ভাব বিনিময়ের সূক্ষ্ম শিল্প (পর্ব – ২)

পারমার্থিক

স্থির চিত্তে গ্রহণ করা

কথোপকথনের কোন প্রক্রিয়াটি আপনার জন্য ভালো আর কোনটি মন্দ তা কীভাবে বুঝবেন? একটি স্বাস্থ্যকর আলাপের জন্য স্থির চিত্তের শক্তি প্রয়োজন। স্থির চিত্ত আমাদেরকে বিচারকের ভূমিকা থেকে সরিয়ে জাগ্রত হালে ফেরত আনে। এই জাগ্রত হাল হলো দেহ ও দমের স্বস্তিময় এক নহর। এই জাগ্রত হাল আমাদেরকে নিজের কাছে পৌঁছে দেয়। কেবল নিজেকে ভাবার জায়গা থেকে বের করে আমাদের চারপাশের অস্তিত্বের প্রতি চেতন করে তোলে। এই চেতনাবোধটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে যে, আপনি এতক্ষণ মনোজগতে যে চিন্তার জাল বুনছিলেন সেটা স্বাস্থ্যকর নাকি অস্বাস্থ্যকর। সেটা কি করুণাময়, নাকি নিষ্ঠুর।

কথোপকথন হলো পুষ্টিগুণের উৎস। আমরা সবাই একাকী অনুভব করি, এবং কারো না কারো সাথে কথা বলতে চাই। কিন্তু যখন আপনি অন্য একটি মানুষের সাথে কথা বলেন তখন হতে পারে সেই অপর মানুষটি যা বলছেন তা হয়তো বিষময়। হতে পারে তার কথাগুলো ঘৃণাপূর্ণ, ক্রোধ এবং হতাশাপূর্ণ। যখন আপনি শুনবেন যে অন্যরা কি বলছে, আপনি কিন্তু সেই বিষগুলোকে ধারণ করছেন। এর মাধ্যমে বিষগুলোকে আপনি আপনার চেতনে ও দেহে নিয়ে আসছেন। এজন্য স্থির চিত্তের কথাটা বলা। তাই স্থির চিত্তে শোনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। 

বিষময় একটা কথোপকথনকে এড়িয়ে যাওয়া হয়তো খুব কঠিন ব্যাপার, বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে। আপনার চারপাশে এই ঘটনাপ্রবাহ চলছে, তাই সতর্ক থাকবেন। এই বিষের দুঃখে পতিত না হতে চাইলে আপনাকে স্থির চিত্তে জাগ্রত হালের একজন অধিকারী হতে হবে। করুণা শক্তির আবরণে নিজেকে মুড়িয়ে এই দুঃখ-দুর্দশা থেকে আপনাকে নিজের রক্ষা করতে হবে। যেহেতু এমন কথা আপনাকে শুনতেই হবে তাই এই বিষময় খাদ্যকে গ্রহণের পরিবর্তে আপনি সক্রিয়ভাবে নিজের মাঝে আরো করুণাভাবের উদয় ঘটাতে পারেন। যখন আপনি এভাবে শুনতে শিখবেন, করুণা আপনাকে রক্ষা করবে। এমনকি যিনি কথাগুলো বলছেন তার দুঃখবোধকেও কমিয়ে আনবে। 

আপনি কেবল নিজের চিন্তা, কথা এবং কর্ম শুষে নিচ্ছেন এমন নয়। আপনার সাথে যাদের যোগাযোগ তাদের চিন্তা, কথা এবং কর্মগুলোও শুষে নিচ্ছেন। এটা এক ধরনের ভোগ। তাই যখন আপনি কিছু পড়ছেন, কারো কথা শুনছেন তখন আপনার সতর্ক থাকা দরকার যেন এর বিষ বা ভোগের যে ভোগান্তি(দুঃখ) তা যেন আপনার স্বাস্থ্যহানি না ঘটায়, যেন তা আপনার জীবনে দুঃখ বয়ে না আনে। পাশাপাশি আপনার জীবনে থাকা একজন বা অনেকজনের জীবনেও যেন তা দুঃখ বয়ে না আনে। 

সত্য-কে এঁকে বোঝাতে গেলে বুদ্ধ একটি গল্প শোনাতেন। তিনি একটা জরাগ্রস্ত গরুর ছবি দেখিয়ে গল্পটি বলতেন। গরুটির চর্মরোগ ছিলো। সে মাটি, গাছ, পানি থেকে আসা অসংখ্য পোকামাকড় ও মাইক্রোঅর্গানিজম দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিল। পচনশীল চামড়া নিয়ে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না। স্থির চিত্ত হলো আমাদের সেই পরিষ্কার চামড়া। কেননা চিত্ত স্থির না থাকলে আমরা বিষময় বিষয়রাশির মাঝে নিজেদেরকে ডুবিয়ে রাখি যে কেবলই ক্ষয় করে। 

আপনি আপনার গাড়ি নিয়ে শহরের রাস্তায় বের হওয়ার মতন সহজ কাজটির মধ্য দিয়েও খাদ্য গ্রহণ করছেন। যেসকল বিজ্ঞাপন আপনার নজরে এলো যার দরুন আপনি ভোগ্যপণ্য নিতে মনে মনে বাধ্য হচ্ছেন সেটিও আপনার খাবার। এমনকি আপনি এমনভাবেও দেখতে পারেন যে এগুলো অতিরিক্ত ও বিষাক্ত ভোগের ফলাফল। স্থির চিত্তে গ্রহণ করার মনোবৃত্তি দিয়ে আমাদের নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে। তাই স্থির চিত্তে কোনো বিষয়কে গ্রহণ করতে পারাটা খুব দরকার। আমরা এমনভাবে ভাবের আদান-প্রদান করতে পারি যা শান্তির সাথে সংহতিপূর্ণ এবং নিজের প্রতি করুণাময় ও অন্যদের প্রতি আনন্দদায়ক।

সঠিক খাবার ছাড়া সম্পর্ক টিকে না

আমাদের মাঝে অনেকেই যোগাযোগ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ভোগান্তির(দুঃখের) শিকার। আমরা মনে করি যে আমাদের কেউ বুঝতে পারে না। বিশেষ করে যাদের আমরা ভালোবাসি তাদের প্রতি এই অভিমানটা আমাদের কাজ করে। একটা সম্পর্কে, আমরা একে অন্যের জন্য পুষ্টিকর উপাদান হিসেবে কাজ করি। তাই আমাদের সেই ধরণের খাদ্য বাছাই করতে হবে যা আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষটিকে দিতে চাই। এমন ধরণের খাবার যা আমাদের এই পারস্পারিক সম্পর্ককে আরো সমৃদ্ধ করবে। এরমাঝে সবকিছু অন্তর্ভুক্ত—ভালবাসা, ঘৃণা এবং দুঃখ—চলমান থাকার জন্য এই সমস্ত খাবার দরকারি। সম্পর্কে ভোগান্তি(দুঃখ) চলমান থাকার অর্থ হলো, আমরা আমাদেরকে খাদ্য হিসেবে দুঃখ নিয়ে চলেছি। যতবার আমরা অস্থির চিত্তে কথা বলছি, ততবারই আসলে নিজেদের দুঃখ খাওয়াচ্ছি। 

স্থির চিত্তে জাগরণের মাধ্যমে আমরা নিজেদের এই দুঃখবোধের প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারবো। তখন আমরা টের পাবো যে কি ধরণের খাবার এতদিন আমরা নিজেদের দিয়ে আসছি এভাবে বেঁচে থাকার জন্য। এই দুঃখ লাঘবের জন্য পুষ্টির উৎসজ্ঞান যখন আমাদের প্রাপ্তি হবে তখন আমরা আগের খাবারের সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারবো। তখন ধীরে ধীরে আমাদের দুঃখবোধ জীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকবে। 

প্রায়সময়েই দেখা যায় একটা রোম্যান্টিক সম্পর্ক খুব সৌন্দর্যের সাথে শুরু হলেও যেহেতু আমাদের জানা নেই কীভাবে এই সম্পর্ককে লালন করতে হয় তাই সম্পর্কটি একসময় মরে যেতে থাকে। ভাব-বিনিময় এমন একটি ঘটনা যা এই মৃতপ্রায় সম্পর্ককে জীবনদান করতে সক্ষম। আপনার মস্তিষ্কে এবং মনে আপনি যতগুলো চিন্তাভাবনা গড়ে তুলছেন তা নিয়ে চীনে একটা কথা প্রচলিত আছে। তারা বলে ‘‘রহস্য যত তোমার পেটের মাঝে’’—তো এই পেটের মাঝের খাবার হলো সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার রসদ। যখন কোনো চিন্তা আপনার মাঝে সন্দেহ জাগায়, ক্রোধান্ধ করে তোলে, ভয় পাওয়ায়, অস্বস্তি দেয় তাহলে এই চিন্তাটা না আপনাকে, না আপনার সঙ্গীকে লালনপালনে সক্ষম। সম্পর্কটা যদি জটিল হয়ে থাকে, তার কারণ হলো আমরা আমাদের বিচারি মনোভাবকে এবং আমাদের ক্রোধকে লালন করেছি, আমাদের করুণাময় সত্তাটিকে নয়।  

একদিন প্লাম ভিলেজের ফ্রেঞ্চ রিট্রিট সেন্টারে মানে যেখানে আমি থাকি সেখানে একটা আলোচনাসভায় বক্তৃতা দিচ্ছিলাম যে, কীভাবে প্রেমময় ভাব-বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের সম্পর্কগুলোকে লালন করতে পারি। আমি সেদিন ভালোবাসার মানুষদেরকে ফুলের সাথে তুলনা করেছিলাম। ফুলের যেমন বেড়ে উঠতে পানির প্রয়োজন হয়, তেমনি করে ভালোবাসার সম্পর্কে প্রেমময় ভাব-বিনময় পানির মতই কাজ করে। আমার কাছের সারিতেই একজন ভদ্রমহিলা বসেছিলেন যিনি পুরোটা সময় জুড়ে কাঁদছিলেন। সেদিনের আলোচনাসভা শেষ হতেই আমি তার স্বামীর কাছে গিয়ে বললাম, ‘‘প্রিয় বন্ধু, তোমার ফুলগাছের কিছু পানির প্রয়োজন দেখা যাচ্ছে।’’ তার স্বামীও সেদিনের আলোচনায় ছিলেন এবং প্রেমময় ভাব-বিনিময় সম্পর্কে জেনেছিলেন। কিন্তু এতকিছু জানার পরেও আমাদের একজন পরম বন্ধুর প্রয়োজন পড়ে যিনি আমাদের ক্ষণে ক্ষণে মনে করিয়ে দেবেন। দুপুরের খাবারের পর স্বামীটি তার স্ত্রীকে নিয়ে গাড়িতে করে গ্রামের রাস্তায় একটু ঘুরতে বের হলেন। তারা হয়ত মাত্র এক ঘন্টা বা তার কিছু কম সময়ের জন্য বাইরে ছিলেন। কিন্তু সেই অল্প সময়টুকুতে ভদ্রলোকটি শুদ্ধ বীজে পানি দেওয়ার প্রতিই নিজের মনকে নিবিষ্ট করেছিলেন। 

যখন তারা ফিরে এলেন ভদ্রমহিলাকে দেখে মনে হলো তার মাঝে একটা বিশাল পরিবর্তন এসে গিয়েছে। তিনি দারুন খুশি এবং আনন্দিত। এ দেখে তাদের সন্তানেরা খুব অবাক হয়। কারণ সকালে যখন তাদের বাবা মা ভ্রমণে বেরিয়েছিল তখন তাদের মাঝে দুঃখ এবং অস্বস্তিকর ভাবটা স্পষ্ট ছিল। মাত্র এক ঘন্টায় নিজেকে এবং অন্য মানুষকে রূপান্তর করানো যায়, কেবলমাত্র স্থির চিত্তে শুদ্ধবীজে পানি প্রদানের মাধ্যমে। স্থির চিত্তকে কর্মের মাধ্যমে ফলিয়ে দেখার আছে; এটি কেবল তত্ত্বাকারে থেকে যাওয়ার বিষয় নয়। 

লালন করা এবং সারিয়ে তোলার যে ভাব-বিনিময় সেটাই আমাদের সম্পর্কের খাদ্য। মাঝে মাঝে একটি কঠোর ব্যবহার বহু বছর ধরে অপর মানুষটিকে ভোগাতে পারে। আমরা নিজেরাও সেই কারণে বহু বছর ধরে দুঃখ পেয়ে থাকি। একটি ক্রোধের বা ভয়ের মুহূর্তে, আমরা বিষময় বা ধ্বংসাত্মক কিছু বলে ফেলতেই পারি। আমরা যদি বিষটা গিলে ফেলি তাহলে তা আমাদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাবে এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ককে মেরে ফেলবে। আমরা হয়তো টেরও পাবো না যে ঠিক কি কারণে কোন বিষের কারণে সম্পর্কটি দিনদিন মারা যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাছে প্রতিষেধক আছে। স্থির চিত্তের করুণা, এবং প্রেমময় ভাব-বিনিময়। ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব নামক সম্পর্কগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য খাদ্য প্রয়োজন। স্থির চিত্তের মাধ্যমে আমরা শুদ্ধ চিন্তার উদয় ঘটাতে পারি। আমাদের সম্পর্কগুলোকে সমৃদ্ধ করার জন্য তাই যুতসই খাদ্য প্রদানের মাধ্যমে মুখের ভাষা ও কর্মকে আমরা বিকশিত করে তুলতে পারি। 

চলবে… …

১ম পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ২)

সামতেন মারা যাওয়ার পরে আমরা তিব্বতের রাজধানী লাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ঘোড়ায় চড়ে তিন মাসের দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। সেখান...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

ভাব বিনিময়ের সূক্ষ্ম শিল্প (পর্ব – ১)

বই পরিচিতি The Art of Communicating হলো ভিয়েতনামি জেন বৌদ্ধ গুরু Thích Nhất Hạnh-এর লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে, প্রকাশক...
ভাষান্তর
পারমার্থিক

একাকীত্ব প্রসঙ্গে ওশো

আমরা সবাই একা। এই পুরো পৃথিবীটা অধিক জনসংখ্যায় হয়তো উপচে পড়ছে কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিটি মানুষ এখানে একা। এমনকি খুব ভিড়ের মাঝে থেকেও তুমি...
চয়নিকা
পারমার্থিক

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ১)

The Tibetan Book of Living and Dying এর এবং বই পরিচিতি: Sogyal Rinpoche ছিলেন একজন তিব্বতি বৌদ্ধ আধ্যাত্মিক শিক্ষক, যিনি পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের কাছে তিব্বতি...
ভাষান্তর
পারমার্থিক
1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow