আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই (পর্ব – ১)

সূর্য মন্দির : বাইরে ভোগ, ভেতরে শূন্যতা

পারমার্থিক

সূর্য মন্দির : বাইরে ভোগ, ভেতরে শূন্যতা

সূর্য মন্দির : বাইরে ভোগ, ভেতরে শূন্যতা

আমার মনে হয়, যারা ভ্রমণ করেন না, তাদের আত্মা শুকিয়ে যায়; শুঁটকি আত্মায় আর যাই হোক, আনন্দ থাকে না। সাধকের কাছে বহির্বিশ্বের চেয়ে অন্তর্বিশ্বে ভ্রমণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমি সাধারণ মানুষ, অন্তর্লোকে পরিভ্রমণের সামর্থ্য কম। তাই, বাইরে বাইরে  ঘুরে বেড়াই, আনন্দ কুড়াই। আনন্দ পাওয়া মানে নিজেকে পাওয়া, নিজের কাছে ফেরা। আমার বেড়ানোর ভাণ্ডার যে খুব বেশি সমৃদ্ধ, এমন নয়, মোটামুটি। কিছু কিছু জায়গাকে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে জানি, চিনি। কিছু জায়গা সম্পর্কে আগে জেনে যাই(লোকমুখে শুনি কিংবা বই পড়ে)।

পুরী(ওড়িশা) যাচ্ছি শুনে পরম শ্রদ্ধেয় মহিদুর রহমানভাই ‘সূর্য মন্দির’ সম্পর্কে বলেছিলেন, ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোনার্ক সূর্য মন্দির শুধু একটি স্থাপত্য নয়—এটি গভীর দার্শনিক ভাবনা ও প্রতীকের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এর বাইরের দেয়ালে প্রেম, কামনা-বাসনার চিত্র অর্থাৎ ভোগবাসনার জগতের ছবি

ভেতরে অন্ধকার, শূন্য।

স্থাপত্য ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমন্বয়ে মন্দির এমনভাবে তৈরি যে, সূর্যের আলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে(মন্দিরের ভেতরে অন্ধকার গর্ভগৃহে) পড়ে। এর দার্শনিক ব্যাখ্যাটি এমন যে, মানুষ যখন বাহ্যিক কামনা-বাসনা (বাইরের ভোগ বাসনার স্তর) অতিক্রম করে ভেতরের শূন্যতায় পৌঁছায়—আর তখনই তার ভেতরে আলো(জ্ঞানের উদয়) আসে।

এই ব্যাখ্যাটি এতো ভালোলাগলো যে, কোনার্কের সূর্য মন্দির দর্শনের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে বিখ্যাত পুরী হোটেল, সেখানেই ছিলাম আমরা। সকালে সূর্য মন্দির দেখার আগ্রহ প্রকাশ করতেই ড্রাইভার নিরুৎসাহিত করে বললেন, ‘‘ওখানে গিয়ে কী করবেন? ঐ মন্দিরে তো ভগবান নেই! জগন্নাথ জীবন্ত, এই মন্দিরে ভগবান আছেন’’।

বললাম, ‘‘জগন্নাথে যাবো, কোনার্কেও যাবো’’।

ভিড়-বিধ্বস্ত জগন্নাথ দর্শন শেষে গেলাম ‘ভগবানশূন্য’ সূর্য মন্দিরে। নিরিবিলি পরিবেশ, মোটামুটি ফাঁকা।

শুনলাম, মন্দিরের চূড়ায় এক সময় বিশাল এক চুম্বক বসানো ছিলো। নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করলে এই চুম্বক নাকি সমুদ্রগামী বিশাল জাহাজকেও টেনে নিয়ে আসতো! এই গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা আছে কিনা জানি না, তবুও শুনলাম, গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে!

রাজা নরসিংহদেব মন্দিরটি খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দীতে, আনুমানিক ১২৫০ সালের দিকে নির্মাণ করেন। ১২০০ কারিগর ১০-১২ বছরে এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত। এর নির্মাণ শৈলীর দার্শনিক ভিত্তি চমৎকৃত করে!

  • সূর্য ও সময়ের প্রতীক মন্দিরটি সূর্যদেবের রথের আকারে নির্মিত—যেন সূর্য আকাশে চলমান।
  • ২৪টি চাকা>  দিনের ২৪ ঘণ্টা
  • ৭টি ঘোড়া = সপ্তাহের ৭ দিন….

ঘুরে ঘুরে দেখছি, মুগ্ধ হচ্ছি, ছবি তুলছি আর মনে মনে  মেলাচ্ছি —

ভোগ থেকে যোগ….

বাইরে → কাম, ভোগ, জীবন

ভেতরে → শূন্যতা, ধ্যান

শেষে → আলো (জ্ঞান)

দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, শুধু নির্মাণশৈলী নয়, বাকি দর্শনার্থীরা কি একই বিষয় দেখছেন? বোধ করছেন? এই দেখা এবং বোঝার জন্য বারবার মন শ্রদ্ধেয় মহিদুর রহমান ভাইয়ে প্রতি কৃতজ্ঞতায় আর্দ্র হয়ে যাচ্ছিলো?

বারবার ভাবছিলাম,  বাইরের কামনা-বাসনার স্তর পার হয়ে শূন্যতায় পৌঁছতে পারবো কি? সূর্যের পবিত্র আলো এসে ভেতরের আঁধার দূর করবে কি?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow