বইয়ের নাম: নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা (অতীশ দীপংকরের পৃথিবী)
লেখক: সন্মাত্রানন্দ
বইটির তথ্য: https://baatighar.com/shop/9789849892885-95084
প্রকাশক: ধানসিঁড়ি ISBN: 9789849892885
প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ২০১৭
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩৬০
ভাষা: বাংলা
আজকের আলোচিত বইয়ের নাম, নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা (অতীশ দীপংকরের পৃথিবী)। বইটির মূল আকর্ষণ, অতীশে দীপঙ্করের জীবন এবং কিভাবে দশম এবং একাদশ শতাব্দীতে একজন বাঙ্গালী হয়ে উঠলেন নালন্দার আচার্য্য এবং তিব্বতের বিখ্যাত ধর্মগুরু।
গ্রামের নাম বজ্রযোগিনী, বিক্রমপুরের চন্দ্রবংশের নৃপতি কল্যাণশ্রীর মধ্যমপুত্র রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ, প্রথম জীবনে, তন্ত্রের পথে সাধনা করলেও পরে গুরু অদ্বয়বজ্রের নির্দেশে শ্রমন্যের পথে আচার্য্য শীলরক্ষিতের কাছে দীক্ষা নেন। তখন তার নাম হয় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। তারপর, সুবর্নদ্বীপে (সুমাত্রায়) পাড়ি জমান তার মহাযানের গুরু ধর্মকীর্তির কাছে। সুদীর্ঘ ২০ বছর সাধনার পর মহাযান বৌদ্ধিয় মতকে নিয়ে আসেন লোক সম্মুখে। সময়ের আবর্তে তিনি হন নালন্দার আচার্য্য। যখন তার বয়স ৬০, তখন তিব্বতের রাজার আমন্ত্রনে পাড়ি দেন তিব্বতে। সেই তিব্বত যাত্রাও বেশ সঙ্গিন এবং রোমাঞ্চকর, এবং এই তিব্বতকে তিনি করে তুলেন বুদ্ধজ্ঞান চর্চার মূল জ্ঞান কেন্দ্র। তিব্বত দীপঙ্কর শ্রিজ্ঞানকে সম্বোধন করে “জোবোজে” বা, “জোবো ছেনপো” (মহাপ্রভু বা মহামান্য আর্য) হিসেবে। পরে সেখানেই দেহ রাখেন তিনি।
বইটিতে তিনটি ঘটনা সমান্তরালে চলে। একটা বর্তমান সময়, যেখানে অতীশের কথা এবং কাজ উঠে আসে, একটা অতীশের ঠিক ২০০ বছর পর বাংলায় বুদ্ধ ও তন্ত্র সাধনার মেল বন্ধন আর বুদ্ধমতে তন্ত্রের যোগসাজে এবং অতীশের সময়কাল এবং তার জীবন যাত্রা।
তন্ত্রের জন্ম যে এই বাংলায় তা এখানে স্পষ্ট রূপে ধরা দেয়। প্রকৃতি কিম্বা, মাতৃ সাধনা এই অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামে এবং আনাচে কানাচে যে দেখা যায় তা এখানে খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরা। তখনকার সমাজ ব্যাবস্থা যে, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিকতার মেশেলে তৈরী তা ইতিহাসও বলে কারন, নিতিশ সেনগুপ্ত বা, ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদারের[1] লিখনিতে পাওয়া যায়, আতীশের সময়কাল, পাল শাসন আমলে এবং পাল সাম্রাজ্যে ধর্মীয় গোলযোগ শুরুর দিকে খুবই কম। পালরা নিজেরা বুদ্ধ মতাদর্শী হলেও তারা আসলে সকল ধর্মমতকেই গ্রাহ্যতা দিতেন। এই সময় বাংলায় প্রচুর বুদ্ধ বিহার ও শিক্ষা নিবাস দেখা যায়। তাছারাও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এই সময় জগৎবিখ্যাত।
তাই অতিশের এই জীবন শৈলীকে তখনকার সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সুগম বলাই চলে। যে কারনে, তিনি মহাযান বুদ্ধমতকে মানবীয় জীবনের সকল স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন এবং নালন্দাতে যে এই চর্চাকে তিনি অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছেন, এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। বোধের পরিপূর্ণতা যে একটি অবস্থা তা অতিশকে লক্ষ্য করলেই দেখা যায়।
বইটির শেষভাগে অতীশ কিভাবে নির্বান প্রাপ্ত হচ্ছেন তাও একটা সুন্দর ঘটনার মাধ্যমে উল্লেখ করা এবং লেখক পরে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন পাঠককে, যে সত্য আসলে কি?
বইটিতে কুন্ডলীনীর কথা আছে যা শাক্ত ও শৈব মতের অন্তর্গত, এবং মা তারা’র উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি দশ মহাবিদ্যার[2] দ্বিতীয় মহাবিদ্যা। কুন্ডলীনী সাধনা তন্ত্রের এক বিশেষ অধ্যায়কে নির্দেশ করে, যেখানে বলা হয়, দেহের নিম্নভাগে যে নাড়ি রয়েছে (মেরুদণ্ডের শেষপ্রান্তে) তাকে বলা হয় সুষূম্না, এখানেই কুন্ডলীনী নামক শক্তির আধার, সাধনা ও ধ্যান ও সম্যক আহারের মাধ্যেমে একে উপরের দিকে ধাবিত করতে হয়। এই ধরনের সাধনা পদ্ধতি শুধু তন্ত্রে নয়, নানা সুফি দর্শনেও (বাংলায় যেসব সুফি তরিকা রয়েছে) দেখা যায়। এখানে দেহকে ৬ টি চক্রে ভাগ করা হয়। মূলাধার চক্র (Muladhara): এটি মেরুদণ্ডের একদম শেষ প্রান্তে অবস্থিত, যা আমাদের মূল বা ভিত্তি বোঝায়। স্বাধিষ্ঠান চক্র (Svadhishthana): এটি তলপেট বা অণ্ডাশয় অঞ্চলে অবস্থিত।মণিপুর চক্র (Manipura): এটি নাভি বা সৌর স্নায়ুজাল অঞ্চলে অবস্থিত।অনাহত চক্র (Anahata): এটি বুক বা হৃদয় এলাকায় অবস্থিত। বিশুদ্ধ চক্র (Vishuddha): এটি গলা বা কণ্ঠের কাছে অবস্থিত।আজ্ঞা চক্র (Ajna): এটি দুই চোখের মাঝখানে ভ্রুর নিচে অবস্থিত তৃতীয় নয়ন।সহস্রার চক্র (Sahasrara): এটি মাথার একদম ওপরের অংশে অবস্থিত। কুন্ডলীনীকে মূলাধার থেকে সহস্রারের দিকে নিয়ে যাওয়াই এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য। বইটিতে এই বিষয়টি নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
বইটি পাঠকে নানা অভিজ্ঞতার মাঝে দিয়ে নিয়ে যাবে।
[1] Land of Two Rivers by Nitish Sengupta and An Advanced History of India by
R. C. Majumdar
[2] রুদ্রমালা তন্ত্র – মা আদ্যাশক্তির (পার্বতীর) ১০ রুপ/অবতার















