠোর হলেও তার উষ্ণতা কখনো কমেনি।


লামা সেতেন এক অসাধারণ উপায়ে মারা যান। কাছেই একটি মঠ ছিল, কিন্তু তিনি সেখানে যেতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, তিনি চান না যে তাদের তার মৃতদেহ পরিষ্কার করার ঝামেলায় পড়তে হোক। তাই আমরা স্বাভাবিক নিয়মে তাঁবুগুলো গোল করে বসিয়ে ক্যাম্প করলাম। খাণ্ড্রো লামা সেতেনের সেবা ও দেখাশোনা করছিলেন, কারণ তিনি তার শিক্ষক ছিলেন।
যখন তিনি হঠাৎ তাকে ডাকলেন, তখন তার তাঁবুর ভেতরে শুধু আমরা দুজনই ছিলাম। তিনি স্নেহভরে তাকে ডাকতেন “আ-মি”—তার স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ “আমার সন্তান”। তিনি কোমল স্বরে বললেন,

“আ-মি, এখানে এসো। এখন সময় এসে গেছে। তোমার জন্য আর কোনো উপদেশ আমার নেই। তুমি যেমন আছো, ঠিক তেমনই ভালো। আমি তোমার ওপর সন্তুষ্ট। তুমি যেমন করে এতদিন তোমার গুরুর সেবা করেছ, ঠিক তেমনই করে যেতে থাকো।”

এ কথা শুনেই তিনি দ্রুত তাঁবু থেকে বেরিয়ে রিনপোচেকে ডাকতে যেতে চাইলেন, কিন্তু লামা সেতেন তার হাতটা ধরে ফেললেন।

“কোথায় যাচ্ছ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি রিনপোচেকে ডাকতে যাচ্ছি,” তিনি বললেন।

লামা সেতেন হেসে বললেন,

“ওনাকে বিরক্ত করার দরকার নেই। তার প্রয়োজন নেই। গুরুর ক্ষেত্রে দূরত্ব বলে কিছু থাকে না।”

এই কথা বলে তিনি শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং তারপরই মৃত্যুবরণ করলেন। খাণ্ড্রো তার হাতের আঁকড়া থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন আমার গুরুকে ডাকতে। আমি সেখানে বসে রইলাম, নড়তেও পারছিলাম না।

আমি বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম—যে কেউ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এতটা আত্মবিশ্বাসী হতে পারে! লামা সেতেন চাইলে তার নিজের গুরুকে শারীরিকভাবে পাশে পেতে পারতেন—যা অন্য কেউ হলে হয়তো খুবই কামনা করত—কিন্তু তার সেই প্রয়োজন ছিল না। এখন আমি বুঝতে পারি কেন। তিনি ইতিমধ্যেই নিজের ভেতরে গুরুর উপস্থিতি উপলব্ধি করেছিলেন। জামইয়াং খিয়েন্তসে তার মন ও হৃদয়ের মধ্যে সর্বদা উপস্থিত ছিলেন; এক মুহূর্তের জন্যও তিনি কোনো বিচ্ছেদ অনুভব করেননি।

খাণ্ড্রো গিয়ে জামইয়াং খিয়েন্তসেকে নিয়ে এলেন। তিনি তাঁবুতে ঢোকার সময় কীভাবে একটু ঝুঁকে প্রবেশ করেছিলেন, তা আমি কখনো ভুলব না। তিনি লামা সেতেনের মুখের দিকে একবার তাকালেন, তারপর তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে হালকা হাসতে শুরু করলেন। তিনি স্নেহ করে তাকে “লা জেন”—অর্থাৎ “বৃদ্ধ লামা”—বলে ডাকতেন।

তিনি বললেন,

“লা জেন, ওই অবস্থায় থাকবেন না!”

এখন আমি বুঝতে পারি, লামা সেতেন তখন ধ্যানের একটি বিশেষ সাধনা করছিলেন, যেখানে সাধক তার মনের প্রকৃতিকে সত্যের অসীম শূন্যতার সঙ্গে একীভূত করেন এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুর সময়ও অনেকক্ষণ থাকতে পারেন।

আমার গুরু বললেন,

“লা জেন, আমরা তো পথিক। আমরা তীর্থযাত্রী। এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সুযোগ আমাদের নেই। চলুন, আমি আপনাকে পথ দেখাই।”

আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো পরবর্তী ঘটনাগুলো দেখছিলাম। যদি নিজ চোখে না দেখতাম, কখনোই বিশ্বাস করতাম না। লামা সেতেন আবার জীবনে ফিরে এলেন।
তারপর আমার গুরু তার পাশে বসে ফোওয়া (phowa) সাধনার মাধ্যমে তাকে পথ দেখালেন—এটি মৃত্যুর ঠিক আগে চেতনাকে পরিচালনা করার একটি বিশেষ সাধনা। এই সাধনার অনেক পদ্ধতি আছে, এবং তিনি যে পদ্ধতিটি ব্যবহার করেছিলেন, তার শেষে গুরু তিনবার “আ” ধ্বনি উচ্চারণ করলেন।

আমার গুরু যখন প্রথমবার “আ” বললেন, তখন আমরা শুনতে পেলাম লামা সেতেনও স্পষ্টভাবে সেই ধ্বনিতে সাড়া দিচ্ছেন। দ্বিতীয়বার তার কণ্ঠ কিছুটা ক্ষীণ হয়ে গেল, আর তৃতীয়বার তিনি আর কোনো শব্দ করলেন না—তিনি চলে গিয়েছিলেন।

সামতেনের মৃত্যু আমাকে আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্য শিখিয়েছিল। আর লামা সেতেনের মৃত্যু আমাকে শিখিয়েছিল যে তার মতো উচ্চস্তরের সাধকেরা জীবদ্দশায় প্রায়ই তাদের অসাধারণ গুণাবলি আড়াল করে রাখেন। কখনো কখনো তারা সেগুলো প্রকাশ করেন কেবল একবার—মৃত্যুর মুহূর্তে।
শিশু অবস্থাতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সামতেনের মৃত্যু এবং লামা সেতেনের মৃত্যুর মধ্যে একটি গভীর পার্থক্য ছিল। আমি উপলব্ধি করেছিলাম—এটি ছিল এমন একজন ভালো সন্ন্যাসীর মৃত্যুর পার্থক্য, যিনি জীবনে সাধনা করেছেন, এবং এমন একজন আরও উচ্চ উপলব্ধিসম্পন্ন সাধকের মৃত্যুর পার্থক্য।

সামতেন সাধারণভাবে এবং কষ্টের মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, যদিও তার বিশ্বাস ছিল দৃঢ়। কিন্তু লামা সেতেনের মৃত্যু ছিল আধ্যাত্মিক সিদ্ধির এক উজ্জ্বল প্রকাশ।

লামা সেতেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কিছুদিন পর আমরা ইয়ামদ্রোকের মঠে চলে গেলাম। আগের মতোই আমি আমার গুরুর ঘরে তার পাশেই ঘুমাতাম। সেই রাতে আমি দেয়ালে মাখনের প্রদীপের আলো দুলে দুলে ছায়া ফেলছে—এ দৃশ্য দেখছিলাম। অন্য সবাই যখন গভীর ঘুমে ছিল, আমি সারা রাত জেগে কেঁদেছিলাম। সেই রাতেই আমি বুঝেছিলাম যে মৃত্যু সত্য, এবং আমাকেও একদিন মরতে হবে। সেখানে শুয়ে শুয়ে আমি মৃত্যু ও নিজের মৃত্যুর কথা ভাবছিলাম। গভীর দুঃখের মধ্য দিয়েও ধীরে ধীরে আমার ভেতরে এক গভীর স্বীকৃতির অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করল, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিল আমার জীবনকে আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য উৎসর্গ করার এক দৃঢ় সংকল্প।

এভাবেই আমি খুব অল্প বয়সেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে শুরু করি এবং তার অর্থ নিয়ে ভাবতে শিখি। তখন আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে এরপর কত ধরনের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা আমার জীবনে আসবে—একটির পর একটি ছিল সেই মৃত্যু, যা ছিল আমার দেশ তিব্বতকে হারানোর করুণ ট্র্যাজেডি—চীনা দখলের পর। ছিল নির্বাসনের মৃত্যু। ছিল আমার পরিবার এবং আমি যা কিছু অধিকার করতাম, সবকিছু হারানোর মৃত্যু। আমার পরিবার, লাকার সাঙ, তিব্বতের অন্যতম ধনী পরিবার ছিল। চতুর্দশ শতাব্দী থেকে তারা বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত ছিল—বুদ্ধের শিক্ষা প্রচারে সহায়তা করা এবং মহান গুরুরা যাতে তাদের কাজ করতে পারেন, সে জন্য সহায়তা করা ছিল তাদের ঐতিহ্য।

কিন্তু সবকিছুর চেয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ মৃত্যু তখনও আসেনি—আমার গুরু জামইয়াং খিয়েন্তসের মৃত্যু। তাকে হারিয়ে আমার মনে হয়েছিল যেন আমার অস্তিত্বের মাটিটাই হারিয়ে গেছে। সেটা ছিল ১৯৫৯ সাল—তিব্বতের পতনের বছর। তিব্বতিদের জন্য আমার গুরুর মৃত্যু ছিল আরেকটি ভয়াবহ আঘাত। আর তিব্বতের জন্য তা ছিল এক যুগের অবসানের সূচনা।

চলবে… …

পর্ব ১

কহিতে পারিব কি? – ২

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জীবনই অবদমনের একেকটা গোডাউন!

ব্যক্তিগত সংস্কার, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বৈশ্বিক বিভিন্ন চাপে বিকশিত হওয়া দূরে থাক, জীবন মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে না পর্যন্ত!

এইভাবে চলিতে চলিতে এক সময় দাঁড়াইবার চেষ্টাও লুপ্ত হইয়া যায়!

সন্দেহ-বাতিগ্রস্ত, মেধাহীন কোনো সাইকো যদি বস-এর(Boss)আসনে বসেন, সেখানকার অধস্তনদের দিন কীভাবে কাটে? নিঃসন্দেহে দুর্বিষহ!

সেই দুর্বিষহ দিন যদি পাড়ি দিতে হয় বছরের পর বছর ধরিয়া, তখন কেমন হয়? কিছুই বলিতে পারিতেছেন না, মনের ভিতরে জমিতে থাকে ক্ষোভের পাহাড়!

কর্মক্ষেত্র হইতে ঘরে ফিরিয়া দেখেন অসুস্থ পরিবেশ, স্বস্তি নাই দুইদণ্ড!

রাস্তায়, বাজারে… সর্বত্র যেন প্রতিকূলতা ষড়যন্ত্র পাকাইতে থাকে সারাক্ষণ!

এই চাপ সহ্য করা যায় না, বলাও যায় না কিছু! না বলা মানে সবকিছু মিটিয়া যাওয়া নয় বরং বিপদজনক ভাবে ভেতরে ভেতরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সঞ্চিত হইতে থাকে! আর, এই প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ব্যক্তি মানুষের বিভিন্ন আচরণে, কর্মে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলিতে থাকে!

দুনিয়া আমার মনের মতো চলিবে না, ইহাতে সমস্যা নাই; সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমি দুনিয়াকে আমার মতো চালাইতে চাই, পাইতে চাই ।

এ অবস্থা হইতে মুক্তির উপায় কী? স্বস্তির পথ কোথায়? পথ একটাই, চারপাশের ক্রিয়ার(ঘটনা)পিছনে ছোটা নয় বরং সেই ক্রিয়া আমার ভিতরে কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিতেছে সেইটি দেখিতে পারা, ধরিতে পারা অর্থাৎ নিজেকে দেখা! নিজেকে দেখিতে হইলে কেন্দ্রে স্থির হইতে হয়। এই ‘স্থির’টুকু হইতে পারিয়াছি কি?