সফরনামা ।। শিল্পী খন্দকার নাছির আহাম্মদ

পারমার্থিক

আমার শিল্পচর্চার শুরু ছোটোবেলা থেকে ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে। পরবর্তীতে স্কাল্পচারের লে-আউট (খসড়া) তৈরির অংশ হিসেবেও ড্রয়িং আমার একটা ভাষা হয়ে ওঠে। কার্ভিং এর কাজের ফাঁকে ঔষধের প্যাডে কিংবা হাতের কাছে যে স্কেচবুক পেয়েছি তাতেই আঁকতে শুরু করেছি। শুরুতে অনেকটাই অন্যমনস্কতা থেকে ড্রয়িং করতাম। হয়তো একটি পাতা আঁকলাম তারপর পাতা থেকে ফুল, ফুল থেকে ফল, ফল থেকে হয়তো মানুষের মুখ বা মাথা এরকম আরকি। অনেকটা উদ্দ্যেশ্যহীনভাবে আঁকতে আঁকতে খেয়াল করলাম ড্রয়িং নিজেই নিজের ভিতরে ন্যারেটিভ বা গল্প তৈরি করেছে। ২০১৫ সাল থেকে এই ড্রয়িংগুলোর ব্যাপারে আরও সচেতন হই। সেসময় আমি প্রচুর বাংলা গান বিশেষ করে ফকিরি বা ভাবগান শুনতাম। তো স্বাভাবিকভাবেই গানের বিভিন্ন প্রসঙ্গ ছবিতে চলে আসতো। একটা সময় গান শোনার পাশাপাশি আমি গানের লিরিক্সও পড়তে শুরু করি এবং ছবির মধ্যে সেগুলোর প্রভাব মেলাতে পারতাম। আমার ছবির স্তরগুলো মূলত সেখান থেকেই বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। যেখানে প্রতিটি রেখা, প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি চরিত্র আমাকে সম্ভাবনার একেকটা নতুন দরজা খুলে দেয়।

মূলত চারুকলায় লেখাপড়া শেষ করে মেইনস্ট্রিম আর্ট প্র্যাকটিসে প্রবেশ করার পর আমার মনে হয়েছিলো, এখানকার শিল্পভাষা সাধারণ মানুষের সাথে ততটা সংযোগ তৈরি করতে পারে না। “ছবির হাট”–এর অভিজ্ঞতা আমাকে এই উপলব্ধি দিয়েছিলো যে, মানুষ যেভাবে সাহিত্য বা গানের সাথে সংযুক্ত, দৃশ্যশিল্পের সাথে সেই মাত্রার সংযোগ এখনো তৈরি হয়নি। এরকম একটা ভাবনা থেকেই আমি মানুষের সাথে সংযোগের ভাষা খুঁজতে থাকি এবং বাংলা গানকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি। বাংলা গানের ঐতিহ্য আমার কাছে উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক কাঠামোর বাইরে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত জ্ঞানভান্ডার মনে হয়, যেখানে এই ভূখণ্ডের দর্শন-চিন্তা, অনুভব ও জীবনবোধ সঞ্চিত আছে।

আমার পারিবারিক শেকড় মাজার, দরবার ও ফকিরি সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। যদিও চারুকলায় পড়ার সময় আমি আধুনিক দর্শন কিংবা বলা যায় কিছুটা নাস্তিক্যবাদী চিন্তা কাঠামোর মধ্যে ছিলাম। নিজের এই উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে ততটা সচেতন ছিলাম না। কিন্তু পরবর্তীতে কতগুলো বাস্তব উপলব্ধি থেকে আমি আবার ফিরে আসি। আমার নানা জালালুদ্দিন রুমি’র অনুরাগী ছিলেন। বাংলা ও ফারসি সাহিত্যেও পারদর্শী ছিলেন তিনি। এই উত্তরাধিকার আমাকে রুমি, শামস তাবরিজ, মনসুর হাল্লাজদের নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে। আমি তাদেরকে শুধু সাধক হিসেবে নয়, বরং সামাজিক রূপান্তরের চিন্তক হিসেবেও দেখি। আমার কাছে এই প্রত্যাবর্তন কেবল ভাব বা আবেগের জায়গা নয়, বরং এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও। নিজেকে জানা, সমাজকে বোঝা, ইতিহাসকে পুনরায় পাঠ করা—এই সবকিছুই এই চিন্তা প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত।

এই অঞ্চলের পুঁথি সাহিত্য, ভাবগান, উঠান সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য—এসবের ভিতরে ছিল সম্পর্ক, কল্পনা, কান্ডজ্ঞান ও সহাবস্থানের শিক্ষা। ঔপনিবেশিক শিক্ষার ধারায় আমরা যে ধরনের জ্ঞান চর্চার ধারায় প্রবেশ করেছি সেখানে এই স্থানিক বা লোকজ জ্ঞানকে অধ্যয়নের অংশ করা হয়নি; বরং পরিত্যাগ করা হয়েছে। ফলে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়েছে, মানুষে মানুষে সহজ সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে। একটা বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, আমি পশ্চিমা আধুনিকতার বিরোধী নই, ঐ চিন্তার সবকিছুকে খারিজও করতে চাই না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি পশ্চিমা আধুনিকতা এবং আমাদের লোকজ জ্ঞানের সমন্বয় করা প্রয়োজন, এবং সেটা সম্ভব কারণ লোকজ জ্ঞান এখনো পরিপূর্ণভাবে জীবিত আছে বাংলা গান, সাহিত্য এবং গণ মানুষের সহজ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ভিতরে।

আমার কাজের মোটিফগুলো কোনো একক জায়গা থেকে আসে না। যেমন আমার কাজে ঘোড়ার মোটিফ বারবার ফিরে আসে। ঘোড়া আমার কাছে গতি, তেজ, অদম্য ইচ্ছা, আধ্যাত্মিক যাত্রা ও ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতীক। লালনের গান, ফররুখ আহমেদের কবিতা, আল মাহমুদের চিত্রকল্প, সুফি ঐতিহ্য, মিনিয়েচার পেইন্টিং, বোরাকের মিথ, এমনকি কারবালার স্মৃতি—সবকিছু মিলিয়ে ঘোড়া এক বহুমাত্রিক চিহ্ন আমার কাছে। তেমনি নারী-পুরুষ, প্রকৃতি এবং মানুষের চিন্তার নানা স্তরকে আমি এঁকে গিয়েছি। কখনো সচেতনভাবে আবার কখনো অবচেতনে যা এসেছে তাকেই ধরতে চেয়েছি, আঁকতে চেয়েছি। আমি এখনো কোনো চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছাইনি, বরং একটা অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। ছবির রেখাগুলো আমার স্মৃতি, বাংলা গান, এ অঞ্চলের ইতিহাস ও মানুষের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের সুতাগুলোকে মূলত একত্রিত করার চেষ্টা।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ২)

সামতেন মারা যাওয়ার পরে আমরা তিব্বতের রাজধানী লাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ঘোড়ায় চড়ে তিন মাসের দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। সেখান...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

জাগতিক না পারমার্থিক? – ২

ইসলাম ধর্মে জাগতিকতা আর পারমার্থিকতা অর্থাৎ ইহকালীন কর্মযজ্ঞ  আর পরকালীন প্রাপ্তব্য-বিভূতি --এতদুভয়ের মধ্যে বিশেষ কোন তফাৎ কিংবা দূরত্ব নাহি। উপযুক্ত ভক্তগণ সম্যকরূপে সাধনা করিয়া...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

জাগতিক না পারমার্থিক?

এই বিশ্বজগতে যত রূপকাঠামো রহিয়াছে তাহার মধ্যে মানবদেহই সব চাইতে উন্নত বলিয়া পরিগণ্য হইবে ইহাতে সন্দেহ কী। আধুনিক যুগে অনেকেই মানবদেহের কারিগরি ত্রুটি লইয়া...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক
1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow