ভর্তিযুদ্ধ! হেরে গেলাম কি? (পর্ব-১)

পারমার্থিক

মাত্র কয়েকটা সিটের জন্য বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে চরম রকমের প্রতিযোগিতা আর সেটাকে কেন্দ্র করে নানারকম ব্যবসা, অভিভাবকদের উত্তেজনা সহ প্রতি বছর আমাদের দেশে যে হুলস্থূল কান্ড কারখানা চলে তাতে করে একে আর ভর্তির জন্য যাচাই পরীক্ষা না বলে ভর্তিযুদ্ধ বলাই ঠিক হবে। যে যেভাবে পারে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে প্রস্তুতি নেয়। জিতে গেলে যেন মহা কিছু জয় হলো আর হারলে সব শেষ! অন্যদের মতো আমিও এক‌ই ঘটনার শিকার। তাই ভর্তি যুদ্ধ নিয়ে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতাখানি একটু মেলে ধরবার চেষ্টা করছি।

(১) কোনটা হবো, ডাক্তার না ইন্জিনিয়ার?

বাংলাদেশের গার্ডিয়ানদের কমন ইচ্ছা, ছেলে হলে ইন্জিনিয়ার, মেয়ে হলে ডাক্তার। এর বাইরে যেন আর কিছু হতে নেই। আমার আব্বুর ক্ষেত্রেও তাই । তার কথা মেডিকেলে পড়লে আমায় বাড়িতে রাখবে আর ন‌য়তো বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দিবে। ওসব ভার্সিটি পড়ায় তার ভরসা নাই। তবে আম্মু অবশ্য চাইত আমি ভার্সিটিতে পড়ি।তেমন বেশি পড়ার চাপ টাপ থাকবে না। কিন্তু ভার্সিটিতে পড়ে পরবর্তীতে চাকরি খোঁজার জ্বালা আর ইন্জিনিয়ারিং পড়াশোনা আমার পছন্দ না হ‌ওয়ায় শেষে মেডিকেল এর জন্য‌ই প্রিপারেশন নেব বলে ঠিক করলাম।

(২) ভর্তি যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য কোচিং ভর্তি হ‌ওয়া কি আবশ্যক?

ভর্তি কোচিং গুলো এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হবার আগেই তাদের ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলায় আমাকেও পরীক্ষার মাঝে তাড়াহুড়ো করে ভর্তি হতে হলো। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, এদের প্রি-মেডিকেল কোর্স শুরু হয় এইচএসসির‌ও ৬/৭মাস আগে। সেখানে একাডেমিক আর মেডিকেল ভর্তির সিলেবাস সামঞ্জস্য করে পড়ানো হয় যাতে করে স্টুডেন্ট এইচএসসি পরীক্ষার আগেই ভর্তি যুদ্ধে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকে। এতে করে খুব ভালো মানের শিক্ষার্থীরা উপকৃত হলেও মাঝারি মানের শিক্ষার্থীরা উল্টো ক্ষতিগ্ৰস্ত হবে। একাডেমিক আর এডমিশনের সিলেবাস সামলাতে এরা একাকার হয়ে যাবে।

মাঝখান দিয়ে কোচিং সেন্টারগুলোর কিছু টাকাপয়সা আয় হবে। আমার কিছু বান্ধবী প্রি মেডিকেল কোর্স এ ভর্তি ও হয়। দুই একটা এক্সাম দেবার পর একাডেমিকের পড়ার চাপে আর কোচিং যাবার খবর নেই। যাক সে কথা, আমার তিনমাসের কোর্সে ডিসকাউন্ট সহ ভর্তি হতে লাগলো ২২ হাজার টাকা। সপ্তাহে তিন দিন দুই ঘণ্টার ক্লাস সাথে আধাঘণ্টার এক্সাম আর একদিন বড় এক্সাম যেটাকে উইকলি বলে আরকি। সাথে কোচিং-এর সকল মেডিকেল রিলেটেড ব‌ই। তবু টাকার পরিমাণ টা কম নয়।বিশেষ করে যাদের আর্থিক সমস্যা আছে।

এইচএসসি পরীক্ষা যতদূর মনে পড়ে প্রাক্টিকালসহ আগস্টের ২৮ তারিখ শেষ হয় আর সেপ্টেম্বর এর ১ তারিখ থেকে কোচিং এ ভর্তি পরীক্ষার ক্লাস শুরু হয়। গ্ৰাম থেকে আসা আমার কিছু ফ্রেন্ড হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে, কেউ বাবা-মাসহ বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। এমন অনেক ফ্রেন্ড ও আছে যারা কোচিং এ জাস্ট ভর্তি হয়ে থাকে, ক্লাস করে না, বাসায় আলাদা করে মেডিকেল এর স্টুডেন্ট রেখে পড়ে। সেক্ষেত্রে তাদের মাসিক বেতন হয় ১০-১৫ হাজার। অনেকক্ষেত্রে এর বেশিও হতে পারে।

আমার ইন্জিনিয়ারিং প্রিপারেশন নেয়া বান্ধবী মুনতাকা আবার তার কোচিং এর কম্বো ব্যাচে ভর্তি হয়। এইটাতে ক্লাসগুলো অনলাইনে আর পরীক্ষা অফলাইনে হয়। ভর্তি পরীক্ষার এর প্রশ্নগুলো ইন্টারমেডিয়েটের ব‌ইগুলোর সর্বশেষ সংস্করণ থেকে করা হয়। এদিকে প্রতিবছর পাবলিকেশনসগুলো ইচ্ছে করেই খুঁটিনাটি চেন্জ করে নতুন সংস্করণ বের করে। স্টুডেন্টদের‌ও নিরুপায় হয়ে ভর্তি প্রস্তুতির সময় এক‌ই ব‌ই আবার নতুন করে কিনতে হয়। মূল ব‌ইগুলো আবার নতুন করে কিনতে আমার খরচ পড়ে গেল প্রায় তিন হাজার টাকা।

(৩)ক্লান্তিময়, যানজট পূর্ণ রাস্তা পেরিয়ে ক্লাস

মেডিকেল কোচিং এর মেইন ব্রাঞ্চ ফার্মগেটে, যেটা আমার কলেজেরও কাছে হ‌ওয়ায় সেখানে ভর্তি হয়ে গেলাম ঠিকই কিন্তু রামপুরা থেকে যেতে আসতে আমার একেবারে নাজেহাল অবস্থা। রামপুরা থেকে আমার সাথে আর‌ও দুজন যেত। ওরা ফার্মগেট এ একেবারে নতুন। কলেজ চলাকালীন হাতিরঝিল দিয়ে সোজা ফার্মগেট এ যে সাতরাস্তা দিয়ে ঢুকতাম তা‌ জ্যাম ঠেকাতে বন্ধ করে দেয়ায় অনেকটা রাস্তা ঘুরে যেতে হয়,ভাড়াও বেশি পড়ে।

অথচ সাত রাস্তা থেকে একটু সামলে গেলেই শত শত ট্রাক অবৈধভাবে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে এবং ওইটা যে জ্যামের মূল ,সেদিকে কার‌ও কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কি আর করার! রাস্তার নানান ঝামেলার কারণে রিকশা থেকে নেমে অনেকটা রাস্তা পায়ে হেঁটেও ক্লাস করতে হয়েছে বহুবার। আমার সাথের দুজনের একজন ‌এক পর্যায়ে এই ভাঙ্গা রাস্তার ঝাঁকুনি সহ্য করতে না পেরে ত‌ওবা করলো ভর্তি পরীক্ষার পর এ জীবনে আর ফার্মগেট আসবে না।

তবে রেটিনার ক্লাসগুলো করতে মন্দ লাগেনি। একেক দিন একেকটা টিচার পড়াতে আসে। দুই ঘন্টায় ২/৩ টা চ্যাপ্টার শেষ করে দিতো! কোনোদিন পড়ার কিছুই বুঝতাম না। বাসায় এসে অনলাইন ঘেঁটে ঐ অধ্যায় গুলোর ক্লাস দেখে পড়া বুঝতাম। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে টিচাররা আবার তাদের মেডিকেল জীবনের কিছু মজার ঘটনা শেয়ার করতেন।

সেসব শুনে ডাক্তারি পড়ার প্রতি বেশ আগ্ৰহ জাগতো। এদিকে কিছু কোচিং সেন্টারের কম্বো ব্যাচের  অফলাইন পরীক্ষাগুলো কোচিং এর ভবনে স্টুডেন্ট সংকুলান না হ‌ওয়ায় তেজগাঁও কলেজে নিতো। কলেজ কর্তৃপক্ষ কোচিং থেকে কিছু কমিশন পাওয়ায় তাদের সে সুযোগও দিতো। ফলে আমার বান্ধবী মুনতাকা বেচারীকে এই বৃষ্টির মধ্যেও ফুট‌ওভার ব্রিজ পার করে কাকভেজা হয়ে ঐ কলেজে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হতো।

(৪)ভর্তি যুদ্ধের পড়াশোনা – সিলেবাস কি শেষ হবে?

সময় কম,পড়া তার তুলনায় অনেক বেশি। দিনরাত এক করে পড়াশোনা। এমন‌ও হয়েছে পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে রাত বারোটায় দশ মিনিট বিশ্রাম নেব বলে শুয়েছি,উঠে দেখি রাত তিনটা। ঘরের লাইট তখন‌ও জ্বলছে আমার। প্রত্যেক টা অধ্যায় পড়ার আগে তার ডিটেইলড ক্লাস করে কনসেপ্ট ক্লিয়ার করতাম। না বুঝে শুধু মুখস্থ করলে তো মনে থাকবে না। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের বা পড়াশোনার সাথে একাডেমিকের পড়াশোনার তেমন মিল নেই। একাডেমিকে থাকতে বিশাল বিশাল ব্যাখ্যামূলক-প্রশ্নের উত্তর লিখতে হত। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন খুব সংক্ষিপ্ত এবং স্ট্যান্ডার্ড হয়।

ফলে এতদিন ধরে গতানুগতিক পড়া থেকে বেরিয়ে আসতে শিক্ষার্থীদের একটা ধাক্কা খেতে হয়। আমাদের একাডেমিকে শর্ট সিলেবাসে থাকলেও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা তো ফুল সিলেবাসের উপর‌ই হয়। ফিজিক্স,কেমিস্ট্রি,বায়োলজি তে টোটাল ৫৫ টা অধ্যায় সাথে ইংলিশ আর সাধারণজ্ঞান। এতবড় সিলেবাস তিনমাসে কভার করতে ভালোই হিমশিম খেতে হয়েছে।এ সময় অসুস্থ হ‌ওয়াটাও যেন পাপ। একদিন নষ্ট হওয়া মানে অনেকটা পিছিয়ে যাওয়া।

(৫)লেখাপড়ার স্বাদ তিতা না মিঠা?

এ প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় লেখাপড়ার স্বাদ শুধু তিতা-ই নয় বরং জঘন্য রকম তিতা। বিশেষ করে আমার কাছে।কলেজে থাকতে পড়তে পড়তে পাগল হ‌ওয়া, কান্নাকাটি করা, অধ্যায় ই শেষ হয়নি এদিকে পরীক্ষা এসে হাজির, একটা টপিক যে ধীরে সুস্থে বুঝে শেষ করব তার উপায় নেই। রাতে সবাই যখন কাজ সেরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাতে যায় আমার তখন ঘুমাবার সুযোগ নেই। প্রাক্টিকাল খাতার কাজ করতে হবে। চাপে অতিষ্ট হয়ে তখন ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে বাইরের খোলা মাঠটার দিকে তাকাতাম বাইরের জগৎ আগের  মতোই চলছে।

অথচ আমার উপর যে অদৃশ্য বোঝা তা কেউ দেখতে পাচ্ছে না। কেননা সময়মতো গত সপ্তাহের প্রাক্টিকাল জমা না দিলে টিচার পরে আর সাইন করবেন না। একবার তো প্র্যাকটিক্যাল খাতায় সামান্য ভুল করেছি বলে স্যার ল্যাবের জানালা দিয়ে আমার খাতা বাইরে ফেলে দিয়েছিলেন। পড়াশোনা নিয়ে আমার ক্লাসমেটদের‌ও প্রায় একই অবস্থা ।তারপর যখন শুনি যে আমাদের দেশের ক্লাস টুয়েলভ নাকি অন্যান্য দেশের ক্লাস সেভেনের সমান। তখন মনটা আরো খারাপ হয়।সে যাক, মেডিকেল এর প্রিপারেশন নিতে আমার খারাপ লাগেনি।তখন পড়াশোনা টা মজাই লাগত। কিন্তু যখনই কম্পিটিশন এর কথাটা মাথায় আসত বেশ টেনশন হতো।

চলবে…

1 COMMENT

  1. লেখনিতে একটা কিছু তো আছে যেটা একটা লাইন পড়লে পরের লাইন পড়তে বাধ্য করে। এই যে বর্ণনার সাবলীল গতিময়তা এটা গোটা বিষয়টাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ধন্যবাদ, লেখিকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও লেখা

পরীক্ষা

'পরীক্ষা' শব্দটি নিয়ে একেক জনের দৃষ্টি একেক রকম। কারও কাছে এটা তার উন্নতি দেখার একটা মাধ্যম, কারও কাছে এটা দৈত্য বা দুঃস্বপ্নের মতো ভয়ংকর...
নয়া পথিক
পারমার্থিক

ইচ্ছে করে

ইচ্ছে করে ইট পাথরের দেয়াল ছেড়ে চলে যাই দূর বনে, যেখানে খোলা আকাশের নিচে নদী বয়ে চলে আপন মনে। ইচ্ছে করে পাখি হয়ে যাই...
নয়া পথিক
পারমার্থিক

মন

অশান্ত মন কিছু তো মানে না, রকেটের মতো শুধু ছোটে সারাক্ষণ। কখনো মন কেঁদে ওঠে কখনো বা হাসে, কখনো‌ বা ডানা মেলে উড়ে আকাশে। গোপনে থেকে মন কত কথা বলে, চিরকাল সে তবু অধরাই থাকে।
নয়া পথিক
পারমার্থিক

বড় হতে কেমন লাগে?

আমি আরওয়া। আমার বয়স  ১২বছর। বড় হতে ভালোও লাগে, খারাপও লাগে। আনন্দও লাগে,দুঃখও লাগে। বড় হতে পেরে আমি নানা ধরনের কাজ করতে পারছি যা...
নয়া পথিক
পারমার্থিক
1
previous arrow
next arrow
a
previous arrow
next arrow