জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ২)

পারমার্থিক

সামতেন মারা যাওয়ার পরে আমরা তিব্বতের রাজধানী লাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ঘোড়ায় চড়ে তিন মাসের দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। সেখান থেকে আমরা মধ্য ও দক্ষিণ তিব্বতের পবিত্র স্থানগুলোতে তীর্থযাত্রা অব্যাহত রাখলাম। এগুলো সেই সব সাধু, রাজা ও পণ্ডিতদের পবিত্র স্থান, যারা সপ্তম শতাব্দী থেকে তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম নিয়ে এসেছিলেন। আমার গুরু ছিলেন নানা ধারার বহু গুরুর অবতারস্বরূপ, এবং তার খ্যাতির কারণে আমরা যেখানে যেতাম সেখানেই তাকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হতো।

আমার জন্য সেই যাত্রা ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং আজও তা অসংখ্য সুন্দর স্মৃতিতে ভরা। তিব্বতিরা খুব ভোরে উঠে, যাতে দিনের সব প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা যায়। সন্ধ্যা নামলে আমরা ঘুমাতে যেতাম এবং ভোর হওয়ার আগেই জেগে উঠতাম। প্রথম আলো ফুটতেই মালপত্র বোঝাই করা ইয়াকগুলো রওনা হয়ে যেত। তাঁবুগুলো গুটিয়ে ফেলা হতো, আর শেষের দিকে নামানো হতো রান্নাঘরের তাঁবু ও আমার গুরুর তাঁবু। একজন আগেভাগে গিয়ে ভালো কোনো ক্যাম্প করার জায়গা বেছে নিত। তারপর আমরা দুপুরের দিকে সেখানে থামতাম এবং বাকি দিনের জন্য ক্যাম্প করতাম। আমি নদীর ধারে ক্যাম্প করতে খুব পছন্দ করতাম—জলের শব্দ শুনতে কিংবা তাঁবুর ভেতরে বসে ছাদের ওপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনতে।

আমরা ছিলাম ছোট একটি দল, মোটামুটি তিরিশটি তাঁবু নিয়ে। দিনের বেলায় আমি আমার গুরুর পাশে সোনালি রঙের একটি ঘোড়ায় চড়ে যেতাম। চলার পথে তিনি শিক্ষা দিতেন, গল্প বলতেন, সাধনা করতেন এবং বিশেষ করে আমার জন্য কিছু সাধনার পদ্ধতিও তৈরি করতেন। একদিন আমরা যখন ইয়ামদ্রোক ত্‌সো নামের পবিত্র হ্রদের কাছে পৌঁছালাম এবং তার পানির ফিরোজা রঙের দীপ্তি দেখতে পেলাম, তখন আমাদের দলের আরেক লামা—লামা সেতেন—মৃত্যুর দিকে এগোতে শুরু করলেন।

লামা সেতেনের মৃত্যু আমার জন্য আরেকটি গভীর শিক্ষা হয়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন আমার গুরুর আধ্যাত্মিক স্ত্রী খাণ্ড্রো সেরিং চোদ্রনের শিক্ষক। অনেকেই তাকে তিব্বতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী সাধিকা হিসেবে সম্মান করতেন—একজন আড়াল থাকা গুরু, যার স্নেহময় ও সরল উপস্থিতির মধ্য দিয়েই ভক্তি ও শিক্ষা প্রকাশ পেত।

লামা সেতেন ছিলেন অত্যন্ত মানবিক এবং অসাধারণ সদয় স্বভাবের মানুষ। তার বয়স ছিল ষাটের বেশি; তিনি ছিলেন লম্বা, ধূসর চুলের অধিকারী, এবং তার মধ্যে ছিল স্বাভাবিক কোমলতা। তিনি ধ্যানচর্চায়ও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তার কাছে থাকলেই আমার মনে শান্তি ও প্রশান্তির অনুভূতি জাগত। মাঝে মাঝে তিনি আমাকে বকাঝকা করতেন, তখন আমি তাকে একটু ভয়ও পেতাম; কিন্তু মাঝে মাঝে কঠোর হলেও তার উষ্ণতা কখনো কমেনি।


লামা সেতেন এক অসাধারণ উপায়ে মারা যান। কাছেই একটি মঠ ছিল, কিন্তু তিনি সেখানে যেতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, তিনি চান না যে তাদের তার মৃতদেহ পরিষ্কার করার ঝামেলায় পড়তে হোক। তাই আমরা স্বাভাবিক নিয়মে তাঁবুগুলো গোল করে বসিয়ে ক্যাম্প করলাম। খাণ্ড্রো লামা সেতেনের সেবা ও দেখাশোনা করছিলেন, কারণ তিনি তার শিক্ষক ছিলেন।
যখন তিনি হঠাৎ তাকে ডাকলেন, তখন তার তাঁবুর ভেতরে শুধু আমরা দুজনই ছিলাম। তিনি স্নেহভরে তাকে ডাকতেন “আ-মি”—তার স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ “আমার সন্তান”। তিনি কোমল স্বরে বললেন,

“আ-মি, এখানে এসো। এখন সময় এসে গেছে। তোমার জন্য আর কোনো উপদেশ আমার নেই। তুমি যেমন আছো, ঠিক তেমনই ভালো। আমি তোমার ওপর সন্তুষ্ট। তুমি যেমন করে এতদিন তোমার গুরুর সেবা করেছ, ঠিক তেমনই করে যেতে থাকো।”

এ কথা শুনেই তিনি দ্রুত তাঁবু থেকে বেরিয়ে রিনপোচেকে ডাকতে যেতে চাইলেন, কিন্তু লামা সেতেন তার হাতটা ধরে ফেললেন।

“কোথায় যাচ্ছ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি রিনপোচেকে ডাকতে যাচ্ছি,” তিনি বললেন।

লামা সেতেন হেসে বললেন,

“ওনাকে বিরক্ত করার দরকার নেই। তার প্রয়োজন নেই। গুরুর ক্ষেত্রে দূরত্ব বলে কিছু থাকে না।”

এই কথা বলে তিনি শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং তারপরই মৃত্যুবরণ করলেন। খাণ্ড্রো তার হাতের আঁকড়া থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন আমার গুরুকে ডাকতে। আমি সেখানে বসে রইলাম, নড়তেও পারছিলাম না।

আমি বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম—যে কেউ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এতটা আত্মবিশ্বাসী হতে পারে! লামা সেতেন চাইলে তার নিজের গুরুকে শারীরিকভাবে পাশে পেতে পারতেন—যা অন্য কেউ হলে হয়তো খুবই কামনা করত—কিন্তু তার সেই প্রয়োজন ছিল না। এখন আমি বুঝতে পারি কেন। তিনি ইতিমধ্যেই নিজের ভেতরে গুরুর উপস্থিতি উপলব্ধি করেছিলেন। জামইয়াং খিয়েন্তসে তার মন ও হৃদয়ের মধ্যে সর্বদা উপস্থিত ছিলেন; এক মুহূর্তের জন্যও তিনি কোনো বিচ্ছেদ অনুভব করেননি।

খাণ্ড্রো গিয়ে জামইয়াং খিয়েন্তসেকে নিয়ে এলেন। তিনি তাঁবুতে ঢোকার সময় কীভাবে একটু ঝুঁকে প্রবেশ করেছিলেন, তা আমি কখনো ভুলব না। তিনি লামা সেতেনের মুখের দিকে একবার তাকালেন, তারপর তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে হালকা হাসতে শুরু করলেন। তিনি স্নেহ করে তাকে “লা জেন”—অর্থাৎ “বৃদ্ধ লামা”—বলে ডাকতেন।

তিনি বললেন,

“লা জেন, ওই অবস্থায় থাকবেন না!”

এখন আমি বুঝতে পারি, লামা সেতেন তখন ধ্যানের একটি বিশেষ সাধনা করছিলেন, যেখানে সাধক তার মনের প্রকৃতিকে সত্যের অসীম শূন্যতার সঙ্গে একীভূত করেন এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুর সময়ও অনেকক্ষণ থাকতে পারেন।

আমার গুরু বললেন,

“লা জেন, আমরা তো পথিক। আমরা তীর্থযাত্রী। এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সুযোগ আমাদের নেই। চলুন, আমি আপনাকে পথ দেখাই।”

আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো পরবর্তী ঘটনাগুলো দেখছিলাম। যদি নিজ চোখে না দেখতাম, কখনোই বিশ্বাস করতাম না। লামা সেতেন আবার জীবনে ফিরে এলেন।
তারপর আমার গুরু তার পাশে বসে ফোওয়া (phowa) সাধনার মাধ্যমে তাকে পথ দেখালেন—এটি মৃত্যুর ঠিক আগে চেতনাকে পরিচালনা করার একটি বিশেষ সাধনা। এই সাধনার অনেক পদ্ধতি আছে, এবং তিনি যে পদ্ধতিটি ব্যবহার করেছিলেন, তার শেষে গুরু তিনবার “আ” ধ্বনি উচ্চারণ করলেন।

আমার গুরু যখন প্রথমবার “আ” বললেন, তখন আমরা শুনতে পেলাম লামা সেতেনও স্পষ্টভাবে সেই ধ্বনিতে সাড়া দিচ্ছেন। দ্বিতীয়বার তার কণ্ঠ কিছুটা ক্ষীণ হয়ে গেল, আর তৃতীয়বার তিনি আর কোনো শব্দ করলেন না—তিনি চলে গিয়েছিলেন।

সামতেনের মৃত্যু আমাকে আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্য শিখিয়েছিল। আর লামা সেতেনের মৃত্যু আমাকে শিখিয়েছিল যে তার মতো উচ্চস্তরের সাধকেরা জীবদ্দশায় প্রায়ই তাদের অসাধারণ গুণাবলি আড়াল করে রাখেন। কখনো কখনো তারা সেগুলো প্রকাশ করেন কেবল একবার—মৃত্যুর মুহূর্তে।
শিশু অবস্থাতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সামতেনের মৃত্যু এবং লামা সেতেনের মৃত্যুর মধ্যে একটি গভীর পার্থক্য ছিল। আমি উপলব্ধি করেছিলাম—এটি ছিল এমন একজন ভালো সন্ন্যাসীর মৃত্যুর পার্থক্য, যিনি জীবনে সাধনা করেছেন, এবং এমন একজন আরও উচ্চ উপলব্ধিসম্পন্ন সাধকের মৃত্যুর পার্থক্য।

সামতেন সাধারণভাবে এবং কষ্টের মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, যদিও তার বিশ্বাস ছিল দৃঢ়। কিন্তু লামা সেতেনের মৃত্যু ছিল আধ্যাত্মিক সিদ্ধির এক উজ্জ্বল প্রকাশ।

লামা সেতেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কিছুদিন পর আমরা ইয়ামদ্রোকের মঠে চলে গেলাম। আগের মতোই আমি আমার গুরুর ঘরে তার পাশেই ঘুমাতাম। সেই রাতে আমি দেয়ালে মাখনের প্রদীপের আলো দুলে দুলে ছায়া ফেলছে—এ দৃশ্য দেখছিলাম। অন্য সবাই যখন গভীর ঘুমে ছিল, আমি সারা রাত জেগে কেঁদেছিলাম। সেই রাতেই আমি বুঝেছিলাম যে মৃত্যু সত্য, এবং আমাকেও একদিন মরতে হবে। সেখানে শুয়ে শুয়ে আমি মৃত্যু ও নিজের মৃত্যুর কথা ভাবছিলাম। গভীর দুঃখের মধ্য দিয়েও ধীরে ধীরে আমার ভেতরে এক গভীর স্বীকৃতির অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করল, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিল আমার জীবনকে আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য উৎসর্গ করার এক দৃঢ় সংকল্প।

চলবে… …

পর্ব ১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

ভাব বিনিময়ের সূক্ষ্ম শিল্প (পর্ব – ২)

স্থির চিত্তে গ্রহণ করা কথোপকথনের কোন প্রক্রিয়াটি আপনার জন্য ভালো আর কোনটি মন্দ তা কীভাবে বুঝবেন? একটি স্বাস্থ্যকর আলাপের জন্য স্থির চিত্তের শক্তি প্রয়োজন। স্থির...
ভাষান্তর
পারমার্থিক

জাগতিক না পারমার্থিক? – ২

ইসলাম ধর্মে জাগতিকতা আর পারমার্থিকতা অর্থাৎ ইহকালীন কর্মযজ্ঞ  আর পরকালীন প্রাপ্তব্য-বিভূতি --এতদুভয়ের মধ্যে বিশেষ কোন তফাৎ কিংবা দূরত্ব নাহি। উপযুক্ত ভক্তগণ সম্যকরূপে সাধনা করিয়া...
টপ পোষ্ট
পারমার্থিক

সফরনামা ।। শিল্পী খন্দকার নাছির আহাম্মদ

শিল্পী পরিচিতি খন্দকার নাছির আহাম্মদ ১৯৭৫ সালে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কারুশিল্প বিভাগ থেকে বি.এফ.এ সম্পন্ন করেন চারুকলায় অধ্যায়নরত অবস্থায় ১৯৯৮,...
ই-এক্সিবিশন
পারমার্থিক

ভাব বিনিময়ের সূক্ষ্ম শিল্প (পর্ব – ১)

বই পরিচিতি The Art of Communicating হলো ভিয়েতনামি জেন বৌদ্ধ গুরু Thích Nhất Hạnh-এর লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে, প্রকাশক...
ভাষান্তর
পারমার্থিক
1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow