Home Blog Page 3

কোরান দর্শন ১ম খণ্ডের ভূমিকা

ভূমিকা

কোরানের বাচনভঙ্গির যে কাব্যিক ধারা তাহা অনুবাদে যথাসম্ভব রক্ষা করতে চেষ্টা করা হইয়াছে। ইহার ফলে অনুবাদ সুখপাঠ্য হয় নাই। কথার যর্থাথতা রক্ষা করবিার চেষ্টা করা হইয়াছে। কোরানুল হাকীমের অনেক কথাই মূলত: রূপক করিয়া ব্যবহার করা হইয়াছে। রূপক অর্থ বুঝিয়া পাঠ করিবার চেষ্টা করিলে ইহার গভীর জীবনদর্শন উপলব্ধি করা যাইবে এবং মনের সৌন্দর্যবোধের উৎকর্ষ লাভ হইবে। কোরান জীবন বিধান নয় l ইহা একটি পূর্নাঙ্গ জীবন দর্শন l সালাত এই দর্শন জ্ঞানের মূল উৎস l ইহার দর্শনে  যিনি পরিপক্ক তিনি যখন যে বিধান যাহাকে দান করিবেন তাহাই তখন তাহার জন্য কোরানের বিধান। বিধান পরিবর্তনশীল কিন্তু দর্শন অপরিবর্তনীয় ।

গুরুকেন্দ্রিক সালাতের আত্মিক অনুশীলনের কথা কোরানে সর্বত্র পরিব্যক্ত আছে। সালাত প্রক্রিয়ার সাহায্যে জন্মান্তরবাদের পরিচয় জ্ঞান পরিস্ফুট হইয়া উঠে এবং বিষয়- দর্শনের উপর জ্ঞানচক্ষু উদিত বা উন্মীলিত হয়। এই সকল কথা কোরানে সর্বত্র থাকা সত্ত্বে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করিলে কোরানের কোন দর্শনই উপলব্ধি করা সম্ভব নয় ।  বস্তুবাদী অর্থের মধ্যে অসংখ্য আত্মবিরোধী ভাব এবং গরমিল বিদ্যমান । আল-কোরানের  শতাধিক বিশিষ্ট শব্দের সংঙ্গা না জানিলে কোরানের দর্শন অনুধাবন করা সম্ভব নয়।  বাংলা ভাষায় আরবী ’আল’ শব্দের কোন একটি নির্দিষ্ট  প্রতিশব্দ নাই। তাই আমরা কোরানের বঙ্গানুবাদে আল (THE) শব্দটিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশেষ, বিশিষ্ট, প্রতিষ্ঠিত এই কয়টি শব্দ দ্বারা প্রকাশ করিয়াছি । ’মদ’ এর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয়। অনুবাদের জটিলতা এড়াইবার জন্য মদের অর্থ  কদাচিত ভাষায় বর্ণিত হইয়াছে। বিজ্ঞ পাঠককে অনুরোধ করা যাইতেছে, তিনি যেন মদসমূহের অর্থের সঙ্গে যোগ রাখিয়া মদের অপ্রকাশিত অংশের  ভাবগাম্ভীর্য অনুধাবন করিতে প্রয়াস পান।

কোরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার যে অভিযোগ রহিয়াছে তাহা নিতান্ত অমূলক ,এই পুস্তকে তাহার উত্তর সন্ধান করা যাইতে পারে সকল পাঠকের প্রতি শুভেচ্ছা রহিল।

রসুলুল্লাহর সকল সুন্নার সার-সংক্ষেপ

রসুলাল্লাহর সকল সুন্নার সার-সংক্ষেপ কি? ইহা মাওলা আলী (আ.) কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হইলে নিম্নলিখিত হাদিসটি রসুলাল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত হয়। মিশরের মোহাম্মদ হোসেন হাইকল-এর লিখিত Life of Muhammad নামক পুস্তক হইতে উদ্ধৃত করা হইল:

১. মারেফাত আমার মূলধন। Wisdom is my capital.

২. যুক্তি আমার ধর্মের শক্তি। Reason the force of my religion.

৩. প্রেম আমার ভিত্তি। Love my foundation.

৪. আকাঙ্খা আমার বাহন। Longing is vehicle.

৫. আল্লাহর জিকির আমার স্থায়ী আনন্দ। The remembrance of Allah (Zikrillah) my constant pleasure.

৬. একিন আমার ধনভাণ্ডার। Trust (Eqin) my treasure.

৭. জ্ঞান আমার হাতিয়ার। Knowledge (Alem) my arm.

৮. ধৈর্য আমার অলঙ্কার। Patience my robe (Zinat)

৯. সন্তোষ আমার জেহাদলব্ধ সম্পদ। Contentment my booty.

১০. নিঃস্বতা আমার গৌরব। Poverty my pride.

১১. সন্ন্যাস আমার পেশা। Asceticism (রোহবানিয়াত) my profession.

১২. সঠিক সিদ্ধান্ত আমার শক্তি। Conviction my Strength.

১৩. সত্যবাদিতা আমার মধ্যস্থতাকারী। Truthfulness my intercessor.

১৪. বাধ্যতা আমার যুক্তিপ্রণালী। Obedience my argument.

১৫. জেহাদ আমার নীতিবিজ্ঞান। Zehad my ethics.

১৬. সালাত (বা ধ্যান) আমার পরম আনন্দ। Mediation my supreme pleasure.

১৭. দুঃখের বিলাপ আমার চিরসাথী। Mourning my companion.

হাদিসটির ব্যাখ্যা

উপরে উল্লিখিত হাদিসটি রসুলাল্লাহর সকল হাদিস এবং সুন্নার সংক্ষিপ্ত সারকথা। ইহাতে ১৭টি কথার উল্লেখ আছে। প্রথম কথা হইল:

১. মারেফাত আমার মূলধন। ‘মারেফাত’ অর্থ দর্শন বা জ্ঞান। ইহার অপর নাম সালাত। সপ্ত ইন্দ্রিয় দ্বারের মাধ্যমে যাহা কিছু আমাদের অস্তিত্বের মধ্যে প্রবেশ করে তাহা এক এক করিয়া দর্শন করিলে অর্থাৎ দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ ইত্যাদি সঠিক দর্শন করিলে উহা হইতে যে মারেফাত বা জ্ঞান উৎপন্ন হয় উহাই মানুষের মূলধন। যে যতটুকু সালাতের গভীরে যাইতে পারে তাহার মূলধন তত বেশী।

২. ‘যুক্তি আমার ধর্মের শক্তি’। ধর্মসমূহকে গ্রহণ ও বর্জন বিষয়ে মানুষ স্বভাবত অত্যন্ত দূর্বল। যুক্তিযুক্তভাবে ধর্মসমূহকে গ্রহণ ও বর্জন করিতে না শিখিলে ধর্মগুলি সংস্কাররুপে মানুষকে বন্দি করিয়া দুর্বল করিয়া ফেলে। যুক্তির সহিত যথাযথভাবে ধর্মরাশির মোকাবেলা করিলে ইহা হইতে আত্মিক মহাশক্তি অর্জন করা যায়। এই যুক্তি সম্যক গুরুর নিকট হইতে শিক্ষণীয়।

৩. ‘প্রেম আমার ভিত্তি’। বিশ্বসৃষ্টির মূলভিত্তি প্রেম। সুতরাং আল্লাহ-রসুলের সকল কর্মকাণ্ড প্রেমকে কেন্দ্র করিয়াই চলিতেছে। প্রেমহীন জীবন পশুর জীবন হইতেও হীন। আল্লাহ ও তাঁহার রসুলগণ মানুষকে তাঁহাদের প্রতি আকৃষ্ট করিয়া তাঁহাদিগকে প্রেম করিতে শিক্ষা দেন, যে প্রেম মানুষকে ক্রমশ উন্নত করিয়া আল্লাহর নৈকট্য দান করিয়া থাকে। ঊর্ধমুখী প্রেম ইনসানকে পরম উন্নতি দান করে আর নিম্নমুখী প্রেম স্নেহরূপে প্রকাশিত হইয়া নিম্ন পর্যায়ের লোকদিগকে উন্নতির দিকে ধাবিত করে। প্রেমহীন জগৎ মনুষ্য বাসের যোগ্য নহে। সুতরাং প্রেম মহানবীর ভিত্তি।

৪. আকাঙ্খা আমার বাহন। জীবজগতে যে যাহা একান্তভাবে আকাঙ্খা করে সে তাহাই পায়। চাহিদার এই ভিত্তির উপরই জীবজগতের আবর্তন ও বিবর্তন চলিতেছে, এই কথা কোরানে বহুরূপে বহুবার উল্লিখিত আছে। সুতরাং আমাদের জন্য রসুলের শিক্ষা হইল আকাঙ্খাকে বাহন করিয়াই পরম উন্নতির দিকে অগ্রসর হইতে হইবে। ইহা অতি মুল্যবান একটি সুন্নাত।

৫. উল্লিখিত আকাঙ্খাকে সার্থকরূপে কার্যকর করিতে চাহিলে আল্লাহর স্মরণ ও সংযোগক্রিয়া আনন্দের সহিত পালন করিতে হইবে। যাহারা সদা সর্বদা জিকিরের আনন্দে অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ ও সংযোগের আনন্দে থাকেন তাহারাই মুক্তির পথে কামিয়াব হইয়া থাকেন।

৬. একিন অর্থ আত্মপ্রত্যয়, আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস না থাকিলে কোনও কাজেই মানুষ সফলতা অর্জন করিতে পারে না। একিন তিন পর্যায়ভুক্ত : প্রথমত এলমুল একিন, তারপর আইনাল একিন, পরিশেষে হাককুল একিন।

৭. এখানে Knowledge বা Awareness অর্থাৎ জ্ঞান বা সজাগতা বা জানা বলা হয়েছে হাতিয়ার বা বাহুবল। এখানে রসুলাল্লাহ আরবি শব্দ কি ব্যবহার করিয়াছেন তাহা জানা নাই বিধায় হাতিয়ার এবং বাহুবল উভয় অর্থে প্রকাশ করিলাম।

সেই সকল ধর্মরাশি বা বিষয়বস্তু অবিরামভাবে আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বার দিয়া প্রবেশ করিতেছে সেইগুলির প্রত্যেকটি সম্বন্ধে অবগত বা জাগ্রত থাকিলে উহা হইতে মানসিক শক্তি উৎপন্ন হয়। এই দর্শনক্রিয়া একটি মৌলিক অস্ত্র যাহা দ্বারা সকল মিথ্যা ও শেরেক অতিক্রম করিয়া শুদ্ধি লাভের পথ প্রতিষ্ঠিত করা যায়। রসুলের সুন্নার ইহা একটি ব্যাপক ও বিরাট বিষয়, যদিও ইহা সমাজে প্রচ্ছন্ন বা অস্পষ্ট রহিয়াছে।

৮. ‘ধৈর্য আমার অলঙ্কার (বা পোশাক)’। এইখানে তিনি পোশাক বলিয়াছেন না অলঙ্কার বলিয়াছেন তাহা নির্ণয় করিতে পারিলাম না। অবশ্য উভয়প্রকার রূপই সম্যকভাবে প্রযোজ্য। ধৈর্য ব্যতিত মহত্ব অর্জন করা সম্ভব নহে। ধৈর্যগুণ মহাগুণ। ইহার সাহায্যে অসম্ভবও সম্ভবপর হইয়া উঠে। ধৈর্য ব্যতিত ধর্মের সঠিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না।

৯. অল্পে তুষ্ট হওয়া বিষয়টি মনের জন্য সহজসাধ্য বিষয় নহে। মনের এই সন্তোষ অর্জন করিতে হয় ‘জেহাদে আকবর’-এর সাহায্যে। সন্তোষ মনের বিশ্রামপ্রাপ্ত শান্ত অবস্থা। বস্তুমোহের শিরিক মাখানো অবস্থাসমূহ হইতে মানসিক জেহাদের মাধ্যমে মন বিষয় হইতে বিষয়ান্তরে ছুটাছুটি করা ত্যাগ করে এবং মহাস্থির শান্ত অবস্থা অর্জন করে। এইরূপ স্থিরতা জেহাদলব্ধ মহাসম্পদ। শিরিকহীন এই অবস্থা জন্মচক্র হইতে মুক্ত।

১০. ‘নিঃস্বতা আমার গৌরব’। নিঃস্বতা অর্থ মনের মহাশূন্যতা সম্পূর্ণভাবে শিরিকহীন অবস্থা। ধর্ম নিরপেক্ষ অবস্থা। সংস্কার সমূদ্রের উপরে ভাসমান থাকিয়া মনকে বিষয়বস্তুর ঊর্ধে শিরিকমুক্ত রাখিবার গৌরব রহিয়াছে। ইতা ছাড়া গৌরবলাভের দ্বিতীয় আর কোনও বিকল্প নাই। বস্তুজগতে বাস করিয়াও বস্তুমোহ হইতে মন-মস্তিস্ককে একেবারে নিঃস্ব করিয়া তুলিবার মধ্যে সকল গৌরব। মানুষের জন্য এই গৌরব মহানবীর সুন্নতের সকল দিক-নির্দেশনা।

১১. ‘সন্ন্যাস আমার পেশা’। আরবি শব্দটি হইল ‘রোহবানিয়াত’। কোনও একটি পেশা অবলম্বন করিয়া মানুষ যেমন বাঁচিয়া থাকে, তেমনই সন্ন্যাসভাব সিদ্ধপুরুষের একটি পেশা। বস্তুজগতে থাকিয়াও বস্তুমোহ ত্যাগের এই পেশা অবলম্বন ব্যতিত বিষয়বস্তুর শিরিক হইতে মুক্ত হওয়া যায় না। পেশা হইতে জগৎবাসী যেমন জীবিকা অর্জন করিয়া থাকে তদ্রুপ সাধক-জীবনের জীবিকা সন্ন্যাস হইতে অর্জিত হয়।

১২. শিরিক হইতে মহাশূন্যভাবে থাকিলে তাহা হইতে যে সিদ্ধান্ত আসে তাহা হয় নির্ভুল এবং শক্তিশালী। আত্মিক শক্তি আসল শক্তি। ইহা মুক্তিপথের দিশারী। শিরিকহীন মন হইতে সঠিক সিদ্ধান্ত বা দৃঢ় বিশ্বাস উদয় হইয়া থাকে। ইহাই মানুষের মৌলিক শক্তি।

১৩. ‘সত্যবাদিতা আমার মধ্যস্থতাকারী’, অর্থাৎ সাহায্যকারী। শিরিকের মধ্যে সত্যবাদিতা নাই। বস্তুবাদী মানুষ শিরিকের মধ্যে বস্তুগত সাহায্য খুঁজিয়া পায়। প্রকৃতপক্ষে উহা অর্থাৎ বস্তুগত সাহায্য সত্তায় মুক্তির সহায়ক নহে। বরং সত্যবাদিতা রহিয়াছে লা-শরিক অবস্থায়। অর্থাৎ মহাশূন্যবাভের মধ্যেই সত্য রহিয়াছে এবং উহাই মুক্তিপথের সহায়ক।

১৪. রক্তমাংসের সত্তা হইয়াও বৈষয়িক বিষয়ে মহাপুরুষের নিজস্ব কোনও যুক্তি নাই। যাহা আছে তাহার সকল যুক্তিই উচ্চতম কর্তার প্রতি আনুগত্য হইতে হইয়া থাকে। রসুলাল্লাহ মহাপুরুষদের প্রতিনিধি হিসাবে এই কথাই প্রকাশ করিতেছেন। Though with flesh and blood I have no argument of my own in this humdrum world. All my arguments come from my obedience to Highest Authority.

১৫. ‘জেহাদ করিতে থাক’ ইহাই রাসুলের মূলনীতি। এই জেহাদ প্রধানত মানসিক জেহাদ। সামাজিক প্রয়োজনে ইহা সম্যক নেতার নির্দেশমত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি প্রয়োগ। সুতরাং জেহাদ সর্বদাই কল্যাণমুখী, কোনও অবস্থাতেই হিংসাত্মক নহে।

১৬. সালাতের মাধ্যমেই সাধক সিদ্ধিলাভ করে। তাই সালাত বিষয়টি তার নিত্যানন্দের বিষয়। বস্তুর মোহে সংযুক্ত আনন্দ ক্ষণস্থায়ী বা অনিত্য। সালাত সাধককে শিরিকমুক্ত করিয়া অনিত্যতা হইতে নিত্যতায় পৌঁছাইয়া দেয়। সালাত সার্বক্ষণিক, ইহা সর্ব অবস্থায় এবং সর্ব কর্মে প্রযোজ্য, ধ্যানভিত্তিক সাধনা। সার্বক্ষণিক সালাত যে করে তাঁহাকে মুসুল্লি বলে। মুসুল্লি শেরেকমুক্ত অবস্থায় থাকিবার কারণে নিত্যানন্দ উপভোগ করে।

১৭. চরম পরম মোহাম্মদরূপে অর্থাৎ নূর মোহাম্মদরূপে তিনি প্রতিটি ব্যক্তিসত্তার মধ্যে বিদ্যমান আছেন। ব্যক্তির শিরিকযুক্ত কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি আচ্ছাদনে পড়িয়া আছেন, জাগ্রত হইতে পারিতেছেন না। ইহাই তাঁহার দুঃখের বিলাপস্বরূপ ব্যক্ত হইয়াছে। আসলে দুঃখটা ব্যক্তিসত্তার। ব্যক্তিসত্তার এই দুঃখের সহিত তিনি চিরসাথীরূপে বর্তমান। জাগ্রত সত্তারূপে রসুলাল্লাহ জিন ও ইনসানের পক্ষ হইয়া এই বিলাপ প্রকাশ করিতেছেন।

একাকীত্ব প্রসঙ্গে ওশো

আমরা সবাই একা। এই পুরো পৃথিবীটা অধিক জনসংখ্যায় হয়তো উপচে পড়ছে কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিটি মানুষ এখানে একা। এমনকি খুব ভিড়ের মাঝে থেকেও তুমি একা। এই একাকীত্ব অসহ্যকর এবং আমি জানি যে তুমি এ থেকে মুক্তি পেতে চাও। তাই তুমি অহেতুক সম্পর্ক তৈরি করো যেন নিজেকে আর নিজের একাকীত্বকে ভুলে থাকতে পারো। অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও তোমার মনে হয় তুমি একা নও।

‘‘মানুষ দারুনভাবে একা”। এই একাকীত্বকে সঙ্গী করে তুমি কেবল দুটি কাজই করতে পারো: হয় তুমি তোমার নিজের মনের মতন একটা দুনিয়া তৈরি করতে পারো, অথবা তুমি সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশ করতে পারো। নিজের মনের মতন দুনিয়া তৈরির অর্থ হলো নানাবিধ সম্পর্ক তৈরি করা যেন তা একাকীত্বকে ভুলিয়ে দেয়। এবং সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশের অর্থ হলো এই একাকীত্বকে গ্রহণ করতে পারা এই অর্থে যে এটাই তোমার প্রকৃতি। এর থেকে দূরে ভাগার চেষ্টা করো না, একে এড়িয়ে চলো না, একে গ্রহণ করো, আলিঙ্গন করো। এটাই তোমার প্রকৃতি। এর থেকে পালিয়ে তুমি কোথাও যেতে পারবে না। তুমি তোমার অসংখ্য জীবনে এই কাণ্ড করেছ এবং ব্যর্থ হয়েছ। ব্যর্থতা ছাড়া এই ক্ষেত্রে তোমার আর কোনো অর্জনই নেই। সন্ন্যাস অর্থ হলো এমন একজন যিনি তার একাকীত্বকে গ্রহণ করতে পেরেছেন। এখন তিনি শিস বাজান না, গান করেন না, কোনো সম্পর্কেও জড়ান না। এখন তিনি নিজের প্রতি সম্পূর্ণরূপে তুষ্ট।

এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করো, তুমি যদি নিজের থেকে পালাতে চেয়ে দৌড়ানো শুরু করো তবে সে দৌড়ের আর শেষ নেই। এবং ততটাই তুমি একাকীত্বের ভয়ে কাবু হয়ে যেতে থাকবে। আর যত তুমি নিজেকে গ্রহণ করতে শিখবে দেখবে যে সেখানে একাকীত্ব নেই, বরং একটা একাকী ভাব রয়েছে। একাকীত্ব এবং একাকী ভাবের মাঝে একটি বিশেষ পার্থক্য আছে। একাকীত্ব মানে হলো সেখানে তুমি অন্য কারো উপস্থিতির প্রয়োজন বোধ করছ। একাকী ভাবের অর্থ হলো, ‘এক’ এর সাথে সংযুক্ত থাকাটায় যখন যথেষ্ট। একাকীত্ব যন্ত্রণাদায়ক কিন্তু একাকী ভাব পরমানন্দের। যখন শংকর বলছেন যে তিনি একা, তখন তিনি নিজের সাথে সংযুক্ত। কিন্তু যখন তুমি বলছ তুমি একা, তখন আসলে তুমি একাকীত্বকে বোঝাচ্ছ।

একাকীত্ব মানে অন্যের উপস্থিতির জন্য আকুলতা আর একাকী ভাব হলো নিজের সংস্পর্শে আনন্দে থাকা। এই একাকী ভাবে তুমি আসলে তোমার নিজের প্রেমে পড়েছ। ধ্যানের অর্থই হলো নিজের প্রেমে পড়া। ধ্যানের অর্থ হলো নিজের সাথে এমন এক সম্পর্ক স্থাপন করা যে সেখানে অন্যের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনই পড়ে না। ধ্যানের অর্থ হলো নিজের মাঝেই পূর্ণতা বোধের প্রাপ্তি। তোমার জগত, সামগ্রিক জগতটা তখন তোমার মাঝে। এখানে আর কোনো খামতি নেই। তুমি সম্পূর্ণ, তুমি সমগ্র, তুমি স্বর্গীয়, তোমার আর কোথাও যাওয়ার দরকারই নেই। এই অভ্যন্তরীণ হালটাকেই বলে ‘সন্ন্যাস’।

আমরা আমাদের আশেপাশে এই বিশাল জগত তৈরি করে নিয়েছি কারণ একাকীত্ব আমাদের দারুনভাবে আহত করে। এই একাকীত্বের শূণ্যতাকে আমরা টাকা দিয়ে, বন্ধুত্ব দিয়ে, পরিবার দিয়ে, ধর্ম দিয়ে, জাতপাত দিয়ে, রাষ্ট্র দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু একে ক্ষতস্থান হিসেবে চিহ্নিত করাটাই ভুল, এ কোনো ক্ষত নয়।

গত রাতে একজন সন্ন্যাস আমার কাছে এসে বলল যে ধ্যান শুরু করার পর থেকে তার হৃদয়ের মৃত্যু ঘটেছে। কোনোরকম সম্পর্ক স্থাপনের কোনো ইচ্ছে তার জাগ্রত হয় না, নারী পুরুষের প্রেমভাব না এমনকি বন্ধুর জন্যেও কোনো ইচ্ছে তার জাগ্রত হয় না। সে খুব দুঃখী ছিলো… কেননা সে পশ্চিমা দেশ থেকে আসা এবং সেখানে এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে প্রেমভাব চলে গেলে সেই মানুষের জীবনের আর কোনো অর্থ থাকে না। আবেগ অনুভূতি হারিয়ে গেলে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবে, এবং জীবন তখন নিরর্থক মনে হবে। তাই সে খুব দুঃখী।

প্রাচ্যে আমরা গভীর গবেষণা করেছি। আমরা জেনেছি যে আমরা যদি অখণ্ডরূপে নিজের মাঝে থাকতে পারি তাহলে সমস্ত সম্পর্ক বিলীন হয়ে যায়। এবং এটা একটা সৌভাগ্যের বিষয়, দুঃখ পাওয়ার মতন কোনো ঘটনা এটা নয়। যখন একজন মানুষ নিজের মাঝে থিতু হতে পারে যৌনতা তার ভিতর থেকে উবে যায় এবং অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের যে ইচ্ছে সেটাও মিলিয়ে যায়। কৃতজ্ঞতাবোধের অনুভূতি এত তীব্র হয় যে কারো সাথে সম্পর্ক তৈরির ইচ্ছের আর জায়গা হয় না। সেই মানুষটা আর কারো সাথে সম্পর্ক করার জন্য ভিক্ষুকের মতো ঘুরে মরে না। সে আর এইকথা বলে না যে ”তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না”। এখন সে একাই বাঁচতে সক্ষম। এবং যে ব্যক্তি একা বসবাস করতে পারেন তিনিই প্রকৃত অর্থে বেঁচে আছেন! অন্য যেকোনো ধরণের বেঁচে থাকা আসলে একটা ছলনা, একটা মায়া। তুমি যদি একাই থাকতে না পারলে তাহলে তুমি অন্যদের সাথে কিভাবে থাকবে?

তাই আমি সেই অল্পবয়সী সন্ন্যাসীকে বললাম, ‘’তুমি ভয় পেও না, অসুখী বোধ করো না। তোমার বোধের সংজ্ঞাটা এখানে ভুল হয়েছে। পশ্চিমের সংজ্ঞাটা ভুল। আনন্দে থাকো, পরমানন্দে থাকো। তুমি চিন্তাও করতে পারবে না যে কোনো সম্পর্ক করার বোধ যে আর তোমার মাঝে উদয় হয় না তার মানে তুমি কতই না সৌভাগ্যবান।’’

সম্পর্ক তোমাকে কেবলই যন্ত্রণা এবং ক্লেশ দিবে। এটা স্বাভাবিক কেননা যখন দুইটি অসুখী মানুষ একসাথে হচ্ছে তারা কি করে একে অপরকে সুখ দিবে? এইখানে গণিতটা একেবারেই স্পষ্ট: যখন দুজন অসুখী মানুষ একসাথে হয় তাদের অসুখীর পরিমাণ কেবল দ্বিগুণ হয় তা নয়, বরং বহুগুণে বেড়ে যায়। তুমি আরেকজন মানুষের খোঁজ করছ কেননা তুমি সুখী নও। যেহেতু তুমি একা সুখী নও, তাই তুমি অন্যের খোঁজ করছ। অথচ সেই অন্য মানুষটিও সুখী নয়, এবং সেও তোমার মতন একই প্রত্যাশা নিয়ে তোমার দিকে চেয়ে আছে। দুজন অসুখী মানুষ সুখের আশায় একে অন্যের দ্বারস্থ হচ্ছে। কিন্তু তারা সুখ পাচ্ছে না। এটা অসম্ভব কারণ দুজন ভিক্ষুক একে অন্যের কাছে ভিক্ষা করছে কিন্তু তাদের কারো ভিক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা নেই। দুজনেই যে ভিক্ষুক! দুজনেই একে অন্যের কাছে প্রত্যাশা করে চলেছে। যখনই তুমি কাউকে ভালোবাসো তুমি প্রত্যাশা করো যেন এর বিনিময়ে সেও তোমাকে ভালোবাসা দেয়। মানুষজন অহরহই আমাকে বলে যে, ‘‘ভালোবাসাতো কেবল দিয়েই গেলাম কিন্তু কিছুইতো পেলাম না’’ কিভাবে তুমি ভালোবাসবে? ভালোবাসা কেবলমাত্র পরমানন্দের উচ্চতর হাল থেকে প্রবাহিত হয়। পরমানন্দের চূড়া থেকে ভালোবাসার নদী বয়ে আসে। তুমি তো সুখী নও, তুমি পরম সুখের ধারে কাছেও নেই, তুমি একজন ভিক্ষুক এবং অন্য মানুষটিও ভিক্ষাবৃত্তি করছে। তোমাদের কারোরই সামর্থ্য নেই একে অন্যকে কিছু দেওয়ার। অথচ তোমরা অপেক্ষা করতে থাকো যদি একটু ভালোবাসা দান-খয়রাতে পাওয়া যায়! যেইনা তোমার অপেক্ষা শুরু হলো তোমার হতাশাও তখন থেকেই শুরু।

যদি একজন মানুষ তার নিজের ভিতর থেকে সুখ না পেতে পারে তাহলে দুনিয়ার কেউ তাকে সুখী করতে পারবে না।

– The Great Transcendence বই থেকে একাংশ বাংলায় সুপ্রভা জুঁই

সাব্বাত পালন ও বানর বিষয়ক উপাখ্যান

সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশ্‌তী রচিত কোরান দর্শন থেকে সূরা বাকারা এর ৬৫-৬৬ নং আয়াত

৬৫। এবং তোমাদের মধ্য হইতে যাহারা সপ্তম দিবসে সীমালঙ্ঘন করিয়াছে নিশ্চয় তোমরা তাহাদিগকে জান। সুতরাং তাহাদিগের জন্য বলিলাম: “অধম বানর হইয়া যাও।

ব্যাখ্যা: যাহারা সপ্তম দিবসের সীমা লংঘন করে তাহারা যে অবশ্য বানর হইয়া যায় অর্থাৎ নিম্নমানের সৃষ্টিতে অধঃপতিত হয় এ বিষয়টি সর্বযুগের বিধান। এ বিধান বনি ইসরাইলগণ অর্থাৎ সর্বযুগের মহামানবগণ স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। সাধারণ মানুষের জন্য ইহা অজ্ঞাত বিষয়।

৬৬। সুতরাং আমরা ইহাকে (অর্থাৎ বানর হইয়া যাওয়ার ঘটনাকে) একটি দৃষ্টান্ত বানাইলাম: এই ঘটনায় উপস্থিত ব্যক্তিগণের জন্য এবং ইহার পরবর্তীদের জন্য। এবং মোত্তাকিদের জন্য একটি ওয়াজ (অর্থাৎ বক্তব্য বা সাবধান বাণী)।

ব্যাখ্যা: বানরে পরিণত করিবার ঘটনা কোন একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইহা সর্বযুগে ঘটিতেই আছে। সর্বযুগের মোত্তাকিদের জন্য বিষয়টি উল্লেখযোগ্য একটি বক্তব্য। ইহার কারণ কেবল মোত্তাকিগণই এইরুপ অধঃপতন হইতে সাবধানতা অবলম্বন করিয়া থাকে। [দ্রষ্টব্য(৭:১৬৩)]

সূরা আরাফ এর ১৬৪-১৬৬ নং আয়াত

১৬৩। এবং তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর সমুদ্র তীরবর্তী জনপদবাসীদের সম্বন্ধে; যখন তাহারা সাব্বাতে সীমালঙ্ঘন করিত (বা করে) তখন তাহাদের বড় মাছগুলি তাহাদের সাব্বাতকালে মাথা উঁচু করিয়া তাহাদের নিকট আসিত (বা আসে)। এবং যে সময় সাব্বাত পালন করিত না তাহাদের নিকট আসিত না। এইরুপ হইয়া থাকে। তাহারা যে প্রবৃত্তিপরায়নতা করে উহা দ্বারাই তাহাদিগকে আমরা পরিক্ষা করিয়াছিলাম।

১৬৪। এবং যখন তাহাদেরকেই এক উম্মত বলিয়াছিল: “কেন তোমরা এমন একটা কাওমকে হেদায়ত কর যাহাদিগকে আল্লাহ বিনাশ করিবেন অথবা কঠোর শাস্তি  দিবেন?” তাহারা (অর্থাৎ প্রচারকরা) বলিলেন: তোমাদের রবের দিকের মজুরীর জন্য (অর্থাৎ অপারগতার কৈফিয়তের জন্য) এবং যেন তাহারা তাকওয়া করে (সেই জন্য)।”

১৬৫। তারপর যখন তাঁহার সহিত সংযোগের বিষয় ভুলিয়া গেল, আমরা উদ্ধার করিলাম তাহাদিগকে যাহারা অসীম মন্দ হইতে নিষেধ করিত, এবং জুলুমকারীদিগকে নিকৃষ্ট একটা শাস্তি দ্বারা ধরিয়াছিলাম, যে ইন্দ্রিয়পরায়নতা তাহারা করে উহা দ্বারা।

১৬৬। সুতরাং যাহা হইতে নিষেধ করা হইয়াছিলো, যখন তাহারা তাহাতে বিরুদ্ধাচারী হইল, তখন আমরা তাহাদিগের জন্য বলিয়াছিলাম: “তোমরা বিতাড়িত বানর হইয়া যাও”।

ব্যাখ্যা ( ১৬৩-১৬৬): সাব্বাত দিবসে সালাত ব্যতীত যে কোন কাজ করা নিষেধ। এই সময়ে যাহাই করা হোক না কেন তাহা সালাতমন্ডিত করিয়া সম্পাদন করিতে হইবে।

ইহুদীদিগের জন্য তাহাদের সাব্বাত দিবস শনিবারের সাংসারিক কার্য করা আইনত নিষিদ্ধ ছিল। তাহাদের আইন অনুসারে সাব্বাতের ধ্যানবিধি ভঙ্গ করিলে প্রাণদন্ডের বিধান ছিল। ইহার কারন তাহাদের ধর্মগ্রন্থের বিধান মতে সেইদিন সালাত ব্যতীত কেহ কোন কাজ করিলে সেই ব্যাক্তি মানুষের দল হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িবে।

সালাত দায়েমী অর্থাৎ সার্বক্ষণিক। মুক্তির লক্ষ্যে জীবনের প্রতিটি বিষয়ের উপর সালাত করিতে হইবে। দায়েমী সালাত শিক্ষা দেবার জন্যই নবীগণ সপ্তাহে একদিন পরিপূর্ণভাবে সালাতে আত্মনিয়োগ করিবার ব্যবস্থা দান করিয়াছেন। সাত দিনের মধ্যে সেই দিনকে সাব্বাত বা সপ্তম দিবস বলে। ইহা সম্পুর্নরুপে সাধনার দিবস হিসেবে নির্ধারিত থাকে। এই দিনটি বাকি ছয় দিনের উপর প্রভাব বিস্তার করে বিধায় ইহার গুরুত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব অসীম।

বিশিষ্ট তিনজন নবী সাপ্তাহিক সপ্তম দিবস নির্ধারিত করিয়াছেন শনিবার, রবিবার এবং শুক্রবার। সাতটি বারের মধ্যে কোন বারই বিশেষ বুজর্গী বা গুরুত্ব বহন করে না। গুরুত্ব বহন করে সেই কাল যাহাতে আত্নদর্শনের সালাত করা হয়।

লোহিত সাগরের তীরে এলাত নামক স্থানে হজরত দাউদ নবীর রাজত্বকালে সাব্বাত দিবসে মাছ ধরিবার অপরাধে একদল ইহুদী বানর হইয়া গিয়াছিল। সেই উপাখ্যানের কথাই এখানে উল্লিখিত হইয়াছে। বিষয়টি স্থান ও কালে আবদ্ধ শুধুমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট ঘটনা নয়, বরং ইহা সার্বজনীন এবং সর্বকালীন একটি বিষয়। সংস্কার সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য যাহারা এই সমুদ্র  তীরবর্তী হয় অর্থাৎ সালাত পালনে ব্রতী হয় তাহাদিগের মধ্যে এইরুপ অবস্থা ঘটিয়া থাকে।

ইন্দ্রিয়পথে আগমনকারী বিষয়সমূহের কোনটি কখন আসিল অথবা অতীত হইয়া গেল অসালাতী অবস্থায় তাহা সুষ্পষ্ট দৃশ্যমান হয় না। সালাতকালে সেই বিষয়গুলি স্বরুপ স্পষ্টভাবে ফুটিয়া উঠে যেগুলি আমরা বড় করিয়া দেখি। সাব্বাত পালনকালে বড় বড় মাছগুলি মাথা উঁচু করিয়া আত্নপ্রকাশ করে। অর্থাৎ যে বিষয়গুলি সম্বন্ধে মন অবচেতন ছিল সেইগুলির উপর সালাত বা ধ্যান প্রোয়োগের কারনে সেইগুলি মাথাচাড়া দিয়া স্পষ্ট  হইয়া উঠে। এইগুলি যাকাত না করিয়া ধরিয়া রাখিলে শেরেকের অপরাধে অপরাধী হইতে হয়। সাব্বাতের সালাতের সাহায্যে আল্লাহতা’লা মানুষকে পরীক্ষা করিয়া থাকেন। আপন সালাতের মধ্যে গোলযোগ সৃষ্টির কারণে পরজন্মে বানর হইয়া যাওয়ার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া যে কথাগুলি প্রকাশ করা হইয়াছে তাহাতে সালাতের ফলশ্রুতি ব্যক্ত হইয়াছে।

যে ইন্দ্রিয়ের যে – বিষয়গুলির উপর সালাত করা হয় সেইগুলির মোহ যাহাতে মনের মধ্যে জাগিয়া না উঠে বরং তাহা সম্পূর্ণ জাকাত করা হইয়া যায় সেই চেষ্টাই সালাতীকে করিতে হইবে। সালাত করিলে আগমনকারী বিষয়গুলি সুষ্পষ্ট হইয়া জাগিয়া উঠে। সালাত না করিলে কখন কোন বিষয় মন- মস্তিষ্কে প্রবেশ করিল অথবা না করিল তাহা অজ্ঞাতই থাকে এবং এইরুপ অজ্ঞাত এবং অসাবধান অবস্থায় বহু শিরিক মস্তিষ্কে অজ্ঞাতে জমা হইয়া যায়। সাব্বাত পালন করিয়া যাহারা দায়েমীভাবে সালাতী হইয়াছেন তাহাদের নিকট তাহাদের বড় বড় মাছগুলি মাথা উঁচু করিয়া প্রতিদিন আসিতেই থাকে। সুতরাং তাহাদের অজ্ঞাতে শেরেক পয়দা করিতে পারে না। অপরপক্ষে সীমা লংঘনকারী সাব্বাতীগন তাহাদের ধ্যানের মধ্যে আগত বিষয়গুলির মোহ জাকাত করে না।

মুসা নবীর সৃষ্ট উম্মতগুলির মধ্যে কোন এক উম্মতের লোকেরা তাহাদের ইমামগনকে জিজ্ঞাসা করিল: “কেন আপনারা এমন সব লোকদিগকে হেদায়ত করেন (অর্থাৎ ধর্মদেশনা দ্বারা পথ দেখাইবার চেষ্টা করেন) যাহাদিগকে আল্লাহ সালাত গ্রহন না করিবার কারনে বিনাশ করিবেন এবং কঠিন শাস্তি দিবেন?” প্রতি উত্তরে তাঁহারা বলিলেন: “তোমাদের গুরুর আশ্রয়ের দিকে যাইবার যে অসুবিধাগুলি তাহাদের আছে সেইগুলি নিরসনের পথ দেখাইবার জন্যই আমরা হেদায়ত করি যাহাতে তাহারা গুরুর প্রতি কর্তব্যপরায়ন হইতে পারে। তাহারা নিজেরা আপন ভবিষ্যত কর্মপন্থা সঠিক গ্রহণ করিবার যোগ্য নহে,কারণ তাহারা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ভবিষ্যৎ- দ্রষ্টা নয়।”

সংসার পরিস্থিতির  নানারুপ জটিলতার মধ্যে আবদ্ধ হইয়া মানুষ সালাতের অনুশীলনে অক্ষম হইয়া থাকে, সেখান হইতে উদ্ধার করিবার চেষ্টা করা গুরুগনের নৈতিক দায়িত্ব।

ইহার পরেও যাহারা হেদায়ত গ্রহণ না করিয়া গুরুর সহিত সংযোগ ভুলিয়া থাকে তাহারা তাহাদের প্রবৃত্তিপরায়নতা  দ্বারা শাস্তির মধ্যে ধরা পড়িয়া থাকে। অপরপক্ষে যাহারা অসীম মন্দ হইতে মানুষকে নিষেধ করে তাহাদিগকের উদ্ধার করা হয় যেহেতু তাহারা আমানু। অসীম মন্দ এবং অসীম অপবিত্রতা একই কথা। ( দ্রষ্টব্য : ১৫৭)।

  • টাইপিং সহযোগী মৈত্রী – তাসলিমা খাতুন

দিল দুনিয়া আর দরবেশী (পর্ব – ১)

আধ্যাত্মিকতা ও ব্যবসাকে আমরা অনেক সময় দুই ভিন্ন জগত বলে ভাবি।  মনে করা হয়, আধ্যাত্মিকতা মানে জগত থেকে সরে দাঁড়ানো আর ব্যবসা মানে কেবল লাভ-ক্ষতির হিসাব। কিন্তু মানব সভ্যতার বড় বড় ধর্মগ্রন্থ ও জ্ঞানীজনের বাণী বলছে ভিন্ন কথা। তারা দেখিয়েছেন—সৎ উদ্দেশ্যে, মানবকল্যাণে এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে করা পার্থিব কাজই মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশের একটি শক্তিশালী পথ। আবুস আসাদের কথায়, “সুন্নত হলো, সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য সর্বোচ্চ পার্থিব কাজ।” অর্থাৎ জগতের দায়িত্বপূর্ণ কাজ থেকে পালিয়ে নয়, বরং সৎভাবে তা সম্পন্ন করার মধ্যেই আধ্যাত্মিকতার গভীরতা পাওয়া যায়।  

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “মানুষের জন্য সে-ই আছে যা সে চেষ্টা করে অর্জন করে।” (সূরা নাজম ৫৩:৩৯)। এই আয়াত মানুষের কর্মকে মর্যাদা দিয়েছে। এখানে বোঝানো হয়েছে যে মানুষের উন্নতি বা সাফল্য কেবল প্রার্থনা বা আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করে না; তাকে পরিশ্রম ও দায়িত্বের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবসাকেও একটি নৈতিক কর্মক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একজন উদ্যোক্তা যদি সততা, শ্রম এবং মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখে কাজ করেন, তবে তার সেই প্রচেষ্টা কেবল অর্থনৈতিক কাজ নয়—এটি এক ধরনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সাধনা হয়ে ওঠে। রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।” (তিরমিজি)।  এই উক্তির মধ্যে ব্যবসার নৈতিকতার গভীর গুরুত্ব ফুটে ওঠে। এখানে ব্যবসাকে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। একজন সৎ ব্যবসায়ী মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন, সমাজে ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করেন, এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন। তাই সৎ ব্যবসা ইসলামের দৃষ্টিতে উচ্চ মর্যাদার কাজ।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ভগবদ্ গীতায় বলা হয়েছে, “কর্মই তোমার অধিকার, ফলের প্রতি আসক্ত হয়ো না।” (গীতা ২:৪৭)। এই শিক্ষাটি কর্মের দর্শনকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। এর অর্থ —মানুষের দায়িত্ব হলো নিষ্ঠার সাথে তার কাজ করা, কিন্তু কেবল ফল বা লাভের চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে পড়া নয়। যখন কাজটি দায়িত্ববোধ ও সততার সাথে করা হয়, তখন সেই কাজ আত্মিক পরিশুদ্ধির পথ হয়ে ওঠে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ প্রকৃত উদ্যোক্তা কেবল লাভের জন্য নয়, সৃষ্টির আনন্দ এবং মানুষের উপকারের জন্যও কাজ করেন। খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে বলা হয়েছে, “যে বিশ্বস্তভাবে অল্প কাজ করে, সে বড় কাজেও বিশ্বস্ত।” (লূক ১৬:১০)। এই বাণী মানুষের চরিত্রের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে। ছোট কাজেও সততা ও দায়িত্ববোধ থাকলে বড় দায়িত্বেও সেই নৈতিকতা বজায় থাকে। ব্যবসার জগতে এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। একজন উদ্যোক্তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি লেনদেন এবং প্রতিটি প্রতিশ্রুতি যদি সততার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার প্রতিষ্ঠানও সমাজে আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে।

আমাদের সাহিত্য ও দর্শনের জ্ঞানীরাও একই শিক্ষা দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “কর্মের মধ্যেই মানুষের মুক্তি।” অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত বিকাশ ঘটে কাজের মধ্য দিয়ে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “কর্মই হলো উপাসনা।” এই উক্তি দেখায় যে মানুষের সৎ কর্মই এক ধরনের প্রার্থনা বা উপাসনা হয়ে উঠতে পারে। যখন কাজ মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হয়, তখন সেটি কেবল পেশা থাকে না—একটি মানবিক সাধনায় পরিণত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে “অরুণিমা” উদ্যোগটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। এখানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত প্রায় তিন হাজার নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। তারা তাদের হাতে সেলাই করে নকশিকাঁথা ও কারুশিল্পের মাধ্যমে নিজের জীবনকে বদলে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এটি কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি নারীর সামাজিক ক্ষমতায়নের একটি পথ। যখন একজন নারী নিজের শ্রমের মাধ্যমে আয় করতে পারেন, তখন তার আত্মমর্যাদা বাড়ে, পরিবারে তার অবস্থান শক্ত হয় এবং সমাজেও একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যক উদ্যোক্তাই এভাবে মানুষের পার্থিব এবং অপার্থিব জীবনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। 

একজন লেখক এবং উদ্যোক্তা হিসেবে আমার মনে হয়, এই ধরনের উদ্যোগই পার্থিব কাজ ও আধ্যাত্মিকতার মিলনকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। কারণ এখানে লাভের সাথে সাথে মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যও কাজ করছে। একটি ব্যবসা যখন মানুষের জীবনে মর্যাদা, স্বাধীনতা ও আশার আলো নিয়ে আসে, তখন সেটি কেবল অর্থনৈতিক কার্যক্রম থাকে না; এটি একটি মানবিক আন্দোলন হয়ে ওঠে। সুতরাং বলা যায়, আধ্যাত্মিকতা ও ব্যবসা পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং নৈতিকতা,  সততা ও মানবকল্যাণের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসাই আধ্যাত্মিকতার বাস্তব প্রকাশ হতে পারে। সেই অর্থে আবুস আসাদের উক্তিটি গভীর সত্যকে প্রকাশ করে—“সুন্নত হলো, সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য সর্বোচ্চ পার্থিব কাজ।” যখন মানুষের পার্থিব কর্ম মানবকল্যাণের সাথে যুক্ত হয়, তখন সেই কর্মই হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিকতার এক উজ্জ্বল পথ।

স্বামী বিবেকানন্দের “কর্মযোগ” গ্রন্থে পার্থিব (জাগতিক কাজ) এবং অপার্থিব (আধ্যাত্মিক উপলব্ধি)-এর মধ্যে একটি গভীর মেলবন্ধনের কথা বলা হয়েছে। তাঁর মতে, মানুষ কেবল ধ্যান বা উপাসনার মাধ্যমে নয়—নিজের দৈনন্দিন কর্মের মধ্য দিয়েও ঈশ্বরের নিকট পৌঁছাতে পারে। বিবেকানন্দ বলেন, পৃথিবীর কাজকে ত্যাগ করে আধ্যাত্মিকতা অর্জন করতে হবে—এ ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়।  বরং যে কাজই আমরা করি, যদি তা নিঃস্বার্থভাবে করি এবং নিজের স্বার্থের জন্য নয় বরং মানুষের কল্যাণের জন্য করি, তখন সেই কাজই আধ্যাত্মিক সাধনা হয়ে ওঠে। এখানে পার্থিব কাজ আর অপার্থিব সাধনার মধ্যে আর কোনো বিভাজন থাকে না। “কর্মযোগ”-এর মূল শিক্ষা হলো—কর্মই উপাসনা। একজন মানুষ যখন নিজের কাজকে ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গ হিসেবে করে, তখন সেই কাজের মধ্যেই ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়। এই অবস্থায় কর্ম আর কেবল জীবিকা বা দায়িত্ব থাকে না; তা হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধি ও আত্মোন্নতির পথ। বিবেকানন্দ আরও বলেন, মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা।  

কারণ প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের উপস্থিতি আছে। তাই ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা, সমাজের উন্নতির জন্য কাজ করা—এসবই এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনা। এই ভাবনার মধ্যেই পার্থিব ও অপার্থিবের প্রকৃত মিলন ঘটে। এই দর্শনে জগতকে ত্যাগ করার কথা বলা হয় না; বরং জগতের মধ্যে থেকেই নিঃস্বার্থ কর্ম করার কথা বলা হয়। মানুষ যখন নিজের অহং, লাভ-লোকসানের হিসাব, প্রশংসা বা স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কেবল কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করে, তখন সেই কর্ম তাকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। অতএব, স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগে পার্থিব ও অপার্থিবের সম্পর্ক বিরোধের নয়, বরং সমন্বয়ের। জাগতিক কর্মই হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক পথ, আর মানুষের কল্যাণে করা প্রতিটি নিঃস্বার্থ কাজই হয়ে ওঠে ঈশ্বরসেবার একটি রূপ। এই ভাবনাই দেখায়—মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সমাজসেবা এবং কর্মপ্রবণতাই হতে পারে আত্মার উচ্চতর জাগরণের পথ।

সুফি দর্শনে পার্থিব ও অপার্থিব এই দুই জগতকে একেবারে আলাদা বা পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখা হয় না। বরং সুফি চিন্তায় দুনিয়াকে এমন একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয় যেখানে মানুষের কর্ম, প্রেম ও সেবার মাধ্যমে সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। অর্থাৎ পার্থিব জীবনই হয়ে ওঠে অপার্থিব সত্য উপলব্ধির পথ। সুফি সাধকরা বলেন, পৃথিবী ত্যাগ করে নয়, বরং পৃথিবীর মধ্যে থেকেই হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়া যায়। মানুষের অন্তরের অহং, লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতা দূর করে যখন সে ভালোবাসা, দয়া ও মানবসেবার পথে চলে, তখন তার দৈনন্দিন জীবনই এক ধরনের আধ্যাত্মিক যাত্রা হয়ে ওঠে। এখানে কাজ, সম্পর্ক, সমাজ—সবকিছুই আল্লাহর প্রেমের প্রকাশের ক্ষেত্র। সুফি কবি ও সাধকেরা প্রায়ই বলেন, দুনিয়া আল্লাহর আয়না।

অর্থাৎ সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার সৌন্দর্যের প্রতিফলন রয়েছে। ফুলের সৌন্দর্য, মানুষের মমতা, প্রকৃতির সুর—সবকিছুর মধ্যেই আল্লাহর ঝলক প্রকাশিত হয়। তাই সুফিরা জগতকে ঘৃণা করে না; বরং এই জগতের মধ্যেই তারা আল্লাহর চিহ্ন খুঁজে পায়। সুফি চিন্তায় “ইশক” বা প্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এই প্রেম কেবল মানুষের প্রতি নয়, বরং সমস্ত সৃষ্টির প্রতি।  যখন মানুষ সৃষ্টিকে ভালোবাসে, তখন সে আসলে স্রষ্টারই প্রেমে আবদ্ধ হয়। এই প্রেমের মধ্য দিয়েই পার্থিব জীবন ধীরে ধীরে অপার্থিব অর্থ পায়। এই দর্শনে মানুষের কর্ম, শিল্প, সঙ্গীত, সেবা—সবই হতে পারে আল্লাহর স্মরণ (জিকির) এবং তাঁর প্রতি প্রেমের প্রকাশ। তাই সুফি সাধনার লক্ষ্য কেবল ধ্যান বা নির্জনতা নয়; বরং হৃদয়ের এমন পরিবর্তন, যেখানে মানুষ প্রতিটি কাজে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করে। অতএব সুফি চিন্তায় পার্থিব ও অপার্থিবের সম্পর্ক বিচ্ছিন্নতার নয়, বরং গভীর ঐক্যের। পৃথিবীর কাজ, মানুষের সেবা, প্রেম ও সৌন্দর্যের অনুভূতির মধ্য দিয়েই মানুষ ধীরে ধীরে আল্লাহর দিকে অগ্রসর হয়। দুনিয়ার পথেই খুলে যায় আধ্যাত্মিকতার দরজা—এটাই সুফি ভাবনার মূল সুর।

আমেরিকায় ধর্ম: সুযোগ, সংকট ও প্রভাব (পর্ব – ১)

অ্যামেরিকাতে ধর্মীয় চর্চা বেশ বৈচিত্র্যময়। এদেশ খ্রিস্টধর্ম প্রধান ধর্ম হলেও ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইহুদি ধর্ম এদেশের প্রধান অ-খ্রিস্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং বিশাল একটি আমেরিকান গোষ্ঠী নিজেদের নাস্তিক, সংশয়বাদী বা ‘কোনো ধর্মে বিশ্বাসী নয়’ হিসেবে পরিচয় দেন।

মার্কিন প্রথম সংশোধনী ও ধর্ম (First Amendment and Religion):

মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দুটি মূল বিধানের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে: ‘প্রতিষ্ঠা ধারা’ (Establishment Clause)—যা সরকারকে কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা কিংবা এক ধর্মকে অন্যটির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া থেকে বিরত রাখে; এবং ‘মুক্ত অনুশীলনের ধারা’ (Free Exercise Clause)—যা সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই ব্যক্তিদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারকে সুরক্ষা প্রদান করে।

অ্যামেরিকাতে ধর্ম চর্চার সুযোগ, সুবিধা ও অসুবিধা এবং জীবনে ধর্মের প্রভাব

অ্যামেরিকায় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান চর্চার সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত বিস্তৃত। দেশটি সংবিধানগতভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়ার ফলে মানুষ নির্বিঘ্নে নিজস্ব উপাসনালয় তৈরী, ধর্মীয় সংগঠনে নিরবিগ্নে, বাঁধাহীন অংশগ্রহণ, ধর্মীয় চর্চা করা এবং বিশ্বাস প্রকাশ করতে পারে।

ধর্ম কি?

ধর্মের সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। কারো কারো মতে ধর্ম একটি বিশ্বাসব্যবস্থা এবং একটি সামাজিক মানবন্ধন যা মানুষকে জীবনের মূল্যবোধ ও উদ্দেশ্য কী শিখায়, ভাল–মন্দের পার্থক্য বোঝায়, এবং সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক তুলে ধরতে সাহায্য করে। এছাড়াও ধর্ম শেখায় মানব সভ্যতাকে উপাসনা, নৈতিক শিক্ষা, আচার‑অনুষ্ঠান, এবং একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলা– যেখানে মানুষ একই বিশ্বাস ভাগ করে।

আবার অনেকের কাছে ধর্ম মানে ঈশ্বর-চর্চা বা আত্ম-চর্চা বা অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস, আবার কারও কাছে এটি নৈতিকতা ও জীবনদর্শনের পথ। মোটা দাগে, ধর্ম হচ্ছে মানুষের জীবনের অর্থ, শান্তি, পরিচয় ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামো।

আমার মতে, ধর্ম হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার জন্য আধ্যাত্মিকতা চর্চা করার অনুশীলন পদ্ধতি। ধর্ম চর্চা এমন এক আদর্শ অনুশীলন পদ্ধতি, যে পদ্ধতি অনুসরণ করে একজন মানুষ তার জীবনের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছাতে পারে। আমার জীবনের ক্ষুদ্র সময়ে অ্যামেরিকার বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে এবং পৃথিবীর নানান প্রান্তে থেকে আশা বিভিন্ন ধর্মীয় লোকজনের সাথে পরিচয় হবার সুযোগ হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমি প্রতিটা ধর্মকে একক হিসেবেই পেয়েছি।

আমি দেখেছি সকল ধর্মগুরুগণ ঠিক একই কথা বিভিন্ন ভাবে ব্যাক্ত করেছেন মাত্র তা ছাড়া আর কিছুই নয়। ধর্ম চর্চা নিয়ে আমদের সমাজে যত গোলযোগ সব আমাদের নিজস্ব সৃষ্টি। ধর্ম চর্চার মহান পদ্ধতিগুলো আমরা ধর্মগুরু, নবী-রাসুল, মহাপুরুষগণের মাধ্যমে পেয়েছি। একেকজন ধর্মগুরু, কালক্রম বা পরিবেশ ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এবং মানুষের যোগ্যতার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ছন্দে-ঢঙ্গে তাঁদের অনুশীলন পদ্ধতি তাঁদের অনুসারী, অনুরাগীদের দেখিয়ে দিয়েছেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন, শিখিয়ে গেছেন। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, মানুষ কোনো কালেই তাদের সময়ের উপস্থিত ধর্মগুরুগণের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারে নি। প্রতিজন ধর্মগুরুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি তাদের ধর্মগুরুর পদ্ধতি ধরে রাখতে পেরেছেন। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সময়ে আমাদের ধর্ম চর্চা পদ্ধতি কতটুকু সঠিক?

চলবে…

আবু জেহেল আসলে কে ছিলেন?

আমি মনে করি আবু জেহেলকে দেখার দুইটি ভঙ্গি আছে।প্রথমটি হলো সুফি জ্ঞানের আলোকে অন্তর্মুখী হয়ে বিষয়টিকে দেখা; দ্বিতীয়টি হলো কোরানে এই নামটি যে কারণে উপমা-অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া। এই ক্ষুদ্র লেখায় আমি দুইভাবেই দেখার একটি সহজ চেষ্টা করছি। সত্যতা ও ভাবের গভীরতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য কিছু দীর্ঘ উদ্ধৃতিও ব্যবহার করেছি।

সুফির চিন্তায়

জাহেল অর্থ, ‘বুদ্ধিজড়তা’। আইয়ামে জাহিলিয়াত মানে, এমন এক সময়কাল যখন অজ্ঞতা প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। এটিকে কেবল ইতিহাসের একটি সময়কালে আটকে দিলে চলবে না। কলিযুগও ঠিক তেমনই। বরং জাহেল প্রসঙ্গে আধ্যাত্মিক অনুভূতির ঘাটতিকে এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

‘‘কেতাবের বক্তব্য বুঝতে না-পারলে, তার তাৎপর্য আত্মগত বা চরিত্রগত না-করলে, পবিত্র গ্রন্থের যে মহানত্ব তার প্রভাবে বা সংস্পর্শে নিজেও মহান রূপে গড়ে না উঠলে গ্রন্থ কেতাব তখন নিছক এক বোঝা স্বরূপ। যা বহন করেও বাস্তবে কিছু ঘটে না। এমন ব্যক্তি যেন উচ্চতর মানবীয় গুণহীন একটা গাধাতুল্য। যেমন, কেউ পানির বোতল পিঠে নিয়ে ঘুরছে অথচ পিপাসায় মরার উপক্রম হয়েছে কিন্তু বোতল খুলে পানি খাওয়ার বুদ্ধি নাই- তার মতো অজ্ঞ বা জাহেল আর কে?
সামাজিক জীবনে দরকারি বিষয়ে জ্ঞানী না-হওয়ার প্রসঙ্গটি কোরানে বর্ণিত ‘অজ্ঞতা বা জাহেলিয়াত’  পরিভাষার অন্তর্গত নয়।
‘আপনি যদি উহাদের ছলনা হইতে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি উহাদের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হইব’। (১২ ইউসুফ: ৩৩ ইফাবা)
উপরিউক্ত বাক্যে যে আবেদন রয়েছে তার তাৎপর্য এই যে, আবেদনকারী এখনো ছলনাময়ীদের কবলে পড়েনি এবং তাই তিনি এখনো অজ্ঞ বা জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য নন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে তাদের ছলনা থেকে রক্ষা না করলে অজ্ঞ বা জাহেলরূপে তাঁর প্রকাশ ঘটবে। ইউসুফ নবির সাথে জড়িত ঐ ঘটনাটি আসলে সকলের জন্যা আদর্শ। আপাতদৃষ্টে, এটি সামাজিক জীবনের একটি প্রসঙ্গ হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কিন্তু ব্যক্তির একান্ত আধ্যাত্মিক চেতনা বা অনুভবের সাথে জড়িত। এরূপে যা মানবীয় সম্ভাবনাকে জ্ঞানময় না-করে অজ্ঞতায় পর্যবসিত করে তাই জাহিলিয়াত’’।    

– কোরানে মানুষতত্ত্ব, পরম্পরা ৫ (রচয়িতা: হিলালুজ্জামান হেলাল)

ব্যক্তি আবু জেহেল

আবু জেহেল ছিলেন গভীর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তদানীন্তন কোরাইশ প্রবীণ নেতারাও তাকে তার দক্ষতা বা উপলব্ধির জন্য বিশেষভাবে বিবেচনা করত। সে তাদের গোপন বৈঠক বা শলা-পরামর্শ গৃহ ‘দারুন নাদওয়ার’ এ যোগ দিতেন। এ সম্মেলনে প্রবেশের জন্য বয়স লাগত কমপক্ষে ৪০ বছর অথচ তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। তার উপাধি ছিল আল-হাকাম অর্থাৎ ‘বিজ্ঞবিচারকের পিতা’ বা জ্ঞানীর বাপ। মূলত তার বিজ্ঞতা ছিল পার্থিব ক্ষেত্রে। ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যাত্ম জগতে তার বিজ্ঞতার পরিবর্তে ছিল শুধুই বিভ্রান্তি। ফলে রসুলুল্লাহ তাকে আবু জেহেল উপাধি দেন। (সীরাতুল মুস্তফা ২য় খণ্ড, পৃ-৯০) এর অর্থ ‘অজ্ঞলোকের বাপ বা পিতা’। তার আসল নামের বিপরীতে শেষোক্ত চারিত্রিক উপাধাটিই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। এটা এক আশ্চর্য ব্যাপার- হাকিম হয়ে গেলেন জাহেল!

– কোরানে মানুষতত্ত্ব পরম্পরা ৫ (রচয়িতা: হিলালুজ্জামান হেলাল)

আবু জেহেলের আসল নাম, আমর ইবনে হিশাম। তিনি হযরত ওমরের মামা ছিলেন।

আমার ভাবনা: আধুনিককালের আবু জেহেল

সুফি মতে, আধ্যাত্মিক জ্ঞানহীন মানুষ প্রত্যেকেই একেকজন ছোট বা বড় ‘আবু জেহেল’ বিশেষ। ফলে সাধকগণ ব্যতীত বাকিরা এই খেতাবের অংশীদার। এক্সট্রিমিস্টদেরকে কেবল যদি লিবারেলরা এই তকমা দেন তাহলে যেমন চলবে না, আবার লিবেরেলদেরকেও এক্সট্রিমিস্টরা এই তকমা দেওয়ার এখতিয়ার রাখেননা। মানে কেবল এই দুই ব্যক্তিবর্গের মাঝে এই তকমা সীমাবদ্ধ নয়।

আমাকে আকৃষ্ট করে আবু জেহেলের দুনিয়াবি জ্ঞানের যে ভাণ্ডার ও তার যে মোহনীয় গুণ সেই ব্যাপারটি। এই যে এত বোঝাপড়া যে মানুষটির, যে সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জাতির জন্য, যার বেশ ফ্যান ফলোয়ার, এবং তার যে চারিত্রিক দাপট সেটাই আমাকে আকৃষ্ট করে। কারণ আমি আমার আশেপাশে এমন মানুষ দেখি। যারা আসলেও হাকিম, জ্ঞানীর বাপ। এমন কিছু জ্ঞানীর বাপে আমিও মুগ্ধ। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো লম্বা সময় ধরে একটা লিগেসি বানিয়ে তারা শুষে নিচ্ছেন পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর সৃষ্টির পবিত্র সম্ভাবনাকে, হয়তো অজান্তেই।

কোরান দর্শনে ‘জিন’ পর্যায়ের মানুষদের প্রসঙ্গে বলা আছে যে তারা আগুনের তৈরি। কেননা আগুনের শিখা মাথা নোয়াতে জানেনা। মাথা না নোয়ালে সিজদাহ হবে না। সিজদায় না গেলে আত্মসম্পর্মণ হলো না। অতএব, সে মুসলিম হলো না। তার মাঝে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেলো না। বুদ্ধিধার ও চিন্তার যে প্লেজার ও অহম সেটা জিনের বৈশিষ্ট্য। তৌহিদ-জ্ঞান বিবর্জিত এমন একজন ব্যক্তি বেশ ভালো মানের একজন আবু জেহেল বলতে হবে। যেকোনো ধারণার সাথে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তিনি ডান বাম, লাল নীল, আস্তিক নাস্তিক সবই হতে পারেন।

''জিন: জাতি হিসাবে ইহারা মানুষ হইতে মর্যাদায় নিম্নমানের। ইহারা সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তি বিশিষ্ট আগুনের তৈয়ারী জীব। আদমের সন্তান হিসাবে মানুষের মধ্যে ফেরেস্তা এবং জিনভাব উভয়ই বিদ্যমান। সুতরাং যাহাদের মধ্যে জিনভাব বেশী প্রবল তাহাদিগকেও জিন বলা যাইতে পারে।''

– কোরান দর্শন , শব্দ সংজ্ঞা, সুফি সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতি

জন্ম যে ঘরে, সে ঘরের ধর্ম পালন করা হয় কথাটা সকলেই বোঝে। বুঝেও ধর্মীয় নানা ভীতি ও অহমের চোটে ব্যাপারটিকে অনেকেই মানতে চাননা বা বলতে চাননা। কিন্তু এ প্রসঙ্গেও উল্লেখ আছে,

''যখন তাহাদিকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহা তোমরা অনুসরণ কর’, তাহারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদিগকে যাহাতে পাইয়াছি তাহার অনুসরণ করিব।‘ এমনকি, তাহাদের পিতৃপুরুষগণ যদিও কিছুই বুঝিত না এবং তাহারা সৎপথেও পরিচালিত ছিল না, তথাপিও?''

– ২ বাকারা: ১৭০, ইফাবা

সুফি সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতি এর কোরান দর্শন থেকে আয়াতটির ব্যাখ্যা: ''পিতৃপুরুষদিগকে অনুসরণ করিবার অভ্যাস ধর্মজীবনে সত্যলাভের পথে শক্তিশালী একটি বাধা। মানুষ পিতৃপুরুষের দোহাই দিয়া ধর্মের মধ্যে মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিতে ভালোবাসে। এইজন্য জনগণ পূর্বপুরুষদের অনুসৃত মিথ্যা ত্যাগ করিয়া উপস্থিত মহাপুরুষ হইতে সত্যপথ গ্রহণ করিতে চাহে না। অথচ পিতৃপুরুষগণ যাহা অনুসরণ করিয়া গিয়াছে তাহা বুদ্ধি প্রয়োগ করিয়া করে নাই। অর্থাৎ ভোগকে উপভোগে পরিণত করিবার বুদ্ধি প্রয়োগ করে নাই, বরং মনুষ্য জীব হিসাবে জৈবিক ভোগের ধারাই অনুসরণ করিয়াছে। ‘কোনো বিষয়েই বুদ্ধি খাটায় নাই’ অর্থাৎ কোনোও একটি বিষোয়মোহ হইতেও মুক্তিলাভের বুদ্ধি খাটায় নাই। সেইজন্য হেদায়েতও পায় নাই।''

অতএব, বাপ দাদার ধর্ম মেনে যে এক্সট্রিমিস্ট আবু জেহেল আছে বলে অনেকে ভাবছেন তাদেরকে চেনা সহজ। যারা নাস্তিকদের আবু জেহেল বলতে চান তাদেরকেও চেনা সহজ। কিন্তু আধুনিককালে এসে মনের রাজত্ব দখল করতে আগত বিজ্ঞ, সূক্ষ্ম চিন্তার ব্যক্তিদেরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আবু জেহেল। এবং ভারী বিপদজনক আবু জেহেল তারা। কেননা মানব মনের প্রেম, ভক্তিভাব ও পরম্পরাগত বিষয়গুলোকে অনেকাংশে তারা হাস্যরসে পরিণত করেছেন। উঠতি তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মাঝে এই প্রেমের প্রতি অনাগ্রহ প্রায়শই নজরে পড়ে। হৃদয়টা মেলে ধরতে কোথায় যেন একটা লজ্জাবোধ হয়।

আমি মনে করি এই বুদ্ধিজীবী আবু জেহেলরা সম্ভাবনাময় সন্তানদের মূলত দ্বন্দে ফেলে রাখেন। আমার মনে করায় ত্রুটি থাকতে পারে, আমার মনে করায় রদবদল আসতে পারে। কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে এবং আমার বিগত জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি যা অনুভব করছি সে অনুযায়ী এমন একটা ভাবনায় আসার ক্ষেত্রে আমার খুব জোরালো মনোভাব আছে।    

তাই আমি মনে রাখতে চাই,

– ৭ আরাফ: ১৯৯ ইফাবা

সুফি সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতি এর কোরান দর্শন থেকে আয়াতটির ব্যাখ্যা: ''মহানবী জনগণলে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছেন যে, দুর্বল আল্লাহ হইতে তাহারা যাহাদিগকে সাহায্যার্থে ডাকিয়া থাকে (তাহা বিষয়াশক হউক বা মানুষ হউক) তাহারা কাহাকেও মুক্তিপথের সাহায্য দানে সমর্থ নহে এবং তাহারা আপন নফসকেও সাহায্য করে না, করিতে পারে না। কারণ তাহারা ধর্ম বিষয়ে অজ্ঞান এবং ভ্রান্ত।

নূর-মোহাম্মদ মানুষ-মোহাম্মদকে বলিতেছেন: ধর্ম বিষয়ে এইসকল ভ্রান্ত লোককে হেদায়তের দিকে ডাকিলেও তাহারা শুনে না, যেহেতু তারা ধর্মরাশির গুরুত্ব উপলব্ধি করে না। সত্যিকার অর্থে তাহারা বধির, অন্ধ। তুমি দেখিতেছ যে, তাহারা তোমার দিকে তাকাইয়া আছে কিন্তু তাহারা তোমার বাহ্য মানবাকৃতি ছাড়া কিছুই দেখিতেছে না। তাহারা অসালাতী। তাই তাহারা অন্তর্দৃষ্টিহীন জ্ঞানান্ধ।

অতএব এইসকল অন্ধজনের প্রতি স্নেহের ক্ষমার দৃষ্টিদান কর। স্নেহের সহিত তাহাদিককে ধর্ম দর্শন দিক্ষা দাও তথা সালাত শেখাও। যেসকল মূর্খজন সালাতের শিক্ষা গ্রহণ করিতে রাজি হইবে না তাহাদিগ হইতে সরিয়া থাক। তাহাদিগকে লইয়া অকারণ সময় নষ্ট করিয়া লাভ নাই’’। 

একজন অসালাতী জাহেল ব্যক্তি সামাজিক চোখে খারাপ মানুষ যেমন হতে পারেন, তেমনি ভালো মানুষও হতে পারেন। ব্যক্তি পর্যায়ে সাধনার ক্ষেত্রে মনের দ্বিধা দূর করার জন্য যে সঙ্গ প্রয়োজন, নিজের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য বাচালতাহীন যে সমপর্ণের হাল প্রয়োজন তার জন্য নিজ নিজ আবু জাহেলকে চিনতে পারা একটি জরুরি বিষয়।

এই কারণে দেখা যায়, সাধকেরা বুদ্ধিজীবি মানুষদের পারতপক্ষে এড়িয়ে চলেন। ভক্তিকে আধুনিক মানুষ ভুলভাবে দেখতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় পেষণ ও পীড়নের পাঠে তারা এতই মজবুত যে এই পরম প্রেমের মাঝেও তারা মগজধোলাই দেখতে পান। একমাত্র রসের আলাপকারীরাই জানেন যে অন্তর শীতল হয় কেবল সাধুসঙ্গে। সভা বা সেমিনারে তাত্ত্বিক তৃপ্তি পাওয়া যায়। সেটিও মন্দ নয়। কিন্তু সেটিই যদি পারমার্থিকভাবকে খোঁজার একমাত্র জায়গা হয়ে থাকে তাহলে বিপদ আছে বৈকি!

সুফি দৃষ্টিতে, যেখানে জ্ঞান আছে কিন্তু বিনয় নেই, বুদ্ধি আছে কিন্তু সমর্পণ নেই, বিশ্লেষণ আছে কিন্তু হৃদয়ের রস নেই—সেখানেই আবু জেহেলীয়তার জন্ম হতে পারে।

আবু জেহেল কেবল ইতিহাসের একটি চরিত্র নন; তিনি মানুষের অন্তর্জগতে পুনরায় জন্ম নেওয়া এক মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রবণতার নাম। যেখানে বুদ্ধি আছে কিন্তু বিনয় নেই, জ্ঞান আছে কিন্তু আত্মসমর্পণ নেই, ভাষা আছে কিন্তু হৃদয়ের রস নেই সেখানেই আবু জেহেলীয়তা জন্ম নিতে পারে। তাই সাধনার পথে সবচেয়ে জরুরি কাজ বাইরের আবু জেহেলকে চিহ্নিত করা নয়, বরং নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই অহং, জড়তা ও বুদ্ধির মোহকে চিনে ফেলা।

যে মুহূর্তে মানুষ নিজের অন্তর্গত জাহেলিয়াতকে দেখতে শেখে, সেই মুহূর্ত থেকেই তার জ্ঞান হৃদয়ে অবতীর্ণ হওয়ার পথ খুলে যায়।

জ্ঞান যখন নারীর মুখ, কিন্তু কণ্ঠস্বর নয়

জ্ঞানকে জাগতিকই হোক বা আধ্যাত্মিক পথের সন্ধানেই হোক গুরুত্ব দেয়া হয়। বহু ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিতে এই প্রজ্ঞা, জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা হয় নারীকে।

সংস্কৃত ‘প্রজ্ঞা’ শব্দটিই স্ত্রীবাচক। বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞা (Prajñā) বা জ্ঞান স্ত্রীবাচক শব্দ। আরবি ভাষায় হিকমাহ (hikmah) শব্দটিও স্ত্রীবাচক, যা জ্ঞানকে নারীত্বের সাথে ভাষাগতভাবে যুক্ত করে। ইসলামি দর্শনে হিকমাহ জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও নৈতিক প্রজ্ঞার প্রতীক। তবে কেবল ভাষাগত অলীক ধারণায় নয়, সুস্পষ্টভাবেই নারীর সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে জ্ঞান। নারী এখানে কেবল জ্ঞানের ধারক নয়, বরং নিজেই জ্ঞান।

বহু ঐতিহ্যে জ্ঞানকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। হিন্দু দর্শনে জ্ঞান সরাসরি নারীরূপে পূজিত। সরস্বতী কেবল বিদ্যার দেবী নন, তিনি সৃজনশীলতা, ভাষা ও চেতনার উৎস। ‘শক্তি’ ধারণায় নারীত্বই সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি। যেখানে জ্ঞান, শক্তি ও অস্তিত্ব একে অপরের সাথে নীবিড়ভাবে যুক্ত। কালী ও দুর্গা শুধু শক্তি নয়, ‘মহামায়া’—যিনি জগতকে ধারণ করেন এবং জ্ঞান দেন।

বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞা মুক্তির অপরিহার্য উপাদান। প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রে প্রজ্ঞাকে ‘সমস্ত বুদ্ধদের জননী’ বলা বলা হয়। অর্থাৎ জ্ঞানই বোধিলাভের জন্মদাত্রী। প্রজ্ঞা ও করুণা (karuṇā)—এই দুইয়ের মিলনেই ঘটে বোধিলাভ। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে প্রজ্ঞাকে নারীত্বের সাথে এবং উপায় (upāya) কে পুরুষত্বের সাথে যুক্ত করে দার্শনিক ভারসাম্য তৈরি করা হয়েছে।

হিব্রু বাইবেলে ‘Book of Proverbs’-এ জ্ঞানকে নারী রূপে (Lady Wisdom) চিত্রিত করা হয়েছে। গ্রিক দর্শনে অ্যাথেনা প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের প্রতীক। খ্রিস্টীয় ও গনস্টিক ঐতিহ্যে সোফিয়া (Sophi) ঈশ্বরীয় জ্ঞানের প্রতীক। কিছু ব্যাখ্যায় ভার্জিন মেরিকে ডিভাইন উইশডম এর ধারক হিসেবে দেখা হয়।

সুফি দর্শনে নারীকে প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে দেখার একটি গভীর ও বহুস্তরীয় ঐতিহ্য আছে। এখানে নারী কেবল জৈবিক সত্তা নয়—বরং ‘মারফত’, ‘আত্মজ্ঞান’ ও ‘সত্য-উপলব্ধি’-র প্রতীক। সুফি তত্ত্বে ‘জ্ঞান’ (Ma‘rifa) অর্জন মানে আল্লাহর সঙ্গে অন্তর্গত সংযোগ। এই জ্ঞানকে প্রায়ই নারীরূপে কল্পনা করা হয়—প্রেমিকা, প্রিয়তমা বা রূপসী সত্তা হিসেবে। আত্মা (সালিক) এখানে প্রেমিক, সত্য/ঈশ্বরীয় জ্ঞান এখানে প্রেমিকা। এই জ্ঞানকে ‘অর্জন’ নয়, ‘প্রেমের মাধ্যমে উপলব্ধি’ করা হয়। রুমির কবিতায় যে প্রিয়তমা সে ঈশ্বরীয় জ্ঞান ও সত্যের প্রতীক। ইবনে আরাবি তার Fusus al-Hikam এ নারীর সৌন্দর্যকে ঈশ্বরের সর্বোচ্চ প্রকাশ বলেছেন। কারণ নারী সৃষ্টিশীলতা ও জ্ঞানের পূর্ণ প্রতিফলন।

বাউল ধারাও এক্ষেত্রে এক। বাংলার বাউল ও সুফি গানে ‘মনের মানুষ’, ‘সই’, ‘প্রেমিকা’—এসবই আসলে আত্মজ্ঞান বা প্রজ্ঞার রূপক। লালন ফকিরের গানেও নারী কখনো গুপ্ত জ্ঞান কখনো বা আত্মার প্রতীক হিসেবে এসেছে।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে জ্ঞানের সাথে দেবতাদের চেয়ে বেশি দেবীদের যুক্ত করা হয়। যেমন গ্রিক দেবী অ্যাথেনা ও মেটিস। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত গ্রিসে মেটিস জ্ঞানের দেবী হিসাবে পূজিত হয়েছেন। জাদুবিদ্যা ও পুনর্জন্মের জ্ঞান নিয়ে রয়েছেন মিশরীয় পুরানের অন্যতম প্রধান দেবী আইসিস। হিন্দু ধর্মে জ্ঞানের দেবী স্বরসতী ছাড়াও রয়েছেন শৈব ও শাক্তধর্মের ঐতিহ্যে দেবীতারা, যিনি দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় মহাবিদ্যা।

অন্যদিকে, ইয়িন-ইয়াং দ্বৈত তত্ত্বে নারীত্ব ও পুরুষত্বকে মহাবিশ্বের দুই মৌলিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়। এখানে ইয়িন নারীসুলভ ও অনুভূতি, অর্ন্তজগতের প্রতীক। ইয়িন-ইয়াংয়ের দ্বৈততার পারস্পরিক ক্রিয়াতেই সৃষ্টি ও ভারসাম্য বজায় থাকে। কনফুসীয় ও তাওবাদী সৃষ্টি কাহিনী এ ধারণা সমর্থন করে। কবি নজরুল যেমনটা বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।

মনোবিশ্লেষণেও এই ধারণার প্রতিধ্বনি আছে। মনোবিশ্লেষক কার্ল জং এর মতে পুরুষের অবচেতনের যে নারীত্ব (anima) তাই হলো অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞার উৎস। এখানে নারীত্ব মানে কেবল লিঙ্গ নয়, বরং মানসিক গুণ—অর্ন্তদৃষ্টি, গভীরতা, ধারনক্ষমতা। তবে আধুনিক দৃষ্টিতে এই গুণগুলো লিঙ্গনিরপেক্ষ—মানবিক গুণ হিসেবেই বিবেচিত।

যুগে যুগে জ্ঞানের এই নারীকরণ পুরুষের নারীর প্রতি চাহিদার সাথেও সম্পর্কিত। সমাজে প্রচল এর মূল ধারণাটি হলো, নারী পুরুষকে রূপান্তরিত করতে পারে। হয় ডাইনির মতো নেতিবাচকভাবে, নতুবা প্রজ্ঞার মাধ্যমে ইতিবাচকভাবে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যেখানে নারীকে জ্ঞানের উৎস, ধারক, এমনকি স্বয়ং জ্ঞান হিসেবে কল্পনা করা হয়, সেখানে বাস্তব সমাজে কেন তাকে জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে রাখা হয়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো সামনে আসে। দি সেকেন্ড সেক্স গ্রন্থে সিমোন দ্য বুভোয়ার দেখান, নারীকে প্রতীকী মর্যাদা দিলেও বাস্তবে তাকে অধীনস্থ রাখা হয়েছে। ফলে প্রতীকী সম্মান ও বাস্তব বৈষম্যের এই দ্বৈততা স্পষ্ট।

এই দ্বৈততা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—নারী কি কেবল জ্ঞানের প্রতীক হয়ে থাকবে? নাকি প্রতীকের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনে সমতা প্রতিষ্ঠা করবে।

জাগতিক না পারমার্থিক?

এই বিশ্বজগতে যত রূপকাঠামো রহিয়াছে তাহার মধ্যে মানবদেহই সব চাইতে উন্নত বলিয়া পরিগণ্য হইবে ইহাতে সন্দেহ কী। আধুনিক যুগে অনেকেই মানবদেহের কারিগরি ত্রুটি লইয়া যতই আপত্তি করুন না কেন ইহার চাইতে উত্তম কোন পরিকাঠামো বা device বিশ্বগজতে আর কিছু রহিয়াছে বলিয়া আমরা জ্ঞাত নহি। প্রকৃতিতে এমন সুন্দরতম অবয়ব বা device কীভাবে বিকশিত হইল?—কিংবা কে এমন ডিভাইস এর ডিজাইনার?—তাহা লইয়া বহু বিতর্ক হইতেই পারিবে, কিন্তু এমন মহা সুন্দর অবয়ব বা device আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে বলিয়া মনে বিশ্বাস হয় না।

এইরূপ অবস্থায় আসিয়া ভাবুক মনে প্রশ্ন আসিয়া হাজির হইতে পারে যে, এই উত্তম অবয়ব বা ডিভাইসটি কি শুধুই জাগতিক নিয়মে জগতের শোভা বর্ধনে গঠিত হইয়াছে নাকি ইহাতে কোন পারমার্থিক তাৎপর্য  নিহিত রহিয়াছে? মানুষের বাস্তব জীবন যাহা লইয়া চলিলে জীবন সমৃদ্ধ হইয়া থাকে বলিয়া যেইরূপ ধারনা আধুনিককালে গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাই কি মানবজীবনের সার কথা? নাকি ইহাতে যোগ করিবার আরও বহুবিধ গুণাবলি সুপ্ত রহিয়াছে? বিশ্ব জগতের কোন পরম অর্থ গুপ্ত হইয়া মানবের মাঝে লুকাইয়া নাহি তো?

যদি জাগতিক জীবনে সাধারণ প্রয়োজন সমূহ কিংবা বিবিধ কৃত্রিম প্রয়োজনাবলি পরিপূরণ করিয়া মানবজীবন ধন্য হইয়া থাকে তাহা হইলে মৃতোত্তর জীবন বলিয়া কিছু না থাকিলেও চলিবে। পৃথিবীতে বহু মানুষ এইরূপ ভাবিয়া-করিয়া নিজেকে বিজ্ঞ বলিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিয়া থাকেন। এমতাবস্থায় অন্য কাহার মনে জিজ্ঞাসার উদয় হইতে পারিবে—তাহা হইলে এই বিশাল অস্তিত্বের এমন আয়োজন কেন করা হইয়াছে? এত সুন্দর অবয়বের মানুষ সৃষ্টির কী প্রয়োজন ছিল? ইহার কিছুই পরম ভাববহ নহে?

উপরোল্লিখিত প্রশ্ন সমূহ সকলের অন্তরে একইরূপ প্রভাব তৈরি করিবে না। কিন্তু জগতে বহু মানুষ রহিয়াছেন যাঁহারা ঐ সকল প্রশ্নে গুরুত্ব দিয়া ভাবিতে ইচ্ছুক না হইয়া পারিবেন না। ফলত ভাবুক অন্তরে নানান রকম অনুভূতির বিকাশ ঘটিয়া থাকে। তাঁহারা মানবজাতির সুদীর্ঘ কালে জমাকৃত সামষ্টিক অভিজ্ঞতা হইতে যে বোধানুভূতির পরিচয় পাইয়া থাকেন তাহা একজীবনের ভোগবাদী মানুষের ধারনা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। সাধারণ জাগতিকতার বিপরীতে একটি বিশিষ্ট পারমার্থিকতা দ্বারা বোধিত হইয়া তাঁহারা মানব জীবনকে অনন্য বলিয়া গ্রহণ করিয়া থাকেন। এমন সুযোগ তাহারা হেলায় নষ্ট করিতে চাহেন না। মানবজীবনের পরম অর্থ খুঁজিতে তাঁহারা কোন দ্বিধায় কিংবা ক্লান্তিতে ক্ষান্ত হইয়া পড়েন না। মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের সত্যিকার ধারক বাহক প্রচারক ইঁহারাই।

মানবকুল পার্থিব জগতে বাস করিয়াও যে পারমার্থিক তাৎপর্য পরিগ্রহ করিয়া থাকেন তাহা বলাই বাহুল্য বটে। ইহা লইয়া নানান রকম তর্ক করিয়া বৃথা বুদ্ধি নাশ করিয়া কাহার কোন জাগতিক কিংবা পারমার্থিক উপকার হইয়াছে বলিয়া বিশ্বাস হয় না। মানুষের মাঝে স্বল্প সংখ্যক গুণবান ব্যক্তি ইহার প্রত্যক্ষকরণ সম্ভব করিতে পারেন। অন্যরা অনুমানে উপলব্ধি করিতে সচেষ্ট হইয়া থাকেন। সংখ্যাধিক মানুষের প্রত্যক্ষানুভূতিতে নাই বলিয়া কুশলী তর্কবিদগণ ইহাকে বিভ্রান্তিকর ভাবিয়া ইহার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। এই জাতীয় আচরণ যতই চমৎকার বলিয়া প্রতিভাত হউক না কেন তাহা নিতান্তই চার্বাকবৎ, শুধুই পার্থিব পান্ডিত্যপূর্ণ অবিদ্যা—পারিমার্থিক নহে। অথচ আমরা বলিতেছি যে, মানুষ একই সঙ্গে পার্থিব এবং পারমার্থিক—এই যুগল রূপের এক অভিন্ন সত্তা।

এই ধরাধামে কত মুণি ঋষি অলি দরবেশ নবি রসুল আসিয়াছেন তাহার ইয়ত্তা নাই। তাঁহারা সকলেই মানুষের মাঝে উক্তরূপ বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। এই বিজ্ঞান চিরন্তন, নিত্য সনাতন। যাঁহারা গুণীজনের সঙ্গ করিয়া উপযুক্ত পরিচর্যা করিবেন তাঁহারা ইহা প্রত্যক্ষ করিবেন—ইহাতে কোনরূপ সংশয় নাই।

উক্তরূপ বোধ হইতে উদ্ভূত চিন্তা দ্বারা চালিত হইয়া আন্তর্জালিক (internet) সুবিধাকে ব্যবহার করিয়া যে নবাগত পারমার্থিক প্রকাশধারা সূচিত হইতে চলিয়াছে তাহাকে স্বাগতম। গভীর হৃদয়াবেগ মিশ্রিত অনুভব থেকে এই কর্মযজ্ঞের সহিত জড়িত সকলকে অভিনন্দন।

পুষ্পিতা

৪ মার্চ ২০২৬

কহিতে পারিব কি?

যত প্রশ্ন মনে উদিত হয় সব কি নির্ভয়ে বলিতে পারি আমরা? পারি না।

অনেক জিজ্ঞাসা মনে আসিলেও উচ্চারণ করি না! কিন্তু প্রশ্ন তো জাগে। জিজ্ঞাসা করিবো কাহার কাছে? করিলে উত্তর না পাইলেও ক্ষতি নাই কিন্তু বিপদে পড়িবার আশঙ্কা বিলক্ষণ!

যেমন, ছোটবেলায় অবুঝ মনের জিজ্ঞাসা ছিল,

  • আল্লাহ তো নিরাকার, তাহা হইলে মেরাজে গিয়া নবীজি আল্লাহর দিদার লাভ করিলেন কীভাবে?
  • কোরআনের প্রথম নাযিলকৃত আয়াত ‘ইকরা বে ইসমি রাব্বিকা..’ তাহা হইলে আমরা যে কোরআন পাঠ করি, তাহা কেন সূরা ফাতিহা দিয়া শুরু?
  • শবে বরাতের রাতে গাছপালা নাকি সেজদায় থাকে। শিশুকালে গভীর কৌতূহল লইয়া জানালা খুলিয়া দেখিয়াছি, বৃক্ষকুলের কেউ সেজদায় (নিচু হইয়া) নাই, সকলেই বহাল তবিয়তে দণ্ডায়মান!

শিশুমনের এইরূপ কতশত জিজ্ঞাসা! গ্রহণযোগ্য উত্তর না পাইয়া কেবল মনের মাঝে ঘুরিয়া বেড়াইত।

আমার বাবা-মা হাজি, নামাজি এবং রোজাদার ছিলেন। রক্ষণশীল ধর্মভীরু পরিবারে আমার জন্ম। ধর্মীয় আবহে বড় হইয়াছি। বড় বড় সূরা মুখস্ত করিয়াছি। প্রতি রমজানে কোরআন খতম। ইয়াসিন আর রহমান এরকম বড় সুরা মুখস্ত করিলে আম্মা নতুন জামা দিতেন। তিনি(আম্মা)খুব দ্রুত অর্থ বুঝিয়া, ব্যাকরণ জানিয়া আরবি পড়িতেন। এইসব কথা বলিয়া বুঝাইতে চাহিতেছি, আমি নাস্তিক কিংবা ধর্মবিদ্বেষী মানুষ না। পাঠক যেন শুরুতেই আমাকে ভুল বুঝিয়া না বসেন!

যাহা হউক, এইসব জিজ্ঞাসা মনে পুষিয়া রাখিয়া বড় হইয়াছি, বুড়ো হইয়াছি। জীবনে প্রথম বড়সড় ধাক্কা খাইলাম অধ্যাপক মোফাখখারুল ইসলামের ‘ইতিহাসগত বিভ্রান্তির রহস্য’ বইটি পাঠ করিয়া!

তাহার পর সুফিগুরু সদর উদ্দিন আহমেদ চিশতি(র.)র মাওলার অভিষেক, রমজান দর্শন, কোরআন দর্শন…। শ্রদ্ধেয় গুরুভাই লেখক, গবেষক হিলালুজ্‌জামান হেলাল রচিত ‘কোরআনে মুমিনতত্ত্ব’, ‘কোরআনে মানুষতত্ত্ব’ ইত্যাদি নামের মহামূল্য গ্রন্থসমূহ অনেক জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়াছে! আল কোরআনের আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা পড়িয়া মনে হইয়াছে এই তো আমার ছোট এবং বড়বেলার ধর্মসংক্রান্ত সকল জিজ্ঞাসার সরল-উত্তর!

সত্যসন্ধানী মন এক সময় না একসময় ঠিক উত্তরের কাছে পৌঁছায় কিংবা উত্তরই তাহার কাছে আসিয়া হাজির হয় । সহজ,সুন্দর,শুদ্ধ বোধ হইতে উৎসারিত অনুভব নিয়া সত্যানুসন্ধানী কিছু মানুষ পারমার্থিক প্রকাশনার আলো জ্বালাইবার প্রয়াস লইয়াছে।

মহতি এই উদ্যোগের আলোয় আলোকিত হউক অন্ধকার।

আমার মতো অনকেরেই মনে হয়তো আছে অনেক জিজ্ঞাসা। খোলামন লইয়া জিজ্ঞাসা করিলে পারমার্থিকের এই ধারাবাহিক প্রকাশনা অনুসন্ধিৎসু মনের পিপাসা অনেকখানি মিটাইতে পারিবে বলিয়া বিশ্বাস করি।

পহেলা বৈশাখ, ঢাকা।