হালাল ও হারাম প্রসঙ্গে সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশ্তী
Halal and Haram is not in the ‘matter’, in the ‘object’. But it is in the Mind.
হালাল ও হারাম কোনো ‘বস্তু’ বা ‘পদার্থ’-এর মধ্যে নেই; এটি রয়েছে মনের মধ্যে।
Object is impartial. It is neither Halal, nor Haram.
বস্তু নিজে নিরপেক্ষ; এটি না হালাল, না হারাম।
It is neither impure, nor pure. Purity and impurity lies in the Mind.
এটি না অপবিত্র, না পবিত্র। পবিত্রতা ও অপবিত্রতা আসলে মনের মধ্যেই অবস্থান করে।
If a Mind of a man applies Salat, on the object, on the matter, then it becomes pure.
যদি একজন মানুষের মন কোনো বস্তু বা বিষয়ের উপর সালাত প্রয়োগ করে, তবে তা পবিত্র হয়ে ওঠে।
So it is Halal.
তখন সেটি হালাল হয়।
But if it does not apply Salat on it then that thing is impure.
কিন্তু যদি তার উপর সালাত প্রয়োগ না করা হয়, তবে সেই বস্তু অপবিত্র থেকে যায়।
All things coming into the brain through the seven antennas, the phenomenal world is coming in.
সাতটি অ্যান্টেনা বা ইন্দ্রিয়পথ দিয়ে মস্তিষ্কে যেসকল বিষয়রাশি প্রবেশ করছে—সমস্ত অভিজ্ঞতার জগতই এভাবে ভিতরে আসছে।
And these are all impure unless you apply Salat on it.
এবং এগুলো সবই অপবিত্র, যতক্ষণ না তুমি তার উপর সালাত প্রয়োগ করছ।
When Salat is applied it becomes pure, so it is Halal.
যখন সালাত প্রয়োগ করা হয়, তখন তা পবিত্র হয়ে যায়, তাই সেটি হালাল হয়।
But a man cannot practice this Salat on every item at a time.
কিন্তু একজন মানুষ একসাথে প্রতিটি বিষয়ের উপর এই সালাত অনুশীলন করতে পারে না।
Every item on this senses at a time. Hence to, do it one by one.
ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি উপাদানের উপর একসাথে নয়; তাই এটি একে একে করতে হয়।
So when in one item of a sense he applies Salat then those matters become pure and Halal.
তাই যখন কোনো একটি ইন্দ্রিয়বস্তুর উপর সে সালাত প্রয়োগ করে, তখন সেই বিষয়টি পবিত্র ও হালাল হয়ে ওঠে।
Other gates are open, things are entering through those gates. Those items are impure.
অন্য দরজাগুলো তখনও খোলা থাকে, এবং সেগুলো দিয়ে নানা বিষয় প্রবেশ করতে থাকে। সেই বিষয়গুলো তখনও অপবিত্র।
But it is Halal because the man has started Salat on one item.
তবুও এটি হালাল, কারণ মানুষটি অন্তত একটি বিষয়ের উপর সালাত শুরু করেছে।
So other items even if those are impure yet it is Halal for him.
তাই অন্য বিষয়গুলো অপবিত্র থাকলেও, তার জন্য তা হালালের পরিসরের মধ্যেই থাকে।
But the man who can extend the Salat on all the items and become perfect, in the performance of the Salat then that man becomes Allah Himself, becomes Allah.
কিন্তু যে ব্যক্তি সবকিছুর উপর সালাত বিস্তৃত করতে পারে এবং সালাতের অনুশীলনে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সে নিজেই আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হয়ে যায়—আল্লাহর সান্নিধ্যে একাত্ম হয়।
All the items cannot be purified so easily as you think it to be.
সবকিছুকে পবিত্র করা তুমি যতটা সহজ ভাবছ, ততটা সহজ নয়।
This is not so easy to apply Salat all the items at a time and then become totally purified mentally, and physically.
একসাথে সব বিষয়ের উপর সালাত প্রয়োগ করে মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে ওঠা মোটেও সহজ নয়।
It is very difficult.
এটি অত্যন্ত কঠিন।
So to be Allah is also no joke.
তাই আল্লাহসুলভ সেই পরিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছানোও কোনো সহজ বিষয় নয়।
It is is a tough matter to become allah.
আল্লাহর নৈকট্যের সেই চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছানো সত্যিই এক কঠিন সাধনা।
গুর্জিয়েফের সাথে কথোকপথন: মানবীয় জীবনের যান্ত্রিকতা ও পরিবর্তন
Views from the Real World এই বইটি মূলত George Ivanovich Gurdjieff-এর বক্তৃতা, আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের সংকলন। এখানে মানুষের চেতনা, আত্মজ্ঞান, যান্ত্রিক জীবনধারা এবং আত্ম-উন্নয়নের পথ নিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বইটির মূল ধারণা হলো—মানুষ সচেতন নয়, বরং “যান্ত্রিকভাবে” জীবন যাপন করে। নিজের ভিতরের বহুসত্তা (multiple ‘I’) বুঝে, পর্যবেক্ষণ করে, ধীরে ধীরে উচ্চতর চেতনার দিকে অগ্রসর হওয়াই এই শিক্ষার উদ্দেশ্য। এটি সরল কোনো ধর্মীয় বই নয়; বরং আত্ম-অনুসন্ধান ও বাস্তব আধ্যাত্মিক অনুশীলনের একটি গাইড।
George Ivanovich Gurdjieff
গুর্জিয়েফ ছিলেন একজন আর্মেনীয়-গ্রিক আধ্যাত্মিক গুরু, দার্শনিক ও শিক্ষক (১৮৬৬–১৯৪৯)। তিনি “Fourth Way” বা চতুর্থ পথের ধারণা দেন—যেখানে দৈনন্দিন জীবনযাপন করেই আত্ম-উন্নয়ন সম্ভব, আলাদা সন্ন্যাস বা নির্জনতা ছাড়াই। তার শিক্ষা মানুষের ভিতরের ঘুমন্ত অবস্থাকে জাগ্রত করার উপর জোর দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—সচেতনতা (consciousness) বাড়ানো এবং নিজের উপর কাজ (self-work) করাই মানুষের প্রকৃত বিকাশের পথ।
এই বইটি শুধু পড়ার জন্য নয়—নিজেকে জানার, নিজের ভেতরের সত্য খুঁজে পাওয়ার একটি “অভ্যন্তরীণ যাত্রা”-র সূচনা। Glimpses of Truth হলো ১৯১৪ সালে মস্কোর একজন শিষ্য কর্তৃক লেখা গুর্জিয়েফের সঙ্গে একটি কথোপকথনের বিবরণ। P. D. Ouspensky তাঁর In Search of the Miraculous বইয়ে এই লেখাটির উল্লেখ করেছেন। এটি সেই সময় গুর্জিয়েফ যে ধারাবাহিক প্রবন্ধগুলোর পরিকল্পনা করেছিলেন, তার প্রথম—এবং সম্ভবত একমাত্র—উদাহরণ। তবে এর লেখক কে, তা জানা যায় না।
এই আলোচনাগুলোকে তুলনা করে পুনরায় বিন্যস্ত করা হয়েছে Madame Thomas de Hartmann-এর সহায়তায়। তিনি ১৯১৭ সালে এসেনতুকিতে (Essentuki) এই সমস্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং তাই এগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। দেখা যাবে, এই আলোচনার কয়েকটি অংশ—যেমন “For an exact study,” “To all my questions” এবং “The two rivers” দিয়ে শুরু হওয়া অংশগুলো—আসলে সেই উপাদানেরই প্রকাশ, যা গুর্জিয়েফ পরে সামান্য পরিবর্তিত রূপে ব্যবহার করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Beelzebub’s Tales to His Grandson-এর শেষ অধ্যায় লেখার সময়।
কিছু নীতিবাক্য (Aphorisms) এর আগে প্রিয়োরে (Prieuré)-তে জীবনযাপনের বিবরণে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলো একটি বিশেষ বর্ণমালায় লেখা ছিল, যা কেবল শিষ্যদেরই জানা ছিল, এবং যেখানে তার আলোচনা হতো সেই স্টাডি হাউসের দেয়ালের উপরে সেগুলো খোদাই করা ছিল।
এই কথোপকথনের পর্বগুলো মূলত Views from the Real World এই বইটির মাঝে থাকা প্রশ্নোত্তর অংশ। এই অংশগুলো পাঠককে বিষয়বস্তু সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা না দিলেও তার মগ্নচৈতন্যে শিষ বাজাবে বলে আমার মনে হয়েছে। এবং এখান থেকে পাঠকের পরবর্তী পাঠ অন্বেষণ জারি থাকবে সে আশা থেকেই এই অংশগুলোর ধারাবাহিক অনুবাদ করার প্রয়াস। দয়াল চাইলে পরবর্তীতে সম্পূর্ণ বইটা অনুবাদ হবে বা হবে না। তবে পাঠের পর পাঠকের/সাধকের হৃদয়ে সামান্যতম অনুরণন হলেই আমার কাজ সার্থক হয়েছে বলে মনে করবো। জয় হোক!
লন্ডন, ১৯২২
মানুষ একক কোনো সত্তা নয়; বরং অসংখ্য ছোট ছোট সত্তার সমষ্টি। আমরা সাধারণত নিজেদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে “আমি” শব্দটি ব্যবহার করি—বলতে অভ্যস্ত, “আমি এটা করেছি”, “আমি এটা ভাবি”, “আমি এটা করতে চাই”—কিন্তু বাস্তবে এই একক ‘আমি’ বলে কিছু নেই। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে শত শত, হাজার হাজার ছোট ছোট ‘আমি’ রয়েছে। আমরা নিজের ভেতরেই বিভক্ত, অথচ এই বহুসত্তার সত্যটি আমরা বুঝতে পারি না, যতক্ষণ না আমরা সচেতনভাবে নিজের ওপর পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন করি।
এক মুহূর্তে এক ‘আমি’ কাজ করে, পরের মুহূর্তে অন্য আরেক ‘আমি’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই ভিন্ন ভিন্ন ‘আমি’-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকার কারণেই আমাদের জীবন ও কাজ কখনো সুষম হয় না। আমরা আমাদের শক্তি ও সামর্থ্যের খুব সামান্য অংশ ব্যবহার করে বাঁচি, কারণ আমরা বুঝতে পারি না যে আমরা অনেকটাই যন্ত্রের মতো কাজ করি। নিজের এই ‘যন্ত্রসত্তা’র প্রকৃতি ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আমাদের কোনো সচেতন জ্ঞান নেই।
বাস্তবে আমরা এক ধরনের যন্ত্রের মতোই পরিচালিত হই, যেখানে বাইরের পরিস্থিতিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের কাজগুলো বাইরের চাপের মুখে সবচেয়ে সহজ পথ ধরে এগিয়ে যায়। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে—আমরা নিজের আবেগকে সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা হয়তো কোনো আবেগকে দমন করার চেষ্টা করি, বা এক আবেগকে অন্য দিয়ে ঢাকতে চাই, কিন্তু আসলে আবেগই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে, আমরা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
একইভাবে, আমরা কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারি—আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ‘আমি’ সেই সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যখন কাজটি করার সময় আসে, তখন দেখা যায় আমরা ঠিক উল্টোটা করে ফেলছি। যদি বাইরের পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে, তাহলে হয়তো আমরা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতে পারি; কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমরা পরিস্থিতির দিকেই ঝুঁকে পড়ি। অর্থাৎ, আমাদের কাজের ওপর আমাদের নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই—আমরা যন্ত্রের মতোই বাইরের প্রভাবের অধীন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের পক্ষে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা অসম্ভব। বরং সমস্যা হলো, আমরা এখনো সেই অবস্থায় পৌঁছাইনি, কারণ আমরা নিজের ভেতরেই বিভক্ত। আমাদের ভেতরে একদিকে শক্তিশালী অংশ, অন্যদিকে দুর্বল অংশ কাজ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের শক্তি যত বাড়ে, দুর্বলতাও ততই বাড়তে পারে—এবং আমরা যদি তা থামাতে না শিখি, তাহলে সেই দুর্বলতাই একসময় নেতিবাচক শক্তিতে পরিণত হয়।
যখন মানুষ নিজের কাজ ও সত্তাকে সত্যিকারভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, তখন চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। অস্তিত্বের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছালে মানুষ নিজের প্রতিটি অংশকে সচেতনভাবে পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাইনি—এমনকি আমরা যা করার সিদ্ধান্ত নিই, সেটুকুও ধারাবাহিকভাবে করতে পারি না।
একজন থিওসফিস্ট প্রশ্ন করলেন যে আমরা কি পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারি?
উত্তর: পরিস্থিতি কখনোই বদলায় না—সবসময় একই থাকে। কোনো প্রকৃত পরিবর্তন নেই, শুধু পরিস্থিতির রূপান্তর বা পরিবর্তিত অবস্থা (modification) ঘটে।
প্রশ্ন: একজন মানুষ যদি ভালো হয়ে ওঠে, সেটাকে কি পরিবর্তন বলা যায় না?
উত্তর: একজন মানুষ মানবজাতির জন্য কিছুই না। একজন ভালো হলে আরেকজন খারাপ হয়—শেষ পর্যন্ত সব একই থাকে।
প্রশ্ন: কিন্তু একজন মিথ্যাবাদী যদি সত্যবাদী হয়ে ওঠে, সেটাকে কি উন্নতি বলা যায় না?
উত্তর: না, সেটাও একই বিষয়। আগে সে যান্ত্রিকভাবে মিথ্যা বলত, কারণ সে সত্য বলতে পারত না; পরে সে যান্ত্রিকভাবে সত্য বলবে, কারণ তখন সেটাই তার জন্য সহজ হয়ে যাবে। সত্য ও মিথ্যার মূল্য তখনই, যখন আমরা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমাদের বর্তমান অবস্থায় আমরা নৈতিক হতে পারি না, কারণ আমরা যান্ত্রিক। নৈতিকতা আপেক্ষিক—এটি ব্যক্তিনির্ভর, বিরোধপূর্ণ এবং যান্ত্রিক।
আমাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য—শারীরিক মানুষ, আবেগীয় মানুষ, বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ—প্রত্যেকেরই নিজস্ব আলাদা নৈতিকতা আছে, যা তার প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই। প্রত্যেক মানুষের এই ‘যন্ত্রসত্তা’ তিনটি মৌলিক অংশ বা কেন্দ্র (center) দিয়ে গঠিত। যেকোনো মুহূর্তে নিজেকে দেখুন এবং প্রশ্ন করুন: “এই মুহূর্তে কোন ‘আমি’ কাজ করছে? এটি কি আমার বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রের, আবেগীয় কেন্দ্রের, না কি গতিশীল (moving) কেন্দ্রের?” আপনি হয়তো দেখবেন, এটি আপনার কল্পনার থেকে ভিন্ন—কিন্তু এই তিনটির মধ্যেই একটি।
প্রশ্ন: এমন কোনো চূড়ান্ত নৈতিক বিধান কি নেই, যা সব মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?
উত্তর: আছে। যখন আমরা আমাদের সব কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণকারী সব শক্তিকে ব্যবহার করতে পারব, তখন আমরা সত্যিকারের নৈতিক হতে পারব। কিন্তু ততদিন, যতদিন আমরা আমাদের সামর্থ্যের কেবল একটি অংশ ব্যবহার করি, আমরা নৈতিক হতে পারি না। আমরা যা কিছু করি, তা যান্ত্রিকভাবে করি—আর যন্ত্র কখনো নৈতিক হতে পারে না।
প্রশ্ন: তাহলে তো অবস্থাটা খুবই হতাশাজনক মনে হচ্ছে?
উত্তর: একদম ঠিক—এটা হতাশাজনকই।
প্রশ্ন: তাহলে আমরা কীভাবে নিজেদের পরিবর্তন করব এবং আমাদের সব শক্তি ব্যবহার করতে শিখব?
উত্তর: সেটা আরেকটি বিষয়। আমাদের দুর্বলতার প্রধান কারণ হলো—আমরা আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে (will) একসাথে তিনটি কেন্দ্রেই প্রয়োগ করতে পারি না।
প্রশ্ন: আমরা কি কোনো একটিতেও ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে পারি?
উত্তর: অবশ্যই, কখনো কখনো পারি। কখনো কখনো আমরা সাময়িকভাবে একটি কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারি, এবং তখন আশ্চর্য ফল দেখা যায়। (তিনি একটি গল্প বলেন—একজন বন্দি তার স্ত্রীর কাছে বার্তা পৌঁছাতে একটি কাগজের বল একটি উঁচু ও কঠিন জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দেয়।)
এটাই তার মুক্ত হওয়ার একমাত্র উপায়। যদি সে প্রথমবার ব্যর্থ হয়, তবে আর কোনো সুযোগ পাবে না। সেই মুহূর্তে সে তার শারীরিক কেন্দ্রের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে সক্ষম হয়—এবং এমন একটি কাজ সম্পন্ন করে, যা অন্যথায় তার পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না।
প্রশ্ন: আপনি কি এমন কাউকে চেনেন, যিনি এই উচ্চতর অস্তিত্বের স্তরে পৌঁছেছেন?
উত্তর: আমি যদি হ্যাঁ বা না বলি, তাতে কোনো অর্থ নেই। যদি বলি হ্যাঁ—আপনি তা যাচাই করতে পারবেন না; আর যদি বলি না—তাতেও আপনার কোনো লাভ হবে না। আপনাকে আমার কথা বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে বলি—যা আপনি নিজে যাচাই করতে পারবেন না, তা বিশ্বাস করবেন না।
প্রশ্ন: যদি আমরা পুরোপুরি যান্ত্রিক হই, তাহলে আমরা কীভাবে নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাব? একটি যন্ত্র কি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
উত্তর: একদম ঠিক—পারে না। আমরা নিজেরা নিজেদের বদলাতে পারি না। আমরা কেবল সামান্য পরিবর্তন (modify) করতে পারি। কিন্তু বাইরের সাহায্যে আমরা পরিবর্তিত হতে পারি। গুপ্তবিদ্যার (esotericism) মতে, মানবজাতি দুইটি বৃত্তে বিভক্ত—একটি বৃহৎ বাইরের বৃত্ত, যেখানে সব মানুষ আছে; আর একটি ছোট, কেন্দ্রীয় বৃত্ত, যেখানে আছে জ্ঞানপ্রাপ্ত ও বোঝাপড়াসম্পন্ন মানুষরা। সত্যিকারের শিক্ষা, যা আমাদের পরিবর্তন করতে পারে, কেবল এই কেন্দ্র থেকেই আসে। এই শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো—আমাদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে আমরা সেই শিক্ষাকে গ্রহণ করতে পারি। আমরা নিজেরা নিজেদের পরিবর্তন করতে পারি না—এটি কেবল বাইরের সাহায্য থেকেই সম্ভব।
প্রত্যেক ধর্মই এক ধরনের সাধারণ জ্ঞানের কেন্দ্রের অস্তিত্বের কথা বলে। প্রতিটি পবিত্র গ্রন্থেই সেই জ্ঞান রয়েছে, কিন্তু মানুষ তা জানতে চায় না।
প্রশ্ন: কিন্তু আমাদের কাছে তো ইতিমধ্যেই অনেক জ্ঞান আছে, তাই না?
উত্তর: হ্যাঁ—অত্যধিক রকমের জ্ঞান আছে। আমাদের বর্তমান জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে—যেমন ছোট শিশুদের জ্ঞান। যদি আমরা সঠিক ধরনের জ্ঞান অর্জন করতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের সত্তার বিকাশ ঘটলে আমরা উচ্চতর চেতনার স্তরে পৌঁছাতে পারি। জ্ঞানের পরিবর্তন আসে সত্তার পরিবর্তনের মাধ্যমে। জ্ঞান নিজে কিছুই না। প্রথমে আমাদের আত্মজ্ঞান অর্জন করতে হবে, এবং সেই আত্মজ্ঞানই আমাদের শেখাবে কীভাবে নিজেদের পরিবর্তন করতে হয়—যদি আমরা সত্যিই পরিবর্তিত হতে চাই।
প্রশ্ন: তাহলে কি এই পরিবর্তনও বাইরে থেকেই আসতে হবে?
উত্তর: হ্যাঁ। যখন আমরা নতুন জ্ঞানের জন্য প্রস্তুত হব, তখন তা আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবে।
প্রশ্ন: আমরা কি বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে (judgment) আমাদের আবেগ পরিবর্তন করতে পারি?
উত্তর: আমাদের এই যন্ত্রসত্তার একটি কেন্দ্র আরেকটি কেন্দ্রকে পরিবর্তন করতে পারে না। যেমন—লন্ডনে আমি বিরক্ত ও খিটখিটে হয়ে যাই, কারণ আবহাওয়া ও পরিবেশ আমাকে নিরুৎসাহিত করে; কিন্তু ভারতে আমি শান্ত ও ভালো মেজাজে থাকি। তখন আমার বিচারবুদ্ধি বলে—ভারতে গেলে আমি এই বিরক্তি থেকে মুক্ত হতে পারি। কিন্তু আবার লন্ডনে আমি কাজ ভালোভাবে করতে পারি, আর উষ্ণ অঞ্চলে (tropics) ততটা পারি না। ফলে সেখানে গিয়ে আমি অন্য কারণে বিরক্ত হয়ে উঠব। দেখতেই পাচ্ছেন—আবেগ বিচারবুদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; একটিকে অন্যটির মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় না।
Samsara চলচ্চিত্র নিয়ে দু’কথা
চলচ্চিত্রের পরিচিতি
নাম: সামসারা (Samsara)
মুক্তির বছর: ২০০১
ধরন: রোমান্স, ড্রামা, আধ্যাত্মিক চলচ্চিত্র
পরিচালনা: পান নালিন
চিত্রনাট্য: পান নালিন
সময়: ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট
ভাষা: তিব্বতি
[spoiler alter]
চলচ্চিত্রের নাম samsara, অর্থ দাঁড়ায় ‘birth, death and rebirth’ অথবা, ‘impermanence’ অর্থাৎ, অনিত্যতা। চলচ্চিত্রটিকেকে non-narrative documentary film বলা পরিচিত করানো হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে ২৫টা দেশের বিভিন্ন জায়গায় শ্যুট করা হয়েছে।
এক একটা ফ্রেমের সৌন্দর্য মাথা খারাপ করিয়ে দেয়। চোখে পড়ে পাহাড়ের মাঝে প্রত্যন্ত এলাকায় ভিক্ষু সম্প্রদায়ের নানা মনেস্ট্রি। Los Angeles Times এ চলচ্চত্রটি নিয়ে লিখা হয়েছে “as frustrating as it is beautiful.” ভালো ফ্রেম, ভালো মনতাজ, ভালো টেকনিক- এইসব বিষয় বেশি সামনে এসেছে। আমার মূল আগ্রহ ছিল এর গল্পকে ঘিরে।
চলচ্চত্রটির কোনো সাবটাইটেল নেই। তার দরকারও পড়েনি। আচ্ছা বলুন তো, দুম করে কি কেউ সাধু হয়? শুরুতে দেখা যায় আকাশে উড়তে থাকা একটা চিল ঢিল দিয়ে বিস্তৃত বরফি পাহাড়ের সমতল এলাকায় থাকা একটা ভ্যাড়াকে মেরে ফেলে। এই সিনটা গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখায় তা বোঝা যাবে।
একদল ভিক্ষু চলেছেন এক নির্জন গুহায় যেখানে আরেক ভিক্ষু লম্বা সময় ধরে ধ্যানস্থ আছেন। এই ধ্যানস্থ ভিক্ষুর জীবন হলো আমাদের গোটা সিনেমাটা। পরম মমতার সাথে তার ধ্যান ভাঙ্গান অন্যরা। বিশাল নখ, চুল কেটে গায়ের ময়লা মুছে তাকে নিয়ে আসেন নিজেদের ঘাঁটিতে। ভিক্ষু সম্প্রদায়ে এই ভিক্ষু খুব আদরের পাত্র। লম্বা সময় ধ্যানে থাকার ফলে তার চেহারার মাঝে যে নির্লিপ্ততা তা দেখে মনে হয় জগতের সকল কিছুরই উপরে চলে গেছে সে।
আমার খুব স্পষ্ট করে জানা নেই তবে আন্দাজ করতে পারি যে মনেস্ট্রির বুদ্ধ ভিক্ষুর চর্চায় শারীরিক সম্পর্কের স্থান নেই। তো সেই মনেস্ট্রিতে বাৎসরিক এক অনুষ্ঠানে আমাদের ভিক্ষু প্রথমবারের মতন ব্রেস্ট-ফিডিং দেখেন। এবং তার অভিজ্ঞতার বাইরের এই ঘটনা দেখে তার গভীরে এক নতুন দুনিয়ার সৃষ্টি হলো… তার ভিতরে কামনা জাগতে থাকে। সে রাতে যৌন স্বপ্ন দেখে সে, বীর্যপাত ঘটে। গুরু সেসব দেখে বুঝে চিন্তিত হয়ে তাকে আরেক গুরুর কাছে পাঠান যৌনতার ব্যাপারে জানার জন্য।
এতই কি সহজ? আমাদের ভিক্ষু নিজ আস্তানায় ফেরত আসে। ভীষণ বিষণ্ণ, কিচ্ছু ভালো লাগেনা। যুক্তি ধর্মের নিকুচি করে এক ভোরবেলায় সে আশ্রম ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে। ভিক্ষুর পোশাক ছেড়ে বেছে নেয় সাধারণ চাষির পোশাক। এরপরের কাহিনী সুদীর্ঘ।
এখানে আর মনোহরা সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য নেই, নেই নিস্তব্ধতার মাঝ দিয়ে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা। এবারে সবটাই বস্তুগত আর সবটাই ধরাছোঁয়ার ভিতর। সে প্রেমহীন কামনার যৌনতায় অংশ নেয়। সামাজিক চাপে তাকেই বিয়ে করে। তার ধারনা সেই মেয়েটিকেই সে ভালোবেসে চলেছে। তাদের সন্তান হয়। ততদিনে সে খুব ভালো মাপের ‘সামাজিক পুরুষ’ হয়ে উঠেছে। তার বাড়ি, চাষ সবকিছুই দুর্দান্ত। জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করে চলেছে সে। দেখলে মনে হয় সে সুখী একতা মানুষ। ছেলে বড় হচ্ছে দিনদিন। কোন কিছুর অভাব নেই।
এরমাঝে একদিন এক নারীকে দেখে আবার তার মাঝে যৌন ইচ্ছা জাগ্রত হয়। সে নতুন ধরনের শূন্যতার সাথে পরিচিত হয়। বউ বাচ্চা বাড়িতে না থাকাকালীন এক সময়ে সেই নারীর সাথে সে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। একদিন তার এতদিনের পরিশ্রমে তিলে তিলে দাঁড় করানো এই ফসলের ক্ষেতে আগুন লেগে যায়। সব শেষ হয়ে যায়। একই সাথে লোকাল পলিটিক্সের সাথেও পেরে ওঠেনা আর। এতদিনের গুহায় ধ্যানে থাকা লোকও কতটা অসহায় হতে পারে সেটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হলো।
কোনো কিছুর অভাব না থাকাটা আমার কাছে জাগতিক মুক্তির মূল হাতিয়ের মনে হয়। আবারো সেই ভোর রাত… সে ঘুমন্ত স্ত্রী পুত্রকে রেখে ভিক্ষু আশ্রমে ফেরত আসে। ঘাড় অবধি নেমে আসা সুন্দর সিল্কি চুলকে মুড়িয়ে ন্যাড়া হয়। যেন বিষয় থেকে মুক্তির চেষ্টা। তুলে নেয় ভিক্ষুর পোশাক। এমন সময় স্ত্রী চলে আসে। সংসারের দায় এড়ানোর ফলে খিস্তিও করে তার স্ত্রী। ভিক্ষু থাকাকালীন শেষ চিহ্ন হিসাবে সন্তানকে উপহার দেয়া (তসবীর মতন একটা মালা) স্বামীর দিকে ছুড়ে দিয়ে সে চলে যায়। এমন অবস্থায় আমাদের ভিক্ষুটি মাটিতে শুয়ে হাত পা ছড়িয়ে কান্না করতে থাকেন। একেবারে ভেংগেচুরে গেছেন তিনি তখন।
বিষয় যখন ছিলোনা তখন কি বিষয় শূণ্যের ধ্যান মানানসই? বিষয়ে থেকে মজে পঁচে তবে তা থেকে মুক্তির চেষ্টা করাটাই যুক্তিসঙ্গত। বুদ্ধ ধর্মের অনুসারীদেরও তবে কি এক প্রকারে গোড়ামি পাওয়া গেল কি তবে? ঘুমন্ত স্ত্রী সন্তান ফেলে চলে গিয়েছিলেন স্বয়ং বুদ্ধ। যদিও মানুষ হিসেবে নিজেকে নির্মাণের কাছে জগতের বাকিসব নস্যি। সাধারণ মানুষের কাছে এই আচরণ কঠোরই লাগবে। সিনেমাতেও এই সিনটা দেখে আমার কেবল রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটা লাইন মনে পড়ে।
বৈরাগ্য
কহিল গভীর রাত্রে সংসারে বিরাগী,
‘গৃহ তেয়াগিব আজি ইষ্টদেব লাগি।
কে আমারে ভুলাইয়া রেখেছে এখানে।’
দেবতা কহিল, ‘আমি।’— শুনিল না কানে।
সুপ্তিমগ্ন শিশুটিরে আঁকড়িয়া বুকে
প্রেয়সী শয্যার প্রান্তে ঘুমাইছে সুখে।
কহিল, ‘কে তােরা ওরে মায়ার ছলনা!’
দেবতা কহিল, ‘আমি।'— কেহ শুনিল না।
ডাকিল শয়ন ছাড়ি, ‘তুমি কোথা প্রভু।’
দেবতা কহিল, “হেথা।”— শুনিল না তবু।
স্বপনে কাঁদিল শিশু জননীরে টানি—
দেবতা কহিল, ‘ফির।' শুনিল না বাণী।
দেবতা নিশ্বাস ছাড়ি কহিলেন, ‘হায়,
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়।’
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়… রবির দর্শনে আমি আস্থা রাখি। সংসারে থেকে সংসার মুক্তির লীলা আমার কাছে আদরণীয়। সিনেমার শেষ দৃশ্য ঐ শুরুটার মতন। ভিক্ষুর মাথার উপরে চিল ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাথর পড়বে কি? আমাদের সকলের মাথার উপরেই ওই চিল ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথায় বলে, ‘’ধাক্কা খেলে মক্কা যায়’’ এইসব ধাক্কার জন্য একটা করে চিল মাথার উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু ধাক্কা চেনার অপেক্ষা।
- চলচ্চিত্রটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য
সর্বকূলের কাণ্ডারি তুমি – হেলাল উদ্দিন চিশতি
কথা ও সুর: হেলাল উদ্দিন চিশতি
সর্বকূলের কাণ্ডারি তুমি
ইয়া মুহাম্মাদ ইয়া রাসূল
তোমা হতে সবই সৃজন
তুমি মূলের মূল
নিজে আল্লাহ প্রেমাবেশে
নিজরূপ দেখার আশে
পয়দা করেন প্রথম তোমায়
নাই যে তব কূল
পয়দা তুমি আল্লাহর নূরে
রাখিয়া দিলেন নূরের ভিতরে
খোদায় তোমায় চিনিতে পারে
ইয়া মুহাম্মাদ ইয়া রাসূল
পাঠালেন যত নবী ও রাসূল
নাই যে কেহ তব সমতুল
তুমি যে মকসুদ তুমি যে মকবুল
হামারি রাসূল
আরশে আল্লাহ অতি যতনে
রাখলেন তোমায় অতি গোপনে
তোমারি ভেদ খোদায় জানে
শাহানশা নবীকূল
আল্লাহরও রহমত তুমি
সাফায়াতের রাজা তুমি
কুদরতেরও কুদরত তুমি
তুমি বিনা নাহি কূল
তব উম্মতের এতই শান
বনি ইসরায়েলের নবীর সমান
পাপীতাপী পাবে পরিত্রাণ
ইয়া মুহাম্মাদ ইয়া রাসূল
আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই (পর্ব – ১)
সূর্য মন্দির : বাইরে ভোগ, ভেতরে শূন্যতা
আমার মনে হয়, যারা ভ্রমণ করেন না, তাদের আত্মা শুকিয়ে যায়; শুঁটকি আত্মায় আর যাই হোক, আনন্দ থাকে না। সাধকের কাছে বহির্বিশ্বের চেয়ে অন্তর্বিশ্বে ভ্রমণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমি সাধারণ মানুষ, অন্তর্লোকে পরিভ্রমণের সামর্থ্য কম। তাই, বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াই, আনন্দ কুড়াই। আনন্দ পাওয়া মানে নিজেকে পাওয়া, নিজের কাছে ফেরা। আমার বেড়ানোর ভাণ্ডার যে খুব বেশি সমৃদ্ধ, এমন নয়, মোটামুটি। কিছু কিছু জায়গাকে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে জানি, চিনি। কিছু জায়গা সম্পর্কে আগে জেনে যাই(লোকমুখে শুনি কিংবা বই পড়ে)।
পুরী(ওড়িশা) যাচ্ছি শুনে পরম শ্রদ্ধেয় মহিদুর রহমানভাই ‘সূর্য মন্দির’ সম্পর্কে বলেছিলেন, ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোনার্ক সূর্য মন্দির শুধু একটি স্থাপত্য নয়—এটি গভীর দার্শনিক ভাবনা ও প্রতীকের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এর বাইরের দেয়ালে প্রেম, কামনা-বাসনার চিত্র অর্থাৎ ভোগবাসনার জগতের ছবি।
ভেতরে অন্ধকার, শূন্য।
স্থাপত্য ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমন্বয়ে মন্দির এমনভাবে তৈরি যে, সূর্যের আলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে(মন্দিরের ভেতরে অন্ধকার গর্ভগৃহে) পড়ে। এর দার্শনিক ব্যাখ্যাটি এমন যে, মানুষ যখন বাহ্যিক কামনা-বাসনা (বাইরের ভোগ বাসনার স্তর) অতিক্রম করে ভেতরের শূন্যতায় পৌঁছায়—আর তখনই তার ভেতরে আলো(জ্ঞানের উদয়) আসে।
এই ব্যাখ্যাটি এতো ভালোলাগলো যে, কোনার্কের সূর্য মন্দির দর্শনের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে বিখ্যাত পুরী হোটেল, সেখানেই ছিলাম আমরা। সকালে সূর্য মন্দির দেখার আগ্রহ প্রকাশ করতেই ড্রাইভার নিরুৎসাহিত করে বললেন, ‘‘ওখানে গিয়ে কী করবেন? ঐ মন্দিরে তো ভগবান নেই! জগন্নাথ জীবন্ত, এই মন্দিরে ভগবান আছেন’’।
বললাম, ‘‘জগন্নাথে যাবো, কোনার্কেও যাবো’’।
ভিড়-বিধ্বস্ত জগন্নাথ দর্শন শেষে গেলাম ‘ভগবানশূন্য’ সূর্য মন্দিরে। নিরিবিলি পরিবেশ, মোটামুটি ফাঁকা।
শুনলাম, মন্দিরের চূড়ায় এক সময় বিশাল এক চুম্বক বসানো ছিলো। নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করলে এই চুম্বক নাকি সমুদ্রগামী বিশাল জাহাজকেও টেনে নিয়ে আসতো! এই গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা আছে কিনা জানি না, তবুও শুনলাম, গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে!
রাজা নরসিংহদেব মন্দিরটি খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দীতে, আনুমানিক ১২৫০ সালের দিকে নির্মাণ করেন। ১২০০ কারিগর ১০-১২ বছরে এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত। এর নির্মাণ শৈলীর দার্শনিক ভিত্তি চমৎকৃত করে!
- সূর্য ও সময়ের প্রতীক মন্দিরটি সূর্যদেবের রথের আকারে নির্মিত—যেন সূর্য আকাশে চলমান।
- ২৪টি চাকা> দিনের ২৪ ঘণ্টা
- ৭টি ঘোড়া = সপ্তাহের ৭ দিন….
ঘুরে ঘুরে দেখছি, মুগ্ধ হচ্ছি, ছবি তুলছি আর মনে মনে মেলাচ্ছি —
ভোগ থেকে যোগ….
বাইরে → কাম, ভোগ, জীবন
ভেতরে → শূন্যতা, ধ্যান
শেষে → আলো (জ্ঞান)
দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, শুধু নির্মাণশৈলী নয়, বাকি দর্শনার্থীরা কি একই বিষয় দেখছেন? বোধ করছেন? এই দেখা এবং বোঝার জন্য বারবার মন শ্রদ্ধেয় মহিদুর রহমান ভাইয়ে প্রতি কৃতজ্ঞতায় আর্দ্র হয়ে যাচ্ছিলো?
বারবার ভাবছিলাম, বাইরের কামনা-বাসনার স্তর পার হয়ে শূন্যতায় পৌঁছতে পারবো কি? সূর্যের পবিত্র আলো এসে ভেতরের আঁধার দূর করবে কি?
অবশেষে প্রতিষ্ঠিত হলো পারমার্থিক স্কুল – ০১
জয়গুরু
শুরুর সময়টা ছিল ২০১১ খ্রি:, তখন গুরুজী মাঝে মাঝে তেঁতুলিয়া তার নিজ পিতৃগৃহে আসতেন । আর আমরা সে খবর পেলে সকলে মিলে দেখা করার জন্য যেতাম । তেমনি একদিন তিনি এসেছিলেন খুব সম্ভবত এপ্রিল মাসে। আমি গিয়েছিলাম তার সাথে দেখা করতে। আরও অনেকে ছিলেন। তাঁর একজন বন্ধুও ছিলেন সেখানে। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের কথা বলছিলেন তাঁর বন্ধুর সাথে। সেখানে কার্যক্রম কেমন হবে সে বিষয়ে তেমন কোন কথা না বললেও তিনি বলছিলেন কোথায় জায়গা পাবো, কিভাবে কিনবো?
সেদিনের কথা যেন আজও চোখে ভাসে। তার পরনে ঝকঝকে সাদা একটি ফতুয়া। সেটির কলারে এবং সামনের ২ পকেটে ছিল চিকন করে এম্ব্রয়ডারি কাজ করা খয়েরি রং এর সুতা। তার মাথার চুলের অগ্রভাগ কালো হলেও গোড়ার দিক যেন সাদা সেটা মাঝে মাঝে উকি দিচ্ছিল। সে কম্বিনেশন ছিল অসাধারন মনোমুগ্ধকর। সেদিন কোন এক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খুব বেশি আলাপ হয়নি তবে, তার বন্ধু কথা দিয়েছিলেন যে, তিনি ভাল কোন জমির সন্ধান পেলে জানাবেন। তখন কোন প্রতিষ্ঠান বা স্কুল বিষয়টি সেভাবে আমার মাথায় আসেনি এবং আমি খুব একটা বুঝতেও পারিনি ।
এরপর কথাগুলো মাঝে মাঝে আলোচনা হতেই থাকত। কেটে যায় অনেকগুলো দিন। ২০১২ সালের জুন মাসের একবার তিনি শালঘরিয়া(আমাদের বাড়ি) এসেছিলেন। সে সময় মোখলেস চাচা কিছু কাগজপত্র নিয়ে আমাদের বাড়িতে হাজির হন। বিষয়গুলো তখন আমার কাছে স্বপ্নের মত লাগত এবং আনন্দ হতো। আসলে আমি তখন নিজের মত করে স্বপ্নে কোন প্রতিষ্ঠানের ছবি আঁকছিলাম আর সেখানে আমার পছন্দের রং দিয়ে সব কিছু রাঙ্গিয়ে দিচ্ছিলাম। সত্যি যদি আমার কল্পনার সেই স্কুল বাস্তবায়িত হত যেটা আমি তাঁর মুখ থেকে শুনেছিলাম। তবে সেই স্কুল বা প্রতিষ্ঠানের নামেই সারাবিশ্ব বাংলাদেশকে চিনত। এমন কথা বলা বোধহয় দুঃসাহসেরই সামিল ।
আর এমন প্রতিষ্ঠান বোধহয় কল্পনাতেই সম্ভব , বাস্তবে কোনদিন হবে কিনা তা জানিনা তবে, সেই কল্পনার প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা করলেও কয়েক হাজার পৃষ্ঠা লেখা যায়। তবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান কোনদিন হবে সেই দাবি সমাজের তথা আত্মিক উন্নতি করতে যারা আগ্রহী, যারা ইতিমধ্যে করেছেন, যারা সেই পথে হাঁটছেন, যাদের ইচ্ছা আছে, সেইসব উত্তরসূরির কাছে। যেন জীবনে যতবার ফিরে আসি না কেন সেইখানে যেন হাশর হয়।
যাইহোক মূল কথায় আসি। মোখলেস চাচা যখন কাগজপত্রগুলো গুরুজীর হাতে দিলেন তিনি, খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। আমি প্রথমবার যখন গুরুজীকে দেখি ,তখন থেকেই দেখি তিনি চশমা পরেন। তো স্বাভাবত সেদিনও তিনি চশমা পরেছিলেন এবং কাগজগুলো দেখার সময় বামহাত দিয়ে চশমাটা একটু ঠিক করে নিলেন। এরপর যখন চাচার সাথে কাগজপত্র নিয়ে কথা বলছিলেন তাকে বেশ খুশি খুশি লাগছিল। এরপর জমি কিভাবে কিনতে পারবো সে বিষয়ে কথা হচ্ছিলো।
টাকা কীভাবে আসবে –সেখানে কে্উ একজন বলেছিলেন যে, গুরুজী যদি সেখানে যায় তবে দাম অনেক বেশি চাইবে । কারণ তাকে অনেক বড় মাপের অফিসার গোছের লোক মনে হয়, এবং তার অনেক অর্থবিত্ত আছে সেটাও মনে হয়। তাই তিনি যদি জমি দেখতে যান তাহলে যেন কাউকে না বলে শুধু দেখে আসেন এমন প্রস্তাব দেয়া হলো। তখন তিনি হাসতে হাসতে বললেন, কেন লুঙ্গি পরে খালি পায়ে ঘাড়ে একটা গামছা নিয়ে গেলে হবে না! সেই কথা শুনে সেখানে উপস্থিত সবাই খুব হাসাহাসি করলেন। এই সমস্যার সম্মুখীন তিনি এর আগেও হয়েছেন সে কথাও তিনি বললেন।
পরে আলাপ হলো সে জমিটা যদি হয় তবে আমাদের অর্থের যোগান আসবে কোথা থেকে? সাথে সাথে অনেকে বলে ফেলল আমি ১০, ১৫, ৫ হাজার করে দিবে। এক ভাই তো সেখানে কথা দিয়ে দিলেন তার কিছু জমি আছে যেটা বন্ধক দিয়ে তিনি ৫০ হাজার টাকা দিবেন! এভাবেই সেদিন সবাই খুব আনন্দের সাথে আলোচনায় আংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই জানতে পারি যে ঐ জমি কোনো আদিবাসী পরিবারের, এবং সেগুলোর কাগজপত্র সব ঠিক নয়। পরবর্তীতে আর সেই জমির কথা এগোলনা। আবার সবকিছু থেমে গেল।
তবে তিনি বলতেন, প্রতিষ্ঠানটি যেন হয় নদীর কাছাকাছি কোথাও। যেন সেখানে সাতার কাটা যায়। তখন একবারও তিনি স্কুল কথাটি বলেননি । আর যে ভাইটি জমি বন্ধক রেখে টাকা দিতে চাইলেন তিনি জানিয়ে গেলেন যে,তার স্ত্রীকে না জানিয়েই তিনি কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী এ বিষয়ে রাজি নয়। তাই তিনি এত টাকা দিতে পারবেন না।
সৈয়দপুর
০৮/০৪/২০২৬ খ্রি:
আমিই ‘সে’
সুস্থির শরীর মনে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে ছিলেন তো এবার চোখ খুলুন। খেয়াল করুন আপনি সচেতন। আবার চোখ বন্ধ করুন, এবার আপনি কিছু অবলোকন করছেন না কিন্তু খেয়াল করুন, আপনার ভিতর চৈতন্য সক্রিয় রয়েছে। আপনার শ্রবনেন্দ্রীয়ের দিকে মনোযোগ দিন, দেখুন- হয়তো পাখির কিচির মিচির শব্দ, মানুষের কথোপকথন, গোলমাল, যানবাহনের শব্দ বা মিউজিক কোনো না কোনো শব্দ আপনার কানের ভিতর প্রবেশ করছে আর আপনার ভিতর বসে কেউ তা শুনছে, এমনকি যদি কোনো শব্দ না থাকে তখনো আপনি কিছু শুনছেন, সেটা হলো- নিঃশব্দ।
শুধু শব্দ কেন- দৃশ্য, স্পর্শ, স্বাদ, গন্ধ সব কিছু আপনি টের পান। মানুষে মানুষে অনুভবের পরিমান বা ধারনাগত তারতম্য থাকতে পারে কিন্তু আমরা বিষয়গুলোকে যে বোধ করতে পারছি তার মানে আমরা চেতন। মনে মনে আমরা কতকিছু ভাবি, নতুন-পুরাতন কত স্মৃতি আমাদের মনের জানালায় উঁকি মারে, আমরা সেসব স্মরণ করতে পারি কারন আমাদের ভিতর একটা চেতনা আছে। এমন কি আমরা যদি কোনো কিছু স্মরণ করতে নাও পারি, সেটাও আমরা বুঝতে পারি। তার মানে তখনও আমরা চেতন।
আমরা কখনো সুখ উপলব্ধি করি কখনো দুঃখ, কারন আমাদের চেতনা রয়েছে। তাই বলে চেতনার কোনো সুখ দুঃখ নেই। প্রতিনিয়ত কত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত হচ্ছে কিন্তু চেতনার কোনো পরিবর্তন নেই। সুখ, দুঃখ বা পরিবর্তন এসব চেতনার বিষয় নয়। চেতনার হ্রাস-বৃদ্ধি নেই, হ্রাস বৃদ্ধি হয় মনের সতর্কাবস্থার ‘মাত্রার’ বা বোধ করবার ‘ক্ষমতার’। পরিবর্তন হয় মনের, শরীরের। হতাশা বা স্বস্তি, জন্ম বা মৃত্যু- চেতনা এসবের বাইরে অর্থাৎ চেতনার জন্ম মৃত্যু নেই বরং চেতনার মধ্যে সব উদ্ভাসিত হয় মাত্র। চেতনা সর্বকালিন সার্বক্ষণিক বিরাজিত, এর জন্য কোনো প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় না। ছিল আছে থাকবে। এই চেতনাই নাকি ‘আমি’।
আমার এই চেতনার মাঝেই উদ্ভাসিত হচ্ছে আমার বিশ্বব্রহ্মান্ড যার সাথে আমার সকল অভিজ্ঞতা জড়িত। বলা যায়, এখানেই সৃষ্টি হচ্ছে আমার স্থান ও কাল। আমি যদি গভির ঘুমে বা কোমায় থাকি তখনো আমার চেতনা বিদ্যমান থাকে। আমার জন্ম হলো। শিশু থেকে কৈশর, যুবক থেকে প্রৌঢ় তারপর যথারীতি মৃত্যু কিন্তু চৈতন্য কোনোরূপ পরিবর্তন ছাড়াই চির বিরাজমান। জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, আনন্দ-বেদনায় মন আলোড়িত হয় কিন্তু চৈতন্য সকল কিছুর প্রভাবমুক্ত, চিরস্থির, চিরশান্ত। চেতনার আলোয় সকল কিছু প্রজ্জ্বলিত, সকল কিছু আলোকিত কিন্তু তাকে আলোকিত করার দরকার পড়ে না। সে নিজেই আলোকময়।
আমাদের শরীর, মন, অনুভুতি, উপলব্ধি, ইগো সবকিছু ভিন্ন অর্থাৎ এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে অনেক শরীর অনেক মন কিন্তু চৈতন্য ‘এক’। ঐ এক চৈতন্যই আমাদের অনেক শরীর অনেক মনে প্রজ্জ্বলিত থেকে আমাদের অনেক করে তুলেছে। আমরা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অনুভব করছি। প্রকৃতঃপক্ষে সকল স্বাতন্ত্র্যের মূলে ঐ এক চৈতন্য। কি অদ্ভুত তাই না? আচ্ছা, চৈতন্য কি কোনো কিছু প্রত্যাশা করে? না। কোনো কিছুতে ভীত? না। কখনো কি অস্থির হয়? না। কোনো কিছুর অভাব বোধ করে? না।আমরা আর একটু গভীরে যাবার চেষ্টা করি।
এর কোনো আদি নেই, অন্ত নেই এবং অদ্বিতীয়। প্রশ্ন হতে পারে নিজের চোখের সামনে কতকিছু দেখছিঃ বাড়ি-গাড়ি, আকাশ-পাতাল, গাছ-পালা, গোরু-ছাগল, মানুষ জন, জমি খেত-খামারি কত কিছু, এক কীকরে হলো? সারা পৃথিবীময় কত সংঘাত, যুদ্ধ, মারা-মারি, হানাহানি, অভাব অভিযোগ লেগেই আছে, আরো ভবিষ্যতে কত কিছুই না হতে পারে, তাহলে চির শান্ত কীকরে হলো? আমাদের জন্ম হচ্ছে, বড় হচ্ছি আবার মারাও যাচ্ছি, তাহলে আদি নেই অন্ত নেই মানে? একটা চেতনা থেকেই যদি সকল ভাব বস্তু বা অভাব বস্তুর উদ্ভব হয় বা আরো স্পষ্ট এবং সংক্ষিপ্তাকারে বললে- যদি সবই একক চৈতন্যের প্রকাশ ও বিকাশ হয়ে থাকে তাহলে স্রষ্টা- সৃষ্টি সম্পর্কে কী বলা যাবে? স্রষ্টা- সৃষ্টি কি এক নাকি ভিন্ন?
