Home Blog Page 4

দিল দুনিয়া আর দরবেশী (পর্ব – ১)

আধ্যাত্মিকতা ও ব্যবসাকে আমরা অনেক সময় দুই ভিন্ন জগত বলে ভাবি।  মনে করা হয়, আধ্যাত্মিকতা মানে জগত থেকে সরে দাঁড়ানো আর ব্যবসা মানে কেবল লাভ-ক্ষতির হিসাব। কিন্তু মানব সভ্যতার বড় বড় ধর্মগ্রন্থ ও জ্ঞানীজনের বাণী বলছে ভিন্ন কথা। তারা দেখিয়েছেন—সৎ উদ্দেশ্যে, মানবকল্যাণে এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে করা পার্থিব কাজই মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশের একটি শক্তিশালী পথ। আবুস আসাদের কথায়, “সুন্নত হলো, সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য সর্বোচ্চ পার্থিব কাজ।” অর্থাৎ জগতের দায়িত্বপূর্ণ কাজ থেকে পালিয়ে নয়, বরং সৎভাবে তা সম্পন্ন করার মধ্যেই আধ্যাত্মিকতার গভীরতা পাওয়া যায়।  

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “মানুষের জন্য সে-ই আছে যা সে চেষ্টা করে অর্জন করে।” (সূরা নাজম ৫৩:৩৯)। এই আয়াত মানুষের কর্মকে মর্যাদা দিয়েছে। এখানে বোঝানো হয়েছে যে মানুষের উন্নতি বা সাফল্য কেবল প্রার্থনা বা আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করে না; তাকে পরিশ্রম ও দায়িত্বের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবসাকেও একটি নৈতিক কর্মক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একজন উদ্যোক্তা যদি সততা, শ্রম এবং মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখে কাজ করেন, তবে তার সেই প্রচেষ্টা কেবল অর্থনৈতিক কাজ নয়—এটি এক ধরনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সাধনা হয়ে ওঠে। রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।” (তিরমিজি)।  এই উক্তির মধ্যে ব্যবসার নৈতিকতার গভীর গুরুত্ব ফুটে ওঠে। এখানে ব্যবসাকে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। একজন সৎ ব্যবসায়ী মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন, সমাজে ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করেন, এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন। তাই সৎ ব্যবসা ইসলামের দৃষ্টিতে উচ্চ মর্যাদার কাজ।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ভগবদ্ গীতায় বলা হয়েছে, “কর্মই তোমার অধিকার, ফলের প্রতি আসক্ত হয়ো না।” (গীতা ২:৪৭)। এই শিক্ষাটি কর্মের দর্শনকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। এর অর্থ —মানুষের দায়িত্ব হলো নিষ্ঠার সাথে তার কাজ করা, কিন্তু কেবল ফল বা লাভের চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে পড়া নয়। যখন কাজটি দায়িত্ববোধ ও সততার সাথে করা হয়, তখন সেই কাজ আত্মিক পরিশুদ্ধির পথ হয়ে ওঠে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ প্রকৃত উদ্যোক্তা কেবল লাভের জন্য নয়, সৃষ্টির আনন্দ এবং মানুষের উপকারের জন্যও কাজ করেন। খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে বলা হয়েছে, “যে বিশ্বস্তভাবে অল্প কাজ করে, সে বড় কাজেও বিশ্বস্ত।” (লূক ১৬:১০)। এই বাণী মানুষের চরিত্রের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে। ছোট কাজেও সততা ও দায়িত্ববোধ থাকলে বড় দায়িত্বেও সেই নৈতিকতা বজায় থাকে। ব্যবসার জগতে এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। একজন উদ্যোক্তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি লেনদেন এবং প্রতিটি প্রতিশ্রুতি যদি সততার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার প্রতিষ্ঠানও সমাজে আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে।

আমাদের সাহিত্য ও দর্শনের জ্ঞানীরাও একই শিক্ষা দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “কর্মের মধ্যেই মানুষের মুক্তি।” অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত বিকাশ ঘটে কাজের মধ্য দিয়ে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “কর্মই হলো উপাসনা।” এই উক্তি দেখায় যে মানুষের সৎ কর্মই এক ধরনের প্রার্থনা বা উপাসনা হয়ে উঠতে পারে। যখন কাজ মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হয়, তখন সেটি কেবল পেশা থাকে না—একটি মানবিক সাধনায় পরিণত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে “অরুণিমা” উদ্যোগটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। এখানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত প্রায় তিন হাজার নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। তারা তাদের হাতে সেলাই করে নকশিকাঁথা ও কারুশিল্পের মাধ্যমে নিজের জীবনকে বদলে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এটি কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি নারীর সামাজিক ক্ষমতায়নের একটি পথ। যখন একজন নারী নিজের শ্রমের মাধ্যমে আয় করতে পারেন, তখন তার আত্মমর্যাদা বাড়ে, পরিবারে তার অবস্থান শক্ত হয় এবং সমাজেও একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যক উদ্যোক্তাই এভাবে মানুষের পার্থিব এবং অপার্থিব জীবনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। 

একজন লেখক এবং উদ্যোক্তা হিসেবে আমার মনে হয়, এই ধরনের উদ্যোগই পার্থিব কাজ ও আধ্যাত্মিকতার মিলনকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। কারণ এখানে লাভের সাথে সাথে মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যও কাজ করছে। একটি ব্যবসা যখন মানুষের জীবনে মর্যাদা, স্বাধীনতা ও আশার আলো নিয়ে আসে, তখন সেটি কেবল অর্থনৈতিক কার্যক্রম থাকে না; এটি একটি মানবিক আন্দোলন হয়ে ওঠে। সুতরাং বলা যায়, আধ্যাত্মিকতা ও ব্যবসা পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং নৈতিকতা,  সততা ও মানবকল্যাণের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসাই আধ্যাত্মিকতার বাস্তব প্রকাশ হতে পারে। সেই অর্থে আবুস আসাদের উক্তিটি গভীর সত্যকে প্রকাশ করে—“সুন্নত হলো, সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য সর্বোচ্চ পার্থিব কাজ।” যখন মানুষের পার্থিব কর্ম মানবকল্যাণের সাথে যুক্ত হয়, তখন সেই কর্মই হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিকতার এক উজ্জ্বল পথ।

স্বামী বিবেকানন্দের “কর্মযোগ” গ্রন্থে পার্থিব (জাগতিক কাজ) এবং অপার্থিব (আধ্যাত্মিক উপলব্ধি)-এর মধ্যে একটি গভীর মেলবন্ধনের কথা বলা হয়েছে। তাঁর মতে, মানুষ কেবল ধ্যান বা উপাসনার মাধ্যমে নয়—নিজের দৈনন্দিন কর্মের মধ্য দিয়েও ঈশ্বরের নিকট পৌঁছাতে পারে। বিবেকানন্দ বলেন, পৃথিবীর কাজকে ত্যাগ করে আধ্যাত্মিকতা অর্জন করতে হবে—এ ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়।  বরং যে কাজই আমরা করি, যদি তা নিঃস্বার্থভাবে করি এবং নিজের স্বার্থের জন্য নয় বরং মানুষের কল্যাণের জন্য করি, তখন সেই কাজই আধ্যাত্মিক সাধনা হয়ে ওঠে। এখানে পার্থিব কাজ আর অপার্থিব সাধনার মধ্যে আর কোনো বিভাজন থাকে না। “কর্মযোগ”-এর মূল শিক্ষা হলো—কর্মই উপাসনা। একজন মানুষ যখন নিজের কাজকে ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গ হিসেবে করে, তখন সেই কাজের মধ্যেই ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়। এই অবস্থায় কর্ম আর কেবল জীবিকা বা দায়িত্ব থাকে না; তা হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধি ও আত্মোন্নতির পথ। বিবেকানন্দ আরও বলেন, মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা।  

কারণ প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের উপস্থিতি আছে। তাই ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা, সমাজের উন্নতির জন্য কাজ করা—এসবই এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনা। এই ভাবনার মধ্যেই পার্থিব ও অপার্থিবের প্রকৃত মিলন ঘটে। এই দর্শনে জগতকে ত্যাগ করার কথা বলা হয় না; বরং জগতের মধ্যে থেকেই নিঃস্বার্থ কর্ম করার কথা বলা হয়। মানুষ যখন নিজের অহং, লাভ-লোকসানের হিসাব, প্রশংসা বা স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কেবল কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করে, তখন সেই কর্ম তাকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। অতএব, স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগে পার্থিব ও অপার্থিবের সম্পর্ক বিরোধের নয়, বরং সমন্বয়ের। জাগতিক কর্মই হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক পথ, আর মানুষের কল্যাণে করা প্রতিটি নিঃস্বার্থ কাজই হয়ে ওঠে ঈশ্বরসেবার একটি রূপ। এই ভাবনাই দেখায়—মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সমাজসেবা এবং কর্মপ্রবণতাই হতে পারে আত্মার উচ্চতর জাগরণের পথ।

সুফি দর্শনে পার্থিব ও অপার্থিব এই দুই জগতকে একেবারে আলাদা বা পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখা হয় না। বরং সুফি চিন্তায় দুনিয়াকে এমন একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয় যেখানে মানুষের কর্ম, প্রেম ও সেবার মাধ্যমে সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। অর্থাৎ পার্থিব জীবনই হয়ে ওঠে অপার্থিব সত্য উপলব্ধির পথ। সুফি সাধকরা বলেন, পৃথিবী ত্যাগ করে নয়, বরং পৃথিবীর মধ্যে থেকেই হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়া যায়। মানুষের অন্তরের অহং, লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতা দূর করে যখন সে ভালোবাসা, দয়া ও মানবসেবার পথে চলে, তখন তার দৈনন্দিন জীবনই এক ধরনের আধ্যাত্মিক যাত্রা হয়ে ওঠে। এখানে কাজ, সম্পর্ক, সমাজ—সবকিছুই আল্লাহর প্রেমের প্রকাশের ক্ষেত্র। সুফি কবি ও সাধকেরা প্রায়ই বলেন, দুনিয়া আল্লাহর আয়না।

অর্থাৎ সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার সৌন্দর্যের প্রতিফলন রয়েছে। ফুলের সৌন্দর্য, মানুষের মমতা, প্রকৃতির সুর—সবকিছুর মধ্যেই আল্লাহর ঝলক প্রকাশিত হয়। তাই সুফিরা জগতকে ঘৃণা করে না; বরং এই জগতের মধ্যেই তারা আল্লাহর চিহ্ন খুঁজে পায়। সুফি চিন্তায় “ইশক” বা প্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এই প্রেম কেবল মানুষের প্রতি নয়, বরং সমস্ত সৃষ্টির প্রতি।  যখন মানুষ সৃষ্টিকে ভালোবাসে, তখন সে আসলে স্রষ্টারই প্রেমে আবদ্ধ হয়। এই প্রেমের মধ্য দিয়েই পার্থিব জীবন ধীরে ধীরে অপার্থিব অর্থ পায়। এই দর্শনে মানুষের কর্ম, শিল্প, সঙ্গীত, সেবা—সবই হতে পারে আল্লাহর স্মরণ (জিকির) এবং তাঁর প্রতি প্রেমের প্রকাশ। তাই সুফি সাধনার লক্ষ্য কেবল ধ্যান বা নির্জনতা নয়; বরং হৃদয়ের এমন পরিবর্তন, যেখানে মানুষ প্রতিটি কাজে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করে। অতএব সুফি চিন্তায় পার্থিব ও অপার্থিবের সম্পর্ক বিচ্ছিন্নতার নয়, বরং গভীর ঐক্যের। পৃথিবীর কাজ, মানুষের সেবা, প্রেম ও সৌন্দর্যের অনুভূতির মধ্য দিয়েই মানুষ ধীরে ধীরে আল্লাহর দিকে অগ্রসর হয়। দুনিয়ার পথেই খুলে যায় আধ্যাত্মিকতার দরজা—এটাই সুফি ভাবনার মূল সুর।

আমেরিকায় ধর্ম: সুযোগ, সংকট ও প্রভাব (পর্ব – ১)

অ্যামেরিকাতে ধর্মীয় চর্চা বেশ বৈচিত্র্যময়। এদেশ খ্রিস্টধর্ম প্রধান ধর্ম হলেও ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইহুদি ধর্ম এদেশের প্রধান অ-খ্রিস্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং বিশাল একটি আমেরিকান গোষ্ঠী নিজেদের নাস্তিক, সংশয়বাদী বা ‘কোনো ধর্মে বিশ্বাসী নয়’ হিসেবে পরিচয় দেন।

মার্কিন প্রথম সংশোধনী ও ধর্ম (First Amendment and Religion):

মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দুটি মূল বিধানের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে: ‘প্রতিষ্ঠা ধারা’ (Establishment Clause)—যা সরকারকে কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা কিংবা এক ধর্মকে অন্যটির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া থেকে বিরত রাখে; এবং ‘মুক্ত অনুশীলনের ধারা’ (Free Exercise Clause)—যা সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই ব্যক্তিদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারকে সুরক্ষা প্রদান করে।

অ্যামেরিকাতে ধর্ম চর্চার সুযোগ, সুবিধা ও অসুবিধা এবং জীবনে ধর্মের প্রভাব

অ্যামেরিকায় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান চর্চার সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত বিস্তৃত। দেশটি সংবিধানগতভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়ার ফলে মানুষ নির্বিঘ্নে নিজস্ব উপাসনালয় তৈরী, ধর্মীয় সংগঠনে নিরবিগ্নে, বাঁধাহীন অংশগ্রহণ, ধর্মীয় চর্চা করা এবং বিশ্বাস প্রকাশ করতে পারে।

ধর্ম কি?

ধর্মের সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। কারো কারো মতে ধর্ম একটি বিশ্বাসব্যবস্থা এবং একটি সামাজিক মানবন্ধন যা মানুষকে জীবনের মূল্যবোধ ও উদ্দেশ্য কী শিখায়, ভাল–মন্দের পার্থক্য বোঝায়, এবং সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক তুলে ধরতে সাহায্য করে। এছাড়াও ধর্ম শেখায় মানব সভ্যতাকে উপাসনা, নৈতিক শিক্ষা, আচার‑অনুষ্ঠান, এবং একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলা– যেখানে মানুষ একই বিশ্বাস ভাগ করে।

আবার অনেকের কাছে ধর্ম মানে ঈশ্বর-চর্চা বা আত্ম-চর্চা বা অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস, আবার কারও কাছে এটি নৈতিকতা ও জীবনদর্শনের পথ। মোটা দাগে, ধর্ম হচ্ছে মানুষের জীবনের অর্থ, শান্তি, পরিচয় ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামো।

আমার মতে, ধর্ম হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার জন্য আধ্যাত্মিকতা চর্চা করার অনুশীলন পদ্ধতি। ধর্ম চর্চা এমন এক আদর্শ অনুশীলন পদ্ধতি, যে পদ্ধতি অনুসরণ করে একজন মানুষ তার জীবনের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছাতে পারে। আমার জীবনের ক্ষুদ্র সময়ে অ্যামেরিকার বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে এবং পৃথিবীর নানান প্রান্তে থেকে আশা বিভিন্ন ধর্মীয় লোকজনের সাথে পরিচয় হবার সুযোগ হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমি প্রতিটা ধর্মকে একক হিসেবেই পেয়েছি।

আমি দেখেছি সকল ধর্মগুরুগণ ঠিক একই কথা বিভিন্ন ভাবে ব্যাক্ত করেছেন মাত্র তা ছাড়া আর কিছুই নয়। ধর্ম চর্চা নিয়ে আমদের সমাজে যত গোলযোগ সব আমাদের নিজস্ব সৃষ্টি। ধর্ম চর্চার মহান পদ্ধতিগুলো আমরা ধর্মগুরু, নবী-রাসুল, মহাপুরুষগণের মাধ্যমে পেয়েছি। একেকজন ধর্মগুরু, কালক্রম বা পরিবেশ ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এবং মানুষের যোগ্যতার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ছন্দে-ঢঙ্গে তাঁদের অনুশীলন পদ্ধতি তাঁদের অনুসারী, অনুরাগীদের দেখিয়ে দিয়েছেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন, শিখিয়ে গেছেন। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, মানুষ কোনো কালেই তাদের সময়ের উপস্থিত ধর্মগুরুগণের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারে নি। প্রতিজন ধর্মগুরুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি তাদের ধর্মগুরুর পদ্ধতি ধরে রাখতে পেরেছেন। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সময়ে আমাদের ধর্ম চর্চা পদ্ধতি কতটুকু সঠিক?

চলবে…

আবু জেহেল আসলে কে ছিলেন?

আমি মনে করি আবু জেহেলকে দেখার দুইটি ভঙ্গি আছে।প্রথমটি হলো সুফি জ্ঞানের আলোকে অন্তর্মুখী হয়ে বিষয়টিকে দেখা; দ্বিতীয়টি হলো কোরানে এই নামটি যে কারণে উপমা-অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া। এই ক্ষুদ্র লেখায় আমি দুইভাবেই দেখার একটি সহজ চেষ্টা করছি। সত্যতা ও ভাবের গভীরতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য কিছু দীর্ঘ উদ্ধৃতিও ব্যবহার করেছি।

সুফির চিন্তায়

জাহেল অর্থ, ‘বুদ্ধিজড়তা’। আইয়ামে জাহিলিয়াত মানে, এমন এক সময়কাল যখন অজ্ঞতা প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। এটিকে কেবল ইতিহাসের একটি সময়কালে আটকে দিলে চলবে না। কলিযুগও ঠিক তেমনই। বরং জাহেল প্রসঙ্গে আধ্যাত্মিক অনুভূতির ঘাটতিকে এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

‘‘কেতাবের বক্তব্য বুঝতে না-পারলে, তার তাৎপর্য আত্মগত বা চরিত্রগত না-করলে, পবিত্র গ্রন্থের যে মহানত্ব তার প্রভাবে বা সংস্পর্শে নিজেও মহান রূপে গড়ে না উঠলে গ্রন্থ কেতাব তখন নিছক এক বোঝা স্বরূপ। যা বহন করেও বাস্তবে কিছু ঘটে না। এমন ব্যক্তি যেন উচ্চতর মানবীয় গুণহীন একটা গাধাতুল্য। যেমন, কেউ পানির বোতল পিঠে নিয়ে ঘুরছে অথচ পিপাসায় মরার উপক্রম হয়েছে কিন্তু বোতল খুলে পানি খাওয়ার বুদ্ধি নাই- তার মতো অজ্ঞ বা জাহেল আর কে?
সামাজিক জীবনে দরকারি বিষয়ে জ্ঞানী না-হওয়ার প্রসঙ্গটি কোরানে বর্ণিত ‘অজ্ঞতা বা জাহেলিয়াত’  পরিভাষার অন্তর্গত নয়।
‘আপনি যদি উহাদের ছলনা হইতে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি উহাদের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হইব’। (১২ ইউসুফ: ৩৩ ইফাবা)
উপরিউক্ত বাক্যে যে আবেদন রয়েছে তার তাৎপর্য এই যে, আবেদনকারী এখনো ছলনাময়ীদের কবলে পড়েনি এবং তাই তিনি এখনো অজ্ঞ বা জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য নন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে তাদের ছলনা থেকে রক্ষা না করলে অজ্ঞ বা জাহেলরূপে তাঁর প্রকাশ ঘটবে। ইউসুফ নবির সাথে জড়িত ঐ ঘটনাটি আসলে সকলের জন্যা আদর্শ। আপাতদৃষ্টে, এটি সামাজিক জীবনের একটি প্রসঙ্গ হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কিন্তু ব্যক্তির একান্ত আধ্যাত্মিক চেতনা বা অনুভবের সাথে জড়িত। এরূপে যা মানবীয় সম্ভাবনাকে জ্ঞানময় না-করে অজ্ঞতায় পর্যবসিত করে তাই জাহিলিয়াত’’।    

– কোরানে মানুষতত্ত্ব, পরম্পরা ৫ (রচয়িতা: হিলালুজ্জামান হেলাল)

ব্যক্তি আবু জেহেল

আবু জেহেল ছিলেন গভীর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তদানীন্তন কোরাইশ প্রবীণ নেতারাও তাকে তার দক্ষতা বা উপলব্ধির জন্য বিশেষভাবে বিবেচনা করত। সে তাদের গোপন বৈঠক বা শলা-পরামর্শ গৃহ ‘দারুন নাদওয়ার’ এ যোগ দিতেন। এ সম্মেলনে প্রবেশের জন্য বয়স লাগত কমপক্ষে ৪০ বছর অথচ তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। তার উপাধি ছিল আল-হাকাম অর্থাৎ ‘বিজ্ঞবিচারকের পিতা’ বা জ্ঞানীর বাপ। মূলত তার বিজ্ঞতা ছিল পার্থিব ক্ষেত্রে। ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যাত্ম জগতে তার বিজ্ঞতার পরিবর্তে ছিল শুধুই বিভ্রান্তি। ফলে রসুলুল্লাহ তাকে আবু জেহেল উপাধি দেন। (সীরাতুল মুস্তফা ২য় খণ্ড, পৃ-৯০) এর অর্থ ‘অজ্ঞলোকের বাপ বা পিতা’। তার আসল নামের বিপরীতে শেষোক্ত চারিত্রিক উপাধাটিই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। এটা এক আশ্চর্য ব্যাপার- হাকিম হয়ে গেলেন জাহেল!

– কোরানে মানুষতত্ত্ব পরম্পরা ৫ (রচয়িতা: হিলালুজ্জামান হেলাল)

আবু জেহেলের আসল নাম, আমর ইবনে হিশাম। তিনি হযরত ওমরের মামা ছিলেন।

আমার ভাবনা: আধুনিককালের আবু জেহেল

সুফি মতে, আধ্যাত্মিক জ্ঞানহীন মানুষ প্রত্যেকেই একেকজন ছোট বা বড় ‘আবু জেহেল’ বিশেষ। ফলে সাধকগণ ব্যতীত বাকিরা এই খেতাবের অংশীদার। এক্সট্রিমিস্টদেরকে কেবল যদি লিবারেলরা এই তকমা দেন তাহলে যেমন চলবে না, আবার লিবেরেলদেরকেও এক্সট্রিমিস্টরা এই তকমা দেওয়ার এখতিয়ার রাখেননা। মানে কেবল এই দুই ব্যক্তিবর্গের মাঝে এই তকমা সীমাবদ্ধ নয়।

আমাকে আকৃষ্ট করে আবু জেহেলের দুনিয়াবি জ্ঞানের যে ভাণ্ডার ও তার যে মোহনীয় গুণ সেই ব্যাপারটি। এই যে এত বোঝাপড়া যে মানুষটির, যে সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জাতির জন্য, যার বেশ ফ্যান ফলোয়ার, এবং তার যে চারিত্রিক দাপট সেটাই আমাকে আকৃষ্ট করে। কারণ আমি আমার আশেপাশে এমন মানুষ দেখি। যারা আসলেও হাকিম, জ্ঞানীর বাপ। এমন কিছু জ্ঞানীর বাপে আমিও মুগ্ধ। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো লম্বা সময় ধরে একটা লিগেসি বানিয়ে তারা শুষে নিচ্ছেন পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর সৃষ্টির পবিত্র সম্ভাবনাকে, হয়তো অজান্তেই।

কোরান দর্শনে ‘জিন’ পর্যায়ের মানুষদের প্রসঙ্গে বলা আছে যে তারা আগুনের তৈরি। কেননা আগুনের শিখা মাথা নোয়াতে জানেনা। মাথা না নোয়ালে সিজদাহ হবে না। সিজদায় না গেলে আত্মসম্পর্মণ হলো না। অতএব, সে মুসলিম হলো না। তার মাঝে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেলো না। বুদ্ধিধার ও চিন্তার যে প্লেজার ও অহম সেটা জিনের বৈশিষ্ট্য। তৌহিদ-জ্ঞান বিবর্জিত এমন একজন ব্যক্তি বেশ ভালো মানের একজন আবু জেহেল বলতে হবে। যেকোনো ধারণার সাথে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তিনি ডান বাম, লাল নীল, আস্তিক নাস্তিক সবই হতে পারেন।

''জিন: জাতি হিসাবে ইহারা মানুষ হইতে মর্যাদায় নিম্নমানের। ইহারা সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তি বিশিষ্ট আগুনের তৈয়ারী জীব। আদমের সন্তান হিসাবে মানুষের মধ্যে ফেরেস্তা এবং জিনভাব উভয়ই বিদ্যমান। সুতরাং যাহাদের মধ্যে জিনভাব বেশী প্রবল তাহাদিগকেও জিন বলা যাইতে পারে।''

– কোরান দর্শন , শব্দ সংজ্ঞা, সুফি সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতি

জন্ম যে ঘরে, সে ঘরের ধর্ম পালন করা হয় কথাটা সকলেই বোঝে। বুঝেও ধর্মীয় নানা ভীতি ও অহমের চোটে ব্যাপারটিকে অনেকেই মানতে চাননা বা বলতে চাননা। কিন্তু এ প্রসঙ্গেও উল্লেখ আছে,

''যখন তাহাদিকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহা তোমরা অনুসরণ কর’, তাহারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদিগকে যাহাতে পাইয়াছি তাহার অনুসরণ করিব।‘ এমনকি, তাহাদের পিতৃপুরুষগণ যদিও কিছুই বুঝিত না এবং তাহারা সৎপথেও পরিচালিত ছিল না, তথাপিও?''

– ২ বাকারা: ১৭০, ইফাবা

সুফি সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতি এর কোরান দর্শন থেকে আয়াতটির ব্যাখ্যা: ''পিতৃপুরুষদিগকে অনুসরণ করিবার অভ্যাস ধর্মজীবনে সত্যলাভের পথে শক্তিশালী একটি বাধা। মানুষ পিতৃপুরুষের দোহাই দিয়া ধর্মের মধ্যে মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিতে ভালোবাসে। এইজন্য জনগণ পূর্বপুরুষদের অনুসৃত মিথ্যা ত্যাগ করিয়া উপস্থিত মহাপুরুষ হইতে সত্যপথ গ্রহণ করিতে চাহে না। অথচ পিতৃপুরুষগণ যাহা অনুসরণ করিয়া গিয়াছে তাহা বুদ্ধি প্রয়োগ করিয়া করে নাই। অর্থাৎ ভোগকে উপভোগে পরিণত করিবার বুদ্ধি প্রয়োগ করে নাই, বরং মনুষ্য জীব হিসাবে জৈবিক ভোগের ধারাই অনুসরণ করিয়াছে। ‘কোনো বিষয়েই বুদ্ধি খাটায় নাই’ অর্থাৎ কোনোও একটি বিষোয়মোহ হইতেও মুক্তিলাভের বুদ্ধি খাটায় নাই। সেইজন্য হেদায়েতও পায় নাই।''

অতএব, বাপ দাদার ধর্ম মেনে যে এক্সট্রিমিস্ট আবু জেহেল আছে বলে অনেকে ভাবছেন তাদেরকে চেনা সহজ। যারা নাস্তিকদের আবু জেহেল বলতে চান তাদেরকেও চেনা সহজ। কিন্তু আধুনিককালে এসে মনের রাজত্ব দখল করতে আগত বিজ্ঞ, সূক্ষ্ম চিন্তার ব্যক্তিদেরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আবু জেহেল। এবং ভারী বিপদজনক আবু জেহেল তারা। কেননা মানব মনের প্রেম, ভক্তিভাব ও পরম্পরাগত বিষয়গুলোকে অনেকাংশে তারা হাস্যরসে পরিণত করেছেন। উঠতি তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মাঝে এই প্রেমের প্রতি অনাগ্রহ প্রায়শই নজরে পড়ে। হৃদয়টা মেলে ধরতে কোথায় যেন একটা লজ্জাবোধ হয়।

আমি মনে করি এই বুদ্ধিজীবী আবু জেহেলরা সম্ভাবনাময় সন্তানদের মূলত দ্বন্দে ফেলে রাখেন। আমার মনে করায় ত্রুটি থাকতে পারে, আমার মনে করায় রদবদল আসতে পারে। কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে এবং আমার বিগত জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি যা অনুভব করছি সে অনুযায়ী এমন একটা ভাবনায় আসার ক্ষেত্রে আমার খুব জোরালো মনোভাব আছে।    

তাই আমি মনে রাখতে চাই,

‘’তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদিককে এড়াইয়া চল।”

– ৭ আরাফ: ১৯৯ ইফাবা

সুফি সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতি এর কোরান দর্শন থেকে আয়াতটির ব্যাখ্যা: ''মহানবী জনগণলে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছেন যে, দুর্বল আল্লাহ হইতে তাহারা যাহাদিগকে সাহায্যার্থে ডাকিয়া থাকে (তাহা বিষয়াশক হউক বা মানুষ হউক) তাহারা কাহাকেও মুক্তিপথের সাহায্য দানে সমর্থ নহে এবং তাহারা আপন নফসকেও সাহায্য করে না, করিতে পারে না। কারণ তাহারা ধর্ম বিষয়ে অজ্ঞান এবং ভ্রান্ত।

নূর-মোহাম্মদ মানুষ-মোহাম্মদকে বলিতেছেন: ধর্ম বিষয়ে এইসকল ভ্রান্ত লোককে হেদায়তের দিকে ডাকিলেও তাহারা শুনে না, যেহেতু তারা ধর্মরাশির গুরুত্ব উপলব্ধি করে না। সত্যিকার অর্থে তাহারা বধির, অন্ধ। তুমি দেখিতেছ যে, তাহারা তোমার দিকে তাকাইয়া আছে কিন্তু তাহারা তোমার বাহ্য মানবাকৃতি ছাড়া কিছুই দেখিতেছে না। তাহারা অসালাতী। তাই তাহারা অন্তর্দৃষ্টিহীন জ্ঞানান্ধ।

অতএব এইসকল অন্ধজনের প্রতি স্নেহের ক্ষমার দৃষ্টিদান কর। স্নেহের সহিত তাহাদিককে ধর্ম দর্শন দিক্ষা দাও তথা সালাত শেখাও। যেসকল মূর্খজন সালাতের শিক্ষা গ্রহণ করিতে রাজি হইবে না তাহাদিগ হইতে সরিয়া থাক। তাহাদিগকে লইয়া অকারণ সময় নষ্ট করিয়া লাভ নাই’’। 

একজন অসালাতী জাহেল ব্যক্তি সামাজিক চোখে খারাপ মানুষ যেমন হতে পারেন, তেমনি ভালো মানুষও হতে পারেন। ব্যক্তি পর্যায়ে সাধনার ক্ষেত্রে মনের দ্বিধা দূর করার জন্য যে সঙ্গ প্রয়োজন, নিজের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য বাচালতাহীন যে সমপর্ণের হাল প্রয়োজন তার জন্য নিজ নিজ আবু জাহেলকে চিনতে পারা একটি জরুরি বিষয়।

এই কারণে দেখা যায়, সাধকেরা বুদ্ধিজীবি মানুষদের পারতপক্ষে এড়িয়ে চলেন। ভক্তিকে আধুনিক মানুষ ভুলভাবে দেখতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় পেষণ ও পীড়নের পাঠে তারা এতই মজবুত যে এই পরম প্রেমের মাঝেও তারা মগজধোলাই দেখতে পান। একমাত্র রসের আলাপকারীরাই জানেন যে অন্তর শীতল হয় কেবল সাধুসঙ্গে। সভা বা সেমিনারে তাত্ত্বিক তৃপ্তি পাওয়া যায়। সেটিও মন্দ নয়। কিন্তু সেটিই যদি পারমার্থিকভাবকে খোঁজার একমাত্র জায়গা হয়ে থাকে তাহলে বিপদ আছে বৈকি!

সুফি দৃষ্টিতে, যেখানে জ্ঞান আছে কিন্তু বিনয় নেই, বুদ্ধি আছে কিন্তু সমর্পণ নেই, বিশ্লেষণ আছে কিন্তু হৃদয়ের রস নেই—সেখানেই আবু জেহেলীয়তার জন্ম হতে পারে।

আবু জেহেল কেবল ইতিহাসের একটি চরিত্র নন; তিনি মানুষের অন্তর্জগতে পুনরায় জন্ম নেওয়া এক মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রবণতার নাম। যেখানে বুদ্ধি আছে কিন্তু বিনয় নেই, জ্ঞান আছে কিন্তু আত্মসমর্পণ নেই, ভাষা আছে কিন্তু হৃদয়ের রস নেই সেখানেই আবু জেহেলীয়তা জন্ম নিতে পারে। তাই সাধনার পথে সবচেয়ে জরুরি কাজ বাইরের আবু জেহেলকে চিহ্নিত করা নয়, বরং নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই অহং, জড়তা ও বুদ্ধির মোহকে চিনে ফেলা।

যে মুহূর্তে মানুষ নিজের অন্তর্গত জাহেলিয়াতকে দেখতে শেখে, সেই মুহূর্ত থেকেই তার জ্ঞান হৃদয়ে অবতীর্ণ হওয়ার পথ খুলে যায়।

জ্ঞান যখন নারীর মুখ, কিন্তু কণ্ঠস্বর নয়

জ্ঞানকে জাগতিকই হোক বা আধ্যাত্মিক পথের সন্ধানেই হোক গুরুত্ব দেয়া হয়। বহু ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিতে এই প্রজ্ঞা, জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা হয় নারীকে।

সংস্কৃত ‘প্রজ্ঞা’ শব্দটিই স্ত্রীবাচক। বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞা (Prajñā) বা জ্ঞান স্ত্রীবাচক শব্দ। আরবি ভাষায় হিকমাহ (hikmah) শব্দটিও স্ত্রীবাচক, যা জ্ঞানকে নারীত্বের সাথে ভাষাগতভাবে যুক্ত করে। ইসলামি দর্শনে হিকমাহ জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও নৈতিক প্রজ্ঞার প্রতীক। তবে কেবল ভাষাগত অলীক ধারণায় নয়, সুস্পষ্টভাবেই নারীর সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে জ্ঞান। নারী এখানে কেবল জ্ঞানের ধারক নয়, বরং নিজেই জ্ঞান।

বহু ঐতিহ্যে জ্ঞানকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। হিন্দু দর্শনে জ্ঞান সরাসরি নারীরূপে পূজিত। সরস্বতী কেবল বিদ্যার দেবী নন, তিনি সৃজনশীলতা, ভাষা ও চেতনার উৎস। ‘শক্তি’ ধারণায় নারীত্বই সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি। যেখানে জ্ঞান, শক্তি ও অস্তিত্ব একে অপরের সাথে নীবিড়ভাবে যুক্ত। কালী ও দুর্গা শুধু শক্তি নয়, ‘মহামায়া’—যিনি জগতকে ধারণ করেন এবং জ্ঞান দেন।

বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞা মুক্তির অপরিহার্য উপাদান। প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রে প্রজ্ঞাকে ‘সমস্ত বুদ্ধদের জননী’ বলা বলা হয়। অর্থাৎ জ্ঞানই বোধিলাভের জন্মদাত্রী। প্রজ্ঞা ও করুণা (karuṇā)—এই দুইয়ের মিলনেই ঘটে বোধিলাভ। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে প্রজ্ঞাকে নারীত্বের সাথে এবং উপায় (upāya) কে পুরুষত্বের সাথে যুক্ত করে দার্শনিক ভারসাম্য তৈরি করা হয়েছে।

হিব্রু বাইবেলে ‘Book of Proverbs’-এ জ্ঞানকে নারী রূপে (Lady Wisdom) চিত্রিত করা হয়েছে। গ্রিক দর্শনে অ্যাথেনা প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের প্রতীক। খ্রিস্টীয় ও গনস্টিক ঐতিহ্যে সোফিয়া (Sophi) ঈশ্বরীয় জ্ঞানের প্রতীক। কিছু ব্যাখ্যায় ভার্জিন মেরিকে ডিভাইন উইশডম এর ধারক হিসেবে দেখা হয়।

সুফি দর্শনে নারীকে প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে দেখার একটি গভীর ও বহুস্তরীয় ঐতিহ্য আছে। এখানে নারী কেবল জৈবিক সত্তা নয়—বরং ‘মারফত’, ‘আত্মজ্ঞান’ ও ‘সত্য-উপলব্ধি’-র প্রতীক। সুফি তত্ত্বে ‘জ্ঞান’ (Ma‘rifa) অর্জন মানে আল্লাহর সঙ্গে অন্তর্গত সংযোগ। এই জ্ঞানকে প্রায়ই নারীরূপে কল্পনা করা হয়—প্রেমিকা, প্রিয়তমা বা রূপসী সত্তা হিসেবে। আত্মা (সালিক) এখানে প্রেমিক, সত্য/ঈশ্বরীয় জ্ঞান এখানে প্রেমিকা। এই জ্ঞানকে ‘অর্জন’ নয়, ‘প্রেমের মাধ্যমে উপলব্ধি’ করা হয়। রুমির কবিতায় যে প্রিয়তমা সে ঈশ্বরীয় জ্ঞান ও সত্যের প্রতীক। ইবনে আরাবি তার Fusus al-Hikam এ নারীর সৌন্দর্যকে ঈশ্বরের সর্বোচ্চ প্রকাশ বলেছেন। কারণ নারী সৃষ্টিশীলতা ও জ্ঞানের পূর্ণ প্রতিফলন।

বাউল ধারাও এক্ষেত্রে এক। বাংলার বাউল ও সুফি গানে ‘মনের মানুষ’, ‘সই’, ‘প্রেমিকা’—এসবই আসলে আত্মজ্ঞান বা প্রজ্ঞার রূপক। লালন ফকিরের গানেও নারী কখনো গুপ্ত জ্ঞান কখনো বা আত্মার প্রতীক হিসেবে এসেছে।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে জ্ঞানের সাথে দেবতাদের চেয়ে বেশি দেবীদের যুক্ত করা হয়। যেমন গ্রিক দেবী অ্যাথেনা ও মেটিস। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত গ্রিসে মেটিস জ্ঞানের দেবী হিসাবে পূজিত হয়েছেন। জাদুবিদ্যা ও পুনর্জন্মের জ্ঞান নিয়ে রয়েছেন মিশরীয় পুরানের অন্যতম প্রধান দেবী আইসিস। হিন্দু ধর্মে জ্ঞানের দেবী স্বরসতী ছাড়াও রয়েছেন শৈব ও শাক্তধর্মের ঐতিহ্যে দেবীতারা, যিনি দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় মহাবিদ্যা।

অন্যদিকে, ইয়িন-ইয়াং দ্বৈত তত্ত্বে নারীত্ব ও পুরুষত্বকে মহাবিশ্বের দুই মৌলিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়। এখানে ইয়িন নারীসুলভ ও অনুভূতি, অর্ন্তজগতের প্রতীক। ইয়িন-ইয়াংয়ের দ্বৈততার পারস্পরিক ক্রিয়াতেই সৃষ্টি ও ভারসাম্য বজায় থাকে। কনফুসীয় ও তাওবাদী সৃষ্টি কাহিনী এ ধারণা সমর্থন করে। কবি নজরুল যেমনটা বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।

মনোবিশ্লেষণেও এই ধারণার প্রতিধ্বনি আছে। মনোবিশ্লেষক কার্ল জং এর মতে পুরুষের অবচেতনের যে নারীত্ব (anima) তাই হলো অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞার উৎস। এখানে নারীত্ব মানে কেবল লিঙ্গ নয়, বরং মানসিক গুণ—অর্ন্তদৃষ্টি, গভীরতা, ধারনক্ষমতা। তবে আধুনিক দৃষ্টিতে এই গুণগুলো লিঙ্গনিরপেক্ষ—মানবিক গুণ হিসেবেই বিবেচিত।

যুগে যুগে জ্ঞানের এই নারীকরণ পুরুষের নারীর প্রতি চাহিদার সাথেও সম্পর্কিত। সমাজে প্রচল এর মূল ধারণাটি হলো, নারী পুরুষকে রূপান্তরিত করতে পারে। হয় ডাইনির মতো নেতিবাচকভাবে, নতুবা প্রজ্ঞার মাধ্যমে ইতিবাচকভাবে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যেখানে নারীকে জ্ঞানের উৎস, ধারক, এমনকি স্বয়ং জ্ঞান হিসেবে কল্পনা করা হয়, সেখানে বাস্তব সমাজে কেন তাকে জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে রাখা হয়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো সামনে আসে। দি সেকেন্ড সেক্স গ্রন্থে সিমোন দ্য বুভোয়ার দেখান, নারীকে প্রতীকী মর্যাদা দিলেও বাস্তবে তাকে অধীনস্থ রাখা হয়েছে। ফলে প্রতীকী সম্মান ও বাস্তব বৈষম্যের এই দ্বৈততা স্পষ্ট।

এই দ্বৈততা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—নারী কি কেবল জ্ঞানের প্রতীক হয়ে থাকবে? নাকি প্রতীকের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনে সমতা প্রতিষ্ঠা করবে।

জাগতিক না পারমার্থিক?

