জাগতিক না পারমার্থিক? – ৩

পারমার্থিক

বাস্তব আর সত্য –ইহাদের মাঝে একটি অঘোষিত বিবাদ রহিয়াছে বলিতে হয়। জগতে যত বাস্তব বিষয় রহিয়াছে তাহার সকলই সত্য বলিয়া প্রতীতি হয় না। অবশ্য উচ্চঅধিকারীগণের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্ট হইলেও নিম্নঅধিকারীগণের নিকট তাহা বোধগম্য হইতে চাহে না। বিবাদটি এইখানেই লুকাইয়া থাকে।

সূর্য পূর্ব দিগন্তে উদিত হইয়া থাকে বলিয়া যে বাস্তব দৃশ্য পৃথিবীর সকলেই নিশ্চিত দেখিয়া থাকি, তাহা কি সত্য বলিয়া স্বীকার করা যায়? উচ্চঅধিকারীগণ এমন তথ্য অধিকার করিয়াছেন যে, পৃথিবীর নিজ অক্ষরেখায় আবর্তনের ফলে সূর্য পূর্বদিগন্তে উদিত হইয়া ক্রমান্বয়ে পশ্চিম গগণে আসিয়া ধীরে ধীরে অস্তমিত হয় বলিয়া প্রতিভাত হইয়া থাকে মাত্র, বাস্তবের এই দৃশ্য পৃথিবীবাসী সকলেই নিত্য প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন, অথচ প্রত্যক্ষ-বাস্তব হইয়াও ইহা সত্য নহে। অর্থাৎ সুর্য নিজে উদিতও হয় না, অস্তও যায় না। বরং যাহারা চক্ষু দ্বারা প্রত্যক্ষ করেন, তাহারা জ্ঞান দ্বারা সত্যায়ন করিতে পারেন না বলিয়াই অনুরূপ ধারণা প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে। প্রতিদিনকার এই জ্বলন্ত বিভ্রম কি প্রকৃতির সৃষ্টি নাকি মানুষের অজ্ঞতা?

মানুষের অজ্ঞতা কি প্রকৃতির সৃষ্টি নাকি মানুষের দায়িত্বহীনতা? দায়িত্বহীন মানুষ তার অজ্ঞতাকে লালন করিয়া থাকে বটে, কিন্তু তার মাঝে বহমান অজ্ঞতার উৎপত্তি কীভাবে হইলো? জন্মের পর পরই মানুষ নানাবিধ অসহায়ত্বের শিকার হইয়া থাকে। যাহার মধ্যে মস্তিষ্কের স্মৃতিভাণ্ডার শুন্য থাকা অন্যতম। জন্মের পরের এই শুন্য স্মৃতিভাণ্ডার হইতেই অজ্ঞতা প্রকাশ পাইয়া থাকে। অজ্ঞতা হইলো সেই অসহায়ত্বের একটা অংশ। এই অসহায়ত্ব এবং অজ্ঞতাই তাকে একটা সম্ভাবনার দ্বারে দাঁড় করাইয়া রাখে। ভবিষ্যতে সে কীরূপ পরিগ্রহ করিবে তাহা অস্পষ্ট হইয়া বাস্তব সামাজিক জীবনের ভিত্তি রচনা করিয়া দেয়। যেন সে সমাজ হইতে প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ নিজের মাঝে যুক্ত করিয়া নেয়। এই বাস্তব কাঠামো তাকে বাধ্য করিয়া রাখে যাহাতে তাহার সত্যবোধ জাগিবে নাকি সাধারণ বাস্তবতায় জীবন অতিবাহিত করিবে তাহা আবিষ্কার করিতে তৎপর হইতে পারে। কোরান বর্ণিত ‘উলিল আমর’ তথা জ্ঞানী-গুণীজনের তত্ত্বাবধানের যাপিত জীবনে বিষয়টি সহজেই সুরাহা প্রাপ্ত হইতে পারে বলিয়া বোদ্ধা কোরান পাঠক দাবি করিয়া থাকেন।

দেখা যায়, কোরান মজিদে দৃঢ় প্রত্যয় বা একিন বিষয়ে ৩ রকম ধারণা ব্যক্ত করা হইয়াছে। তাহা যথাক্রমে ‘চাক্ষুস প্রত্যয়’ (আইনুল একিন- তাকাছুর ১০২:৭), ‘জ্ঞানের প্রত্যয়’ (এলমুল একিন- তাকাছুর ১০২: ৫) আর ‘যথার্থ প্রত্যয়’ (হাক্কুল একিন- ওয়াকেয়া ৫৬: ৯৫, হাক্কা ৬৯: ৫১)। নিম্নঅধিকারীগণ চাক্ষুস প্রত্যয় লাভ করিতে পারিলেও জ্ঞানের প্রত্যয় ও যথার্থ প্রত্যয় শুধু মাত্র উচ্চঅধিকারীগণের জন্য নির্ধারিত। প্রকৃতি মানুষকে যে সকল সাধারণ গুণাবলি প্রদান করিয়াছে তাহার অতিরিক্ত অর্জনে যাঁহারা সচেষ্ট শুধুমাত্র তাঁহারাই উচ্চঅধিকার লাভে সক্ষম বলিয়া প্রমাণিত। সাধারণ প্রকৃতিসম্পন্ন মানুষকে কিছু অসাধারণ চেতনা বা কর্মে নিযুক্ত থাকিয়াই এমন বৈশিষ্ট্যাবলি অধিকার করিতে হয়, যাহা একান্ত তাঁহারই। সুতরাং এইরূপ ব্যক্তিমানুষের সংখ্যা প্রায়শ স্বল্পই হইয়া থাকে। বাস্তবে অনেককে যেইরূপ দেখায় সত্যিকার অর্থে তাহারা তাহা নন। বাহ্যিক বেশভূষা দেখিয়া ব্যক্তি বা বস্তুর চরিত্র নির্ণয় দূরহ ব্যাপার বটে। বলিতে হয়, সকল চাক্ষুস সত্য যথার্থ সত্য হয় না। একইভাবে, সকল যথার্থ সত্য চাক্ষুস সত্য বা বাস্তব হইবেই –এমন নহে। সত্যের সাথে বাস্তবতার কিংবা বাস্তবতার সাথে সত্যের একটা দৃশ্যমান সংঘাত যেন চিরন্তন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁহার মৃত্যুর মাস দুয়েক পূর্বে একটি প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন, সেটির নাম ‘সত্য ও বাস্তব’। উহাতে কবিবর আমাদের পূর্বোল্লিখিত ধারণাই অভিব্যক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার মতন এত বড় একজন মানুষ তাঁহার সমগ্রজীবনের উপলব্ধিকে ভাষায় প্রকাশ করিয়াছেন, অকপটে বলিয়াছেন– সত্য আর বাস্তব এক নহে। অবশ্য ইহা সাহিত্য-শিল্প বিষয়ে বলা হইলেও নানাবিধ ক্ষেত্রেও ঐ তত্ত্ব কার্যকরি বটে।

পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে কিন্তু বাস্তব আর সত্য ততটা পার্থক্যবহ নহে। সুতরাং সত্যের চেয়ে টাকা বড়, ক্ষমতার বাস্তবতা বড়। এমনকি সত্যের চেয়ে ব্যক্তির বাস্তবতা বড়। ফলে সকলের ভোটের মান সমান। তাহাই ভোটের গোপনীয়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা হইয়াছে। কোন ভোট কে প্রদান করিলেন তাহা যেন উপলব্ধ না-হয় তাহাই রক্ষা করিবার তরে গোপন ব্যালট ব্যবস্থা। একজন গুণী বা জ্ঞানী কিংবা উচ্চঅধিকারী মানুষের ভোট আর একজন অতি সাধারণ নিম্নঅধিকারী ব্যক্তির ভোট কার্যত সমান বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। যাঁহাকে ভোটে নিবাচন করা হইলো তাঁহাকে তাৎক্ষণিক জবাব দিহিতার পরিবর্তে একটা বিশেষ সময়কাল পর্যন্ত স্বাধীনতা দিয়া নানান রকম দায়মুক্তির সুবিধা প্রদান করিয়া নিজেরাও তাঁহার কর্মের দায়মুক্তি নিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায়, কারণ, কে তাহাকে ভোট দিয়াছেন তাহার কোন প্রমাণ নাই। ভাবিয়া দেখিলে বুঝিতে পারিব যে, আমাদের দেশে যাাঁহারা কথিত গণতান্ত্রিক গোপন ভোটে নির্বাচিত হইয়া লুটপাটসহ বিস্তর অপকর্ম সাধন করিয়া থাকেন তাহাদের ঐ সকল অপকর্মের দায় কি ঐ সকল ভোটারের নাহি– যাহারা  সেই সব লুটেরা নেতাকে নির্বাচিত করেন? সত্য ইহাই যে, ভোটারের দায় আছে। কিন্তু বাস্তবতা ইহাই যে, ভোটারগণ দায়মুক্ত! এবং শেষ পর্যন্ত ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ পরিত্যক্ত!

ধর্মীয় পরিমণ্ডলে বিষয়টি আরও রুঢ় রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। মহামতি ইমাম হোসাইন সত্য হইলেও তাঁহার সমর্থকগণ অতিশয় অল্প, বিপরীতে যাহারা সত্য পরিপন্থি তাহারা বিশাল সংখ্যায় জগৎ দখল করিয়া রাখিয়াছে। কারবালার প্রান্তরে হোসাইনের মস্তক কর্তন করিয়াই সেই বিশাল এজিদ বাহিনী ক্ষান্ত হন নাই, বহু সংখ্যক ঘোড়া ছুটাইয়া ঐ সকল ঘোড়ার খুরে তাঁহার পবিত্র দেহখানিকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়া মাটিতে মিশাইয়া দিয়াছেন। যে হোসাইনকে হজরত মুহাম্মদ ‘আলে-মুহাম্মদ’ ঘোষণা করিয়াছেন (দ্রষ্টব্য : বুখারি ৩য় খণ্ড, হাদিস নং ১৩৯৮, পৃ. ৫২, ইফাবা) সেই তাঁহাকেই নজিরবিহিন নির্মম পাশবিকতায় নিহত করিবার পরক্ষণেই নামাজ পড়িয়া সেই ‘আলে-মুহাম্মদ’ এঁর নামে দরুদ পড়িয়াছেন। আজও মুসলিম সমাজে সকলেই নামাজে বসিয়া ‘আলে-মুহাম্মদের’ জন্য দরুদ পড়েন কিন্তু ‘আলে-মুহাম্মদ’ এঁর সত্য বুঝিয়া তাঁহাকে ভক্তি করিতে পারেন না। আহা! কি বাস্তবতা!

উচ্চঅধিকারীগণ বাস্তব আর সত্যের মাঝে ঘটিয়া চলা এমন জটিলতার নিরসন করিতে পারিলেও নিম্নঅধিকারীগণ তাহাতে নিজেরাই জটিল বিবাদে জড়াইয়া পড়েন। ইতিহাস শিল্প সাহিত্য দর্শন বিজ্ঞান ধর্ম –কোন ক্ষেত্রই এই বিবাদ থেকে নিষ্কৃতি পায় না।

জগতে কী আজব লীলা চলিতেছে– সত্য হইয়াও বাস্তব হয় না আবার বাস্তব হইয়াও সত্য হয় না!

পুষ্পিতা

২৩ জুন ২০২৬     

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

নবির দেশে 

কোভিডের নিষেধাজ্ঞার পর কাবার আঙিনা উন্মুক্ত হয়েছে বেশিদিন হয়নি তখনো। মানুষের উপচে পড়া ভিড়! তার ওপর ডিসেম্বর মাস, আরব-আকাশে সূর্যতাপ অতোটা নির্দয় থাকে না।...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ২)

সামতেন মারা যাওয়ার পরে আমরা তিব্বতের রাজধানী লাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ঘোড়ায় চড়ে তিন মাসের দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। সেখান...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

কহিতে পারিব কি? – ২

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জীবনই অবদমনের একেকটা গোডাউন! ব্যক্তিগত সংস্কার, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বৈশ্বিক বিভিন্ন চাপে বিকশিত হওয়া দূরে থাক, জীবন মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে না...
default
পারমার্থিক

জাগতিক না পারমার্থিক? – ২

ইসলাম ধর্মে জাগতিকতা আর পারমার্থিকতা অর্থাৎ ইহকালীন কর্মযজ্ঞ  আর পরকালীন প্রাপ্তব্য-বিভূতি --এতদুভয়ের মধ্যে বিশেষ কোন তফাৎ কিংবা দূরত্ব নাহি। উপযুক্ত ভক্তগণ সম্যকরূপে সাধনা করিয়া...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক
1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow