Samsara চলচ্চিত্র নিয়ে দু’কথা

পারমার্থিক

চলচ্চিত্রের পরিচিতি

নাম: সামসারা (Samsara)
মুক্তির বছর: ২০০১
ধরন: রোমান্স, ড্রামা, আধ্যাত্মিক চলচ্চিত্র
পরিচালনা: পান নালিন
চিত্রনাট্য: পান নালিন
সময়: ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট
ভাষা: তিব্বতি

[spoiler alter]

চলচ্চিত্রের নাম samsara, অর্থ দাঁড়ায় ‘birth, death and rebirth’ অথবা, ‘impermanence’ অর্থাৎ, অনিত্যতা। চলচ্চিত্রটিকেকে non-narrative documentary film বলা পরিচিত করানো হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে ২৫টা দেশের বিভিন্ন জায়গায় শ্যুট করা হয়েছে।

এক একটা ফ্রেমের সৌন্দর্য মাথা খারাপ করিয়ে দেয়। চোখে পড়ে পাহাড়ের মাঝে প্রত্যন্ত এলাকায় ভিক্ষু সম্প্রদায়ের নানা মনেস্ট্রি। Los Angeles Times এ চলচ্চত্রটি নিয়ে লিখা হয়েছে “as frustrating as it is beautiful.” ভালো ফ্রেম, ভালো মনতাজ, ভালো টেকনিক- এইসব বিষয় বেশি সামনে এসেছে। আমার মূল আগ্রহ ছিল এর গল্পকে ঘিরে।

চলচ্চত্রটির কোনো সাবটাইটেল নেই। তার দরকারও পড়েনি। আচ্ছা বলুন তো, দুম করে কি কেউ সাধু হয়? শুরুতে দেখা যায় আকাশে উড়তে থাকা একটা চিল ঢিল দিয়ে বিস্তৃত বরফি পাহাড়ের সমতল এলাকায় থাকা একটা ভ্যাড়াকে মেরে ফেলে। এই সিনটা গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখায় তা বোঝা যাবে।

একদল ভিক্ষু চলেছেন এক নির্জন গুহায় যেখানে আরেক ভিক্ষু লম্বা সময় ধরে ধ্যানস্থ আছেন। এই ধ্যানস্থ ভিক্ষুর জীবন হলো আমাদের গোটা সিনেমাটা। পরম মমতার সাথে তার ধ্যান ভাঙ্গান অন্যরা। বিশাল নখ, চুল কেটে গায়ের ময়লা মুছে তাকে নিয়ে আসেন নিজেদের ঘাঁটিতে। ভিক্ষু সম্প্রদায়ে এই ভিক্ষু খুব আদরের পাত্র। লম্বা সময় ধ্যানে থাকার ফলে তার চেহারার মাঝে যে নির্লিপ্ততা তা দেখে মনে হয় জগতের সকল কিছুরই উপরে চলে গেছে সে।

আমার খুব স্পষ্ট করে জানা নেই তবে আন্দাজ করতে পারি যে মনেস্ট্রির বুদ্ধ ভিক্ষুর চর্চায় শারীরিক সম্পর্কের স্থান নেই। তো সেই মনেস্ট্রিতে বাৎসরিক এক অনুষ্ঠানে আমাদের ভিক্ষু প্রথমবারের মতন ব্রেস্ট-ফিডিং দেখেন। এবং তার অভিজ্ঞতার বাইরের এই ঘটনা দেখে তার গভীরে এক নতুন দুনিয়ার সৃষ্টি হলো… তার ভিতরে কামনা জাগতে থাকে। সে রাতে যৌন স্বপ্ন দেখে সে, বীর্যপাত ঘটে। গুরু সেসব দেখে বুঝে চিন্তিত হয়ে তাকে আরেক  গুরুর কাছে পাঠান যৌনতার ব্যাপারে জানার জন্য।

এতই কি সহজ? আমাদের ভিক্ষু নিজ আস্তানায় ফেরত আসে। ভীষণ বিষণ্ণ, কিচ্ছু ভালো লাগেনা। যুক্তি ধর্মের নিকুচি করে এক ভোরবেলায় সে আশ্রম ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে। ভিক্ষুর পোশাক ছেড়ে বেছে নেয় সাধারণ চাষির পোশাক। এরপরের কাহিনী সুদীর্ঘ।

এখানে আর মনোহরা সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য নেই, নেই নিস্তব্ধতার মাঝ দিয়ে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা। এবারে সবটাই বস্তুগত আর সবটাই ধরাছোঁয়ার ভিতর। সে প্রেমহীন কামনার যৌনতায় অংশ নেয়। সামাজিক চাপে তাকেই বিয়ে করে। তার ধারনা সেই মেয়েটিকেই সে ভালোবেসে চলেছে। তাদের সন্তান হয়। ততদিনে সে খুব ভালো মাপের ‘সামাজিক পুরুষ’ হয়ে উঠেছে। তার বাড়ি, চাষ সবকিছুই দুর্দান্ত। জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করে চলেছে সে। দেখলে মনে হয় সে সুখী একতা মানুষ। ছেলে বড় হচ্ছে দিনদিন। কোন কিছুর অভাব নেই।

এরমাঝে একদিন এক নারীকে দেখে আবার তার মাঝে যৌন ইচ্ছা জাগ্রত হয়। সে নতুন ধরনের শূন্যতার সাথে পরিচিত হয়। বউ বাচ্চা বাড়িতে না থাকাকালীন এক সময়ে সেই নারীর সাথে সে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। একদিন তার এতদিনের পরিশ্রমে তিলে তিলে দাঁড় করানো এই ফসলের ক্ষেতে আগুন লেগে যায়। সব শেষ হয়ে যায়। একই সাথে লোকাল পলিটিক্সের সাথেও পেরে ওঠেনা আর। এতদিনের গুহায় ধ্যানে থাকা লোকও কতটা অসহায় হতে পারে সেটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হলো।

কোনো কিছুর অভাব না থাকাটা আমার কাছে জাগতিক মুক্তির মূল হাতিয়ের মনে হয়। আবারো সেই ভোর রাত… সে ঘুমন্ত স্ত্রী পুত্রকে রেখে ভিক্ষু আশ্রমে ফেরত আসে। ঘাড় অবধি নেমে আসা সুন্দর সিল্কি চুলকে মুড়িয়ে ন্যাড়া হয়। যেন বিষয় থেকে মুক্তির চেষ্টা। তুলে নেয় ভিক্ষুর পোশাক। এমন সময় স্ত্রী চলে আসে। সংসারের দায় এড়ানোর ফলে খিস্তিও করে তার স্ত্রী। ভিক্ষু থাকাকালীন শেষ চিহ্ন হিসাবে সন্তানকে উপহার দেয়া (তসবীর মতন একটা মালা) স্বামীর দিকে ছুড়ে দিয়ে সে চলে যায়। এমন অবস্থায় আমাদের ভিক্ষুটি মাটিতে শুয়ে হাত পা ছড়িয়ে কান্না করতে থাকেন। একেবারে ভেংগেচুরে গেছেন তিনি তখন।

বিষয় যখন ছিলোনা তখন কি বিষয় শূণ্যের ধ্যান মানানসই? বিষয়ে থেকে মজে পঁচে তবে তা থেকে মুক্তির চেষ্টা করাটাই যুক্তিসঙ্গত। বুদ্ধ ধর্মের অনুসারীদেরও তবে কি এক প্রকারে গোড়ামি পাওয়া গেল কি তবে? ঘুমন্ত স্ত্রী সন্তান ফেলে চলে গিয়েছিলেন স্বয়ং বুদ্ধ। যদিও মানুষ হিসেবে নিজেকে নির্মাণের কাছে জগতের বাকিসব নস্যি। সাধারণ মানুষের কাছে এই আচরণ কঠোরই লাগবে। সিনেমাতেও এই সিনটা দেখে আমার কেবল রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটা লাইন মনে পড়ে।

বৈরাগ্য

কহিল গভীর রাত্রে সংসারে বিরাগী,
‘গৃহ তেয়াগিব আজি ইষ্টদেব লাগি।
কে আমারে ভুলাইয়া রেখেছে এখানে।’
দেবতা কহিল, ‘আমি।’— শুনিল না কানে।
সুপ্তিমগ্ন শিশুটিরে আঁকড়িয়া বুকে
প্রেয়সী শয্যার প্রান্তে ঘুমাইছে সুখে।
কহিল, ‘কে তােরা ওরে মায়ার ছলনা!’
দেবতা কহিল, ‘আমি।'— কেহ শুনিল না।
ডাকিল শয়ন ছাড়ি, ‘তুমি কোথা প্রভু।’
দেবতা কহিল, “হেথা।”— শুনিল না তবু।
স্বপনে কাঁদিল শিশু জননীরে টানি—
দেবতা কহিল, ‘ফির।' শুনিল না বাণী।
দেবতা নিশ্বাস ছাড়ি কহিলেন, ‘হায়,
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়।’

আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়… রবির দর্শনে আমি আস্থা রাখি। সংসারে থেকে সংসার মুক্তির লীলা আমার কাছে আদরণীয়। সিনেমার শেষ দৃশ্য ঐ শুরুটার মতন। ভিক্ষুর মাথার উপরে চিল ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাথর পড়বে কি? আমাদের সকলের মাথার উপরেই ওই চিল ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথায় বলে, ‘’ধাক্কা খেলে মক্কা যায়’’ এইসব ধাক্কার জন্য একটা করে চিল মাথার উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু ধাক্কা চেনার অপেক্ষা।

  • চলচ্চিত্রটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow