জাগতিক না পারমার্থিক? – ২

পারমার্থিক

ইসলাম ধর্মে জাগতিকতা আর পারমার্থিকতা অর্থাৎ ইহকালীন কর্মযজ্ঞ  আর পরকালীন প্রাপ্তব্য-বিভূতি –এতদুভয়ের মধ্যে বিশেষ কোন তফাৎ কিংবা দূরত্ব নাহি। উপযুক্ত ভক্তগণ সম্যকরূপে সাধনা করিয়া যে দৈহিক মানসিক আধ্যাত্মিকতা সম্বলিত চারিত্রিক গুণাবলি যোগ করিতেন তাহাতে জাগতিকতার সঙ্গে পারমার্থিকতা মিলিয়া মিশিয়া একাকার হইয়া যাইত। এমন যোগী-মুমিন ব্যক্তিগণের নিকট এইরূপ আপন ঐশ্বর্য বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হইয়া থাকে। অতএব বলিতে হইবে ইসলামে তাহা চিরন্তন ধারা–নিত্য সনাতন।

কিন্তু অনুপযুক্তব্যক্তিবর্গ কিংবা নিম্নঅধিকারীগণ যথার্থ সাধন ভজন বা এবাদত বন্দেগী করিতে অনীহ থাকেন। তাহাদের কর্মযোগ যথাযথরূপে সম্পাদিত না হওয়ায় তাহাদের অর্জিতব্য উৎকর্ষ সুদূরের বিষয় বলিয়া তাহাদের নিকট প্রতিপন্ন হয়। স্বল্প কিছু আমল করিয়া তাহারা ভাবিতে থাকেন যে, ইহা সকলই সওয়াবের কাজ– পরকালে প্রাপ্তব্য। ইহা যেন ঈশপের বিখ্যাত গল্পে বর্ণিত শিয়ালের পান্ডিত্যপূর্ণ উক্তি‘আঙুর বড়ই টক‘ এর ন্যায়। নিজের ব্যর্থতা আড়াল করিবার ইহা একটি আত্মপ্রতারণাপূর্ণ চাতুরিপনা বলিয়া উচ্চঅধিকারীগণ কিংবা সুফি সাধকগণ উপলব্ধি করেন। ইমান-বান্ধব পরিবেশের অভাবে ইসলামের এমন সুন্দর অবস্থাটি আর অনেকের বোধগম্য হইতেছে না।

নবি রসুল বা অনুরূপ অবতার মহা মানবগণ যাঁহারা তাঁহাদের ভক্ত অনুসারীদিগকে মহা কল্যাণের ইঙ্গিতবহ প্রবচণ দান করিতেন তাহা কি শুধুই পরজগতে প্রাপ্তব্য? বহু কষ্টে অজস্র সাধনকর্ম সমাধা করিয়াও যদি ইহজগতে তাহা দুষ্প্রাপ্য বলিয়া গণ্য হয় তাহা হইলে মানবকুলের জন্য উহা এক অতিশয় পীড়াদায়ক পরিহাস বৈকি!

ধরাধামে আল্লাহর প্রতিনিধি নিয়োগদানের কথা কোরান মজিদে বর্ণিত হইয়াছে। যাঁহারা আল্লাহর প্রতিনিধি হইতে পারিবেন সেই তাহারাই পারমার্থিকতা লাভ করিতে পারিবেন না তাহা আমরা বিশ্বাস করিতে পারি না। খোদ আল্লাহর প্রতিনিধির পক্ষে জাগতিকতা কিংবা এই স্থূল কাঠামো আর আনুষ্ঠানিকতা অতিক্রম করিবার উপায় নাহি– এমন চিন্তা করাও আল্লাহর প্রতিনিধিত্বে বিশ্বাসীভক্তগণের নিকট পাপ বলিয়া গণ্য হইতে পারিবে। তবে যাহারা ‘আঙ্গুর ফল টক’-তত্ত্বে আস্থাশীল তাহারা তাহাদের যেমন সুবিধা ভাবিতে থাকুন। কবে তাহাদের মৃত্যু হইবে এবং শেষ বিচারের পর তাহারা পরম সুখদায়ক লোভনীয় বস্তুসকল লাভ করিতে পারিবেন তদুদ্দেশ্যে তাহারা অপেক্ষায় দিনাতিপাত করিতে থাকুন–ইহাতে কাহারো আপত্তিজ্ঞাপন উচিত নহে।

হজরত মুহাম্মদ এঁর ভক্ত সাহাবিগণের মধ্যে স্পষ্টত দুইটি ভাগ সূচিত হইয়াছিল। তাঁহাদের একভাগ অনুভব করিতে পারিয়াছিলেন যে মানবজীবনের মাঝে এক পরম অর্থবোধক তাৎপর্য রহিয়াছে। আর তাহা বিশেষ প্রচেষ্টায় অর্জিতব্য। রসুলুল্লাহর বিশেষ নেকদৃষ্টি লাভে ধন্য হইয়া কতিপয় মুত্তাকি সাহাবি তাহা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। যদিও তাঁহাদের সংখ্যা মোট সাহাবিগণের তুলনায় অতি অল্প, তথাপি তাঁহারা সিদ্ধপুরুষরূপে গণ্য হইতে পারিয়াছিলেন। এঁনাদের মধ্যে আহলেবাইত সকলের অগ্রগণ্য। সফলকামদের  মাঝে অনেকেই ‘আহলে সুফ্ফা’বলিয়া পরিচিত ছিলেন। তাঁহাদের আচরণ-বিচরণ রসুলের অন্যান্য সাহাবিদের চাইতে একেবারেই আলাদা ছিল। চলনে বলনে শয়নে স্বপনে হজরত রসুলে-করিম এঁর প্রতি এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে, মনে হইত, তাঁহারা বুঝি আল্লাহর এবাদত নয়–স্বয়ং মুহাম্মদ এঁর এবাদত করিত!

যেই কথা রসুলুল্লাহর ইন্তেকালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় হজরত আবু বকর সিদ্দিক প্রকাশ করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন যে, “ওহে! তোমরা যাহারা মুহাম্মদের এবাদত করিতে (শোন), মুহাম্মদ মরিয়া গিয়াছে। আর যাহারা আল্লাহর এবাদত করিতে (শোন), আল্লাহ্ চিরঞ্জীব”(মূল বর্ণনা : হাদিস নং ১১৬৯, বোখারি ২য় খণ্ড, ইফাবা)। হজরত আবু বকরের ঘোষণানুযায়ী সাহাবিগণের মাঝে এই যে দুইটি বিভক্তি তার একটিকে দেখিয়া প্রতিভাত হইত যে, তাঁহারা যেন হজরত মুহাম্মদের এবাদত করিতেছেন এবং অপরটিকে দেখিয়া সহজেই বুঝা যাইত যে, তাহারা নিরাকার আল্লাহর প্রতি মনোযোগী–রসুলের প্রতি নহেন। নবিজির ইন্তেকালের পর মুহূর্তেই ঐরূপ ভাষায় একটি ঘোষণা কেন দিতে হইয়াছিল তাহা ইতিহাসবিদগণ ভাবিয়া দেখিলে বিষয়টি স্পষ্ট হইয়া যাইবে।

হজরত রসুলে-করিমের সমকাল হইতে শুরু করিয়া অদ্যাবধি এইরূপ ২টি দল শাখা-প্রশাখাসহ চলিয়া আসিতেছে। হজরত আবু বকর বর্ণিত প্রথম দলটি ইহকালেই পারমার্থিকতা অর্জনে সদা তৎপর হইয়া থাকেন, কিন্তু তাঁহারা সংখ্যালঘু। আর দ্বিতীয় দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাঁহারা জাগতিক আনুষ্ঠানিকতায় আবদ্ধ থাকিতে সচেষ্ট থাকেন। ফলে মুসলিম সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই জীবনকে পরমার্থবোধক কিছু না ভাবিয়া শুধুই আর্থসামাজিক সুবিধাভোগী এবং আল্লাহর এবাদত এর পারিশ্রমিক স্বরূপ পরকালে নির্দিষ্ট পাওনা দাবী তৈরি করিয়া তাহা আমল নামায় বাকি রাখিয়া পরকালের অপেক্ষায় থাকিতে প্রবৃত্ত হইয়া পড়েন।

