Home Blog Page 2

প্রশ্ন: ওহাবি ও মোজাদ্দেদি চিন্তাদর্শন কেন দ্বৈতবাদী—তারা তো একত্ববাদই মানে?

উত্তর: ওহাবি চিন্তাদর্শন ভাবগতভাবে আল্লাহর নাম, গুণ, এবাদত সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর একত্বে বিশ্বাসী। যা বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা ইন্দ্রিয়জ ব্যাপার। এতে যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর একত্ব প্রমাণ করা যায় বটে কিন্তু তা অতীন্দ্রিয়জ বা সত্তাকারে বুঝা যায় না। তাই যিনি বিষয়টি এভাবে বোঝেন তাকেও বর্তমান থাকতে হয়। ফলে ২ টি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় থাকে—যিনি বোঝেন তিনি অর্থাৎ ব্যক্তি মানুষটি এবং যাঁকে বুঝা হয় তিনি তথা আল্লাহ্। ফলে যাঁকে বোঝা হচ্ছে সেই আল্লাহ্ সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে ১ জন প্রমাণিত হলেও যিনি তাঁকে বুঝতে পারছেন (বা উক্ত ব্যক্তি) তাঁরও স্বকীয়তা টিকে থাকছে আরো ১ জন রূপে। প্রাসঙ্গিক কারণে সমস্ত সৃষ্টিজগতকেও আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে—তাই তা আপনা থেকে দ্বৈত অবস্থার সৃষ্টি করছে। সুতরাং তা একত্ববাদ হলো না—দ্বৈতবাদই হলো। আবার মোজাদ্দেদি চিন্তাদর্শন সাধনার চূড়ান্ত পর্যায়ে অতীন্দ্রিয় অনুভূতির সাহায্যে আল্লাহকে সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে ১ জন বলে বুঝতে পারেন বলে দাবি করা হয়। এবং সাধক ব্যক্তি তাঁর এবাদতে মশগুল থাকেন। এতে আল্লাহর সাথে এবাদতে কোনো শেরেক থাকে না—যা একজন মানুষের জীবনে এক বড় অর্জন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও পূর্বের ওহাবি দর্শনের মতো ২ টি অস্তিত্বে গিয়ে বিষয়টি থেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ এবাদতকারী এবং যাঁর এবাদত করা হচ্ছে সেই তিনি। সুতরাং তা একত্ববাদ নয়, দ্বৈতবাদ।

যখন কেউ মূর্তি পূজা করে তখন সে ঈশ্বরকে মেনে নিয়েই তা করে। তার মূর্তি এ ক্ষেত্রে ঈশ্বরের উপলক্ষ্য। একই ধারণা প্রয়োগকৃত হয়ে আছে দ্বৈতবাদী দর্শনে। মূর্তিপূজক, মূর্তি আর ঈশ্বর যেমন ঠিক তেমনি এবাদতকারী, সৃষ্টিজগত আর আল্লাহ্। সমস্ত সৃষ্টিজগত যেন একটি মূর্তি—যা ঈশ্বর বা আল্লাহর বিপরীতে রয়েছে। আর মূর্তিপূজক বা এবাদতকারী ঈশ্বর বা আল্লাহকে ১ জন বলেই মেনে চলেছেন। এমনকি এখানে নিজেকেই আল্লাহর সমান্তরাল বলে দাবি করা হচ্ছে। যেন বলা হচ্ছে যে, ‘আল্লাহ তুমিও আছ, আমিও আছি’। এটা আল্লাহর একত্ববাদ হলেও, অস্তিত্বের দ্বৈতবাদ—যা শেরেক বলে গণ্য। আসলে ওহাবি দর্শন প্রাথমিক পর্যায়ের, চূড়ান্ত দর্শন নয়। আর কেউ কি মনে করতে পারে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিক্ষালাভের চূড়ান্ত ক্ষেত্র—আর কোনো শিক্ষা নেই? মোটেই তা হতে পারে না। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া উচ্চতর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। অর্থাৎ পর্যায়ক্রমিক ধারা ঠিক রেখেই শিক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে হয়। নতুবা অজ্ঞতার অবসান হয় না। আর উচ্চতর পর্যায়ে বেশি মানুষের পক্ষে সাফল্য লাভ সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু উচ্চতর সাফল্য লাভ করতে না-পারা এক কথা আর সেটাকে অস্বীকার করা আরেক কথা। এ জাতীয় অস্বীকার করণ একটা বড় ধরনের কুফরি।

তাই এটা খুব স্পষ্ট যে, ওহাবি ও মোজাদ্দেদি চিন্তাদর্শন দ্বৈতবাদী, তা মোটেই একত্ববাদী নয়।

তথ্যসূত্র: 

কোরানে মানুষতত্ব পরম্পরা – ৩, হিলালুজ্‌জামান হেলাল

টাইপিং সহযোগী মৈত্রী: সৌমিক জয়

বুঝে শুনে পড়ি বই (পর্ব – ১)

বইয়ের নাম: Apprenticed to a Himalayan Master (A Yogi’s Autobiography) 
যোগী শ্রী ম (Sri M) - শ্রী মধুকর নাথ 
  • বইটির তথ্য:
  • প্রকাশক: মেজেন্টা প্রেস (ভারত) [Magenta Press (India)]
  • প্রথম প্রকাশ: ২০১০
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩২৯
  • ভাষা: ইংরেজী

আজকের আলোচিত বইয়ের নাম, Sri M (শ্রী এম ) এর লিখা “Apprenticed to a Himalayan Master (A Yogi’s Autobiography” [এপ্রেন্টিসড টু এ হিমালায়ান মাস্টার (এ যোগী’স অটোবায়োগ্রাফি)];

এই বইটিতে একজন সাধকের জীবনশৈলী এবং তাঁর আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণের বর্ণনা পাওয়া যায়। যিনি এই অভিজ্ঞতার কথন বর্ণনা করছেন, তাঁর লেখক নাম শ্রী ম (Sri M), পারিবারিক নাম মমতাজ আলী খান, যিনি সন্ন্যাসের পর হন শ্রী মধুকরনাথ (সংক্ষেপে শ্রী ম) । এই আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণের গল্পে রয়েছে, হিমালয় ও হিমালয়ে থাকা আধ্যাত্মিক গুরুদের শিক্ষা, তাদের দীক্ষা ও দর্শণ, তাদের সাবলীলতা, সাধকের আত্মচেতনার বিকাশ, আত্মপরিভ্রমণ, এবং নিজের স্বরূপকে চেনার নানা পথ, পরীক্ষা ও নিরীক্ষণ। এই কথন/কহন/ গল্প, সমাজ ও সামাজিক ধর্মের উর্ধ্বে গিয়ে পাঠককেও আত্ম পরিচিন্তনের এক কর্মযজ্ঞে ফেলে দেয়। এটা শুধু একজন সাধকের কাহিনী নয় বরং একজন সংসারী মানুষের আত্মিক অনুসন্ধানের জীবন্ত দলীল, যার মাঝে সম্প্রীতি ও মানবতার অনন্য উদাহরণও পাওয়া যায়। 

বইটিতে মোট ৫০টি অধ্যায় আছে যা পাঠককে নানা আভিজ্ঞতার দর্শণ এবং নিরীক্ষণের সুযোগ করে দেয়।

এই গল্পের শুরু হয় কেরেলার তিরুভান্তপুরামে, যেখানে ১৯৪৮ সালে লেখক জন্মগ্রহন করেন। খুব ছোট থেকেই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় বিষয়ে নানা প্রশ্ন ছিল মমতাজের। সময়ের সাথে সাথে তা আরো গভীর হতে থাকে। প্রথম ৯ বছর বয়সে গুরুর দর্শণ পান, পরে নানা সুফি ও সনাতনী সাধন পদ্ধতির সাথে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সঙ্গে দেখা হয় বিভিন্ন মার্গের গুরুদের সঙ্গে, যার মধ্যে কালাডি মাস্তান[1] ও ম-ঈ মা (অবধূত[2]) অন্যতম।

২০ বছর বয়সে মমতাজ তাঁর হিমালয়ের যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে ট্রেনে করে চেন্নাই থেকে দেহেরাদুন, পরে হরিদ্বার ও হৃষীকেশ। হৃষীকেশে প্রথম স্বামী চিদানন্দজীর সৎসঙ্গে যোগদান করেন, উপনিষদ, যোগ-আসন ও ধ্যান বিষয়ক ধারণা লাভ করেন। একমাস সেখানে থাকার পর হিমালয়ের আরো গভীরে, প্রয়াগ হয়ে বদ্রীনাথদের দিকে যাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন কঠিন এবং দুস্কর পথ পাড়ি দিয়ে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বদ্রীনাথ পৌঁছানোর পর মানা গ্রামের সন্ধান পান, যেখানে ব্যাস গুহায় তাঁর গুরু ‘শ্রী মহেশ্বর নাথে’র সাথে বহুকাল পর দেখা হয়, এবং গুরু তাঁকে সম্বোধন করেন ‘মধু’ নামে (যা মমতাজ আলীর পূর্ব জন্মের নাম এবং সন্ন্যাসী নাম)। এরপর শুরু হয় তাঁর জীবনে গুরুর তত্ত্বাবধানে সাধনার অধ্যায়।

পবিত্রতা, অপবিত্রতা, ক্রিয়া, যোগ (চার মার্গ[3]), ধর্ম (আত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক), ভেদ-অভেদ,  দ্বৈত্ব-অদ্বৈত্ব, মন, স্মৃতি, শাস্ত্র, বেদ, উপনিষদ, বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব, মন্ত্র/জপ, তন্ত্র/তপ, পরম সম্বন্ধে জ্ঞান, প্রেম, বোধ; ধাপে ধাপে এই সকল বিষয়ে দর্শন লাভ করেন মমতাজ। টানা তিন বছর সাধনা ও নানা অভিজ্ঞতার পর গুরুর নির্দেশে সংসারে ফেরেন। এই অভিজ্ঞতায় যে শুধু ভালোবাসা আর জ্ঞান রয়েছে তা না, এই অভিজ্ঞতার মাঝে রয়েছে গুরুকে ছেড়ে যাওয়া ও হারানোর বেদনাও।

তবে গুরু কি আসলেই আমাদের ছেড়ে কখনো যান আদৌ? এবং এই পরম্পরা যে চলমান তা প্রতক্ষ হয় শ্রী ম(Sri M) শেষ কথায়।

একজন পাঠক হিসেবে, এই বইটি আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং আমার মনে তৈরী করেছে অনেক, অনুসন্ধিৎসা, জিজ্ঞাসা। প্রথম যখন বইটি পড়ি তখন গুরু-শিষ্য সংক্রান্ত এবং আধ্যাত্মবাদ সম্পর্কিত কিছু অভিজ্ঞতা আমার ছিল। তবে বইটির প্রতিটি অধ্যায় যেন আমাকে আবার নতুন করে এই বিষয়গুলোর সাথে পরিচয় করায়। প্রথমত, আমি ভাবতাম, গুরু-শিষ্যের মধ্যকার সম্পর্ক যেন, একজন পিতা-পুত্র কিম্বা স্কুল কেন্দ্রিক হয়, কিম্বা প্রচন্ড সম্মানের, গাম্ভির্যের এর মাঝে যে ভালোবাসা থাকে এটা আমার  জানা ছিল না। শ্রী মধুকর নাথের লেখা থেকে আমার বার বার মনে হয়েছে, গুরু-শিষ্যের গাম্ভীর্য থেকে ভালোবাসা অনেক জরুরি, গুরু যে শুধু আমার আলোকবর্তা তা নয়, গুরু যে একটা নিরাপদ ঠাঁয়, একটা শান্তির জায়গা, শেষ আশ্রয়ের জায়গা।

এ ছাড়াও, হিমালয় এবং তার বর্ণনা আমাকে এতটাই তাড়িত করেছে যে আমি ২০১৯ এ হৃষীকেশ যাত্রা করি এবং রামঝুলার গঙ্গার ঘাটে দাড়িয়ে এটা সেদিন অনুভব করি যে, হিমালয় একটা আধ্যাত্মিক পীঠ এবং লেখক তাঁর কথায় সত্য। এই প্রথম আমার স্থিরতার অনুভূতি হয়। তাই এই বইটি বইই নয় বরং সাধকদের জন্য নতুন সূচনার মার্গও বটে। তৃতীয়ত, বইটি পড়তে গিয়ে আমার বেশ কিছু ধ্যানধারণার পরিবর্তন হয়েছে এবং সেই সাথে আমার দেখার ধরনও। অনেক আগে রামকৃষ্ণ কথামৃত পড়তে গিয়ে যত-মত তত-পথ এই বিষয়টা জানা হয়েছিল, তবে মধুকরনাথের এই লেখায় রামকৃষ্ণের কথার ধারাটা আমার আরো পরিষ্কার হয়েছে।

একটা আকর্ষনীয় বিষয় হল, কথামৃতের লেখক মাস্টার মশায় শ্রীম (মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) এর আদ্যাক্ষর ও মধুকর নাথের প্রকাশক নাম এক “শ্রীম” এক। এছাড়াও বইটিতে দৈনন্দিন জীবনের অনেক বিষয় উঠে এসেছে যা যে কোন পাঠকই তার জীবনশৈলীর সাথে মিলিয়ে নিতে পারবে, তবে দেখার ধরণ বদলে যাবে।

পরিশেষে, দেখার ধরণ কিম্বা, দর্শন এবং দর্শন নিয়ে কিছু কথা বলা যায়, আমরা যা দেখি তাই আমরা সাধারণ অর্থে দর্শন বলে ধরে নেই, এবং দর্শন বলতে আমরা বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যাক্তির অভিজ্ঞতা লব্ধ কথাকে বুঝি। তবে আধ্যাত্মবাদে, এই দেখার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করে। এখানে দেখা মানে, চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা না, এখানে দেখা মানে অন্তর দৃষ্টী বা হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখা।

আরো সহজ করে বললে, নিজেকে খুব সূক্ষ্ণ আকারে দেখতে পারা; যেমন, প্রতিটা কাজ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, নিজের মনের মধ্যে যে বিষয়গুলো নাড়া দিচ্ছে সেগুলো, নিজের অনুভূতিগুলো (রাগ, আনন্দ, হ্রেশ, ভালোলাগা ইত্যাদি) দেখতে পারা। এটাই যে আসল দর্শন তা এই বইয়ে আমি খুঁজে পেয়েছি, সবাইকে বইটি পড়ার অনুরোধ রইল।


[1] Masthan (মাস্তান)- Intoxicated/ ecstatic

[2] অবধূত (avadhut) – যিনি অদ্বৈত্ব/এক বা একত্ব প্রাপ্ত  হয়েছেন বা, যার মাঝে দ্বৈত্বতা (duality) নেই।

[3] যোগের চার মার্গ- জ্ঞান, ভক্তি, ক্রিয়া, কর্ম।

মন

অশান্ত মন

কিছু তো মানে না,

রকেটের মতো শুধু

ছোটে সারাক্ষণ।

কখনো মন কেঁদে ওঠে

কখনো বা হাসে,

কখনো‌ বা ডানা মেলে

উড়ে আকাশে।

গোপনে থেকে মন

কত কথা বলে,

চিরকাল সে তবু

অধরাই থাকে।

বড় হতে কেমন লাগে?

আমি আরওয়া। আমার বয়স  ১২বছর। বড় হতে ভালোও লাগে, খারাপও লাগে। আনন্দও লাগে,দুঃখও লাগে। বড় হতে পেরে আমি নানা ধরনের কাজ করতে পারছি যা ছোটবেলায় করতে পারতাম না। যেমন- ছুরি, কাচি দিয়ে কাজ করা, গরম জিনিস নিয়ে কাজ করা, ইত্যাদি। তবে, এখন এই কারণে আমার ইচ্ছা না থাকলেও অনেক কাজ করতে হয়। বড় হয়ে লেখাপড়া করে এখন আমি অনেক কিছু শিখছি এবং বুঝতে পারছি যা ছোটবেলায় করতে পারতাম না। তবে, এর কারণে আমাকে অনেক বেশি বেশি লেখাপড়াও করতে হচ্ছে। বড় হবার কারণে আমি নতুন নতুন বড়দের খেলা খেলতে পারছি যা ছোটবেলায় বুঝতাম না।

আমার ছোট ভাইয়ের বয়সের সাথে তার চিন্তার ধরনের পার্থক্য অনেক। তার কথা ও আচরণে কিছু সময় আমার মনে হয় যে, সে আমার চেয়েও বড়! আমি এটা বলছি কারণ তার সাথে অনেক গল্পের বইয়ের চরিত্রের মিল পাই। এ চরিত্রগুলো আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তারা কমপক্ষে সেভেন এইটে বা কলেজে পড়ে। আবার কখনো ১৯-২০ বছর বয়সেরও মনে হয়। সে তুলনায় আমার ভাই অনেক ছোট। তার বয়স ৮ বছর এবং সে ক্লাস টুতে পড়ে। তার চিন্তা ভাবনা ঠিক ওই বইয়ের চরিত্রগুলোর মতই। এক কথায় আমার ভাইয়ের মন তার বয়স থেকে অনেক বড়।

সব মিলিয়ে বড় হওয়া আমার কাছে ভালোও লাগে আবার খারাপও লাগে। বড় হলে যেমন অনেক নতুন কাজ করা যায়, তেমনি অনেক দায়িত্বও নিতে হয়। আমার ছোট ভাইকে দেখে আমি বুঝতে পারি যে বয়স আর মন সমান সমান চলে এমন নয়। কেউ কেউ ছোট হয়েও অনেক বড়দের মতো চিন্তা করতে পারে। তাই আমি মনে করি, বড় হওয়া শুধু বয়সের না, মনেরও ব্যাপার।

ভাব বিনিময়ের সূক্ষ্ম শিল্প (পর্ব – ১)

বই পরিচিতি

The Art of Communicating হলো ভিয়েতনামি জেন বৌদ্ধ গুরু Thích Nhất Hạnh-এর লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে, প্রকাশক ছিল HarperCollins-এর HarperOne imprint। বইটি মূলত ইংরেজিতেই প্রকাশিত হয়েছিল, অর্থাৎ এটি কোনো আলাদা ভিয়েতনামি লেকচার থেকে পরে অনুবাদ করা বই নয়; বরং থিচ নাত হানের বহু বছরের mindfulness teaching, retreat talk, এবং জীবনদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি ইংরেজি ভাষায় সাজানো একটি গ্রন্থ।

লেখক সম্পর্কে

তিক নাত হান ছিলেন ভিয়েতনামের একজন বিশ্ববিখ্যাত জেন বৌদ্ধ ভিক্ষু, শান্তিকর্মী, কবি ও দার্শনিক। তিনি mindfulness-কে আধুনিক বিশ্বে জনপ্রিয় করে তোলার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। ১৯২৬ সালে ভিয়েতনামের হুয়ে শহরে জন্ম নেওয়া এই আধ্যাত্মিক গুরু “engaged Buddhism” ধারণাকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেন, যেখানে ধ্যান, করুণা ও সচেতন জীবনচর্চাকে সামাজিক শান্তি ও মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তিনি France-এ Plum Village tradition প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ mindfulness practice center।

মৌলিক খাবার

খাবার ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না। আমরা যা কিছু গ্রহণ করি তা হয় আমাদের সারিয়ে তোলে, নয়তো ধীরে ধীরে বিষময় করে তোলে। আমরা সাধারণত মনে করি, মুখ দিয়ে গ্রহণ করা খাবারই কেবল আমাদের পুষ্টি দেয়। অথচ আমরা চোখ দিয়ে যা দেখি, কান দিয়ে যা শুনি, নাক দিয়ে যে গন্ধ পাই, জিভ দিয়ে যে স্বাদ নেই, কিংবা দেহে যে স্পর্শ অনুভব করি এসবই আমাদের খাদ্য। আমাদের চারপাশের গুঞ্জন, কথোপকথন, এমনকি যেসব ঘটনায় আমরা অংশ নিই সবই এই খাদ্যের অংশ।

এখন প্রশ্ন হলো, যা কিছু আমরা গ্রহণ করছি এবং সৃষ্টি করছি, তা কি আমাদের উচ্চতর সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নিচ্ছে?

যখন আমরা এমন কিছু বলি যা আমাদের লালন করে, কিংবা আশেপাশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, তখন আমরা ভালোবাসা ও করুণার সুধা পান করি। আর যখন আমাদের কথা ও কাজ দুশ্চিন্তা, ক্রোধ বা বিভাজন তৈরি করে, তখন আমরা আসলে সংঘর্ষ ও দুঃখকে লালন করি।

প্রায়ই আমরা এমন কথা শুনি, যা বিষের মতো হুল ফোটায়। আমরা যা দেখি বা পড়ি, তাও অনেক সময় আমাদের মনে নেতিবাচকতা জন্ম দেয়। কিন্তু আমরা কি এমন কিছু পড়ছি বা দেখছি, যা আমাদের মধ্যে বোধ ও করুণার বিকাশ ঘটায়? যদি তা পারে, তবে সেটাই প্রকৃত সুখাদ্য।

প্রতিদিনের জীবনে আমরা অনেক কিছুই “হজম” করি যা আমাদের মন খারাপ করায়, নিরাপত্তাহীন করে তোলে, অন্যদের বিচার করতে শেখায়, কিংবা নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে প্রলুব্ধ করে। তাই আমাদের উচিত, নিজের প্রতিদিনের কথোপকথন ও অভিজ্ঞতাগুলোকে একজন সচেতন গ্রাহকের মতো দেখা যেন আমরা বুঝতে পারি, কী ধরনের পুষ্টি আমরা গ্রহণ করছি।

ইন্টারনেট এই খাদ্যতালিকার একটি শক্তিশালী অংশ যার ক্ষমতা আছে আমাদের সারিয়ে তোলার, আবার একইসঙ্গে বিষময় করে তোলারও। মাত্র কয়েক মিনিট অনলাইনে থাকলেই অসংখ্য বিষয় আমাদের সামনে হাজির হয়। তাই ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করা সমাধান নয়; বরং আমরা কী দেখছি, কী পড়ছি সেই বিষয়ে সচেতন হওয়াটাই জরুরি।

যখন আপনি টানা তিন বা চার ঘণ্টা কম্পিউটারে কাজ করেন, খেয়াল করবেন আপনি যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন সেই কাজে। এটা অনেকটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়ার মতো। সারাদিন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি সারাদিন কম্পিউটারে ডুবে থাকাও স্বাস্থ্যকর নয়। অল্প পরিমাণে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই যেমন গ্রহণযোগ্য, তেমনি সীমিত সময় প্রযুক্তির ব্যবহারও স্বাভাবিক।

আপনি যা পড়ছেন এবং লিখছেন, তা-ও আপনাকে প্রভাবিত করে। তাই কী গ্রহণ করছেন, সে বিষয়ে সচেতন থাকুন। যখন আপনি এমন একটি ই-মেইল বা চিঠি লেখেন, যেখানে সহানুভূতি ও করুণার প্রকাশ আছে, তখন আপনি নিজেকেও সেই প্রক্রিয়ায় পুষ্ট করছেন। এমনকি একটি ছোট্ট নোট যা-ই লিখুন না কেন তা আপনাকে সারিয়ে তোলার ক্ষমতা রাখে। শুধু তাই নয়, যার উদ্দেশ্যে আপনি লিখছেন, তাকেও এটি স্পর্শ করে, তাকে পুষ্টি দেয়।

বাংলায়: সুপ্রভা জুঁই

সরল অলীক পথ

ঘন ঘন ভূমিকম্পেও হৃদয় কাঁপে না

অমনোযোগী ভাবনারা কচুরিপানার ফুলেরা মতন

বাফারিং হতে হতে রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে

সেই বায়োলুমিনেসেন্স দ্বীপের মতনই জেগে রয়।

মস্তিষ্কের সংগ্রামকে কবিতার ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব যুক্তি-তক্কো আর কোমল অনুভূতিদের লড়াই চলমান

আমার মন যেন অসংখ্য জানালার ঘর—

হাওয়া ঢোকে আর গল্প হয়ে যায়, শব্দ আসে- আর পথ দেখিয়ে দেয়।

ভাবনাগুলো হাঁটে না,

তারা ছুটে, ধূমকেতুর চেয়ে দ্রুত সংঘর্ষে!

রোদ্দুরে ফুটে ওঠা আতশবাজির মতো

প্রতিটি বর্ণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।

একটা ভাবনা ধরতে যাই,

আরেকটা কাঁধে এসে টোকা দেয়,

আরো একটা দূর থেকে ডেকে ওঠে

শেষে ছুয়ে দেখি, হাতে লেগে আছে নীল শূন্যতা

ফেলে গেছে “কাছাকাছির“ নরম প্রতিধ্বনি।

মনোযোগ এখান গোল্ডফিশের মতো-

সোনালী রং- কিন্তু কমলা দেখতে,

ঝিলমিল করে নীল বিদ্যুত গতিতে,

কিন্তু স্থির আর হয় না সহজে;

দুনিয়া যখন শান্ত হয়, দয়া করে আমাকে

ভেতরের ‘তাড়াহুড়ারা’ একটু নরম হয়।

তারপরও,

এই ঝড়ের গতির ভেতরেই

এক অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে!

“উদ্ভাবন”- বেড়া টপকে যায়,

“কৌতূহল”- একদমই ঘুমোতে দিতে চায় না,

“সৃষ্টিশীলতা”- একটা আগুন যা নিভতে জানে না।

হ্যাঁ, আমাদের “মনোযোগ ঘাটতি” এমনি

কিন্তু ঐ মহাজাগতিক মারপ্যাঁচে

আমি খুঁজে পেয়েছি সেই সরল অলীক পথ

যেখানে যাওয়ার কথা ভুলে যাচ্ছো দিনকে দিন।

শুধু মনে রেখো অতিসক্রিয়তা ব্যাধিতেও-

“একত্ব

সংযোগ

অপ্রত্যাশিত

ভালোবাসাও”।

চিত্রনাট্য: ঘোড়া সওয়ার

চরিত্র

০১. শিহাব

(নামের অর্থঃ Shooting star, উল্কা)

– কিছুটা লম্বাটে, উজ্জ্বল বর্ণ, তারুণ্য যেমন আছে তেমনই শ্নাত প্রকৃতির।

– কর্পরেট জব করে কিন্তু এক্সাক্টলি কি সেটা বোঝা যাবে না। দরকারও নাই।

– স্মার্ট ছিপছিপে, মেদহীন, জিম করতেও পারে। মোটকথা ব্যালেন্সড লাইফ লিড করে।

– কোনকিছুর বিশেষ কমতি নাই কিন্তু একটা অজানা জায়গায় আছে।

০২. শ্যামা

(নামের অর্থঃ কালীর অন্য নাম শ্যামা যার অর্থ আদ্যাশক্তি)

– শ্যাম বর্ণের হতে হবে এমন নয়। শিহাবের তুলনায় এক্সট্রোভার্ট।

– নিজের অনুভূতি সম্পর্কে সে সচেতন। শিহাব যেমন নিজেকে খুব বুঝে উঠতে পারেনি তেমন নয়।

দৃশ্য ১

এই ঢাকা শহরে কর্পরেট চাকরী করতে করতে ক্লান্ত শিহাব। তার এই ক্লান্তি অবশ্য সকলের অজানা। একা একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে উঠেছে সে সম্প্রতি। বিশেষ ফার্নিচার নেই। সকালে উঠে ওটস, ডিম সেদ্ধ আর একটা কফি মগ নিয়ে নিজে হাতে আয়রন করা পোশাক পরে কানে হেডফোন গুঁজে সে আপিসে যায় রোজ। আপাতভাবে শুনলে মনে হবে সে সোশ্যাল না। ব্যাপারটা ঠিক তেমন না। সে জীবনে একাকী কিন্তু নারী বা বন্ধু কারোর জন্য অমন মরিয়া নয়। শিহাব সম্ভবত নিজেও জানেনা সে কি চায়, কিন্তু তার মাঝে একটা স্থিরতা আছে। আমরা এক বা দুই মিনিটে শিহাবের নিয়মিত জীবন প্রণালীর কিছু চিত্র দেখব যেখানে অনেক মানুষ অফ ফোকাসে এবং তাদের সাথে শিহাবের কথাও হয়। এখানে কোনো সংলাপ নেই। আবহ সঙ্গীত অথবা নানা সিচুয়েশন অনুযায়ী আশেপাশের মানুষের আওয়াজ থাকতে পারে। অথবা দুটোই থাকতে পারে যেমন শিহাব কানে হেডফোন দিলে সে যে গানটা শুনতে পাবে সেটাই আমরা শুনবো। আমরা আসলে গোটা একটা গানই এই ফিল্মের জন্য বানিয়ে ফেলতে পারি বা মিউজিক পিস। শিহাব ওর আশেপাশের মানুষজনের সাথে কথা বলবে কিন্তু সেগুলো আমরা শুনবো না। অথচ শিহাবের দীর্ঘশ্বাস শুনবো। এই কতগুলো দৃশ্যের কোলাজে আমরা শিহাবের স্থির যে একাকীত্ব সেটাই দেখবো।

মোটা দাগে ভিজুয়াল কাঠামো যেমন হতে পারে:

ক্যালেন্ডারে এক এক করে দিন পার < ঘুম ভাঙা < আপিসের জন্য রেডি হওয়া < সবার সাথে আপিস যাওয়া < টেরাসে গ্রুপ লাঞ্চ < আপিস শেষে বন্ধুদের সাথে চা নাস্তা < বাসায় টিভি অন কিন্তু অন্যমনস্ক হয়ে রাতের খাবার খাওয়া < অতঃপর ঘুম।

এরপর একদিন ক্যালেন্ডারে ছুটির দিন আসে।

দৃশ্য ২

Indoor: বাতিঘর, ঢাকা

শিহাবের মনোলগ:

ঢাকায় যখনই আমার খারাপ লাগে, আমি বাতিঘরে চলে আসি।

কেন? কেননা যখনই আমি বাতিঘরে আসি আমি একরাশ ব্যাথা বুকে বয়ে আনি। এই ব্যাথাদের আমি না ঘরে ফেলে আসতে পারি না অন্যকোথাও।

এই ব্যাথারা আমার খুব কাছের, এরা খুব দামী। তাহলেও বাতিঘরে এসে কি কাজ? কি হয় এখানে এলে? এখানে এসে আমি ইচ্ছেমতন একটা বই বের করি। হাত দিয়ে তাকে স্পর্শ করি। একটা টেবিলে তাকে নিয়ে বসে পড়তে আরম্ভ করি। আর এই পুরো সময়টায় আমার শ্বাস প্রশ্বাসের মধ্য দিয়ে

আমার ব্যাথাগুলো সেই বইয়ের সমস্ত পাতা শুষে নেয়। তারপর সেই বইটাকে আমি অতি যত্ন সহকারে তাকে উঠিয়ে রাখি। আমার তখনকার পড়া আর আমার সাথে থাকা এই অতি মূল্যবান ব্যাথাদের মিলিয়ে তৎক্ষণাৎ আমি কাগজে কলমে লিখতে থাকি। আমার ব্যাথা আর আমার পড়ার বোধের মিথস্ক্রিয়ায় আমার খাতার পাতাগুলো ভরে ওঠে। হাইস্পিডে সারাদিন অফিসের কম্মপিউটারে লিখতে লিখতে সপ্তাহের এই দুইটা দিন হাতে কলমে সময় নিয়ে যত্ন করে লিখতে আমার বেশ লাগে।

আর সাথে একটা কফি হলে সারা শরীরে ঝিরঝিরিয়ে একটা আনন্দ না বয়ে আর উপায় কি!

(সংলাপ অনুযায়ী দৃশ্যায়ন হবে। অফ-ফোকাস থেকে ফোকাসে দেখা যাবে একটা মেয়ে বই হাতে শিহাবের আগে থেকে এককোণে বসেছিলো এবং সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শিহাবকে দেখে যাচ্ছে। মেয়েটার চোখে মুখে রাজ্যের কৌতুহল!)

সেদিন রাতে বাসায় ফিরে এসে খুব আরামের ঘুম দেয় শিহাব।

দৃশ্য ৩

Indoor: বাতিঘর, ঢাকা

পরদিন শিহাব আবার বাতিঘরে যায়। সেদিন একটা বই বের করে সবে পড়তে বসবে এমন সময় পাশের টেবিল থেকে একটা মেয়ের চিৎকার শুনতে পাওয়া যায়।

শ্যামা

আপনি জোর করবেন কেন আমাকে!

অচেনা ভদ্রলোক

আপনি চিৎকার করছেন কেন?

শ্যামা

তাই বলে আপনি আমাকে জোর করবেন?

ভদ্রলোক

দেখুন এভাবে কথা বললে লোকে ভুল বুঝবে!

শ্যামা

আর আমার যে কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে সেটা আপনি বুঝবেন না?

(মেয়েটার সাথে বসে থাকা ভদ্রলোকটি বাতিঘরে অন্য অন্য লোকদের মুখে সন্দেহের ছাপ দেখতে পেয়ে দ্রুতবেগে জায়গা ত্যাগ করে। শ্যামা তাই দেখে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। শিহাব কিছু না ভেবে তার রুমালটা নিয়ে এগিয়ে আসে। শ্যামার মুখের সামনে ধরলে শ্যামা রুমালটা নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে। হাত দিয়ে ইশারায় শিহাবকে টেবিলের অপপ্র পাশের চেয়ারে বসতে অনুরোধ করে।)

শ্যামা

দেখুন আমি অন্যায় কোনো দাবী উনার কাছে করিনি।

শিহাব

উনি কি আপনাকে বিরক্ত করছে?

শ্যামা

বিরক্ত তো বটেই। দীর্ঘদিন ধরেই করছে।

(শিহাবের লোকটাকে পেটানোর একটা ইচ্ছে তৈরি হচ্ছে। সেটা তার মুখ দেখে আমরা বুঝতে পারবো। শিহাব চেয়ার ছেড়ে উঠে পরে। সে টেরাসে যেয়ে নিচে তাকায়। লোকটা নিচে চলে গিয়েছে এবং ঠিক সেই সময়ে একবার উপরে তাকিয়ে শিহাবের মুখ দেখে আরো দ্রুত পালিয়ে যায়। শ্যামাও ঊঠে আসে টেরাসে। শিহাবের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে।)

শিহাব

আপনার কোনো সাহায্য লাগবে? কাউকে ফোন করবেন?

শ্যামা

কেন ফোন করবো কেন? শুনেন, হাসি এলে লোকে কোনো সমস্যা করে না। হা-হা-হা করে জোরছে হাসলে হয়তো একটু বিরক্ত হতে পারে কেউ।

কিন্তু কান্না করা যাবে না তাই বলে? আপনিই বলেন এটা কান্নার প্রতি অবিচার নয়? আপনার সততার প্রতি অবিচার নয়?

শিহাব

জ্বি নিশ্চয় নিশ্চয়। (আমতা আমতা করতে করতে)

শ্যামা

আমি দীর্ঘদিন ধরে এতগুলো কবিতা লিখলাম আর উনিও আমাকে ভরসা দিলেন যে বইটা বের করবেন। এই যে দেখুন আমি প্রুফ রিড করিয়েছি। পাণ্ডুলিপি নিয়ে উনার পিছে পিছে ঘুরে বেড়াচ্ছি আজ ছয় মাস। আমার কবিতা নাকি খুব ভালো কিন্তু একটাও প্রেমের কবিতা নেই। প্রেমের কবিতা ছাড়া উনি বই ছাপবেন না। এটা তো উনি আমাকে আগে বললেও পারতেন, তাই না?

শিহাব

ও, প্রেমের কবিতা নেই?

শ্যামা

না, নেই।

শিহাব

অবশ্য একজন কবিকে এভাবে লিখতে বাধ্য করা যায় না।

শ্যামা

না তাতো যায় না কিন্তু সমস্যা সেখানেও নেই। আমার অনেকগুলো প্রেমের কবিতা লেখা আছে। সত্যি বলতে প্রেমের কবিতার সংখ্যায় বেশি।

শিহাব

ও!

(শিহাব চুপ মেরে যায়। এই মেয়ের সমস্যা কি সে বুঝতে পারে না।)

শ্যামা

তাহলে সমস্যা কোথায়?

(শিহাবের মনের কথা টের পেয়ে মেয়েটা বলে। জবাবে শিহাব মাথা নাড়ে।)

শ্যামা

সমস্যা হলো প্রেমের কবিতা আমি বেচবো না।

(দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। শিহাবও বুঝতে পারছে না কি বলবে। তাই দেখে মেয়েটা তার কান্নার বেগ বাড়িয়ে দেয়।)

শ্যামা

এখন আপনিও নিশ্চয় ভাবছেন এ কোন বোকার পাল্লায় পড়লাম।

শিহাব

এই ইয়ে না না। শুনুন, কাঁদবেন না প্লিজ। প্রেমের কবিতা কেউ বেচবে না এতো নতুন শুনলাম। তাছাড়া বেচাবেচিই-বা ভাবছেন কেন? এই যে এত এয় হৃদয় নাড়ানো প্রেমের কবিতা আছে সেগুলো তো বই কিনেই পড়েছি। তাও তো বুকে এসে লাগে শব্দগুলো।

শ্যামা

তাহলে রোজ শুক্র-শনি করে আপনি বাতিঘরে এসে ফ্রি ফ্রি বই না পড়লেই পারতেন। বইগুলো কিনে পড়েননা কেন? কোন বইটার উপরে আপনার টান বেশি বলুন? কেনা বই নাকি ওই সেলফে তুলে রাখা অতগুলো বই?

(শিহাব লজ্জায় পড়ে যায়।)

শিহাব

ও, আপনি দেখেছেন বুঝি!

শ্যামা

তাছাড়া প্রেমের কবিতাগুলো অবরুদ্ধ করেতো রাখিনি। বরং ওগুলো যেন না কিনে সবাই পড়তে পারে সেটাই আমি চাই। আপনাকেই শোনাচ্ছি এখন একটা শুনুন। না বেচা প্রেমের একটা কবিতা শুনুন।

(আমরা দেখব ঘূর্ণায়মান ক্যামেরায় মেয়েটি একটা কবিতা বলে যাচ্ছে অত্যন্ত প্যাশানের সাথে। সেই কবিতা আমরা শুনতে পাবো না যেহেতু এটা না বেচা প্রেমের কবিতা। কিন্তু কবিতা শুনে মুগ্ধ হতে দেখা যায় শিহাবকে। শিহাবের চোখে মুখে সেই অভিব্যক্তি স্পষ্ট। কবিতা শেষ হলে আশেপাশের শব্দ বেড়ে যায় ছাড়া কবিতা চলাকালীন একটা স্বপ্নময় আবহ সঙ্গীত শোনা যেতে থাকে। কবিতা আবৃত্তি শেষ হলে দুজনে নীরব হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। জুম-আউট করতে করতে ঝাপসা হয়ে আসে পর্দা।)

দৃশ্য ৪

Outdoor: শাহাবাগের BSMMU এর এ ব্লকের ছাদ, পড়ন্ত বিকেলে

উঁচু ভবনের ছাদে শিহাব আর সেই মেয়েটি পাশাপাশি শুয়ে আছে। বাতাসে তাদের চুল উড়ছে, পোশাক উড়ছে। চোখ দুটো কারো কখনো বন্ধ, কখনো খোলা। মৃদু বাতাস হচ্ছে। শহুরে রাস্তায় ক্যাওয়াজ শোনা যাচ্ছে খুব। এরই মাঝে কিছু পাখিও ডেকে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই অবস্থা ক্লোজলি দেখানো হবে। কোনো সংলাপ নেই কিন্তু পাশাপাশি দুটো মানুষের নিশ্চুপ শুয়ে থাকার শব্দ, তাদের দমের শব্দ, তাদের আলতো করে হাত স্পর্শ করা, আলতো চোখে চেয়ে দেখা এরসবকিছুই আমরা দেখবো। তাদের অনুভব করবো।

শ্যামা উঠে বসে মাথা থেকে চুল বাঁধার স্কার্ফটা খুলে ফেলে। ছাদের রেলিং এর ধারে যেয়ে হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। হাতের স্কার্ফটা বাতাসে পতপত করে উড়ছিলো। পরক্ষণেই আঙ্গুল ঢিলে করে স্কার্ফটা উড়িয়ে দিলো সে। তাই দেখে শিহাব উঠে বসে। দুজনেই এই অদ্ভুত কাণ্ডে শব্দ করে হেসে ওঠে। শিহাব একটু একটু করে শ্যামার কাছে এগিয়ে আসে।

শ্যামা বিড়বিড় করে বলছে…

শ্যামা

গিরতে হ্যায় শাহসাওয়ার হি ম্যায়দানি জাংগ মে

উও তিফ্ল কেয়া গিরেগা জো ঘুটনো কে বাল পে চালে।

শিহাব

মির্জা আজিম বেগ?

(শ্যামা মাথা নাড়ায়।)

শিহাব

ঘোড়ায় থাকা সৈনিকই যুদ্ধের ময়দানে পড়তে পারে

সেই নাবালক কীভাবে পড়ে আহত হবে

যে এখনো হাঁটুতে ভর দিয়ে চলে

(শিহাব পিছন থেকে শ্যামাকে জড়িয়ে ধরে।)

শিহাব

প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কে জানিস?

শ্যামা

হুমমমমমমম

শিহাব

মানিস?

শ্যামা

হুমমমমমমম

(শ্যামার মুখে এবার হাসি। সে উলটে শিহাবের দিকে ফেরে। দুজনের দুজনের হাত ধরে থাকে।)

শ্যামা

কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে

মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;

অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে

ভালোমন্দ যা ঘটুক, মেনে নেবো: এ আমার ঈদ।

শিহাব

আল মাহমুদ?

(শ্যামা মাথা নাড়ে। শিহাবের দিকে পিছন ফিরে আবার আগের ভঙ্গিতে ফিরে আসে।)

শ্যামা

মরণের আগে মরণ।

ঐ যে দূরে নোয়ার নৌকা।

নিয়ে যাবে আমাদের প্যারালাল ইউনিভার্সে।

(আকাশে কাল্পনিক মেঘ দেখিয়ে কথাগুলো বলে শ্যামা।)

শিহাব

কি যা তা বকছিস!

শ্যামা

কেন? তুমি প্যারালাল ইউনিভার্স মানোনা?

(শিহাব কেমন যেন চুপ মেরে যায়। শ্যামা বলতে থাকে…)

শ্যামা

ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন –

নিরুপায় কিছু নাম, কিছু স্মৃতি, কিংবা কিছু নয়;

অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন;

কার হাত ভাঙে চুড়ি? কে ফোঁপায়? পৃথিবী, নিশ্চয়।

স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক,

অদৃশ্য আত্মার তরী …

(শিহাব এবারে শ্যামার কথাগুলো ধরে নিজেই বলতে শুরু করে।)

শিহাব

অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?

কেন দোলে হৃদপিণ্ড, আমার কি ভয়ের অসুখ?

নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়!

আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার

যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।

(একটু পরে ছাদে আর কাউকে দেখা যায় না। মনে হলো রেলিং থেকে দুজনে ঝাঁপ দিয়েছে হয়তো। কিন্তু নিচের ব্যস্ত লোকারণ্য রাস্তায় কারো মরদেহ নেই। ছাদের উপরে থাকা দুইজনের স্মার্ট ফোন পড়ে আছে। শিহাবের অফিস খোলা ব্যাগ দেখা যায়। সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, পেপার্স, ল্যাপটপ। আকাশ কাপিয়ে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। ঝড়ো বাতাসে সব উড়িয়ে নিতে চাইছে যেন।)

এই পৃথিবী থেকে দুম করে দুইজন মানব মানবী কেমন করে নাই হয়ে গেলো কেউ টেরও পেলো না……

দৃশ্য ৫

Outdoor: আমাদের স্বাভাবিক রোজকার গ্রামাঞ্চল, শীতের উষ্ণ দুপুর

শ্যামার মাথার সেই স্কার্ফ খোলা হাওয়ায় উড়ছে। শিহাব সেটা ধরে ফেলল। স্কার্ফটা এনে শ্যামার মাথায় পরিয়ে দেয় সে। পুকুর ঘাটের ধারে এক সর্ষে ক্ষেতে শ্যামা আর শিহাব একটা পিকনিক করতে এসেছে, অথবা এটাই তাদের ঘর সংসার আমরা তা জানিনা। দুজনে মিলে কিছু বই আর ফলমূল এনেছে। ফ্লাস্কে আছে চা। আরো শুকনো কিছু খাবার। একটা সুন্দর সাদা নকশি কাঁথা পেড়ে তার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে খাতার লেখা আর পেন্সিল ধরে আছে শ্যামা, কিন্তু দৃষ্টি দিগন্তের দিকে। নিমগ্ন হয়ে আছে দেখার মাঝে, প্রকৃতির সৌন্দর্য সুধা পানের মাঝে।

শিহাবকেও দেখে নেয় এক ফাঁকে সে। শিহাব একটা দোলনা রেডি করছে। একে অপরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে তারা, মৃদু হাসে। শিহাব গাছ ঘেঁষে বসে ওর গিটারে অচেনা সুর তোলে মাঝে মাঝে খাতায় নোটগুলো লিখে আবার পেন্সিলটা কানে গুঁজে রাখে। এরসবই শ্যামা দেখতে থাকে। একসময় খাতায় সে লিখতে শুরু করে। এই প্রথমবার আমরা তার লেখা প্রেমের কবিতাটি দেখতে পাবো। যেহেতু এ এক অন্য জগত, যেখানে কিছু বিক্রি হয় না।

পারমার্থিক অনলাইন সাধুসঙ্গ থেকে ওয়েবসাইটের যাত্রা

সময়টা ২০২০ সাল। কোভিডের আক্রমণে কেঁপে উঠেছিল পৃথিবীর সভ্যতা। স্থবির হয়ে পড়েছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এরই প্রেক্ষিতে এবং সরকারি বিধিনিষেধের কারণে গুরুজীর সঙ্গে আমাদের সম্মুখ সাক্ষাৎ বন্ধ হয়ে যায়।

প্রবাহমান জলরাশিকে যেমন থামিয়ে রাখা যায়…

না—পিছনের স্রোতের ধাক্কা তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। তেমনি, আমাদের জীবনেও হয়তো তখন একটা ধাক্কা কাজ করছিল, যা আমাদের বিকল্প পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

একদিন পারিবারিক আলোচনায় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম—সরাসরি দেখা সম্ভব না হলেও বিকল্প উপায়ে, অনলাইনে অন্তত সপ্তাহে একদিন একত্রিত হওয়া যেতে পারে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তখন আমরা যেহেতু চাকরিসূত্রে মেহেরপুর শহরে বসবাস করছিলাম, তাই পরিচিত এক WiFi সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সেদিন বিকেলেই বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করা হলো।

এভাবেই শুরু হলো পারমার্থিক Online Conversations। অল্প সময়ের মধ্যেই এর সদস্য সংখ্যা ত্রিশ ছাড়িয়ে গেল।

এক পর্যায়ে কোভিডের প্রভাব কমে এলো। আমি ও তোরিফা সরকারি চাকরি ছেড়ে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়, মহাত্মা লালন ফকিরের পুণ্যভূমিতে, তাঁবু খাটিয়ে নতুনভাবে বসতি স্থাপন করলাম। ছেঁউড়িয়ায় কেন এলাম—সে গল্প আজ নয়, অন্যক্ষণে বলার অভিপ্রায় রইলো।

যাইহোক, সেদিনের Zoom প্ল্যাটফর্মের সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে পারমার্থিক ওয়েবসাইটে। এটি আমার জন্য এক গভীর আনন্দের বিষয়। কারণ, এর সূচনালগ্নে আমি যুক্ত ছিলাম। সেই শুরুর অনুভূতিগুলো আজও হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। এই দোলা ছড়িয়ে পড়ুক সকল মনে, সকল ক্ষণে ।

লেখালেখির জগতে আমি অত্যন্ত দরিদ্র। কন্যা সুপ্রভা জুঁই-এর ধাক্কাতেই এই লেখাটি নির্মিত হলো।

প্রসঙ্গত বলতে হয়—বন্যা যেমন আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি তার বয়ে আনা পলিমাটি আবার উর্বরতা এনে দেয়, বাড়িয়ে তোলে ফসলের উৎপাদন। তেমনি কোভিড আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, আবার দিয়েছে নতুন কিছু সম্ভাবনাও। পারমার্থিকের Zoom প্ল্যাটফর্ম এবং আজকের এই ওয়েবসাইট তারই ধারাবাহিক প্রকাশ।

অর্থাৎ, এগিয়ে যেতে প্রয়োজন একটুখানি ধাক্কা, আন্তরিকতা এবং নিরবচ্ছিন্ন পথচলা বা লেগে থাকা । গুরু-কৃপায় সাফল্য তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এপর্যন্ত যা কিছু অর্জন, সবই “উনার” দিকনির্দেশনা ও পরামর্শের ফল। আর যারা তাঁর নির্দেশনায় পারমার্থিক ওয়েবসাইট নির্মাণে নানাভাবে যুক্ত থেকে এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়েছেন, তাঁদের সকলকে জানাই আন্তরিক সাধুবাদ।

জগতে সকলের কল্যাণ হোক।

জয় গুরু।

ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া।

জয়তুনের বেহেশ্তি বিয়ে

বকুলের মা`র হাত ধরে লঞ্চে উঠে হাঁপাতে থাকে জয়তুন।

বুকে চেপে ধরা একমাত্র ছেলে কুদ্দুস। তার কাছে সব কিছু কেমন যেন নতুন নতুন লাগে। কী করতে হবে নিজে নিজে বুঝতে পারে না সে। এদিক সেদিক তাকায়। অব্যক্ত অজানা কী-একটা তার মনের কোথায় সারাক্ষণ নাড়া দিয়ে চলেছে।

‘বও বও`, বকুলের মা উপদেশ দেয়। সাথে আনা ছোট মাদুরটি বিছিয়ে বলে, ‘এহানে পোলারে রাইখ্যা বস্তায় এলান দিয়া বও`। কাঁথা বালিশ থালা বাটি ডেকচি আরো কিছু দরকারি জিনিসপত্রে ভরা বস্তাটি টেনে বিছানার এক পাশে নিয়ে বলে, ‘ডাহায় যাইতে কাইল হেই বিয়ানে। হারা রাইত ঘুমাইতে ঘুমাইতে যামু। কেউ আবার টাইন্যা নিয়ে যায় নাহি। তুই ঘুমাইয়া উঠলে আমি ঘুমামু।`

এখনো জয়তুন কিছু বলতে পারে না। কত অজানা বিষয় মাথায় ভিড় করছে তার ইয়ত্তা নেই। লঞ্চ ছাড়তে অনেক দেরি মনে হয়। ডেকে অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে যে। ওর কথা বলা ছেলেটাও নতুন অবস্থায় নিজেকে এখনো মানিয়ে নিতে পারে নি। কোনো কথা না বলে এদিক সেদিক তাকিয়ে থাকে। আত্মীয় বা কয়েক জন পরিচিত ছাড়া কাউকে সে কোন দিন দেখে নি। কিন্তু লঞ্চ পর্যন্ত আসতে আসতে তার এত বেশি দেখাশুনা হলো যে ঠিক মত সব বুঝতে পারছে না। বরগুনার বাইরে এই প্রথম জয়তুন যাচ্ছে। তার মুখে কথা ফোটে না, শুধুই কানে বাজে।

আস্তে আস্তে অনেক লোক উঠে পড়ে। অনেকে তর্কাতর্কি করছে জায়গা নিয়ে। অনেকে আরাম করে বসে পড়েছে। কাউকে কাউকে দেখে মনে হচ্ছে টাকা পয়সাওয়ালা। কেউ মনে হয় চাকরি করেন। আবার অনেকের অবস্থা জয়তুনদের মতই। জয়তুন ইতস্তত চোখ বুলায়, অনুমান করে এটা সেটা।

বকুলের মা মুখে পান পুরে দিয়ে চিবায় একটু একটু। ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুলে লেপটানো চুন। ‘নে, পান নে‘, জয়তুনের দিকে অর্ধেক ছেঁড়া পানে চুন লাগিয়ে টিনের কৌটা থেকে একটু সুপারি তুলে দেয় বকুলের মা। হাতটা বাড়িয়ে পান নেয় সে। মুখে পুরতে পুরতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। জয়তুনের চোখে মুখে উদাস চাহনি।

‘অত চিন্তা করিস না। মোর লগে থাকবি। চিন্তা কী, আঁ?‘ আঙ্গুল থেকে একটু চুন দাঁত দিয়ে কেটে জিবে নেয় বকুলের মা। পানের পড়ন্ত রসকে সুড়ুৎ শব্দে মুখের মাঝে টেনে নেয়। ‘মুই যা খামু তুইও হেইডা খাবি। কাম একটা জোগাড় করে নিমু। মোর তো আছেই। তোর লইগ্যা কইয়া রাখছি মোগোর সামনের মেস বাসায়। হারুন ভাই খুব ভালো মানুষ।‘

কেমন এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে ওঠে জয়তুনের বুকটা।

বকুলে মা আবার বলে, ‘মোরে কইছে, নিয়া আইও বকুলের মা, মোগো মেসে একটা ভালো বুয়া লাগবো। যেডা আছে, হেডা কামের না।‘ মুই ঠিক মত যদি তোরে লাগাইয়া দিতে পারি, আর যদি তুই কাম কাইজ বুইঝ্যা লও, তাহলে তো কোন চিন্তাই নাই।‘ বকুলের মা জয়তুনের সাফল্যে আগাম খুশি হয়ে ওঠে।

ব্যাগ বস্তা ঠিক আছে কিনা একটু দেখে নেয় বকুলের মা। জয়তুনের আরো কাছে আসে, ‘লও, চুন নেবা না?‘। প্লাস্টিকের ছোট একটা কৌটা থেকে দু আঙ্গুল দিয়ে একটু জর্দা তুলে মুখ উপর দিক করে সেটুকু মুখে ফেলে। ‘এ কদ্দুস, কি ঘুমাইছনি?‘ জয়তুনের গায়ের সাথে থাকা ছেলেটাকে নাড়া দেয়। পানভর্তি পলিথিনের ব্যাগটা খুঁজতে থাকে। চুনের কৌটাও খোঁজে। ‘অকি, তুই দেহি মুখ লাড়িস না? তুই তো আবার পান খাস না। তয় অভ্যাস কর। জানো, পান খাইলে দুঃখ ভোলা যায়‘।

জয়তুনের চোখ জলে ভরে যায়।

আঁচলে চোখ মুছে পান ভরা মুখটা আস্তে আস্তে নাড়তে থাকে জয়তুন। বকুলের মায়ের পুরান জর্দার কৌটায় রাখা চুন থেকে একটু চুনও নেয় আঙ্গুলে। চিবোতে থাকে। কেটে যায় কিছুক্ষণ। পান চিবালে কষ্ট ভুলা যায়?–ভাবে সে।

লঞ্চে ওঠার পর থেকে যে একটা কষ্ট শুরু হয়েছে সেটা যাবে তো? পান চিবাতে চিবাতে তার মুখটা ভরে যায় রসে। একটু একটু করে গিলেও ফেলে তা। মাথাটা কেমন ঝিম মেরে ওঠে তার। নতুন কষ্টটা যেতে চাচ্ছে না তার কাছ থেকে। আবার পুরান দুঃখটাও হঠাৎ করে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে মনের ভিতর থেকে।

এমন দুঃখের সময় কুদ্দুসকে বুকে ধরলে একটু সুখ পাওয়া যায়। ছেলেকে কাছে টানে জয়তুন। এতক্ষণে কুদ্দুসেরও তন্দ্রা পেয়েছে। তন্দ্রালু ছেলে ওঁ আঁ শব্দ করে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় জয়তুন। একটা কেমন দীর্ঘ শ্বাস বেরোয় বুকের গভীর থেকে।

লঞ্চ ছাড়ার সময় হয়েছে। হুইসেল বাজায় কয়েকবার। ইঞ্জিনের শব্দ বাড়তে থাকে। লঞ্চটি কাঁপতে থাকে। এক সময় বেশ দুলে ওঠে। জয়তুন ভয় পায়। বকুলের মায়ের হাত চেপে ধরে। বকুলের মায়ের হাসি পায়। নিজের অভিজ্ঞতার সাথে জয়তুনের অনভিজ্ঞতার তুলনা করে চোখে মুখে সে অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। জয়তুনের মুখ ফোটে, ‘আল্লাহ্!‘ অস্ফুট স্বরে দোয়া পড়তে থাকে সে।

‘দোয়া পড়! দোয়া-দরুদ, আল্লাহুম্মা…‘। বকুলের মা উপদেশ দেয়। নিজেও কী যেন পড়তে থাকে।

… এভাবেই একসময় সদরঘাট। সায়েদাবাদে। হারুন ভাইয়ের মেসে। অতঃপর …

জয়তুন সব শিখে ফেলেছে। অনেক কিছু তার জানা। অন্যসব বুয়া। মেসের লোকজন। তাদের আসা যাওয়া। ভাবভঙ্গি। চোখের চাহনি। কিসের আকুতি। কাঁচা বাজার, পাকা বাজার। বস্তিতে থাকা। আগুনে পোড়া বস্তি। নতুন ঘরে ওঠা। কত রকম প্রতিবেশী। আট দশ বছর কেটে যাওয়া। ছেলের বড় হওয়া। যত পরিবর্তন, সব জানা তার।

জয়তুনের চিকন এক হারা শরীর দোহারা থেকে তেহারার মত পৃথুল হতে চলেছে। বয়স যৌবনকে ছেড়ে দেবার পাঁয়তারা করছে। কত আশা আকাঙ্খা হারিয়ে গেছে কোথায়। কত নিকটাত্মীয় পর হতে চলেছে। দূরের লোকজন আপন হয়েছে। সে হয়ত কিছু মনে রাখে কিছু রাখে না।

দুপুরের পর বিকেলের আগে একটু অবসর সময়। তখন সে কী-সব ভাবে মাঝে মাঝে। কিন্তু ঠিক মত সব বুঝতে পারে না। হঠাৎ জীবন জগৎটা তার কাছে অচেনা লাগে।

‘মা, ও মা…‘ হটাৎ চমকে ওঠে জয়তুন। ‘ভাত খামু‘। ছেলের কথায় নড়ে চড়ে ওঠে সে। ব্র্যাক স্কুল পড়ুয়া ছেলে এদিক সেদিক ঘুরে এখন ফিরলো। কতক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রয় সে। ঠিক বাপের মত দেখতে। নামও রেখেছিল বাপের নামের অক্ষরে। করিমের ছেলে কুদ্দুস। বুকটা একটু কেমন মোচড় দেয় জয়তুনের।

মেসের চুলাতেই তার নিজের রান্নাবান্না হয়ে থাকে। দিনের প্রায় পুরোটাই কাটে মেসের ব্যস্ততায়। ছেলেটাও বস্তিতে রাতে ঘুমানোর সময় আর স্কুলে থাকার সময় ছাড়া মায়ের ধারে কাছেই থাকে। মেসে এর ওর ফাই ফরমাস খেটে ভালোই কাটে তার। অনেকে ছেলের সাথে ঘনিষ্ট হয়ে মাকেও ঘনিষ্ট করতে চায়। জয়তুন বুঝেও না-বুঝার ভান করে। বিরক্ত হয়, উপভোগও করে অনেক সময়। পুরুষ মানুষের জ্বালা না-পেলে মেয়ে মানুষের জ্বলন কমে না মনে হয়।

হারুন ভাই মেস ছেড়েছেন কবে। তার ঘরে এখন বাস করে তরুন ভাই। বকুলের মা অসুস্থ হয়ে সেই কতদিন হলো দেশে ফিরে গেছেন। লোক মুখে শুনেছে জয়তুন, বকুলের মায়ের ভিক্ষা করে খাওয়ার কথা। শুধু হারুন ভাই আর বকুলের মা নয়, অনেকেই চলে গেছেন। নতুন নতুন কত জন এসেছেন। কিন্তু জয়তুনের যাওয়া হলো না কোথাও।

‘ওহানে কদ্দুস? এ কুদ্দুস্সা‘ ডাক শুনে ভাবনায় ছেদ পড়ে জয়তুনের। উঠে দাঁড়ায়। ‘হ, ভাই‘ উত্তর দেয় সে। তরুন ভাইয়ের ঘরের দরজায় আসে জয়তুন। ‘কী কন?‘ জিঙ্গেস করে সে। ‘তোর পোলাডারে লন্ডিতে পাডাইয়া দে’ তরুন ভাই বলে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির নাইট শিফটের এক লাইন ইন-চার্জ। ‘রাঙ্গা জামাডারে গায়ে না-দেলে সুইংয়ের মাইয়ারা একটা হাসিও দেয় না। কত বড় খারাপ মাইয়াগুলা‘। আক্ষেপ তরুন ভাইয়ের গলায়। জয়তুন রস বোধ করে। ঘরে ঢোকে। ‘আমনে আইজ গো পান খাইছেন?‘ দু জনে কেমন তাকিয়ে থাকে। জয়তুনের মুখে পান, তরুনের মুখে সিগারেট। দু জনের গালে হাসি।

‘ও মা, মোর একছের খিদা লাগজে‘, কুদ্দুস কষ্ট প্রকাশ করে। ‘এ কদ্দুস, তোর কি বেশী খিদা লাগজে? তাইলে একটা কেলা খাইয়া যা‘। ডাকে তরুন। ছেলের প্রতি বিরক্তি নিয়ে ভাত বাড়তে তরুনের ঘর থেকে বের হয় জয়তুন।

অমন করে আলো ছাড়া অন্ধকারেও যে আসতে যেতে হয়, এ ঘরে নয়তো ও ঘরে। ঠাণ্ডা গরম পরশ যে পেতে হয় না এর বা ওর তাতো নয়। অন্ধকারে পিচ্ছিল পথে গর্তেও পড়তে হয় ইচ্ছায় না-হলেও অনিচ্ছায়। বস্তির ঘরে ফিরে রাতে শুয়ে শুয়ে কত কী ভাবনা ভাবে জয়তুন। অনেকদিন পর আবার ফিরে আসে স্বামীর মুখচ্ছবি। জয়তুনের বুকের কোথায় যেন ব্যথা করে ওঠে। কাতরায়। ঘুমন্ত ছেলেটার গায়ে হাত বুলায়। দীর্ঘ শ্বাস আসে শুধু। ঘুম আসে না।

করিম তখন মৃত্যুজ্বরে বিছানায় পড়ে ছিল। একদিন ভোর রাতে জয়তুন স্বামীর বুকে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদছিল। চোখের জলে ভিজে করিম একটু আরাম বোধ করে। দুর্বল ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় কী সব বলে জয়তুনকে। সব কথা তার মনে নেই। কিন্তু একটা কথা তার সব সময় মনে শব্দ করে বেড়ায়। করিম একবার গলা খাঁকারি দিয়ে কেশে ওঠে বার কয়েক। জয়তুন তার বুক থেকে মাথা তুলে বসে। করিম হঠাৎ তার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে। বিড় বিড় করে বলে ‘জয়তুন, তুমি মোরে একটা কথা রাখবা, জয়তুন্ন্যা…?‘ জয়তুন স্বামীর কথায় আপ্লুত হয়ে পড়ে। বলে, ‘কও কও, তোমারে মুই কথা দেলাম, কও কী কথা?‘

করিম একটা হাত জয়তুনের পেটে বুলাতে বুলাতে বলে, ‘মুই যদি মইর‍্যা যাই‘ একটু দম নেয় সে, আবার বলে, ‘এই পেডে যে আছে হ্যারে নিয়াই তোমার জীবনডা শেষ করবা। আর কাউরে বিয়া করবা না। তাইলে পরকালে মোগো আবার বিয়া অইবে।‘ থামে করিম। জোর করে নিশ্বাস নেয়। জয়তুনকে আর কাছে নিতে পারে না। একটুখানি বাতাস টানতে পারলেও জয়তুনের এলোমেলো চুলটুকুও টানতে ব্যর্থ হয় সে। জয়তুন তাকে ধরতে পারলেও কাকে যেন আর ধরতে পারে না। সেই যে চলে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই–তা জয়তুন বুঝতেও পারলো না, মানতেও পারল না। স্বামীকে শক্ত করে ধরেই রইল। সকালে যখন আর অন্যরা এসে বললেন ওর প্রাণ নেই, তখনো সে শক্ত হাতে স্বামীকেই ধরে ছিল। করিমের দেহ তো রয়েছে, তাহলে গেলো কে? এর ঘোর আজও জয়তুনের কাটে নি।

স্বামীকে দেয়া কথা থেকে জয়তুন এক মূহুর্তও সরে নি। তার স্বামী কি নিজে জানত যে, সে বা তারা বেহেশতে যাবে? নিজের মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে নিজের লোভনীয় জায়গায় যাওয়া এবং নিজের প্রিয় স্ত্রীকেও সেখানে নিতে চাওয়া জয়তুনের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা সন্দেহ নেই। কিন্তু তার প্রিয় স্ত্রীটি বাকি জীবন কত কষ্টে দিন যাপন করবে সে বিষয়ে সে কতটুকু ভাল মনের পরিচয় দিল? জয়তুন একটি বারও তা পরীক্ষা করে নি। স্বামীর প্রতি শুধু গভীর ভালোবাসাই যত্ন করে রেখে দিয়েছে বুকের মাঝে।

বস্তিতে বাস করে হীরা জহরত দিয়ে গড়া বেহেশত অনুমান করার চেষ্টা করে জয়তুন মাঝে মাঝেই। কিন্তু হীরা জহরত সে কখনো দেখে নি। তাই বেহেশতটা ঠিক মত দেখতে পায় না। তখন স্বামীর চেহারাটাও কেমন ফ্যাকাসে মনে হয়। তার ভয় লাগে এ বেহেশত নিয়ে। ভাবনাটা ভেঙ্গে যায়। কিন্তু তারপরও বিশ্বাস টিকে থাকে। এ বিশ্বাস নিয়ে টিকে থাকতেই কত মহৎ হাতছানিতে সাড়া দেয়া হলো না তার। মানুষ তাকে দেখে ভাবে– অনেক কষ্ট আর একটা ছেলে শুধু তার। আর সে ভাবে তার আছে বেহেশতি বিয়ের বর, তার ভালোবাসার স্বামী।

একদিন বস্তির ও-পাশের মাঠে হাফিজিয়া মাদ্রাসার উদ্যোগে একটা ইসালে সওয়াব হলো। জয়তুন কাজ শেষে আর অন্যদের সাথে গিয়েছিল হুজুরের বয়ান শুনতে। হুজুরের অনেক কথার মধ্যে একটা কথা তার মনে লাগে খুব। হুজুর বলেছিলেন, ‘ও আমার মা বোন ভাইয়েরা, যে ব্যক্তি যেমন বিষয়-মানুষ মনের মাঝে লাগিয়ে রাখে সে ব্যক্তির হাশর হবে তেমন বিষয়-মানুষের সাথে’। কী সুন্দর সুর করে কথাগুলো বলেছিলেন তিনি। তখন বুকে কাঁপন ধরেছিল তার। স্বামীর সাথে তার যেন হাশর হয় এই কথা ভেবেই কী অদ্ভুত সুখ হয়েছিল তার। সে দিন ইসলামের নামে দান করার ফজিলত শুনে তার হাতে থাকা টাকাটাও দিয়েছিল জয়তুন হুজুরকে। মনে মনে একটা নিয়ত করেছিল। তার স্বামীর সাথে যেন তার হাশর হয়। ছেলের জামা কেনার টাকা হুজুরকে দিয়েই সে স্বস্তি পেয়েছিল। রাত গভীর হলে কয়েক রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে কত কান্না কাটি করে দোয়া করেছিল সে। ঐ দিন থেকে তার আশা বেড়ে গেছে অনেক গুণ।

জয়তুনের বিশ্বাস আর ভাঙ্গে না। বেহেশতে তাদের বিয়ে হবে। তার ভালোবাসা আর বিশ্বাস একাকার হয়ে আছে। মনে হয়, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা থেকে উৎপন্ন বিশ্বাস তার কাঁচা বয়সকেই পাকিয়ে দিয়ে যাবে। তারও শেষ নিশ্বাস চলে যাওয়ার পর আবার হয়ত তাকে নিশ্বাস নিতে ফিরে আসতে হবে। তখন হয়ত জয়তুন পুরুষ বেশে আর করিম নারী বেশে জনম নেবে। নাকি আগের মতই থাকবে বলা যায় না। হয়ত তারা ভাই-বোন, কিংবা পিতা-কন্যা, অথবা মা-ছেলে, কিংবা আর কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশী হয়ে জন্ম নেবে। নাকি তারা দূরে অজ্ঞাত স্থানে জন্ম নিয়ে কীভাবে যেন কাছাকাছি একত্রিত হবে। তাদের সম্পর্ক যাই হোক এক সাথেই তাদের হাশর হবে। লোকেরা তাদের দেখেও হয়ত চিনতে পারবে না। তারা নিজেরাও চিনবে না নিজেদের। তাদের বিয়ে বা বন্ধুত্ব নিয়ে তারা বা লোকেরা সবাই শুধুই হইচই করবে। এভাবেই হাশরের নামে একত্রিত হওয়া কিংবা কত নরক গমন আর কত স্বর্গারোহন তার হিসাব জয়তুনরা রাখতে পারে? এমন ধারণাও তাদের নেই। মানুষের অজ্ঞতার মত বেহেশতটাও জয়তুনের কাছে অস্পষ্ট রয়েই গেলো।

ঈদে মায়ের বাড়ি আসে জয়তুন ছেলেকে নিয়ে। অনেক দিন পরে আসা। স্বামীর কবরের জায়গাটা চোখে পড়ে তার। ক-দিন পর তার জমানো কিছু টাকা খরচ করে মিলাদ পড়িয়ে নেয় সে। হাফেজি পড়া ছাত্রদের দিয়ে কবর জিয়ারত করায়। নিজে দূরে দাঁড়িয়ে থেকে ভালোবাসার কষ্টে কিছুক্ষণ কাঁদে।

‘মাগো, ঘরে যাবা না, নানী বোলাইতেছে’। কুদ্দুসের কথা শুনে সম্বিত ফেরে তার। লোকেরা কখন সব চলে গেছে ভাবনার ঘোরে থাকায় জয়তুন টের পায় নি। ‘বা-জান‘ এবারে ডুকরে ওঠে সে। এক সময় ছেলের হাত ধরে আস্তে আস্তে ঘরে ফেরে সে।

আবার… ঢাকায় সায়েদাবাদের মেসে ফেরার সময় হলো।

ব্যাগ বস্তা নিয়ে ছেলের হাত ধরে লঞ্চে বসে থাকে জয়তুন। পাশের বুড়ি বয়সের এক জনের সাথে আলাপ জমে তার। ‘ডাহা শহর হইলো মোগো হাশরখানা। ঐহানে না-ওডলে মোগো বিচার শ্যাষ অইবে না, মা’– পান এগিয়ে দিতে দিতে বলে ঐ বুড়ি। জয়তুন হাত বাড়িয়ে নেয়। বুড়ি বলে, ‘এক শ বারের বেশী অইলো এই লঞ্চে চইররে ডাহায় আই আর যাই। আওয়ারও শ্যাষ অয় না আর যাওয়ারও শ্যাষ অয় না।’

বুড়ির কথাগুলো জয়তুনের বুকে কোথায় যেন সুইয়ের মত বেধে। ভাষা হারিয়ে ফেলে সে। ভাবে– আমরা কি শুধুই এ ভাবে আসা যাওয়া করি? জীবন সুখের হোক আর দুখের হোক–আসা যাওয়া ছাড়া আর কী? এর শেষ নেই? প্রথম যে-দিন বকুলের মায়ের সাথে লঞ্চে উঠেছিল সে স্মৃতি এবার মনে পড়ে তার। মনটা খুব উদাস লাগে।

জয়তুনের মাথাটা ঘুরছে যেন। এর মাঝেই স্বামী করিমের মুখচ্ছবি ভেসে আসে তার অন্তরে। করিমের মুখাবয়ব একেবারেই দুনিয়ার সাধারণ মানুষের মতই লাগছে। সেখানে তার আশেপাশে হিরা জহরতের মত কিছু দেখা যাচ্ছে না।

জয়তুনের কী সব অদ্ভুত ধারণা হতে থাকল– এত আসা যাওয়া, দুনিয়ায় হোক আর বেহেশতেই হোক– তা থেকে মুক্তির যদি একটা উপায় থাকত! বিয়েটা তার কাছে হঠাৎ মনে হলো– নিছক একটা মাখামাখি, মাতামাতি। কিছু ছেলে-পুলে কিংবা মায়ার বন্ধন। যদি এ বন্ধন ছেঁড়া যেত! এ জ্বালা যদি জুড়ানো যেত! যদি নেভানো যেত, ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা যেত! নির্বাণ হত!

এবার আকস্মিকভাবে দুনিয়ার জ্বালা আর বেহেশতের খেলা জয়তুনের কাছে একই রকম মনে হতে লাগলো…

বোকার ভাবনা

“আমি মুক্ত!, আমি স্বাধীন!” আসলেই কি তাই?

আমি কি মুক্তির স্বাদ নিতে পেরেছি?

আমি স্বাধীন হতে চাই,

আমি জাত-ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ থেকে মুক্তি চাই,

কিন্তু এ সমাজ আমাকে কি সেই সুযোগ দিচ্ছে?

আমি যে চাই নিজেকে নিয়ে ভাবতে, আত্মকেন্দ্রিক হতে,

“আমি কে?” তা গবেষণা করতে,

সৃষ্টি-রহস্য ভেদ করে স্রষ্টার মাঝে ডুবে থাকতে।

আমি যে স্বাধীন হতে চাই; দুনিয়ার মায়া-বন্ধনের জালে জড়াতে নয়!

সত্যিই কি আমি তা করতে পারছি? এ সমাজই কি আমাকে সেই সুযোগ দিচ্ছে?

আমার অধিকার রয়েছে আত্মপরিচয় জানার, কিন্তু এ সমাজ কি আমাকে ‘আত্মকেন্দ্রিক’ হতে দিচ্ছে?

কখনো কি ভেবেছি, আমি কেন এই ধরায় এসেছি?

আমার আসার কি কোনো উদ্দেশ্য ছিল?

কে আমাকে পাঠিয়েছেন? কেনইবা পাঠিয়েছেন?

কি সেই রহস্য যে স্রষ্টা আমাকে বানালেন আর পাঠিয়ে দিলেন এই ধরায়?

আমি কি কারো কছে অঙ্গীকার করে এসেছিলাম, যা পূরন করতে ব্যার্থ হচ্ছি?

সত্যি করে বলতে, আমি কি জানি আমি আসলে কে?

কে আমি? কি আমার পরিচয়? আমি কি কখনো আমাকে দেখেছি?

বাহিরটি নয়, ভিতরটি—

বাহিরটি দেখতেও যে বস্তুর (আয়নার) সাহায্য নিতে হয়!

আমার ভেতরের আমি কে সে?

জানি না! কখনো জানার চেষ্টাই যে করি নি!!

তবে কেন করিনি?

নাকি আমাকে সেই চেষ্টা করতে দেওয়া হয় নি?

এ সমাজ কি আমাকে সেই সুযোগটুকু দিয়েছে?

নিজেদের মস্ত-বড় পন্ডিত বলে পরিচয় দেই!

বলি আমি সবার রাজা! অনেক ক্ষমতা আমার!!

আচ্ছা মৃত্যুর চেয়েও কি আমরা অনেক ক্ষমতাবান?

তা ছাড় একটু অসুস্থ হলেই তো হাউমাউ করে কেঁদে উঠি।

তখন যায় কোথায় আমাদের ক্ষমতা?

এই যে ‘আমার’, ‘আমার’ করি; আসলে ‘আমার’ কি আছে, যেটা সত্যই আমার?

এই দেহ; প্রাণ-ই তো আমার নয়, তবে ‘আমার’ কি আছে, যা সত্যই আমার?

এই যে বলি খুব মিষ্টি করে; বলতে ভালই লাগে–

“প্রয়োজনে স্রস্টার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করবো, স্রস্টাকে সবকিছু উজাড় করে দিব।”

স্রস্টার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করবো; সেই প্রাণের মালিক তো আমি নই;

তবে এমন কি আছে যা সত্যই আমার– যে স্রষ্টাকে দিব?

ফুল দিয়ে তাঁর পূজো করবো, টাকা দিয়ে উপাসনালয় গড়বো, মাটি, পানি, বায়ু-–

আমার কি আছে, যা তাঁকে দিব? এগুলো যে সব তাঁর-ই!

আচ্ছা মরার পরে কোথায় যাবো? কার কাছে যাব?

যার কাছে যাবো তাঁকে কি চিনি বা জানি? দেখেছি কি কখনো?

যার কাছে যাবো তাঁকে কি বলব? কি নিয়ে যাবো তাঁর কাছে?

কি আছে আমার যে তাঁকে দিব? সবই যে তাঁর!

সব যদি তাঁরই তাহলে ‘আমার’, ‘আমার’ বলে চিল্লালাম যে এতোদিন!

ভেবেছি কি কখনো?

ভাবিনি! — কেন ভাবিনি?

মৃত্যু তো পরের কথা, এ তো সুদূর ব্যাপার– তা ছাড়া;

বেঁচে থেকেই এখন কি করছি?

নিজেকে কি এতোটুকু রূপান্তর করতে পেরেছি?

‘পরিবর্তন!’–

যুগ হয়েছে পরিবর্তন, কিন্তু তার স্বভাব?

এখনো কেন করি ভেদাভেদ?

অতীতে ছিল রাজা আর প্রজা–

আজ তো কেবল নাম আর ধরন বদলেছে,

কিন্তু পরিবর্তন কি সত্যিই এসেছে?

কেন এই ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ?

কোথায় পালিয়েছে ‘মনুষ্যত্ব’,’একত্ব’ আর ‘সমত্ব’?

পালিয়েছে নাকি তারিয়ে দিয়েছি?

রেগে যাচ্ছ নাকি?-

যুগ তো পরিবর্তন হয়েছে, আরেহ আমরাই তো করেছি।

কিন্তু আমি কি এই ‘আমাকে’ পরিবর্তন করতে পেরেছি?

পারি নি? –পেরেছি?

হ্যাঁ করতে পেরেছি–!!

বাহির করেছি পরিপাটি কিন্তু অন্তুরমুখির এ কি দুরবস্থা!

দেখেছি কি কখনো?

আমি না ধার্মিক? হ্যাঁ নিজেকে তাই বলেই-তো ভাবি!

যখন প্রার্থনা করি বা কাউকে সাহায্য করি তখন ভাবি স্রষ্টা দেখছেন!

অথচ যখন অন্যায় করি তখন কি করে ভুলে যাই যে স্রষ্টা তখনও দেখছেন?

আমি কি করছি তা কি আমি জানি?

যা করছি- তা কেন করছি তা কি আমি বুঝি?

আমি কি জেগে আছি; নাকি জেগে থেকেও ঘুমন্ত?

আমি কি ‘আত্মসচেতন’ হতে পেরেছি?

আমি কি সত্যিই স্বাধীন হতে পেরেছি?

এ জীবন আমার অথচ চলছে সমাজের নিয়মে; যেখানে চলার কথা স্রষ্টার নিয়মে।

স্রষ্টার দেওয়া আইন-বিধান পাশে রেখে-

মানবসৃষ্ট নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করায় আজ সমাজ অধপতনের দিকে নয় কি?

আমারা কি সমাজের সিস্টেমের মধ্যে বন্ধী নই?

এই সিস্টেম থেকে মুক্তি পেতে অন্যত্র আশ্রয় পাবো কি?

আমি না চাইলেও আমাকে মানবসৃষ্ট বিদ্যালয়ে যেতেই হবে,

কাজ করতেই হবে, সংসারের জালে আটকে থাকতেই হবে।

হ্যাঁ এমন সমাজেই আমরা আছি; যেটা একটা ‘সিস্টেমের বন্দিশালা’!

আমি না চাইলেও আমাকে ‘সিস্টেম’ মানতেই হবে;

তবে কি আমরা সিস্টেমের দাস হয়ে যাচ্ছি না?

তবে যে বলি, আমরা কেবল স্রষ্টার দাস!

তবে কি তা কেবল মিথ্যা আওড়ানো?

আমরা কি ভ্রমের মধ্যে থেকে এতকিছু সয়ে যাচ্ছি?

নাকি আমাদেরকে ভ্রমনাশক অ্যালকোহল গেলানো হচ্ছে?

নাকি আমরাই ভোগী হয়ে যাচ্ছি এবং দাস হয়ে যাচ্ছি বস্তুবাদের?

আচ্ছা– আমাদেরকে কেউ ভোগ করতে বাধ্য করছে না তো?

আমরা কি কোনো ফাঁদের মধ্যে আছি, কুয়োর ব্যাঙের মতো?

আচ্ছা পৃথিবী কি কারো ব্যাক্তিগত সম্পদ?

আমার অধিকার রয়েছে পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাওয়ার-

তাহলে কে আমার অধিকার হরণ করলো?

মানুষ যদি স্বাধীন- তবে পাসপোর্ট কি জন্য তৈরি করা হলো?

পশু-পাখির তো পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না!

তবে আমরা কি রাষ্ট্র নামক বন্দীশালায় বন্দি?

মানবতার কথা বলো–

মানুষের যে অধিকার রয়েছে স্রষ্টার সৃষ্টিতে স্বাধীনভাবে বিচরণ করা!

তা কে বা কারা কিসের লোভে হরণ করে নিল?

আমাকে কে বা কারা কিসের ভয়ে ‘নাগরিক’ নামক দাস বানালো?

‘নাগরিক’– সে তো দাস!

রাষ্ট্রের দাস, সমাজের সিষ্টেমের দাস!!

তাই নয় কি?

আচ্ছা রাষ্ট্রের প্রয়োজন কার জন্য?

কিসের প্রয়োজনে তৈরি হলো বর্ডার?

পৃথিবীর কোথাও স্রষ্টার জায়গা-জমি বলতে কিছু বাকি আছে কি?

“স্রষ্টানীতি” কে বা কারা বাদ দিল?—

মানবতার নামে যে রাজনীতি-কুটনীতি চলছে বিশ্ব জুড়ে–

তা থেকে অদ্যও মুক্তি পাব কি?

আমারা বিশ্ব মানচিত্র থেকে সব দাগ মুছে দিচ্ছি না কেন?

কি প্রয়োজন আছে সেই দাগের?

কি প্রয়োজন আছে পাসপোর্টের?

কোন প্রয়োজনে এতো রাষ্ট্র সৃষ্টির?

ঐক্য হলে সকল মানুষ-

আর কি প্রয়োজন পরবে রাষ্ট্র, পাসপোর্ট, সেনাবাহিনীর?

বন্ধু হলে সবাই– তবেই-না যুদ্ধ থামবে!

রাষ্ট্র সৃষ্টি করা মানেই– শত্রু তৈরি করা নয় কি?

এত দিনে বুঝলাম–

ধর্ম, বর্ণ এবং জাত এই তিন কানাকে নিয়েই যত কোলাহল!

তুমি মুসলিম কিংবা হিন্দু; বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান;

যা বলেই দাবী কর-না কেন–-

এ যে তোমার বাপ-দাদার ধর্ম!

তোমার বাপ-দাদা যেই ধর্মের লোক ছিলেন–

সেই ধর্মই তুমি অজ্ঞানে গ্রহণ করেছ মাত্র;

তাই নয় কি?

রেগে যাচ্ছ?–

আচ্ছা ধার্মিক বড় নাকি মানুষ?

ধর্মের জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য ধর্ম?

মানুষ সেই– যার মনুষ্যত্ব রয়েছে!

মানুষ কি কখনো ধর্ম, বর্ণ, জাত নিয়ে মারামারি করতে পারে?

ধর্ম, বর্ণ, জাত–

এই তিন কানাকে বন্দি করবে কে?

কবে আসবেন সেই বীরপুরুষ?–

যে এই তিন কানাকে সঠিক পথ দেখাবেন।

মানুষের কাছে এখন সত্যের চেয়ে শাস্ত্র বড়!

যার কাছে শাস্ত্র– সত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়;

তাকে ‘সত্যের পথিক’ বানাবে কে?

শান্তির নামে অশান্তি; যেখানে সবই মিথ্যা–

সেখানে কোনো এক মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নিলেই হলো?

আমরা দুনিয়া বা বস্তুর প্রতি দুর্বল নই কি?–

এই যে এতো যন্ত্রণা ভোগ করি, তার জন্য আমরাই দ্বায়ি নই কি?

নাকি যন্ত্রণায় বসবাস করেও বুঝি না কেন আছি যন্ত্রণায়?

এর থেকে “মুক্তি” পাবার উপায় আছে কি?

‘মুক্তি’ — ‘মুক্তি’ যে এখন নিজেই বন্দি!

তাহলে উপায়! — উপায়ও নিশ্চয়ই আছে।

সেটা বের করার দায়িত্ব কার?

আমার? না… আমাদের?

যেদিন মানুষ তার “আধ্যাত্মিক” অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে;

আধ্যাত্মিক উন্নয়ন মূলক কাজে অংশগ্রহন করবে–

নিজেকে পাঠ করে “আত্মসচেতন” হবে;

সেদিনই তার বোধে আসবে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য।

নিজেকে চিনবে, জানবে— জানবে স্রষ্টাকে!

সেইদিন হয়তো সে বুঝবে এখন আমাকে “মুক্ত” হতেই হবে।

ধারাবাহিকতায়– একটা সময় সে বলবে– “আমি এখন মুক্ত।”