সূচনা কথা
মহানবি হজরত মুহাম্মদ আ. এঁর মাধ্যমে মানবজাতি আরবি ভাষায় পবিত্র কোরান লাভ করেছে। আরবি ভাষা জানলে কোরান পড়া তেমন কঠিন কাজ নয়, এমনকি ভাষাটা না-জেনেও আরবি পড়া শিখেই (জের-জবর- পেশ যুক্ত) কোরান পড়তে পারা যায়। কিন্তু পড়তে পারলেই বুঝা যায় না। আসলে এত উঁচু মানের কোরানি কথার তাৎপর্য (আরবি ভাষা জানলেও) সকলের বোধগম্য হওয়ার কথা নয়। তাই এর ব্যাখ্যা বা তাফসির (تفسير) আবশ্যক। আর তাফসির যথাযথ করার জন্য কোরানের দর্শনজ্ঞান অতি জরুরি। কিন্ত বিষয়টি মুসলিম জগতে চরম উপেক্ষার শিকার হয়েছে। এর একটা উপযুক্ত সমাধান আবশ্যক।
মহানবি এঁর সাহাবিগণ বিশেষ করে হযরত ওসমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা কালে কোরানের একটা চুড়ান্ত সংকলন প্রস্তুত করেন, যা আজও বিশ্বজগতে বিদ্যমান। কোরান সংকলনের ন্যায় তাঁরা যদি হাদিসও সংকলন করতেন! তাঁদের পক্ষেই তা খুব সহজে সম্ভব ছিল। কিন্তু সাহাবিগণ রসুলুল্লাহর হাদিস সংকলনের কোনো বাস্তব ব্যবস্থা নেন নি। ফলে পরবর্তীতে অসংখ্য মানুষ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় হাদিস সংগ্রহে উদ্যোগী হোন। তাঁদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন গ্রন্থাকারে হাদিসসংকলন প্রস্তুত করেন। আমরা বর্তমানে বোখারি, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসায়ি, ইবনে মাজা, মুআত্তা-ই মালিক, সুনানে আহমদ, মিশকাত ইত্যাদি নামে হাদিস গ্রন্থসমূহ দেখতে পাই।
যাঁদের দ্বারা (সাহাবিগণ) হাদিস সংকলিত হওয়া সহজ ছিল তাঁদের দ্বারা হাদিস সংকলন না-হওয়ায় পরবর্তীকালে যেমন বহু (যোগ্য-অযোগ্য) ব্যক্তি তা সংকলনে উদ্যোগী হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি যাঁদের থেকে (আহলে বায়ত) কোরানের ব্যাখ্যা সংগৃহীত হওয়া উত্তম ছিল তাঁদের থেকে তা সংগ্রহ না-করার ফলে পরবর্তীতে বহু (যোগ্য-অযোগ্য) মানুষ কোরান ব্যাখ্যায় নেমে পড়েন। লেখা হয় বিখ্যাত কিছু তাফসির গ্রন্থ। তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে বাইজাভি, তাফসিরে কাশ্শাফ, তাফিসের কবির, তাফসিরে তাবারি, তাফসিরে কাছির, তাফসিরে মাজহারি, তাফসিরে বয়ানুল কোরান, তাফসিরে জিলালিল কোরান, মাআরেফুল কোরান, তাফহিমুল কোরান বিশ্বজুড়ে খুব সমাদৃত তাফসির গ্রন্থ।
তাফসির সাহিত্যের ইতিহাস পাঠে জানা যায়, গত হিজরি ত্রয়োদশ শতকের মধ্যেই বিভিন্ন ভাষায় ১১৬১ খানা পূর্ণাঙ্গ তাফসির গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে (তাফসীর সাহিত্যে ইতিহাস, পৃ. ৬৮,— আবদুস সামাদ ছারিম আল আযহারী)। তারপর আরো প্রায় দেড়শ বছর গত হলো। এ সময়ে নিশ্চয়ই অনেক তাফসির গ্রন্থ লেখা হয়েছে। আর অপূর্ণাঙ্গ তাফসির গ্রন্থ তো অগুণিত হতে পারে। এতসব তাফসির গ্রন্থের মাঝে কোরানের দর্শন তথা কোরানের চিন্তাকাঠামো বা তত্ত্বদর্শন যথার্থরূপে ফুটে ওঠে নি। ফলে তাফসিরের একজন আগ্রহী পাঠকের নিকট কোরানের যথাযথ দার্শনিক তত্ত্বের পরিবর্তে ফতোয়া কিচ্ছা কাহিনী সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি প্রকাশ পায় বেশি। কোরানি তত্ত্বে যে স্বর্গীয় নুরানি আবহ রয়েছে, হৃদয় জাগানো গভীর অনুভূতির স্পন্দন রয়েছে তাফসির পড়ে তা বুঝা দুষ্কর। বরং পাঠকের কাছে পবিত্র কোরান যেন আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো মাথাভারি করা তথ্যপূর্ণ বিবিধ বিষয়রাশিতে ভরপুর একটি গ্রন্থ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এভাবেই পবিত্র কোরান জীবনদর্শন না-হয়ে জীবনবিধান হয়ে পড়েছে। এই জগৎসংসারে মানুষ কি করে জান্নাতি অনুভূতিপূর্ণ আদর্শ স্থাপন করতে পারে এবং মানুষ সাধারণ দেহকাঠামোর সাথেই কত উচ্চতর আধ্যাত্মিকতাসম্পন্ন— তার নিখুঁত ভাষিক বর্ণনা কোরানি দর্শনে আছে, অথচ সাধারণ তাফসিরের আড়ালে সেই দর্শন ঢাকা পড়ে গেছে। তাই কোরানের দশর্নতত্ত্ব উদ্ধার করা খুব জরুরি একটি বিষয়।
পবিত্র কোরানের ব্যাখ্যার স্বরূপ
এত তাফসির লিখতে হয় কেন? আল্লাহ্র বাণীর ব্যাখ্যার কর্তৃপক্ষ কে?
এর সদুত্তর থাকা উচিত। কোরান ব্যাখ্যার কোনো কর্তৃপক্ষ ছাড়াই কিছু মনগড়া নীতিমালা তৈরি করে তার আলোকে তাফসির লেখা যেতে পারে এবং তাই হয়ে চলেছে। ফলে কোরানের নামে উদ্ভট ধারণার বিস্তার ঘটে চলেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোরান নাজিলের প্রথম বাক্যের প্রথম শব্দ ‘ اقرا ’ বা ‘পাঠ কর’ বা ‘পড়’। এটি নির্দেশবাচক কথা, যা পালন করতে হবে। এই বাণী অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রায় ২৩ বছর ধরে কোরান নাজিল হয়েছিল। অথচ মহানবি পড়তে পারেন নি (!/?)। কেননা, তাফসিরশাস্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখ করে থাকে যে, রসুলুল্লাহ্ ছিলেন নিরক্ষর-— ‘পড়তে পারতেন না’। তাহলে তিনি কোরানের প্রথম নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হয়েছেন! ‘পড়’ দিয়ে কোরান নাজিল হলো অথচ নবিজি আ. পড়তেই শিখলেন না! কী আশ্চর্য তাফসির! অবশ্য তাঁর নিরক্ষরতা প্রমাণে তাফসিরকারকগণ কোরানের দোহাই দিয়েই তা করে থাকেন। সুরা আরাফে (৭:১৫৭/৫৮) মহানবিকে ‘উম্মি’ বলা হয়েছে। যার আভিধানিক অর্থ: মাতৃতুল্য বা মাতৃসুলভ, নিরক্ষর। বিজ্ঞ তফসিরকারকগণ তাঁর ক্ষেত্রে ‘নিরক্ষর’—অর্থাৎ লেখাপড়া জানেন না—শব্দটিই বেছে নিয়েছেন। তাই তাঁদের মতে, রসুলুল্লাহ্ তাঁর শিষ্যদের লিপিবদ্ধকরা কোরান একবারও পড়ে দেখতে পারেন নি! সুতরাং স্বয়ং আল্লাহ্র রসুল আল্লাহ্র প্রথম নির্দেশ পালনে কার্যত ব্যর্থ হয়েছেন বলে তাফসিরশাস্ত্র কার্যত সাব্যস্ত করে ফেলেছে। এবং এ জাতীয় তাফসির লিখেই তারা বিশ্বখ্যাত মুফাসসিরে কোরান! অথচ ‘পাঠ কর’ এবং ‘উম্মি’ শব্দের মাঝে কত সুন্দর ভাব লুকিয়ে রয়েছে। সেই সুন্দর তত্ত্ব দর্শন যদি তাঁরা জ্ঞাত থাকতেন! এমন অনেক ভুল ধারণা নবিজির উপর আরোপ করা হয়েছে, তা নিয়ে বহু কেচ্ছা কাহিনী লেখা হয়েছে—যা সত্যি খুব দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। (এ বিষয়ে আমার লেখা “ইকরা ও নাবিউল উম্মি” নামক প্রবন্ধে কিছুটা আলোকপাত রয়েছে।)
স্বভাবতই পবিত্র কোরানের প্রথম ব্যাখ্যাতা বা তাফসিরকারকও মহানবি নিজেই। কারণ তাঁর পক্ষেই কোরান এর মর্মার্থ জানা, বুঝা, উপস্থাপন করা অতি সহজ। এবং আল্লাহর বাণীর যথাযথ বাস্তবায়ন করা তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাই মহানবির চরিত্রকেই কোরানের ব্যাখ্যা মনে করা যায়। এবং তাঁর পরে তাঁর নিকটতম ব্যক্তিবৃন্দই কোরানের তাৎপর্য অনুধাবনে বেশি দাবিদার হতে পারেন। এ সূত্রে তাঁর আহলে বাইত এবং আলে-মিম এর মহান সদস্যগণকেই কোরান দর্শনের খাঁটি বোদ্ধা এবং একই সাথে তাফসিরেরও বড় কর্তৃপক্ষ মানতে হবে। কিন্তু ইসলামি জ্ঞান জগতে এমন ধারণা থাকলেও মহানবির আহলে বাইত থেকে কোরানের দর্শন ও ব্যাখ্যাকে মূলত রাজনৈতিক কারণে সঠিকভাবে সংগ্রহ করা হয় নি। বরং মনে করা হয়ে থাকে যে, সাধারণভাবে প্রাপ্ত হাদিসশাস্ত্রই হলো কোরানের মূল ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এ ধারণার আলোকে বলা হয়, রসুলুল্লাহ্ তাঁর ‘কথা, কাজ, সমর্থন’ এর মাধ্যমেই কোরানের ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছেন— যা কিছু হাদিসগ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। যদিও রসুলুল্লাহ্ থেকে নির্দিষ্টভাবে কোনো সুরা কিংবা আয়াতের ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো মাহফিল অনুষ্ঠান করে তাফসির করার বর্ণনা পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায়, অনেকেই নিজের যোগ্যতানুযায়ী (এবং অনেকেই নিজের স্বার্থানুযায়ী) কোরানের তফসির করে চলেছেন।
অথচ আহলে বাইতের সাহচর্য লাভের মাধ্যমে প্রাপ্ত কোরানের ব্যাখ্যা কতই না ভালো হত!
তাফসিরশাস্ত্রের শুরু আর বহমানতা
বাদশাহ/আমির মুয়াবিয়া দামেস্কে খেলাফতের নামে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁর পুত্র এজিদের মাধ্যমে (বহুসংখ্যক প্রসিদ্ধ সাহাবি বর্তমান থাকাবস্থায় আমির মুয়াবিয়া তাঁর পুত্র অ-সাহাবি এজিদের জন্য পরবর্তী খলিফা পদ নিশ্চিত করেন, নিজের জীবদ্দশায় এজিদের জন্য বহু মানুষের বাইয়াতও গ্রহণ করেন।—- আল বিদায়া ওয়াননিহায়া ৮ম খণ্ড, পৃ. ২৮৬) ইসলাম ধর্মে এ রকম বেদাতি কার্যক্রম দ্বারা যে রাজতন্ত্রের যাত্রা শুরু করা হয় তা কোনোভাবেই রসুলুল্লাহ্ আ. এঁর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অনুমোদন দূরে থাক, খোলাফায়ে রাশেদিনের সাধারণ আদর্শের সাথেও মেলে না। এবং তা ইসলামি আধ্যাত্মিকতার সাথে মারাত্মক সাংঘর্ষিক ছিল। যে কারণে আমির মুয়াবিয়া সাহাবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর শাসনব্যবস্থা “রাশেদিন” এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে নি। পরবর্তীতে খেলাফতের নামে এমন রাজতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়, কোরানের মর্মবাণীর সাথে বহু অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উমাইয়াদের পরিচালিত খেলাফতি রাজতন্ত্রের মূল বিষয়টিই ছিল হজরত আলি এবং রসুল বংশের ইমামগণের বিরোধিতা করা এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা। পরবর্তীতে দামেস্কের উমাইয়াদের ক্ষমতাচ্যূত করে আব্বাসিরা বাগদাদে আবারও খেলাফতের নামে রাজতন্ত্র চালু করেন। ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের পরিধি অনেক বেড়ে যায়। ক্ষমতা দিয়ে বা রাষ্ট্র শক্তিকে কাজে লাগিয়ে খেলাফত চালু রাখা গেলেও তা কোরান সম্মত কিনা তা নিয়ে নানান রকম প্রশ্নও দেখা দেয়, সৃষ্টি হয় বহু জটিলতাও— এতসব জটিলতা নিরসন করার প্রয়োজন দেখা দিল। ফলে কোরানের বিশেষ রকমের ব্যাখ্যা জরুরি হয়ে গেল। এবং সে ব্যাখ্যা এমনভাবে করতে হবে যেন তা অবশ্যই রাজানুকুল হয় অর্থাৎ সেই তাফসির থেকে যেন খেলাফতি রাজতন্ত্র কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। একই সাথে নতুন নতুন জনগোষ্ঠী ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তাদেরকেও রাজকীয় ভাবধারার ইসলামে অভ্যস্ত করারও প্রয়োজন ছিল। এত সব কারণে কোরানের রাজকীয় ব্যাখ্যায় তথাকথিত আলেম সমাজ তাঁদের প্রতিভাকে ব্যবহার শুরু করলেন। বিষয়টি এতদূর বিস্তৃতি লাভ করে যে, “নাসেখ-মানসুখ” তত্ত্বের অপব্যাখ্যা তৈরি করে কোরানের বহু আয়াত বা বাক্যকে পর্যন্ত বাতিল করে দেওয়া হয়।
হযরত আলি এবং তাঁর পরবর্তী জ্ঞানতাপস ইমামগণ ততদিনে সবাই চলে গেছেন। তাঁদের কথায় কোরানের এক রকম ব্যাখ্যা হয়েই যেত। কিন্তু তা রাজকীয় প্রয়োজন পূরণ করত না। বরং তা রাজতান্ত্রিক কাঠামোর বিপক্ষে যেত। আব্বাসি খিলাফতি রাজতন্ত্রের আমলে যখন আহলে বাইতের কেউ প্রকাশ্যে থাকলেন না (আসলে তাঁদের উল্লেখযোগ্য সকলেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন) তখন অনেক সংখ্যক বুদ্ধিমান পণ্ডিত ব্যক্তি নিজেদের ইমাম পরিচয়ে (ফেকার ইমাম, হাদিসের ইমাম, তাফসিরের ইমাম) রাজতন্ত্রের গোপন সুবিধা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠেন। আহলে বাইতের অনুপস্থিতিতে রাজসুবিধাভোগী আলেমগণের নিকট নিজেদের সুবিধা মতন কিচ্ছা কাহিনী নির্ভর তাফসির করার সুযোগ এসে গেল। আব্বাসী যুগ তাই কোরান তাফসিরের স্বর্ণযুগ!
কয়েকটি বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ
লিখিত পূর্ণাঙ্গ তাফসির গ্রন্থের মধ্যে প্রাচীনতম হলো মুফাসসির মাকাতিল বিন সুলাইমান (মৃ. ১৫০ হিজরি) রচিত তাফসীর। যদিও সেটি বর্তমানে সেভাবে পাওয়া যায় না। তবে নিম্নে কয়েকটি সহজলভ্য বিখ্যাত তাফসিরের নাম ও রচনাকাল এবং তাফসির বিষয়ে সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত মতামত প্রদত্ত হলো:
১. তাফসিরে তাবারি। রচনাকাল: ২৭০ হিজরি (৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দ)। লেখক : ইমাম ইবনে জারির আত-তাবারি। গুরুত্ব: এটি ইসলামের ইতিহাসের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তাফসিরগুলোর একটি। বাংলায় অনুবাদ আছে।
২. তাফসিরে কাশশাফ। রচনাকাল: দ্বাদশ শতাব্দী (আনুমানিক ১১৩২-১১৩৪ খ্রিষ্টাব্দ / ৫২৮ হিজরি)। লেখক : জামাখশারী। গুরুত্ব: কুরআনের অলংকার শাস্ত্র ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য এটি অত্যন্ত বিখ্যাত। বাংলাদেশের মাদ্রাসার পাঠ্যতালিকাভুক্ত।
৩. তাফসিরে কবির (মাফাতিহুল গাইব)। রচনাকাল: দ্বাদশ শতাব্দী (১২১০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে / ৬০৬ হিজরি)। লেখক: ফখরুদ্দীন আল-রাযি। গুরুত্ব: এটি যুক্তিশাস্ত্র, দর্শন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যার জন্য এক অনন্য গ্রন্থ। ইমাম রাযির মৃত্যুর পর তাঁর ছাত্ররা এর অবশিষ্টাংশ সম্পন্ন করেন।
৪. তাফসিরে বায়যাভি (আনোয়ারুত তানযিল)। রচনাকাল: ত্রয়োদশ শতাব্দী (আনুমানিক ১২৮৬ খ্রিষ্টাব্দ / ৬৮৫ হিজরি)। লেখক: কাজী নাসিরুদ্দিন আবদুল্লাহ আল-বায়যাভি। গুরুত্ব: সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ ব্যাখ্যার কারণে এটি বিভিন্ন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের মাদ্রাসার পাঠ্যতালিকাভুক্ত।
৫. তাফসিরে ইবনে কাছীর। রচনাকাল: চতুর্দশ শতাব্দী (আনুমানিক ১৩৭০ খ্রিষ্টাব্দ / ৭৭৪ হিজরি)। লেখক: হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনে কাছির। গুরুত্ব: হাদীসের আলোকে কেরান বিশ্লেষণের (তাফসির বিল-মা’ছুর) ক্ষেত্রে এটি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয়। বাংলায় পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ আছে।
৬. তাফসিরে জালালাইন। রচনাকাল: ১৫০৫ খ্রিষ্টাব্দ (৯১১ হিজরি)। লেখক: জালালুদ্দিন মহল্লি। (রচনাকাল ১৪৫৯ খ্রি.) এবং সমাপ্তকারী জালালুদ্দিন সুয়ূতি। গুরুত্ব: এটি মাত্র এক খণ্ডের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও বহুল পঠিত একটি তাফসীর। বাংলাদেশের মাদ্রাসার পাঠ্যতালিকাভুক্ত।
৭. বয়ানুল কুরআন। প্রথম প্রকাশকাল: ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ (১৩২৬ হিজরি)। লেখক: মাওলানা আশরাফ আলি থানভি। গুরুত্ব: এটি উপমহাদেশে উর্দু ভাষায় রচিত অন্যতম সুসংগত এবং নির্ভরযোগ্য তাফসির, যা ১২ খণ্ডে দিল্লি থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়।
৮. তাফসিরে মাজহারি। লেখক: কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথি। মূল ভাষা: আরবি। রচনাকাল/প্রকাশকাল: এটি ১২০৮ হিজরি (১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দ) সালে রচনা সম্পন্ন হয়। লেখক প্রায় ১৪ বছর ধরে এটি রচনা করেন। এটি বাংলায় অনূদিত হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এটি সম্পূর্ণ ১৩ খণ্ডে বাংলায় অনুবাদ ও প্রকাশ করেছে।
৯. তাফসিরে ফি জিলালিল কোরান। লেখক : সৈয়দ কুতুব (মিশরীয় ইসলামি চিন্তাবিদ)। মূল ভাষা: আরবি। রচনাকাল/ প্রকাশকাল: এটি ১৯৫১ থেকে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়। লেখক তাঁর কারাজীবনের দীর্ঘ সময় এই তাফসিরটি লেখেন। এটি বাংলায় অনূদিত হয়েছে। বাংলাদেশে এটি সম্পূর্ণ ২২টি খণ্ডে (সহজ পাঠের জন্য ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত করে) বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।
১০. মাআরেফুল কোরান। লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফী (পাকিস্তানের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি)। মূল ভাষা: উর্দু। রচনাকাল/ প্রকাশকাল: এটি ১৯৫৪ থেকে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সম্পন্ন হয়। প্রথমে রেডিও পাকিস্তানের একটি ধারাবাহিক আলোচনা হিসেবে শুরু হয়ে পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে রূপ নেয়। এটি বাংলায় অনূদিত হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের অনুবাদে এটি ৮ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এছাড়া সৌদি আরব সরকারের অর্থায়নে এই তাফসীরের একটি সংক্ষিপ্ত ১ খণ্ডের সংস্করণও বাংলায় বিতরণ করা হয়েছে।
১১. তাফহিমুল কোরান। লেখক : সৈয়দ আবুল আ’লা মওদুদী। মূল ভাষা: উর্দু। রচনাকাল/ প্রকাশকাল: এটি রচনা করতে লেখকের দীর্ঘ ৩০ বছর সময় লেগেছিল। তিনি ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে এটি লেখা শুরু করেন এবং ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে এর সমাপ্তি ঘটে। এটি বাংলায় অনূদিত হয়েছে, সম্পূর্ণ ১৯ খণ্ডে (এবং পরবর্তীতে সংক্ষিপ্ত ১৯ খণ্ড বা ৩ খণ্ডের সংকলনে) এটি আধুনিক বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সহজলভ্য।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাফসির লেখার ও ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় তা অনুবাদের এ ধারা চলছেই।
তাফসির বা কোরান ব্যাখ্যার দর্শন
কোরানের তাফসির লেখার জন্য একজন ব্যক্তির অনেক যোগ্যতা থাকা দরকার বলে মনে করা হয়। যেমন আরবি ভাষা, তার অভিধান-ব্যকরণ, তাজবিদ-কেরাত বা পাঠনীতি, বালাগাত বা বাচনভঙ্গি, হাদিসশাস্ত্র, ফেকাশাস্ত্র, হাদিস-ফেকার উসুল বা মূলনীতি, ইতিহাস, রিজাল শাস্ত্র বা জীবন চরিত, শানে নজুল, ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ, নাসেখ-মানসুখ বা কোরানের কোন্ আয়াত বাতিল বা বাতিলকারী, উসুলে তাফসির ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরি। পূবসূরীদের তাফসির করার নীতিমালা পরিপালনও কর্তব্য। সুতরাং তাফসির করার ক্ষেত্রে এভাবে একটা বৃত্ত তৈরি হয়। সে বৃত্ত থেকে বের হওয়ার কারো কোনো সুযোগ থাকবে না। ফলে সংখ্যায় যত তাফসির গ্রন্থ লেখা হোক না কেন তা ঘুরে ফিরে মূলত একই। শুধু মুফাসসিরের তালিকায় নতুন একজনের অন্তর্ভুক্তি ঘটে।
এমন অবস্থায় শাখা-প্রশাখায় বিভক্তিও বাড়তে থাকে। নতুন নতুন গোষ্ঠীও গড়ে ওঠে। এভাবে মতভেদের দুয়ার খুলে যাওয়ায় মানুষ বিভিন্ন মাজহাব দল ফেরকা ইত্যাদিতে বিভক্ত হতে থাকে। যারা পরস্পর ঝগড়া-বিবাদেও লিপ্ত হয়। এক কোরান নিয়ে বহু দল-মত তৈরি হচ্ছে এবং প্রত্যেক মতের পক্ষে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ সরবরাহ করা হচ্ছে, কিন্তু ‘ইসলামি খেলাফত’ শুধু তখন মুসকি হেসে দেখে চলেছে মাত্র। মানুষ যতই নিজেদের দল-মত নিয়ে বিভক্ত হয় ততই রাজাদের সুবিধা হয়। নিজেরা বিবাদ করলে রাজার বিরুদ্ধে আর কেউ কথা বলার সুযোগ পায় না।
এই যে তাফসিরশাস্ত্রের বিশাল জগত তৈরি হয়েছে বিশেষ এক চেতনা বা নীতিমালার আলোকে সেখানে কিন্তু আধ্যাত্মিক কোনো যোগ্যতা কিংবা আহলে বাইতের পরামর্শ মেনে চলাকে কখনোও গুরুত্ব দেওয়া হয় নি। বরং তাঁদের চেতনাকে কার্যত এড়িয়ে যাওয়াই হয়েছে। ফলে তাফসির শাস্ত্র বাস্তবে আধ্যাত্মিকতা বিহীন এক কিচ্ছা কাহিনী-প্রধান কিংবা অনুশাসনিক জীবন বিধান হয়ে ওঠে।
খুব অদ্ভুৎ ব্যাপার, এতসব তাফসিরের আড়ালেই কোরানের দর্শন পরিত্যক্ত হয়ে যায়, কেউ বুঝেই উঠতে পারেন না!
তাফসির এবং তাবিল
ইতোমধ্যে কয়েক হাজার সম্পূর্ণ বা আংশিক তাফসির লেখা হয়েছে। যা পূর্বোক্ত নীতিমালার আলোকে সম্পন্ন হয়েছে। তবে তাবিলের (تاويل) উপর খুব বেশি কাজ হয় নি। কোরানের শব্দের প্রকাশ্য অর্থ থেকে তার মাঝে লুক্কায়িত সম্ভাবনাময় মর্মার্থ গ্রহণ করাই তাবিলের বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে শুধু ভাষা-সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও তাবিল করা যায়, কিংবা সুফি তথা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তা আরো সফলভাবে করা যায়। আহলে বাইতের সাথে জড়িত থেকে লব্ধ জ্ঞান এ কাজে খুব তাৎপর্যপূর্ণ সহায়ক হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক সুফি সাধনাও এ ক্ষেত্রে জরুরি বটে। কিন্তু কোরান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তা তেমন হয় নি বললেই চলে। গাজ্জালি (১০৫৮-১১১১ খৃ.) কিংবা জালালুদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩ খৃ.) ধর্মতত্ত্বে খুব উঁচু যোগ্যতা রাখতেন। তাঁরাও সরাসরি কোরানের তাফসির বা তাবিল নিয়ে কাজ করেন নি। অনেক বিখ্যাত অলি-দরবেশ ছিলেন, যাঁরা কোরানের প্রকৃত সমঝদার ছিলেন, তাঁরাও এ বিষয়ে লিখিত কোনো কাজ করেন নি। হয়তো তাঁরা ভক্ত-শিষ্যদের মাঝে বাচনিক প্রক্রিয়ায় কোরান থেকে আলোচনা করতেন কিন্তু তা লিপিবদ্ধ হয় নি। কিংবা কিছু কাজ করা হলেও বিরোধীপক্ষের রোষানলে পড়ে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে!
কোরানি ভাষার মূলক অর্থ গ্রহণ করাই কোরান বুঝার জন্য অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হতে পারে। মূলকের মাঝে থাকা তার রূপক অর্থ না-মানলে তাৎপর্য অনুধাবনে পাঠক ব্যর্থ হবেন। কিন্তু প্রচলিত নীতিমালার আলোকে এমন কাজে অংশগ্রহণ সম্ভব হয় না। সুতরাং কোরানের অর্থপূর্ণ তাৎপর্য নির্ধারণে মুফাসসিরগণ প্রায় সময় ব্যর্থ হয়ে পড়েন। যদিও প্রথাগতভাবে আলেম সমাজ তা মানতে রাজি নন।
তাফসির যা হওয়ার তা হয়েছে, এখন পাঠককুলকে কোরানের সত্যিকার মর্মার্থ অনুধাবনে সহায়তা করার জন্য আহলে বাইতের সহায়তায় তাবিল ভিত্তিক ব্যাখ্যাগ্রন্থ জরুরি হয়ে পড়েছে।
চলবে…


