কোরান মজিদে আল্লাহ্ মাননীয় ত্রয়ী বিষয়ে নির্দেশনা দান করিয়াছেন : আল্লাহর আনুগত্য, তাঁহার রসুলের আনুগত্য এবং তোমাদের মধ্যে থাকা উলিল আমরের আনুগত্য বিষয়ে (মূল বর্ণনা: ৪ সুরা নাস: ৫৯/৮৩)। ইহা অলঙ্ঘনীয়।  যাঁহারা সফল হইবেন তাঁহারা এই পবিত্র ৩ এঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই তাহা অধিকার করিবেন। আল্লাহ্ এবং রসুল–এই ২ জন যে একান্ত আল্লাহ্-রসুলের বিষয় তাহা সহজেই বোধগম্য হইয়া থাকে কিন্তু ৩য় জন অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে থাকা ‘উলিল আমর‘ও কি আল্লাহ্-রসুলের বিষয় নাকি জনগণ ভোট দিয়া কাহাকেও নির্বাচন করিবেন? ইহা লইয়া মুসলিম জগৎ বিষম গোলযোগে পতিত হইয়াছে। হজরত মুহাম্মদ ইন্তেকাল করিবার পর থাকিয়াই ইতিহাসের এই চরম বিরুদ্ধ মতের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়া চলিয়াছে। তথাপি যাঁহারা আধ্যাত্মিক সুফি সাধনায় জড়িত থাকেন তাঁহারা ‘উলিল আমর‘-কেও আল্লাহ্-রসুলের স্বীকৃতিধন্য পারমার্থিক বলিয়াই উপলব্ধি করিয়া থাকেন। অন্যরা ‘উলিল আমর‘-কে জাগতিক বিষয়রূপে গণ্য করিয়া তাঁহাকে নিজেরাই নির্বাচন করিয়া থাকেন।

নবিজির ইন্তেকাল পরবর্তী কালে যেহেতু ‘রসুল‘ সশরীরে উপস্থিত নহেন এবং পারমার্থিকরূপে উলিল আমরও স্বীকৃত নহেন তাহা হইলে অবশিষ্ট থাকিলেন শুধু মহান আল্লাহ্ তায়ালা। সুতরাং কোরান বর্ণিত মাননীয় ৩ এঁর স্থলে হজরত আবু বকর বর্ণিত চিরঞ্জীব আল্লাহ্ একাই সর্বময় কর্তৃত্বের আসনে আসীন বলিয়া গণ্য হইলেন। সাধারণ বুদ্ধিতে ইহাই সঠিক বলিয়া প্রতীয়মান হইলেও কোরানি বর্ণনার সহিত তাহা সঙ্গতিপূর্ণ হইতে পারিল না। জাগতিক বুদ্ধির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই সিদ্ধান্ত কোরানি পারমার্থিক জ্ঞানে আদৌ গৃহীতব্য নহে–ভাবিয়া দেখিবার জন্য ইহা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। ইহকাল ও পরকাল বিষয়ে যথার্থ বোধ তৈরির জন্যও তাহা অত্যাবশ্যক বটে।

উলিল আমর বিষয়ে ত্রুটিপূর্ণ ধারণার বশবর্তী হইয়া ইসলামের জাগতিক কর্মের সহিত পারমার্থিকতার যথার্থ সমন্বয় আর হইলো না। ফলে ইসলামের সত্যিকার সৌন্দর্য প্রশ্ববিদ্ধ হইয়া থাকিল। ইহা অতিশয় পরিতাপের বিষয়! 

পুষ্পিতা

২৫ এপ্রিল ২০২৬      

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ২)

সামতেন মারা যাওয়ার পরে আমরা তিব্বতের রাজধানী লাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ঘোড়ায় চড়ে তিন মাসের দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। সেখান...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

কহিতে পারিব কি? – ২

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জীবনই অবদমনের একেকটা গোডাউন! ব্যক্তিগত সংস্কার, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বৈশ্বিক বিভিন্ন চাপে বিকশিত হওয়া দূরে থাক, জীবন মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে না...
default
পারমার্থিক

সফরনামা ।। শিল্পী খন্দকার নাছির আহাম্মদ

শিল্পী পরিচিতি খন্দকার নাছির আহাম্মদ ১৯৭৫ সালে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কারুশিল্প বিভাগ থেকে বি.এফ.এ সম্পন্ন করেন চারুকলায় অধ্যায়নরত অবস্থায় ১৯৯৮,...
ই-এক্সিবিশন
পারমার্থিক

জাগতিক না পারমার্থিক?

এই বিশ্বজগতে যত রূপকাঠামো রহিয়াছে তাহার মধ্যে মানবদেহই সব চাইতে উন্নত বলিয়া পরিগণ্য হইবে ইহাতে সন্দেহ কী। আধুনিক যুগে অনেকেই মানবদেহের কারিগরি ত্রুটি লইয়া...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক
1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow