বুঝে শুনে পড়ি বই (পর্ব – ১)

বইয়ের নাম: Apprenticed to a Himalayan Master (A Yogi’s Autobiography) 
যোগী শ্রী ম (Sri M) - শ্রী মধুকর নাথ 
  • বইটির তথ্য:
  • প্রকাশক: মেজেন্টা প্রেস (ভারত) [Magenta Press (India)]
  • প্রথম প্রকাশ: ২০১০
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩২৯
  • ভাষা: ইংরেজী

আজকের আলোচিত বইয়ের নাম, Sri M (শ্রী এম ) এর লিখা “Apprenticed to a Himalayan Master (A Yogi’s Autobiography” [এপ্রেন্টিসড টু এ হিমালায়ান মাস্টার (এ যোগী’স অটোবায়োগ্রাফি)];

এই বইটিতে একজন সাধকের জীবনশৈলী এবং তাঁর আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণের বর্ণনা পাওয়া যায়। যিনি এই অভিজ্ঞতার কথন বর্ণনা করছেন, তাঁর লেখক নাম শ্রী ম (Sri M), পারিবারিক নাম মমতাজ আলী খান, যিনি সন্ন্যাসের পর হন শ্রী মধুকরনাথ (সংক্ষেপে শ্রী ম) । এই আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণের গল্পে রয়েছে, হিমালয় ও হিমালয়ে থাকা আধ্যাত্মিক গুরুদের শিক্ষা, তাদের দীক্ষা ও দর্শণ, তাদের সাবলীলতা, সাধকের আত্মচেতনার বিকাশ, আত্মপরিভ্রমণ, এবং নিজের স্বরূপকে চেনার নানা পথ, পরীক্ষা ও নিরীক্ষণ। এই কথন/কহন/ গল্প, সমাজ ও সামাজিক ধর্মের উর্ধ্বে গিয়ে পাঠককেও আত্ম পরিচিন্তনের এক কর্মযজ্ঞে ফেলে দেয়। এটা শুধু একজন সাধকের কাহিনী নয় বরং একজন সংসারী মানুষের আত্মিক অনুসন্ধানের জীবন্ত দলীল, যার মাঝে সম্প্রীতি ও মানবতার অনন্য উদাহরণও পাওয়া যায়। 

বইটিতে মোট ৫০টি অধ্যায় আছে যা পাঠককে নানা আভিজ্ঞতার দর্শণ এবং নিরীক্ষণের সুযোগ করে দেয়।

এই গল্পের শুরু হয় কেরেলার তিরুভান্তপুরামে, যেখানে ১৯৪৮ সালে লেখক জন্মগ্রহন করেন। খুব ছোট থেকেই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় বিষয়ে নানা প্রশ্ন ছিল মমতাজের। সময়ের সাথে সাথে তা আরো গভীর হতে থাকে। প্রথম ৯ বছর বয়সে গুরুর দর্শণ পান, পরে নানা সুফি ও সনাতনী সাধন পদ্ধতির সাথে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সঙ্গে দেখা হয় বিভিন্ন মার্গের গুরুদের সঙ্গে, যার মধ্যে কালাডি মাস্তান[1] ও ম-ঈ মা (অবধূত[2]) অন্যতম।

২০ বছর বয়সে মমতাজ তাঁর হিমালয়ের যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে ট্রেনে করে চেন্নাই থেকে দেহেরাদুন, পরে হরিদ্বার ও হৃষীকেশ। হৃষীকেশে প্রথম স্বামী চিদানন্দজীর সৎসঙ্গে যোগদান করেন, উপনিষদ, যোগ-আসন ও ধ্যান বিষয়ক ধারণা লাভ করেন। একমাস সেখানে থাকার পর হিমালয়ের আরো গভীরে, প্রয়াগ হয়ে বদ্রীনাথদের দিকে যাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন কঠিন এবং দুস্কর পথ পাড়ি দিয়ে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বদ্রীনাথ পৌঁছানোর পর মানা গ্রামের সন্ধান পান, যেখানে ব্যাস গুহায় তাঁর গুরু ‘শ্রী মহেশ্বর নাথে’র সাথে বহুকাল পর দেখা হয়, এবং গুরু তাঁকে সম্বোধন করেন ‘মধু’ নামে (যা মমতাজ আলীর পূর্ব জন্মের নাম এবং সন্ন্যাসী নাম)। এরপর শুরু হয় তাঁর জীবনে গুরুর তত্ত্বাবধানে সাধনার অধ্যায়।

পবিত্রতা, অপবিত্রতা, ক্রিয়া, যোগ (চার মার্গ[3]), ধর্ম (আত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক), ভেদ-অভেদ,  দ্বৈত্ব-অদ্বৈত্ব, মন, স্মৃতি, শাস্ত্র, বেদ, উপনিষদ, বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব, মন্ত্র/জপ, তন্ত্র/তপ, পরম সম্বন্ধে জ্ঞান, প্রেম, বোধ; ধাপে ধাপে এই সকল বিষয়ে দর্শন লাভ করেন মমতাজ। টানা তিন বছর সাধনা ও নানা অভিজ্ঞতার পর গুরুর নির্দেশে সংসারে ফেরেন। এই অভিজ্ঞতায় যে শুধু ভালোবাসা আর জ্ঞান রয়েছে তা না, এই অভিজ্ঞতার মাঝে রয়েছে গুরুকে ছেড়ে যাওয়া ও হারানোর বেদনাও।

তবে গুরু কি আসলেই আমাদের ছেড়ে কখনো যান আদৌ? এবং এই পরম্পরা যে চলমান তা প্রতক্ষ হয় শ্রী ম(Sri M) শেষ কথায়।

একজন পাঠক হিসেবে, এই বইটি আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং আমার মনে তৈরী করেছে অনেক, অনুসন্ধিৎসা, জিজ্ঞাসা। প্রথম যখন বইটি পড়ি তখন গুরু-শিষ্য সংক্রান্ত এবং আধ্যাত্মবাদ সম্পর্কিত কিছু অভিজ্ঞতা আমার ছিল। তবে বইটির প্রতিটি অধ্যায় যেন আমাকে আবার নতুন করে এই বিষয়গুলোর সাথে পরিচয় করায়। প্রথমত, আমি ভাবতাম, গুরু-শিষ্যের মধ্যকার সম্পর্ক যেন, একজন পিতা-পুত্র কিম্বা স্কুল কেন্দ্রিক হয়, কিম্বা প্রচন্ড সম্মানের, গাম্ভির্যের এর মাঝে যে ভালোবাসা থাকে এটা আমার  জানা ছিল না। শ্রী মধুকর নাথের লেখা থেকে আমার বার বার মনে হয়েছে, গুরু-শিষ্যের গাম্ভীর্য থেকে ভালোবাসা অনেক জরুরি, গুরু যে শুধু আমার আলোকবর্তা তা নয়, গুরু যে একটা নিরাপদ ঠাঁয়, একটা শান্তির জায়গা, শেষ আশ্রয়ের জায়গা।

এ ছাড়াও, হিমালয় এবং তার বর্ণনা আমাকে এতটাই তাড়িত করেছে যে আমি ২০১৯ এ হৃষীকেশ যাত্রা করি এবং রামঝুলার গঙ্গার ঘাটে দাড়িয়ে এটা সেদিন অনুভব করি যে, হিমালয় একটা আধ্যাত্মিক পীঠ এবং লেখক তাঁর কথায় সত্য। এই প্রথম আমার স্থিরতার অনুভূতি হয়। তাই এই বইটি বইই নয় বরং সাধকদের জন্য নতুন সূচনার মার্গও বটে। তৃতীয়ত, বইটি পড়তে গিয়ে আমার বেশ কিছু ধ্যানধারণার পরিবর্তন হয়েছে এবং সেই সাথে আমার দেখার ধরনও। অনেক আগে রামকৃষ্ণ কথামৃত পড়তে গিয়ে যত-মত তত-পথ এই বিষয়টা জানা হয়েছিল, তবে মধুকরনাথের এই লেখায় রামকৃষ্ণের কথার ধারাটা আমার আরো পরিষ্কার হয়েছে।

একটা আকর্ষনীয় বিষয় হল, কথামৃতের লেখক মাস্টার মশায় শ্রীম (মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) এর আদ্যাক্ষর ও মধুকর নাথের প্রকাশক নাম এক “শ্রীম” এক। এছাড়াও বইটিতে দৈনন্দিন জীবনের অনেক বিষয় উঠে এসেছে যা যে কোন পাঠকই তার জীবনশৈলীর সাথে মিলিয়ে নিতে পারবে, তবে দেখার ধরণ বদলে যাবে।

পরিশেষে, দেখার ধরণ কিম্বা, দর্শন এবং দর্শন নিয়ে কিছু কথা বলা যায়, আমরা যা দেখি তাই আমরা সাধারণ অর্থে দর্শন বলে ধরে নেই, এবং দর্শন বলতে আমরা বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যাক্তির অভিজ্ঞতা লব্ধ কথাকে বুঝি। তবে আধ্যাত্মবাদে, এই দেখার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করে। এখানে দেখা মানে, চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা না, এখানে দেখা মানে অন্তর দৃষ্টী বা হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখা।

আরো সহজ করে বললে, নিজেকে খুব সূক্ষ্ণ আকারে দেখতে পারা; যেমন, প্রতিটা কাজ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, নিজের মনের মধ্যে যে বিষয়গুলো নাড়া দিচ্ছে সেগুলো, নিজের অনুভূতিগুলো (রাগ, আনন্দ, হ্রেশ, ভালোলাগা ইত্যাদি) দেখতে পারা। এটাই যে আসল দর্শন তা এই বইয়ে আমি খুঁজে পেয়েছি, সবাইকে বইটি পড়ার অনুরোধ রইল।


[1] Masthan (মাস্তান)- Intoxicated/ ecstatic

[2] অবধূত (avadhut) – যিনি অদ্বৈত্ব/এক বা একত্ব প্রাপ্ত  হয়েছেন বা, যার মাঝে দ্বৈত্বতা (duality) নেই।

[3] যোগের চার মার্গ- জ্ঞান, ভক্তি, ক্রিয়া, কর্ম।

আরও লেখা

spot_imgspot_img