উত্তর: ওহাবি চিন্তাদর্শন ভাবগতভাবে আল্লাহর নাম, গুণ, এবাদত সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর একত্বে বিশ্বাসী। যা বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা ইন্দ্রিয়জ ব্যাপার। এতে যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর একত্ব প্রমাণ করা যায় বটে কিন্তু তা অতীন্দ্রিয়জ বা সত্তাকারে বুঝা যায় না। তাই যিনি বিষয়টি এভাবে বোঝেন তাকেও বর্তমান থাকতে হয়। ফলে ২ টি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় থাকে—যিনি বোঝেন তিনি অর্থাৎ ব্যক্তি মানুষটি এবং যাঁকে বুঝা হয় তিনি তথা আল্লাহ্। ফলে যাঁকে বোঝা হচ্ছে সেই আল্লাহ্ সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে ১ জন প্রমাণিত হলেও যিনি তাঁকে বুঝতে পারছেন (বা উক্ত ব্যক্তি) তাঁরও স্বকীয়তা টিকে থাকছে আরো ১ জন রূপে। প্রাসঙ্গিক কারণে সমস্ত সৃষ্টিজগতকেও আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে—তাই তা আপনা থেকে দ্বৈত অবস্থার সৃষ্টি করছে। সুতরাং তা একত্ববাদ হলো না—দ্বৈতবাদই হলো। আবার মোজাদ্দেদি চিন্তাদর্শন সাধনার চূড়ান্ত পর্যায়ে অতীন্দ্রিয় অনুভূতির সাহায্যে আল্লাহকে সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে ১ জন বলে বুঝতে পারেন বলে দাবি করা হয়। এবং সাধক ব্যক্তি তাঁর এবাদতে মশগুল থাকেন। এতে আল্লাহর সাথে এবাদতে কোনো শেরেক থাকে না—যা একজন মানুষের জীবনে এক বড় অর্জন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও পূর্বের ওহাবি দর্শনের মতো ২ টি অস্তিত্বে গিয়ে বিষয়টি থেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ এবাদতকারী এবং যাঁর এবাদত করা হচ্ছে সেই তিনি। সুতরাং তা একত্ববাদ নয়, দ্বৈতবাদ।
যখন কেউ মূর্তি পূজা করে তখন সে ঈশ্বরকে মেনে নিয়েই তা করে। তার মূর্তি এ ক্ষেত্রে ঈশ্বরের উপলক্ষ্য। একই ধারণা প্রয়োগকৃত হয়ে আছে দ্বৈতবাদী দর্শনে। মূর্তিপূজক, মূর্তি আর ঈশ্বর যেমন ঠিক তেমনি এবাদতকারী, সৃষ্টিজগত আর আল্লাহ্। সমস্ত সৃষ্টিজগত যেন একটি মূর্তি—যা ঈশ্বর বা আল্লাহর বিপরীতে রয়েছে। আর মূর্তিপূজক বা এবাদতকারী ঈশ্বর বা আল্লাহকে ১ জন বলেই মেনে চলেছেন। এমনকি এখানে নিজেকেই আল্লাহর সমান্তরাল বলে দাবি করা হচ্ছে। যেন বলা হচ্ছে যে, ‘আল্লাহ তুমিও আছ, আমিও আছি’। এটা আল্লাহর একত্ববাদ হলেও, অস্তিত্বের দ্বৈতবাদ—যা শেরেক বলে গণ্য। আসলে ওহাবি দর্শন প্রাথমিক পর্যায়ের, চূড়ান্ত দর্শন নয়। আর কেউ কি মনে করতে পারে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিক্ষালাভের চূড়ান্ত ক্ষেত্র—আর কোনো শিক্ষা নেই? মোটেই তা হতে পারে না। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া উচ্চতর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। অর্থাৎ পর্যায়ক্রমিক ধারা ঠিক রেখেই শিক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে হয়। নতুবা অজ্ঞতার অবসান হয় না। আর উচ্চতর পর্যায়ে বেশি মানুষের পক্ষে সাফল্য লাভ সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু উচ্চতর সাফল্য লাভ করতে না-পারা এক কথা আর সেটাকে অস্বীকার করা আরেক কথা। এ জাতীয় অস্বীকার করণ একটা বড় ধরনের কুফরি।
তাই এটা খুব স্পষ্ট যে, ওহাবি ও মোজাদ্দেদি চিন্তাদর্শন দ্বৈতবাদী, তা মোটেই একত্ববাদী নয়।
তথ্যসূত্র:
কোরানে মানুষতত্ব পরম্পরা – ৩, হিলালুজ্জামান হেলাল
টাইপিং সহযোগী মৈত্রী: সৌমিক জয়


