Home Blog Page 2

জাগতিক না পারমার্থিক? – ২

ইসলাম ধর্মে জাগতিকতা আর পারমার্থিকতা অর্থাৎ ইহকালীন কর্মযজ্ঞ  আর পরকালীন প্রাপ্তব্য-বিভূতি –এতদুভয়ের মধ্যে বিশেষ কোন তফাৎ কিংবা দূরত্ব নাহি। উপযুক্ত ভক্তগণ সম্যকরূপে সাধনা করিয়া যে দৈহিক মানসিক আধ্যাত্মিকতা সম্বলিত চারিত্রিক গুণাবলি যোগ করিতেন তাহাতে জাগতিকতার সঙ্গে পারমার্থিকতা মিলিয়া মিশিয়া একাকার হইয়া যাইত। এমন যোগী-মুমিন ব্যক্তিগণের নিকট এইরূপ আপন ঐশ্বর্য বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হইয়া থাকে। অতএব বলিতে হইবে ইসলামে তাহা চিরন্তন ধারা–নিত্য সনাতন।

কিন্তু অনুপযুক্তব্যক্তিবর্গ কিংবা নিম্নঅধিকারীগণ যথার্থ সাধন ভজন বা এবাদত বন্দেগী করিতে অনীহ থাকেন। তাহাদের কর্মযোগ যথাযথরূপে সম্পাদিত না হওয়ায় তাহাদের অর্জিতব্য উৎকর্ষ সুদূরের বিষয় বলিয়া তাহাদের নিকট প্রতিপন্ন হয়। স্বল্প কিছু আমল করিয়া তাহারা ভাবিতে থাকেন যে, ইহা সকলই সওয়াবের কাজ– পরকালে প্রাপ্তব্য। ইহা যেন ঈশপের বিখ্যাত গল্পে বর্ণিত শিয়ালের পান্ডিত্যপূর্ণ উক্তি‘আঙুর বড়ই টক‘ এর ন্যায়। নিজের ব্যর্থতা আড়াল করিবার ইহা একটি আত্মপ্রতারণাপূর্ণ চাতুরিপনা বলিয়া উচ্চঅধিকারীগণ কিংবা সুফি সাধকগণ উপলব্ধি করেন। ইমান-বান্ধব পরিবেশের অভাবে ইসলামের এমন সুন্দর অবস্থাটি আর অনেকের বোধগম্য হইতেছে না।

নবি রসুল বা অনুরূপ অবতার মহা মানবগণ যাঁহারা তাঁহাদের ভক্ত অনুসারীদিগকে মহা কল্যাণের ইঙ্গিতবহ প্রবচণ দান করিতেন তাহা কি শুধুই পরজগতে প্রাপ্তব্য? বহু কষ্টে অজস্র সাধনকর্ম সমাধা করিয়াও যদি ইহজগতে তাহা দুষ্প্রাপ্য বলিয়া গণ্য হয় তাহা হইলে মানবকুলের জন্য উহা এক অতিশয় পীড়াদায়ক পরিহাস বৈকি!

ধরাধামে আল্লাহর প্রতিনিধি নিয়োগদানের কথা কোরান মজিদে বর্ণিত হইয়াছে। যাঁহারা আল্লাহর প্রতিনিধি হইতে পারিবেন সেই তাহারাই পারমার্থিকতা লাভ করিতে পারিবেন না তাহা আমরা বিশ্বাস করিতে পারি না। খোদ আল্লাহর প্রতিনিধির পক্ষে জাগতিকতা কিংবা এই স্থূল কাঠামো আর আনুষ্ঠানিকতা অতিক্রম করিবার উপায় নাহি– এমন চিন্তা করাও আল্লাহর প্রতিনিধিত্বে বিশ্বাসীভক্তগণের নিকট পাপ বলিয়া গণ্য হইতে পারিবে। তবে যাহারা ‘আঙ্গুর ফল টক’-তত্ত্বে আস্থাশীল তাহারা তাহাদের যেমন সুবিধা ভাবিতে থাকুন। কবে তাহাদের মৃত্যু হইবে এবং শেষ বিচারের পর তাহারা পরম সুখদায়ক লোভনীয় বস্তুসকল লাভ করিতে পারিবেন তদুদ্দেশ্যে তাহারা অপেক্ষায় দিনাতিপাত করিতে থাকুন–ইহাতে কাহারো আপত্তিজ্ঞাপন উচিত নহে।

হজরত মুহাম্মদ এঁর ভক্ত সাহাবিগণের মধ্যে স্পষ্টত দুইটি ভাগ সূচিত হইয়াছিল। তাঁহাদের একভাগ অনুভব করিতে পারিয়াছিলেন যে মানবজীবনের মাঝে এক পরম অর্থবোধক তাৎপর্য রহিয়াছে। আর তাহা বিশেষ প্রচেষ্টায় অর্জিতব্য। রসুলুল্লাহর বিশেষ নেকদৃষ্টি লাভে ধন্য হইয়া কতিপয় মুত্তাকি সাহাবি তাহা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। যদিও তাঁহাদের সংখ্যা মোট সাহাবিগণের তুলনায় অতি অল্প, তথাপি তাঁহারা সিদ্ধপুরুষরূপে গণ্য হইতে পারিয়াছিলেন। এঁনাদের মধ্যে আহলেবাইত সকলের অগ্রগণ্য। সফলকামদের  মাঝে অনেকেই ‘আহলে সুফ্ফা’বলিয়া পরিচিত ছিলেন। তাঁহাদের আচরণ-বিচরণ রসুলের অন্যান্য সাহাবিদের চাইতে একেবারেই আলাদা ছিল। চলনে বলনে শয়নে স্বপনে হজরত রসুলে-করিম এঁর প্রতি এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে, মনে হইত, তাঁহারা বুঝি আল্লাহর এবাদত নয়–স্বয়ং মুহাম্মদ এঁর এবাদত করিত!

যেই কথা রসুলুল্লাহর ইন্তেকালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় হজরত আবু বকর সিদ্দিক প্রকাশ করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন যে, “ওহে! তোমরা যাহারা মুহাম্মদের এবাদত করিতে (শোন), মুহাম্মদ মরিয়া গিয়াছে। আর যাহারা আল্লাহর এবাদত করিতে (শোন), আল্লাহ্ চিরঞ্জীব”(মূল বর্ণনা : হাদিস নং ১১৬৯, বোখারি ২য় খণ্ড, ইফাবা)। হজরত আবু বকরের ঘোষণানুযায়ী সাহাবিগণের মাঝে এই যে দুইটি বিভক্তি তার একটিকে দেখিয়া প্রতিভাত হইত যে, তাঁহারা যেন হজরত মুহাম্মদের এবাদত করিতেছেন এবং অপরটিকে দেখিয়া সহজেই বুঝা যাইত যে, তাহারা নিরাকার আল্লাহর প্রতি মনোযোগী–রসুলের প্রতি নহেন। নবিজির ইন্তেকালের পর মুহূর্তেই ঐরূপ ভাষায় একটি ঘোষণা কেন দিতে হইয়াছিল তাহা ইতিহাসবিদগণ ভাবিয়া দেখিলে বিষয়টি স্পষ্ট হইয়া যাইবে।

হজরত রসুলে-করিমের সমকাল হইতে শুরু করিয়া অদ্যাবধি এইরূপ ২টি দল শাখা-প্রশাখাসহ চলিয়া আসিতেছে। হজরত আবু বকর বর্ণিত প্রথম দলটি ইহকালেই পারমার্থিকতা অর্জনে সদা তৎপর হইয়া থাকেন, কিন্তু তাঁহারা সংখ্যালঘু। আর দ্বিতীয় দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাঁহারা জাগতিক আনুষ্ঠানিকতায় আবদ্ধ থাকিতে সচেষ্ট থাকেন। ফলে মুসলিম সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই জীবনকে পরমার্থবোধক কিছু না ভাবিয়া শুধুই আর্থসামাজিক সুবিধাভোগী এবং আল্লাহর এবাদত এর পারিশ্রমিক স্বরূপ পরকালে নির্দিষ্ট পাওনা দাবী তৈরি করিয়া তাহা আমল নামায় বাকি রাখিয়া পরকালের অপেক্ষায় থাকিতে প্রবৃত্ত হইয়া পড়েন।

কোরান মজিদে আল্লাহ্ মাননীয় ত্রয়ী বিষয়ে নির্দেশনা দান করিয়াছেন : আল্লাহর আনুগত্য, তাঁহার রসুলের আনুগত্য এবং তোমাদের মধ্যে থাকা উলিল আমরের আনুগত্য বিষয়ে (মূল বর্ণনা: ৪ সুরা নাস: ৫৯/৮৩)। ইহা অলঙ্ঘনীয়।  যাঁহারা সফল হইবেন তাঁহারা এই পবিত্র ৩ এঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই তাহা অধিকার করিবেন। আল্লাহ্ এবং রসুল–এই ২ জন যে একান্ত আল্লাহ্-রসুলের বিষয় তাহা সহজেই বোধগম্য হইয়া থাকে কিন্তু ৩য় জন অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে থাকা ‘উলিল আমর‘ও কি আল্লাহ্-রসুলের বিষয় নাকি জনগণ ভোট দিয়া কাহাকেও নির্বাচন করিবেন? ইহা লইয়া মুসলিম জগৎ বিষম গোলযোগে পতিত হইয়াছে। হজরত মুহাম্মদ ইন্তেকাল করিবার পর থাকিয়াই ইতিহাসের এই চরম বিরুদ্ধ মতের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়া চলিয়াছে। তথাপি যাঁহারা আধ্যাত্মিক সুফি সাধনায় জড়িত থাকেন তাঁহারা ‘উলিল আমর‘-কেও আল্লাহ্-রসুলের স্বীকৃতিধন্য পারমার্থিক বলিয়াই উপলব্ধি করিয়া থাকেন। অন্যরা ‘উলিল আমর‘-কে জাগতিক বিষয়রূপে গণ্য করিয়া তাঁহাকে নিজেরাই নির্বাচন করিয়া থাকেন।

নবিজির ইন্তেকাল পরবর্তী কালে যেহেতু ‘রসুল‘ সশরীরে উপস্থিত নহেন এবং পারমার্থিকরূপে উলিল আমরও স্বীকৃত নহেন তাহা হইলে অবশিষ্ট থাকিলেন শুধু মহান আল্লাহ্ তায়ালা। সুতরাং কোরান বর্ণিত মাননীয় ৩ এঁর স্থলে হজরত আবু বকর বর্ণিত চিরঞ্জীব আল্লাহ্ একাই সর্বময় কর্তৃত্বের আসনে আসীন বলিয়া গণ্য হইলেন। সাধারণ বুদ্ধিতে ইহাই সঠিক বলিয়া প্রতীয়মান হইলেও কোরানি বর্ণনার সহিত তাহা সঙ্গতিপূর্ণ হইতে পারিল না। জাগতিক বুদ্ধির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই সিদ্ধান্ত কোরানি পারমার্থিক জ্ঞানে আদৌ গৃহীতব্য নহে–ভাবিয়া দেখিবার জন্য ইহা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। ইহকাল ও পরকাল বিষয়ে যথার্থ বোধ তৈরির জন্যও তাহা অত্যাবশ্যক বটে।

উলিল আমর বিষয়ে ত্রুটিপূর্ণ ধারণার বশবর্তী হইয়া ইসলামের জাগতিক কর্মের সহিত পারমার্থিকতার যথার্থ সমন্বয় আর হইলো না। ফলে ইসলামের সত্যিকার সৌন্দর্য প্রশ্ববিদ্ধ হইয়া থাকিল। ইহা অতিশয় পরিতাপের বিষয়! 

পুষ্পিতা

২৫ এপ্রিল ২০২৬      

সফরনামা ।। শিল্পী খন্দকার নাছির আহাম্মদ

আমার শিল্পচর্চার শুরু ছোটোবেলা থেকে ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে। পরবর্তীতে স্কাল্পচারের লে-আউট (খসড়া) তৈরির অংশ হিসেবেও ড্রয়িং আমার একটা ভাষা হয়ে ওঠে। কার্ভিং এর কাজের ফাঁকে ঔষধের প্যাডে কিংবা হাতের কাছে যে স্কেচবুক পেয়েছি তাতেই আঁকতে শুরু করেছি। শুরুতে অনেকটাই অন্যমনস্কতা থেকে ড্রয়িং করতাম। হয়তো একটি পাতা আঁকলাম তারপর পাতা থেকে ফুল, ফুল থেকে ফল, ফল থেকে হয়তো মানুষের মুখ বা মাথা এরকম আরকি। অনেকটা উদ্দ্যেশ্যহীনভাবে আঁকতে আঁকতে খেয়াল করলাম ড্রয়িং নিজেই নিজের ভিতরে ন্যারেটিভ বা গল্প তৈরি করেছে। ২০১৫ সাল থেকে এই ড্রয়িংগুলোর ব্যাপারে আরও সচেতন হই। সেসময় আমি প্রচুর বাংলা গান বিশেষ করে ফকিরি বা ভাবগান শুনতাম। তো স্বাভাবিকভাবেই গানের বিভিন্ন প্রসঙ্গ ছবিতে চলে আসতো। একটা সময় গান শোনার পাশাপাশি আমি গানের লিরিক্সও পড়তে শুরু করি এবং ছবির মধ্যে সেগুলোর প্রভাব মেলাতে পারতাম। আমার ছবির স্তরগুলো মূলত সেখান থেকেই বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। যেখানে প্রতিটি রেখা, প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি চরিত্র আমাকে সম্ভাবনার একেকটা নতুন দরজা খুলে দেয়।

মূলত চারুকলায় লেখাপড়া শেষ করে মেইনস্ট্রিম আর্ট প্র্যাকটিসে প্রবেশ করার পর আমার মনে হয়েছিলো, এখানকার শিল্পভাষা সাধারণ মানুষের সাথে ততটা সংযোগ তৈরি করতে পারে না। “ছবির হাট”–এর অভিজ্ঞতা আমাকে এই উপলব্ধি দিয়েছিলো যে, মানুষ যেভাবে সাহিত্য বা গানের সাথে সংযুক্ত, দৃশ্যশিল্পের সাথে সেই মাত্রার সংযোগ এখনো তৈরি হয়নি। এরকম একটা ভাবনা থেকেই আমি মানুষের সাথে সংযোগের ভাষা খুঁজতে থাকি এবং বাংলা গানকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি। বাংলা গানের ঐতিহ্য আমার কাছে উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক কাঠামোর বাইরে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত জ্ঞানভান্ডার মনে হয়, যেখানে এই ভূখণ্ডের দর্শন-চিন্তা, অনুভব ও জীবনবোধ সঞ্চিত আছে।

আমার পারিবারিক শেকড় মাজার, দরবার ও ফকিরি সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। যদিও চারুকলায় পড়ার সময় আমি আধুনিক দর্শন কিংবা বলা যায় কিছুটা নাস্তিক্যবাদী চিন্তা কাঠামোর মধ্যে ছিলাম। নিজের এই উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে ততটা সচেতন ছিলাম না। কিন্তু পরবর্তীতে কতগুলো বাস্তব উপলব্ধি থেকে আমি আবার ফিরে আসি। আমার নানা জালালুদ্দিন রুমি’র অনুরাগী ছিলেন। বাংলা ও ফারসি সাহিত্যেও পারদর্শী ছিলেন তিনি। এই উত্তরাধিকার আমাকে রুমি, শামস তাবরিজ, মনসুর হাল্লাজদের নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে। আমি তাদেরকে শুধু সাধক হিসেবে নয়, বরং সামাজিক রূপান্তরের চিন্তক হিসেবেও দেখি। আমার কাছে এই প্রত্যাবর্তন কেবল ভাব বা আবেগের জায়গা নয়, বরং এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও। নিজেকে জানা, সমাজকে বোঝা, ইতিহাসকে পুনরায় পাঠ করা—এই সবকিছুই এই চিন্তা প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত।

এই অঞ্চলের পুঁথি সাহিত্য, ভাবগান, উঠান সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য—এসবের ভিতরে ছিল সম্পর্ক, কল্পনা, কান্ডজ্ঞান ও সহাবস্থানের শিক্ষা। ঔপনিবেশিক শিক্ষার ধারায় আমরা যে ধরনের জ্ঞান চর্চার ধারায় প্রবেশ করেছি সেখানে এই স্থানিক বা লোকজ জ্ঞানকে অধ্যয়নের অংশ করা হয়নি; বরং পরিত্যাগ করা হয়েছে। ফলে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়েছে, মানুষে মানুষে সহজ সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে। একটা বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, আমি পশ্চিমা আধুনিকতার বিরোধী নই, ঐ চিন্তার সবকিছুকে খারিজও করতে চাই না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি পশ্চিমা আধুনিকতা এবং আমাদের লোকজ জ্ঞানের সমন্বয় করা প্রয়োজন, এবং সেটা সম্ভব কারণ লোকজ জ্ঞান এখনো পরিপূর্ণভাবে জীবিত আছে বাংলা গান, সাহিত্য এবং গণ মানুষের সহজ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ভিতরে।

আমার কাজের মোটিফগুলো কোনো একক জায়গা থেকে আসে না। যেমন আমার কাজে ঘোড়ার মোটিফ বারবার ফিরে আসে। ঘোড়া আমার কাছে গতি, তেজ, অদম্য ইচ্ছা, আধ্যাত্মিক যাত্রা ও ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতীক। লালনের গান, ফররুখ আহমেদের কবিতা, আল মাহমুদের চিত্রকল্প, সুফি ঐতিহ্য, মিনিয়েচার পেইন্টিং, বোরাকের মিথ, এমনকি কারবালার স্মৃতি—সবকিছু মিলিয়ে ঘোড়া এক বহুমাত্রিক চিহ্ন আমার কাছে। তেমনি নারী-পুরুষ, প্রকৃতি এবং মানুষের চিন্তার নানা স্তরকে আমি এঁকে গিয়েছি। কখনো সচেতনভাবে আবার কখনো অবচেতনে যা এসেছে তাকেই ধরতে চেয়েছি, আঁকতে চেয়েছি। আমি এখনো কোনো চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছাইনি, বরং একটা অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। ছবির রেখাগুলো আমার স্মৃতি, বাংলা গান, এ অঞ্চলের ইতিহাস ও মানুষের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের সুতাগুলোকে মূলত একত্রিত করার চেষ্টা।

ঘরে ফেরার গান

যুগল স্বরূপ
অটল
থির
সম্যক স্মৃতি
ছায়াহীন

হালাল ও হারাম প্রসঙ্গে সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশ্‌তী 

Halal and Haram is not in the ‘matter’, in the ‘object’. But it is in the Mind.
হালাল ও হারাম কোনো ‘বস্তু’ বা ‘পদার্থ’-এর মধ্যে নেই; এটি রয়েছে মনের মধ্যে।

Object is impartial. It is neither Halal, nor Haram.
বস্তু নিজে নিরপেক্ষ; এটি না হালাল, না হারাম।

It is neither impure, nor pure. Purity and impurity lies in the Mind.
এটি না অপবিত্র, না পবিত্র। পবিত্রতা ও অপবিত্রতা আসলে মনের মধ্যেই অবস্থান করে।

If a Mind of a man applies Salat, on the object, on the matter, then it becomes pure.
যদি একজন মানুষের মন কোনো বস্তু বা বিষয়ের উপর সালাত প্রয়োগ করে, তবে তা পবিত্র হয়ে ওঠে।

So it is Halal.
তখন সেটি হালাল হয়।

But if it does not apply Salat on it then that thing is impure.
কিন্তু যদি তার উপর সালাত প্রয়োগ না করা হয়, তবে সেই বস্তু অপবিত্র থেকে যায়।

All things coming into the brain through the seven antennas, the phenomenal world is coming in.
সাতটি অ্যান্টেনা বা ইন্দ্রিয়পথ দিয়ে মস্তিষ্কে যেসকল বিষয়রাশি প্রবেশ করছে—সমস্ত অভিজ্ঞতার জগতই এভাবে ভিতরে আসছে।

And these are all impure unless you apply Salat on it.
এবং এগুলো সবই অপবিত্র, যতক্ষণ না তুমি তার উপর সালাত প্রয়োগ করছ।

When Salat is applied it becomes pure, so it is Halal.
যখন সালাত প্রয়োগ করা হয়, তখন তা পবিত্র হয়ে যায়, তাই সেটি হালাল হয়।

But a man cannot practice this Salat on every item at a time.
কিন্তু একজন মানুষ একসাথে প্রতিটি বিষয়ের উপর এই সালাত অনুশীলন করতে পারে না।

Every item on this senses at a time. Hence to, do it one by one.
ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি উপাদানের উপর একসাথে নয়; তাই এটি একে একে করতে হয়।

So when in one item of a sense he applies Salat then those matters become pure and Halal.
তাই যখন কোনো একটি ইন্দ্রিয়বস্তুর উপর সে সালাত প্রয়োগ করে, তখন সেই বিষয়টি পবিত্র ও হালাল হয়ে ওঠে।

Other gates are open, things are entering through those gates. Those items are impure.
অন্য দরজাগুলো তখনও খোলা থাকে, এবং সেগুলো দিয়ে নানা বিষয় প্রবেশ করতে থাকে। সেই বিষয়গুলো তখনও অপবিত্র।

But it is Halal because the man has started Salat on one item.
তবুও এটি হালাল, কারণ মানুষটি অন্তত একটি বিষয়ের উপর সালাত শুরু করেছে।

So other items even if those are impure yet it is Halal for him.
তাই অন্য বিষয়গুলো অপবিত্র থাকলেও, তার জন্য তা হালালের পরিসরের মধ্যেই থাকে।

But the man who can extend the Salat on all the items and become perfect, in the performance of the Salat then that man becomes Allah Himself, becomes Allah.
কিন্তু যে ব্যক্তি সবকিছুর উপর সালাত বিস্তৃত করতে পারে এবং সালাতের অনুশীলনে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সে নিজেই আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হয়ে যায়—আল্লাহর সান্নিধ্যে একাত্ম হয়।

All the items cannot be purified so easily as you think it to be.
সবকিছুকে পবিত্র করা তুমি যতটা সহজ ভাবছ, ততটা সহজ নয়।

This is not so easy to apply Salat all the items at a time and then become totally purified mentally, and physically.
একসাথে সব বিষয়ের উপর সালাত প্রয়োগ করে মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে ওঠা মোটেও সহজ নয়।

It is very difficult.
এটি অত্যন্ত কঠিন।

So to be Allah is also no joke.
তাই আল্লাহসুলভ সেই পরিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছানোও কোনো সহজ বিষয় নয়।

It is is a tough matter to become allah.
আল্লাহর নৈকট্যের সেই চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছানো সত্যিই এক কঠিন সাধনা।

Samsara চলচ্চিত্র নিয়ে দু’কথা

চলচ্চিত্রের পরিচিতি

নাম: সামসারা (Samsara)
মুক্তির বছর: ২০০১
ধরন: রোমান্স, ড্রামা, আধ্যাত্মিক চলচ্চিত্র
পরিচালনা: পান নালিন
চিত্রনাট্য: পান নালিন
সময়: ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট
ভাষা: তিব্বতি

[spoiler alter]

চলচ্চিত্রের নাম samsara, অর্থ দাঁড়ায় ‘birth, death and rebirth’ অথবা, ‘impermanence’ অর্থাৎ, অনিত্যতা। চলচ্চিত্রটিকেকে non-narrative documentary film বলা পরিচিত করানো হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে ২৫টা দেশের বিভিন্ন জায়গায় শ্যুট করা হয়েছে।

এক একটা ফ্রেমের সৌন্দর্য মাথা খারাপ করিয়ে দেয়। চোখে পড়ে পাহাড়ের মাঝে প্রত্যন্ত এলাকায় ভিক্ষু সম্প্রদায়ের নানা মনেস্ট্রি। Los Angeles Times এ চলচ্চত্রটি নিয়ে লিখা হয়েছে “as frustrating as it is beautiful.” ভালো ফ্রেম, ভালো মনতাজ, ভালো টেকনিক- এইসব বিষয় বেশি সামনে এসেছে। আমার মূল আগ্রহ ছিল এর গল্পকে ঘিরে।

চলচ্চত্রটির কোনো সাবটাইটেল নেই। তার দরকারও পড়েনি। আচ্ছা বলুন তো, দুম করে কি কেউ সাধু হয়? শুরুতে দেখা যায় আকাশে উড়তে থাকা একটা চিল ঢিল দিয়ে বিস্তৃত বরফি পাহাড়ের সমতল এলাকায় থাকা একটা ভ্যাড়াকে মেরে ফেলে। এই সিনটা গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখায় তা বোঝা যাবে।

একদল ভিক্ষু চলেছেন এক নির্জন গুহায় যেখানে আরেক ভিক্ষু লম্বা সময় ধরে ধ্যানস্থ আছেন। এই ধ্যানস্থ ভিক্ষুর জীবন হলো আমাদের গোটা সিনেমাটা। পরম মমতার সাথে তার ধ্যান ভাঙ্গান অন্যরা। বিশাল নখ, চুল কেটে গায়ের ময়লা মুছে তাকে নিয়ে আসেন নিজেদের ঘাঁটিতে। ভিক্ষু সম্প্রদায়ে এই ভিক্ষু খুব আদরের পাত্র। লম্বা সময় ধ্যানে থাকার ফলে তার চেহারার মাঝে যে নির্লিপ্ততা তা দেখে মনে হয় জগতের সকল কিছুরই উপরে চলে গেছে সে।

আমার খুব স্পষ্ট করে জানা নেই তবে আন্দাজ করতে পারি যে মনেস্ট্রির বুদ্ধ ভিক্ষুর চর্চায় শারীরিক সম্পর্কের স্থান নেই। তো সেই মনেস্ট্রিতে বাৎসরিক এক অনুষ্ঠানে আমাদের ভিক্ষু প্রথমবারের মতন ব্রেস্ট-ফিডিং দেখেন। এবং তার অভিজ্ঞতার বাইরের এই ঘটনা দেখে তার গভীরে এক নতুন দুনিয়ার সৃষ্টি হলো… তার ভিতরে কামনা জাগতে থাকে। সে রাতে যৌন স্বপ্ন দেখে সে, বীর্যপাত ঘটে। গুরু সেসব দেখে বুঝে চিন্তিত হয়ে তাকে আরেক  গুরুর কাছে পাঠান যৌনতার ব্যাপারে জানার জন্য।

এতই কি সহজ? আমাদের ভিক্ষু নিজ আস্তানায় ফেরত আসে। ভীষণ বিষণ্ণ, কিচ্ছু ভালো লাগেনা। যুক্তি ধর্মের নিকুচি করে এক ভোরবেলায় সে আশ্রম ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে। ভিক্ষুর পোশাক ছেড়ে বেছে নেয় সাধারণ চাষির পোশাক। এরপরের কাহিনী সুদীর্ঘ।

এখানে আর মনোহরা সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য নেই, নেই নিস্তব্ধতার মাঝ দিয়ে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা। এবারে সবটাই বস্তুগত আর সবটাই ধরাছোঁয়ার ভিতর। সে প্রেমহীন কামনার যৌনতায় অংশ নেয়। সামাজিক চাপে তাকেই বিয়ে করে। তার ধারনা সেই মেয়েটিকেই সে ভালোবেসে চলেছে। তাদের সন্তান হয়। ততদিনে সে খুব ভালো মাপের ‘সামাজিক পুরুষ’ হয়ে উঠেছে। তার বাড়ি, চাষ সবকিছুই দুর্দান্ত। জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করে চলেছে সে। দেখলে মনে হয় সে সুখী একতা মানুষ। ছেলে বড় হচ্ছে দিনদিন। কোন কিছুর অভাব নেই।

এরমাঝে একদিন এক নারীকে দেখে আবার তার মাঝে যৌন ইচ্ছা জাগ্রত হয়। সে নতুন ধরনের শূন্যতার সাথে পরিচিত হয়। বউ বাচ্চা বাড়িতে না থাকাকালীন এক সময়ে সেই নারীর সাথে সে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। একদিন তার এতদিনের পরিশ্রমে তিলে তিলে দাঁড় করানো এই ফসলের ক্ষেতে আগুন লেগে যায়। সব শেষ হয়ে যায়। একই সাথে লোকাল পলিটিক্সের সাথেও পেরে ওঠেনা আর। এতদিনের গুহায় ধ্যানে থাকা লোকও কতটা অসহায় হতে পারে সেটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হলো।

কোনো কিছুর অভাব না থাকাটা আমার কাছে জাগতিক মুক্তির মূল হাতিয়ের মনে হয়। আবারো সেই ভোর রাত… সে ঘুমন্ত স্ত্রী পুত্রকে রেখে ভিক্ষু আশ্রমে ফেরত আসে। ঘাড় অবধি নেমে আসা সুন্দর সিল্কি চুলকে মুড়িয়ে ন্যাড়া হয়। যেন বিষয় থেকে মুক্তির চেষ্টা। তুলে নেয় ভিক্ষুর পোশাক। এমন সময় স্ত্রী চলে আসে। সংসারের দায় এড়ানোর ফলে খিস্তিও করে তার স্ত্রী। ভিক্ষু থাকাকালীন শেষ চিহ্ন হিসাবে সন্তানকে উপহার দেয়া (তসবীর মতন একটা মালা) স্বামীর দিকে ছুড়ে দিয়ে সে চলে যায়। এমন অবস্থায় আমাদের ভিক্ষুটি মাটিতে শুয়ে হাত পা ছড়িয়ে কান্না করতে থাকেন। একেবারে ভেংগেচুরে গেছেন তিনি তখন।

বিষয় যখন ছিলোনা তখন কি বিষয় শূণ্যের ধ্যান মানানসই? বিষয়ে থেকে মজে পঁচে তবে তা থেকে মুক্তির চেষ্টা করাটাই যুক্তিসঙ্গত। বুদ্ধ ধর্মের অনুসারীদেরও তবে কি এক প্রকারে গোড়ামি পাওয়া গেল কি তবে? ঘুমন্ত স্ত্রী সন্তান ফেলে চলে গিয়েছিলেন স্বয়ং বুদ্ধ। যদিও মানুষ হিসেবে নিজেকে নির্মাণের কাছে জগতের বাকিসব নস্যি। সাধারণ মানুষের কাছে এই আচরণ কঠোরই লাগবে। সিনেমাতেও এই সিনটা দেখে আমার কেবল রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটা লাইন মনে পড়ে।

বৈরাগ্য

কহিল গভীর রাত্রে সংসারে বিরাগী,
‘গৃহ তেয়াগিব আজি ইষ্টদেব লাগি।
কে আমারে ভুলাইয়া রেখেছে এখানে।’
দেবতা কহিল, ‘আমি।’— শুনিল না কানে।
সুপ্তিমগ্ন শিশুটিরে আঁকড়িয়া বুকে
প্রেয়সী শয্যার প্রান্তে ঘুমাইছে সুখে।
কহিল, ‘কে তােরা ওরে মায়ার ছলনা!’
দেবতা কহিল, ‘আমি।'— কেহ শুনিল না।
ডাকিল শয়ন ছাড়ি, ‘তুমি কোথা প্রভু।’
দেবতা কহিল, “হেথা।”— শুনিল না তবু।
স্বপনে কাঁদিল শিশু জননীরে টানি—
দেবতা কহিল, ‘ফির।' শুনিল না বাণী।
দেবতা নিশ্বাস ছাড়ি কহিলেন, ‘হায়,
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়।’

আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়… রবির দর্শনে আমি আস্থা রাখি। সংসারে থেকে সংসার মুক্তির লীলা আমার কাছে আদরণীয়। সিনেমার শেষ দৃশ্য ঐ শুরুটার মতন। ভিক্ষুর মাথার উপরে চিল ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাথর পড়বে কি? আমাদের সকলের মাথার উপরেই ওই চিল ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথায় বলে, ‘’ধাক্কা খেলে মক্কা যায়’’ এইসব ধাক্কার জন্য একটা করে চিল মাথার উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু ধাক্কা চেনার অপেক্ষা।

  • চলচ্চিত্রটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য

সর্বকূলের কাণ্ডারি তুমি – হেলাল উদ্দিন চিশতি

কথা ও সুর: হেলাল উদ্দিন চিশতি

সর্বকূলের কাণ্ডারি তুমি

ইয়া মুহাম্মাদ ইয়া রাসূল

তোমা হতে সবই সৃজন

তুমি মূলের মূল

নিজে আল্লাহ প্রেমাবেশে

নিজরূপ দেখার আশে

পয়দা করেন প্রথম তোমায়

নাই যে তব কূল

পয়দা তুমি আল্লাহর নূরে

রাখিয়া দিলেন নূরের ভিতরে

খোদায় তোমায় চিনিতে পারে

ইয়া মুহাম্মাদ ইয়া রাসূল

পাঠালেন যত নবী ও রাসূল

নাই যে কেহ তব সমতুল

তুমি যে মকসুদ তুমি যে মকবুল

হামারি রাসূল

আরশে আল্লাহ অতি যতনে

রাখলেন তোমায় অতি গোপনে

তোমারি ভেদ খোদায় জানে

শাহানশা নবীকূল

আল্লাহরও রহমত তুমি

সাফায়াতের রাজা তুমি

কুদরতেরও কুদরত তুমি

তুমি বিনা নাহি কূল

তব উম্মতের এতই শান

বনি ইসরায়েলের নবীর সমান

পাপীতাপী পাবে পরিত্রাণ

ইয়া মুহাম্মাদ ইয়া রাসূল

প্রশ্ন: ওহাবি ও মোজাদ্দেদি চিন্তাদর্শন কেন দ্বৈতবাদী—তারা তো একত্ববাদই মানে?

উত্তর: ওহাবি চিন্তাদর্শন ভাবগতভাবে আল্লাহর নাম, গুণ, এবাদত সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর একত্বে বিশ্বাসী। যা বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা ইন্দ্রিয়জ ব্যাপার। এতে যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর একত্ব প্রমাণ করা যায় বটে কিন্তু তা অতীন্দ্রিয়জ বা সত্তাকারে বুঝা যায় না। তাই যিনি বিষয়টি এভাবে বোঝেন তাকেও বর্তমান থাকতে হয়। ফলে ২ টি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় থাকে—যিনি বোঝেন তিনি অর্থাৎ ব্যক্তি মানুষটি এবং যাঁকে বুঝা হয় তিনি তথা আল্লাহ্। ফলে যাঁকে বোঝা হচ্ছে সেই আল্লাহ্ সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে ১ জন প্রমাণিত হলেও যিনি তাঁকে বুঝতে পারছেন (বা উক্ত ব্যক্তি) তাঁরও স্বকীয়তা টিকে থাকছে আরো ১ জন রূপে। প্রাসঙ্গিক কারণে সমস্ত সৃষ্টিজগতকেও আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে—তাই তা আপনা থেকে দ্বৈত অবস্থার সৃষ্টি করছে। সুতরাং তা একত্ববাদ হলো না—দ্বৈতবাদই হলো। আবার মোজাদ্দেদি চিন্তাদর্শন সাধনার চূড়ান্ত পর্যায়ে অতীন্দ্রিয় অনুভূতির সাহায্যে আল্লাহকে সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে ১ জন বলে বুঝতে পারেন বলে দাবি করা হয়। এবং সাধক ব্যক্তি তাঁর এবাদতে মশগুল থাকেন। এতে আল্লাহর সাথে এবাদতে কোনো শেরেক থাকে না—যা একজন মানুষের জীবনে এক বড় অর্জন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও পূর্বের ওহাবি দর্শনের মতো ২ টি অস্তিত্বে গিয়ে বিষয়টি থেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ এবাদতকারী এবং যাঁর এবাদত করা হচ্ছে সেই তিনি। সুতরাং তা একত্ববাদ নয়, দ্বৈতবাদ।

যখন কেউ মূর্তি পূজা করে তখন সে ঈশ্বরকে মেনে নিয়েই তা করে। তার মূর্তি এ ক্ষেত্রে ঈশ্বরের উপলক্ষ্য। একই ধারণা প্রয়োগকৃত হয়ে আছে দ্বৈতবাদী দর্শনে। মূর্তিপূজক, মূর্তি আর ঈশ্বর যেমন ঠিক তেমনি এবাদতকারী, সৃষ্টিজগত আর আল্লাহ্। সমস্ত সৃষ্টিজগত যেন একটি মূর্তি—যা ঈশ্বর বা আল্লাহর বিপরীতে রয়েছে। আর মূর্তিপূজক বা এবাদতকারী ঈশ্বর বা আল্লাহকে ১ জন বলেই মেনে চলেছেন। এমনকি এখানে নিজেকেই আল্লাহর সমান্তরাল বলে দাবি করা হচ্ছে। যেন বলা হচ্ছে যে, ‘আল্লাহ তুমিও আছ, আমিও আছি’। এটা আল্লাহর একত্ববাদ হলেও, অস্তিত্বের দ্বৈতবাদ—যা শেরেক বলে গণ্য। আসলে ওহাবি দর্শন প্রাথমিক পর্যায়ের, চূড়ান্ত দর্শন নয়। আর কেউ কি মনে করতে পারে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিক্ষালাভের চূড়ান্ত ক্ষেত্র—আর কোনো শিক্ষা নেই? মোটেই তা হতে পারে না। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া উচ্চতর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। অর্থাৎ পর্যায়ক্রমিক ধারা ঠিক রেখেই শিক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে হয়। নতুবা অজ্ঞতার অবসান হয় না। আর উচ্চতর পর্যায়ে বেশি মানুষের পক্ষে সাফল্য লাভ সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু উচ্চতর সাফল্য লাভ করতে না-পারা এক কথা আর সেটাকে অস্বীকার করা আরেক কথা। এ জাতীয় অস্বীকার করণ একটা বড় ধরনের কুফরি।

তাই এটা খুব স্পষ্ট যে, ওহাবি ও মোজাদ্দেদি চিন্তাদর্শন দ্বৈতবাদী, তা মোটেই একত্ববাদী নয়।

তথ্যসূত্র: 

কোরানে মানুষতত্ব পরম্পরা – ৩, হিলালুজ্‌জামান হেলাল

টাইপিং সহযোগী মৈত্রী: সৌমিক জয়

বুঝে শুনে পড়ি বই (পর্ব – ১)

বইয়ের নাম: Apprenticed to a Himalayan Master (A Yogi’s Autobiography) 
যোগী শ্রী ম (Sri M) - শ্রী মধুকর নাথ 
  • বইটির তথ্য:
  • প্রকাশক: মেজেন্টা প্রেস (ভারত) [Magenta Press (India)]
  • প্রথম প্রকাশ: ২০১০
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩২৯
  • ভাষা: ইংরেজী

আজকের আলোচিত বইয়ের নাম, Sri M (শ্রী এম ) এর লিখা “Apprenticed to a Himalayan Master (A Yogi’s Autobiography” [এপ্রেন্টিসড টু এ হিমালায়ান মাস্টার (এ যোগী’স অটোবায়োগ্রাফি)];

এই বইটিতে একজন সাধকের জীবনশৈলী এবং তাঁর আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণের বর্ণনা পাওয়া যায়। যিনি এই অভিজ্ঞতার কথন বর্ণনা করছেন, তাঁর লেখক নাম শ্রী ম (Sri M), পারিবারিক নাম মমতাজ আলী খান, যিনি সন্ন্যাসের পর হন শ্রী মধুকরনাথ (সংক্ষেপে শ্রী ম) । এই আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণের গল্পে রয়েছে, হিমালয় ও হিমালয়ে থাকা আধ্যাত্মিক গুরুদের শিক্ষা, তাদের দীক্ষা ও দর্শণ, তাদের সাবলীলতা, সাধকের আত্মচেতনার বিকাশ, আত্মপরিভ্রমণ, এবং নিজের স্বরূপকে চেনার নানা পথ, পরীক্ষা ও নিরীক্ষণ। এই কথন/কহন/ গল্প, সমাজ ও সামাজিক ধর্মের উর্ধ্বে গিয়ে পাঠককেও আত্ম পরিচিন্তনের এক কর্মযজ্ঞে ফেলে দেয়। এটা শুধু একজন সাধকের কাহিনী নয় বরং একজন সংসারী মানুষের আত্মিক অনুসন্ধানের জীবন্ত দলীল, যার মাঝে সম্প্রীতি ও মানবতার অনন্য উদাহরণও পাওয়া যায়। 

বইটিতে মোট ৫০টি অধ্যায় আছে যা পাঠককে নানা আভিজ্ঞতার দর্শণ এবং নিরীক্ষণের সুযোগ করে দেয়।

এই গল্পের শুরু হয় কেরেলার তিরুভান্তপুরামে, যেখানে ১৯৪৮ সালে লেখক জন্মগ্রহন করেন। খুব ছোট থেকেই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় বিষয়ে নানা প্রশ্ন ছিল মমতাজের। সময়ের সাথে সাথে তা আরো গভীর হতে থাকে। প্রথম ৯ বছর বয়সে গুরুর দর্শণ পান, পরে নানা সুফি ও সনাতনী সাধন পদ্ধতির সাথে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সঙ্গে দেখা হয় বিভিন্ন মার্গের গুরুদের সঙ্গে, যার মধ্যে কালাডি মাস্তান[1] ও ম-ঈ মা (অবধূত[2]) অন্যতম।

২০ বছর বয়সে মমতাজ তাঁর হিমালয়ের যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে ট্রেনে করে চেন্নাই থেকে দেহেরাদুন, পরে হরিদ্বার ও হৃষীকেশ। হৃষীকেশে প্রথম স্বামী চিদানন্দজীর সৎসঙ্গে যোগদান করেন, উপনিষদ, যোগ-আসন ও ধ্যান বিষয়ক ধারণা লাভ করেন। একমাস সেখানে থাকার পর হিমালয়ের আরো গভীরে, প্রয়াগ হয়ে বদ্রীনাথদের দিকে যাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন কঠিন এবং দুস্কর পথ পাড়ি দিয়ে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বদ্রীনাথ পৌঁছানোর পর মানা গ্রামের সন্ধান পান, যেখানে ব্যাস গুহায় তাঁর গুরু ‘শ্রী মহেশ্বর নাথে’র সাথে বহুকাল পর দেখা হয়, এবং গুরু তাঁকে সম্বোধন করেন ‘মধু’ নামে (যা মমতাজ আলীর পূর্ব জন্মের নাম এবং সন্ন্যাসী নাম)। এরপর শুরু হয় তাঁর জীবনে গুরুর তত্ত্বাবধানে সাধনার অধ্যায়।

পবিত্রতা, অপবিত্রতা, ক্রিয়া, যোগ (চার মার্গ[3]), ধর্ম (আত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক), ভেদ-অভেদ,  দ্বৈত্ব-অদ্বৈত্ব, মন, স্মৃতি, শাস্ত্র, বেদ, উপনিষদ, বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব, মন্ত্র/জপ, তন্ত্র/তপ, পরম সম্বন্ধে জ্ঞান, প্রেম, বোধ; ধাপে ধাপে এই সকল বিষয়ে দর্শন লাভ করেন মমতাজ। টানা তিন বছর সাধনা ও নানা অভিজ্ঞতার পর গুরুর নির্দেশে সংসারে ফেরেন। এই অভিজ্ঞতায় যে শুধু ভালোবাসা আর জ্ঞান রয়েছে তা না, এই অভিজ্ঞতার মাঝে রয়েছে গুরুকে ছেড়ে যাওয়া ও হারানোর বেদনাও।

তবে গুরু কি আসলেই আমাদের ছেড়ে কখনো যান আদৌ? এবং এই পরম্পরা যে চলমান তা প্রতক্ষ হয় শ্রী ম(Sri M) শেষ কথায়।

একজন পাঠক হিসেবে, এই বইটি আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং আমার মনে তৈরী করেছে অনেক, অনুসন্ধিৎসা, জিজ্ঞাসা। প্রথম যখন বইটি পড়ি তখন গুরু-শিষ্য সংক্রান্ত এবং আধ্যাত্মবাদ সম্পর্কিত কিছু অভিজ্ঞতা আমার ছিল। তবে বইটির প্রতিটি অধ্যায় যেন আমাকে আবার নতুন করে এই বিষয়গুলোর সাথে পরিচয় করায়। প্রথমত, আমি ভাবতাম, গুরু-শিষ্যের মধ্যকার সম্পর্ক যেন, একজন পিতা-পুত্র কিম্বা স্কুল কেন্দ্রিক হয়, কিম্বা প্রচন্ড সম্মানের, গাম্ভির্যের এর মাঝে যে ভালোবাসা থাকে এটা আমার  জানা ছিল না। শ্রী মধুকর নাথের লেখা থেকে আমার বার বার মনে হয়েছে, গুরু-শিষ্যের গাম্ভীর্য থেকে ভালোবাসা অনেক জরুরি, গুরু যে শুধু আমার আলোকবর্তা তা নয়, গুরু যে একটা নিরাপদ ঠাঁয়, একটা শান্তির জায়গা, শেষ আশ্রয়ের জায়গা।

এ ছাড়াও, হিমালয় এবং তার বর্ণনা আমাকে এতটাই তাড়িত করেছে যে আমি ২০১৯ এ হৃষীকেশ যাত্রা করি এবং রামঝুলার গঙ্গার ঘাটে দাড়িয়ে এটা সেদিন অনুভব করি যে, হিমালয় একটা আধ্যাত্মিক পীঠ এবং লেখক তাঁর কথায় সত্য। এই প্রথম আমার স্থিরতার অনুভূতি হয়। তাই এই বইটি বইই নয় বরং সাধকদের জন্য নতুন সূচনার মার্গও বটে। তৃতীয়ত, বইটি পড়তে গিয়ে আমার বেশ কিছু ধ্যানধারণার পরিবর্তন হয়েছে এবং সেই সাথে আমার দেখার ধরনও। অনেক আগে রামকৃষ্ণ কথামৃত পড়তে গিয়ে যত-মত তত-পথ এই বিষয়টা জানা হয়েছিল, তবে মধুকরনাথের এই লেখায় রামকৃষ্ণের কথার ধারাটা আমার আরো পরিষ্কার হয়েছে।

একটা আকর্ষনীয় বিষয় হল, কথামৃতের লেখক মাস্টার মশায় শ্রীম (মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) এর আদ্যাক্ষর ও মধুকর নাথের প্রকাশক নাম এক “শ্রীম” এক। এছাড়াও বইটিতে দৈনন্দিন জীবনের অনেক বিষয় উঠে এসেছে যা যে কোন পাঠকই তার জীবনশৈলীর সাথে মিলিয়ে নিতে পারবে, তবে দেখার ধরণ বদলে যাবে।

পরিশেষে, দেখার ধরণ কিম্বা, দর্শন এবং দর্শন নিয়ে কিছু কথা বলা যায়, আমরা যা দেখি তাই আমরা সাধারণ অর্থে দর্শন বলে ধরে নেই, এবং দর্শন বলতে আমরা বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যাক্তির অভিজ্ঞতা লব্ধ কথাকে বুঝি। তবে আধ্যাত্মবাদে, এই দেখার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করে। এখানে দেখা মানে, চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা না, এখানে দেখা মানে অন্তর দৃষ্টী বা হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখা।

আরো সহজ করে বললে, নিজেকে খুব সূক্ষ্ণ আকারে দেখতে পারা; যেমন, প্রতিটা কাজ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, নিজের মনের মধ্যে যে বিষয়গুলো নাড়া দিচ্ছে সেগুলো, নিজের অনুভূতিগুলো (রাগ, আনন্দ, হ্রেশ, ভালোলাগা ইত্যাদি) দেখতে পারা। এটাই যে আসল দর্শন তা এই বইয়ে আমি খুঁজে পেয়েছি, সবাইকে বইটি পড়ার অনুরোধ রইল।


[1] Masthan (মাস্তান)- Intoxicated/ ecstatic

[2] অবধূত (avadhut) – যিনি অদ্বৈত্ব/এক বা একত্ব প্রাপ্ত  হয়েছেন বা, যার মাঝে দ্বৈত্বতা (duality) নেই।

[3] যোগের চার মার্গ- জ্ঞান, ভক্তি, ক্রিয়া, কর্ম।

মন

অশান্ত মন

কিছু তো মানে না,

রকেটের মতো শুধু

ছোটে সারাক্ষণ।

কখনো মন কেঁদে ওঠে

কখনো বা হাসে,

কখনো‌ বা ডানা মেলে

উড়ে আকাশে।

গোপনে থেকে মন

কত কথা বলে,

চিরকাল সে তবু

অধরাই থাকে।

বড় হতে কেমন লাগে?

আমি আরওয়া। আমার বয়স  ১২বছর। বড় হতে ভালোও লাগে, খারাপও লাগে। আনন্দও লাগে,দুঃখও লাগে। বড় হতে পেরে আমি নানা ধরনের কাজ করতে পারছি যা ছোটবেলায় করতে পারতাম না। যেমন- ছুরি, কাচি দিয়ে কাজ করা, গরম জিনিস নিয়ে কাজ করা, ইত্যাদি। তবে, এখন এই কারণে আমার ইচ্ছা না থাকলেও অনেক কাজ করতে হয়। বড় হয়ে লেখাপড়া করে এখন আমি অনেক কিছু শিখছি এবং বুঝতে পারছি যা ছোটবেলায় করতে পারতাম না। তবে, এর কারণে আমাকে অনেক বেশি বেশি লেখাপড়াও করতে হচ্ছে। বড় হবার কারণে আমি নতুন নতুন বড়দের খেলা খেলতে পারছি যা ছোটবেলায় বুঝতাম না।

আমার ছোট ভাইয়ের বয়সের সাথে তার চিন্তার ধরনের পার্থক্য অনেক। তার কথা ও আচরণে কিছু সময় আমার মনে হয় যে, সে আমার চেয়েও বড়! আমি এটা বলছি কারণ তার সাথে অনেক গল্পের বইয়ের চরিত্রের মিল পাই। এ চরিত্রগুলো আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তারা কমপক্ষে সেভেন এইটে বা কলেজে পড়ে। আবার কখনো ১৯-২০ বছর বয়সেরও মনে হয়। সে তুলনায় আমার ভাই অনেক ছোট। তার বয়স ৮ বছর এবং সে ক্লাস টুতে পড়ে। তার চিন্তা ভাবনা ঠিক ওই বইয়ের চরিত্রগুলোর মতই। এক কথায় আমার ভাইয়ের মন তার বয়স থেকে অনেক বড়।

সব মিলিয়ে বড় হওয়া আমার কাছে ভালোও লাগে আবার খারাপও লাগে। বড় হলে যেমন অনেক নতুন কাজ করা যায়, তেমনি অনেক দায়িত্বও নিতে হয়। আমার ছোট ভাইকে দেখে আমি বুঝতে পারি যে বয়স আর মন সমান সমান চলে এমন নয়। কেউ কেউ ছোট হয়েও অনেক বড়দের মতো চিন্তা করতে পারে। তাই আমি মনে করি, বড় হওয়া শুধু বয়সের না, মনেরও ব্যাপার।