এখানে এসে চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষ দু’দিকে পা বাড়ায়। আস্তিক্য ও নাস্তিক্য। সাধারণভাবে সবাই জানে, নাস্তিক কোনো বিশ্বাসে বিশ্বাসী নয়- তাদের চাই প্রমান। আসলে কি তাই নাকি তারাও একটা বিশ্বাস লালন করেন। সেটা হলো- ঈশ্বর বলে কেউ নাই। কিন্তু সেটা তারা প্রমান করতে পারেন না যার অর্থ শেষাবধি ঐ এক ধরণের ‘বিশ্বাস’। নিরেশ্বরবাদিতার বিশ্বাস। তারা পদার্থ বিজ্ঞান থেকে বলবে, এই বিশ্ব জগত সৃষ্টি হয়েছে অসীম ভর বিশিষ্ট কণা থেকে। কিন্তু এই কণা কোথা থেকে এলো বা কে সৃষ্ট করেছে তার কোনো সদুত্তোরদাতা এখনো পাওয়া যায় না।
তাদের দৃষ্টিতে ঈশ্বর ছাড়াই মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রধান যুক্তিগুলো হলো:
১. কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন (Quantum Fluctuation)
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মতে, ‘শূন্য’ মানে আসলে কিছুই না থাকা নয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, শূন্যস্থানের মধ্যেও শক্তি ক্রমাগত ওঠানামা করে। বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং তার বই ‘The Grand Design’-এ বলেছেন- মহাকর্ষের মতো একটি সূত্র (Law of Gravity) থাকার কারণে মহাবিশ্ব শূন্য থেকে নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে পারে এবং করবেই। একেই বলা হয় Spontaneous Creation বা স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টি।
২. কারণ ও প্রভাবের ভিন্ন ধারণা
আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় মনে হয় প্রতিটি জিনিসের একজন নির্মাতা বা কারণ থাকে। কিন্তু মহাবিশ্বের উৎপত্তির ক্ষেত্রে ‘সময়’ নিজেই বিগ ব্যাং-এর সাথে শুরু হয়েছে। অর্থাৎ, বিগ ব্যাং-এর ‘আগে’ বলে কিছু ছিল না। স্টিফেন হকিংয়ের মতে, ‘বিগ ব্যাং’-এর আগে কী ছিল তা জানতে চাওয়া অনেকটা দক্ষিণ মেরুতে দাঁড়িয়ে আরও দক্ষিণে যাওয়ার পথ খোঁজার মতো যার কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই সৃষ্টির জন্য কোনো ‘স্রষ্টা’ বা বাইরের চালিকাশক্তির প্রয়োজন পড়ে না।
৩. মাল্টিভার্স বা বহু-মহাবিশ্ব তত্ত্ব
অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, আমাদের মহাবিশ্ব একা নয়। হয়তো অসংখ্য মহাবিশ্ব বুদবুদের মতো তৈরি হচ্ছে। আমরা এমন একটি মহাবিশ্বে আছি যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো এমনভাবে সেট হয়ে গেছে যে প্রাণ টিকে থাকতে পারে। একে বলা হয় ‘Anthropic Principle’। এটি অনেকটা লটারিতে জেতার মতো—লাখ লাখ মহাবিশ্বের মধ্যে একটিতে প্রাণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
৪. বিবর্তন ও জটিলতা
জটিল কিছু মানেই যে তার একজন নকশাকার (Designer) থাকতে হবে, বিজ্ঞানে তা সবসময় সত্য নয়। যেমন- ডারউইনের বিবর্তনবাদ দেখিয়েছে যে, অতি সামান্য কোষ থেকে মিলিয়ন বছরের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে অত্যন্ত জটিল মানুষ তৈরি হতে পারে। একইভাবে, মহাজাগতিক বিবর্তনের মাধ্যমে ধূলিকণা ও গ্যাস থেকে নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছে।
৫. গাণিতিক অনিবার্যতা
ম্যাক্স টেগমার্কের মতো বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্ব আসলে একটি গাণিতিক কাঠামো। গণিতের নিয়মগুলো যেমন চিরন্তন এবং স্বয়ংসিদ্ধ, মহাবিশ্বও তেমনি গাণিতিক নিয়মের ফলশ্রুতি। এখানে কোনো সচেতন সত্তার হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে না।
সারকথা:
বিজ্ঞান বলে যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য পদার্থবিদ্যা, গণিত এবং শক্তির মিথস্ক্রিয়া যথেষ্ট। তবে, ‘কেন এই নিয়মগুলো (যেমন মহাকর্ষ) এমন নিখুঁত হলো?’ বা ‘একেবারে শূন্য থেকে কেন কিছু সৃষ্টি হলো?’- এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর এখনো অজানা।
আস্তিক নাস্তিকের প্রশ্নের যেন শেষ হতে চায় না। এখন আস্তিক বলবে, আচ্ছা ঈশ্বর নেই তা যেহেতু তুমি প্রামাণ করতে পার না তাহলে মেনে নাও ঈশ্বর আছে এবং তিনিই সকল কিছুর স্রষ্টা। তখন আবার নাস্তিক প্রশ্নবাণ ছুড়ে মারবে,- ঈশ্বর সবকিছুর স্রষ্টা মানলাম। এখন তোমার ঈশ্বর কোথা থেকে এলো, কে সৃষ্টি করেছে তাকে? তাহলে এই দ্বন্দকে পাশে সরিয়ে রেখে আর একটা চিন্তা করা যায় কিনা। পৃথিবীর অনেক চিন্তাশীল জ্ঞানী ব্যাক্তিগণ এই দ্বন্দে না জড়িয়ে সুন্দর একটা চিন্তা দর্শনের কথা বলেছেন, আমরা সেই চিন্তাকে নিয়ে চিন্তা করে দেখতে চাই। আর সেটাই হলো- কনশাসনেস বা চৈতন্য যা নিয়ে আমরা শুরু করেছি। ঈশ্বর আছেন কি না তানিয়ে আর যুদ্ধে না গিয়ে এখান থেকে শুরু করে দেখি, রাস্তা কোথায় নিয়ে যায়। হয়তো এই দ্বান্দিক অবস্থার নিরসন হলে হতেও পারে আর তা হলো- ঈশ্বর আছে কিনা না ভেবে ‘আমি আছি কিনা’ এখান থেকে শুরু হোক:
চলবে ……
জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ১)
The Tibetan Book of Living and Dying এর এবং বই পরিচিতি:
Sogyal Rinpoche ছিলেন একজন তিব্বতি বৌদ্ধ আধ্যাত্মিক শিক্ষক, যিনি পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের কাছে তিব্বতি বৌদ্ধ দর্শনকে সহজভাবে তুলে ধরার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি তিব্বতের প্রাচীন জ্ঞানকে আধুনিক জীবনের সাথে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন। তার শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো—মৃত্যুকে বুঝে জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা।
বইটির সারকথা
“The Tibetan Book of Living and Dying” একটি গভীর আধ্যাত্মিক গ্রন্থ, যেখানে জীবন ও মৃত্যুকে একই ধারার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই বইটি তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন জ্ঞান, ধ্যানপদ্ধতি এবং মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থার (বর্দো) ধারণাকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে।
এখানে লেখক দেখাতে চেয়েছেন—
আমরা কীভাবে বাঁচি, সেটাই নির্ধারণ করে আমরা কীভাবে মরবো।
মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে, বরং তাকে বুঝে জীবনকে আরও অর্থবহ করা যায়।
বইটির একটি বড় শক্তি হলো—এটি শুধু একক কোন ধর্মীয় আলোচনা নয়, বরং বাস্তব জীবনের দুঃখ, ভয়, ভালোবাসা এবং মানবিকতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত যেটা সর্বজনীন। আধুনিক মানুষের জন্য এটি এক ধরনের পথনির্দেশ, যা শেখায়—
সচেতনভাবে বাঁচা।
মৃত্যুকে গ্রহণ করা।
অন্তরের শান্তি খুঁজে পাওয়া।
এই বইটি কেবল মৃত্যু নিয়ে নয়, বরং কীভাবে সত্যিকারের বাঁচা যায়—সেই শিক্ষা দেয়।
এক অর্থে, এটি জীবনকে ধীরে, সচেতনভাবে এবং ভালোবাসায় স্পর্শ করার এক আমন্ত্রণ।
.
.
অধ্যায় এক: মৃত্যুর আয়নায়
মৃত্যু সম্পর্কে আমার নিজের প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল যখন আমার বয়স প্রায় সাত বছর। তখন আমরা পূর্ব তিব্বতের পাহাড়ি অঞ্চল ছেড়ে মধ্য তিব্বতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার গুরুর ব্যক্তিগত সহকারীদের একজন, সামতেন, ছিলেন এক অসাধারণ সন্ন্যাসী, যিনি আমার শৈশবে আমার প্রতি খুবই স্নেহশীল ছিলেন। তার উজ্জ্বল, গোলগাল মুখ ছিল, আর সবসময় যেন মুখে হাসি ফুটে উঠতে প্রস্তুত থাকত। তার স্বভাব এতই ভালো ছিল যে মঠের সবার কাছেই তিনি প্রিয় ছিলেন।
প্রতিদিন আমার গুরু শিক্ষা ও দীক্ষা দিতেন এবং বিভিন্ন সাধনা ও আচার পরিচালনা করতেন। দিনের শেষ দিকে আমি আমার বন্ধুদের জড়ো করতাম এবং সকালে যা ঘটেছিল তা অভিনয় করে ছোট একটি নাটক করতাম। সেই সময় আমার গুরু সকালে যে পোশাকগুলো পরতেন, সেগুলো আমাকে প্রায়ই ধার দিত সামতেন। কিন্তু সেই দিন তিনি আমাকে তা দিতে অস্বীকার করলেন।
তারপর হঠাৎই সামতেন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, এবং স্পষ্ট হয়ে গেল যে তিনি আর বাঁচবেন না। আমাদের যাত্রা স্থগিত করতে হলো। এরপরের দুই সপ্তাহ আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। মৃত্যুর তীব্র গন্ধ যেন চারদিকে মেঘের মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল, এবং যখনই আমি সেই সময়টার কথা ভাবি, সেই গন্ধ আবার যেন মনে ফিরে আসে। ঠজুড়ে মৃত্যুর ব্যাপারে এক গভীর সচেতনতা ছড়িয়ে পড়েছিল।
তবে এটি ভীতিকর বা বিষণ্ণ ছিল না। বরং আমার গুরুর উপস্থিতিতে সামতেনের মৃত্যু এক বিশেষ তাৎপর্য ধারণ করেছিল। এটি আমাদের সবার জন্য একটি শিক্ষা হয়ে উঠেছিল।
সামতেন আমার গুরুর বাসস্থানের পাশে একটি ছোট মন্দিরে জানালার ধারে একটি বিছানায় শুয়ে ছিলেন। আমি জানতাম তিনি মারা যাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে আমি গিয়ে তার পাশে বসতাম। তিনি কথা বলতে পারতেন না, আর তার মুখের পরিবর্তন দেখে আমি হতবাক হয়ে যেতাম—এখন তার মুখ খুবই ক্লান্ত ও শুকনো দেখাত। আমি বুঝতে পারলাম তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন এবং আমরা তাকে আর কখনো দেখব না। এতে আমি গভীরভাবে দুঃখ ও একাকী বোধ করছিলাম।
সামতেনের মৃত্যু সহজ ছিল না। তার কষ্টকর শ্বাসের শব্দ সব জায়গায় শোনা যেত, এবং আমরা তার দেহ পচতে থাকার গন্ধও অনুভব করতে পারতাম। সেই শ্বাসের শব্দ ছাড়া মঠজুড়ে যেন গভীর নীরবতা নেমে এসেছিল। সবকিছু যেন সামতেনকে ঘিরেই কেন্দ্রীভূত ছিল।
যদিও সামতেনের দীর্ঘ মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে অনেক কষ্ট ছিল, তবুও আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছিলাম যে গভীরভাবে তার মধ্যে এক ধরনের শান্তি এবং অন্তর্নিহিত আত্মবিশ্বাস ছিল। প্রথমে আমি এর ব্যাখ্যা করতে পারিনি। পরে বুঝলাম এটি কোথা থেকে এসেছে—তার বিশ্বাস, তার সাধনা-প্রশিক্ষণ এবং আমাদের গুরুর উপস্থিতি থেকে। যদিও আমি দুঃখ অনুভব করছিলাম, তবুও জানতাম যে আমাদের গুরু সেখানে থাকলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, কারণ তিনি সামতেনকে মুক্তির পথে সাহায্য করতে পারবেন। পরে আমি জানতে পারি, অনেক সাধকের স্বপ্নই হলো নিজের গুরুর আগে মারা যাওয়া এবং মৃত্যুর সময় গুরুর দ্বারা পথনির্দেশ পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করা।
যখন জামইয়াং খিয়েন্তসে শান্তভাবে সামতেনকে তার মৃত্যুর পথে পরিচালিত করছিলেন, তখন তিনি তাকে মৃত্যুর প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তর একে একে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। আমার গুরুর জ্ঞানের সূক্ষ্মতা এবং তার আত্মবিশ্বাস ও শান্তি আমাকে বিস্মিত করেছিল। আমার গুরু যখন উপস্থিত থাকতেন, তার সেই শান্ত আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে উদ্বিগ্ন মানুষকেও আশ্বস্ত করত। এখন জামইয়াং খিয়েন্তসে আমাদের সামনে মৃত্যুভয়ের ঊর্ধ্বে থাকার এক উদাহরণ তুলে ধরছিলেন।
তবে তিনি কখনো মৃত্যুকে হালকাভাবে নেননি। তিনি প্রায়ই বলতেন যে তিনিও মৃত্যুকে ভয় পান, এবং আমাদের সতর্ক করতেন যেন আমরা মৃত্যুকে সরলভাবে বা উদাসীনভাবে না দেখি। তবুও কী এমন ছিল যা আমার গুরুকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে দিত একই সঙ্গে এতটা গম্ভীর অথচ হালকা মনে, এতটা বাস্তবসম্মত অথচ রহস্যময়ভাবে নির্ভার ভঙ্গিতে? এই প্রশ্ন আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং চিন্তায় ডুবিয়ে রেখেছিল।
সামতেনের মৃত্যু আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সাত বছর বয়সে আমি প্রথমবারের মতো সেই বিশাল ঐতিহ্যের শক্তির ঝলক দেখেছিলাম যার অংশ হয়ে আমি বড় হচ্ছিলাম, এবং আমি আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্য বুঝতে শুরু করলাম। সাধনা সামতেনকে মৃত্যুকে গ্রহণ করার ক্ষমতা দিয়েছিল, এবং একই সঙ্গে এই পরিষ্কার উপলব্ধিও দিয়েছিল যে কষ্ট ও যন্ত্রণা কখনো কখনো গভীর, স্বাভাবিক শুদ্ধির একটি প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। সাধনা আমার গুরুকেও মৃত্যুর প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান দিয়েছিল এবং মানুষকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত করার একটি সুস্পষ্ট পদ্ধতি দিয়েছিল।