এই বিশ্বজগতে যত রূপকাঠামো রহিয়াছে তাহার মধ্যে মানবদেহই সব চাইতে উন্নত বলিয়া পরিগণ্য হইবে ইহাতে সন্দেহ কী। আধুনিক যুগে অনেকেই মানবদেহের কারিগরি ত্রুটি লইয়া যতই আপত্তি করুন না কেন ইহার চাইতে উত্তম কোন পরিকাঠামো বা device বিশ্বগজতে আর কিছু রহিয়াছে বলিয়া আমরা জ্ঞাত নহি। প্রকৃতিতে এমন সুন্দরতম অবয়ব বা device কীভাবে বিকশিত হইল?—কিংবা কে এমন ডিভাইস এর ডিজাইনার?—তাহা লইয়া বহু বিতর্ক হইতেই পারিবে, কিন্তু এমন মহা সুন্দর অবয়ব বা device আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে বলিয়া মনে বিশ্বাস হয় না।

এইরূপ অবস্থায় আসিয়া ভাবুক মনে প্রশ্ন আসিয়া হাজির হইতে পারে যে, এই উত্তম অবয়ব বা ডিভাইসটি কি শুধুই জাগতিক নিয়মে জগতের শোভা বর্ধনে গঠিত হইয়াছে নাকি ইহাতে কোন পারমার্থিক তাৎপর্য  নিহিত রহিয়াছে? মানুষের বাস্তব জীবন যাহা লইয়া চলিলে জীবন সমৃদ্ধ হইয়া থাকে বলিয়া যেইরূপ ধারনা আধুনিককালে গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাই কি মানবজীবনের সার কথা? নাকি ইহাতে যোগ করিবার আরও বহুবিধ গুণাবলি সুপ্ত রহিয়াছে? বিশ্ব জগতের কোন পরম অর্থ গুপ্ত হইয়া মানবের মাঝে লুকাইয়া নাহি তো?

যদি জাগতিক জীবনে সাধারণ প্রয়োজন সমূহ কিংবা বিবিধ কৃত্রিম প্রয়োজনাবলি পরিপূরণ করিয়া মানবজীবন ধন্য হইয়া থাকে তাহা হইলে মৃতোত্তর জীবন বলিয়া কিছু না থাকিলেও চলিবে। পৃথিবীতে বহু মানুষ এইরূপ ভাবিয়া-করিয়া নিজেকে বিজ্ঞ বলিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিয়া থাকেন। এমতাবস্থায় অন্য কাহার মনে জিজ্ঞাসার উদয় হইতে পারিবে—তাহা হইলে এই বিশাল অস্তিত্বের এমন আয়োজন কেন করা হইয়াছে? এত সুন্দর অবয়বের মানুষ সৃষ্টির কী প্রয়োজন ছিল? ইহার কিছুই পরম ভাববহ নহে?

উপরোল্লিখিত প্রশ্ন সমূহ সকলের অন্তরে একইরূপ প্রভাব তৈরি করিবে না। কিন্তু জগতে বহু মানুষ রহিয়াছেন যাঁহারা ঐ সকল প্রশ্নে গুরুত্ব দিয়া ভাবিতে ইচ্ছুক না হইয়া পারিবেন না। ফলত ভাবুক অন্তরে নানান রকম অনুভূতির বিকাশ ঘটিয়া থাকে। তাঁহারা মানবজাতির সুদীর্ঘ কালে জমাকৃত সামষ্টিক অভিজ্ঞতা হইতে যে বোধানুভূতির পরিচয় পাইয়া থাকেন তাহা একজীবনের ভোগবাদী মানুষের ধারনা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। সাধারণ জাগতিকতার বিপরীতে একটি বিশিষ্ট পারমার্থিকতা দ্বারা বোধিত হইয়া তাঁহারা মানব জীবনকে অনন্য বলিয়া গ্রহণ করিয়া থাকেন। এমন সুযোগ তাহারা হেলায় নষ্ট করিতে চাহেন না। মানবজীবনের পরম অর্থ খুঁজিতে তাঁহারা কোন দ্বিধায় কিংবা ক্লান্তিতে ক্ষান্ত হইয়া পড়েন না। মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের সত্যিকার ধারক বাহক প্রচারক ইঁহারাই।

মানবকুল পার্থিব জগতে বাস করিয়াও যে পারমার্থিক তাৎপর্য পরিগ্রহ করিয়া থাকেন তাহা বলাই বাহুল্য বটে। ইহা লইয়া নানান রকম তর্ক করিয়া বৃথা বুদ্ধি নাশ করিয়া কাহার কোন জাগতিক কিংবা পারমার্থিক উপকার হইয়াছে বলিয়া বিশ্বাস হয় না। মানুষের মাঝে স্বল্প সংখ্যক গুণবান ব্যক্তি ইহার প্রত্যক্ষকরণ সম্ভব করিতে পারেন। অন্যরা অনুমানে উপলব্ধি করিতে সচেষ্ট হইয়া থাকেন। সংখ্যাধিক মানুষের প্রত্যক্ষানুভূতিতে নাই বলিয়া কুশলী তর্কবিদগণ ইহাকে বিভ্রান্তিকর ভাবিয়া ইহার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। এই জাতীয় আচরণ যতই চমৎকার বলিয়া প্রতিভাত হউক না কেন তাহা নিতান্তই চার্বাকবৎ, শুধুই পার্থিব পান্ডিত্যপূর্ণ অবিদ্যা—পারিমার্থিক নহে। অথচ আমরা বলিতেছি যে, মানুষ একই সঙ্গে পার্থিব এবং পারমার্থিক—এই যুগল রূপের এক অভিন্ন সত্তা।

এই ধরাধামে কত মুণি ঋষি অলি দরবেশ নবি রসুল আসিয়াছেন তাহার ইয়ত্তা নাই। তাঁহারা সকলেই মানুষের মাঝে উক্তরূপ বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। এই বিজ্ঞান চিরন্তন, নিত্য সনাতন। যাঁহারা গুণীজনের সঙ্গ করিয়া উপযুক্ত পরিচর্যা করিবেন তাঁহারা ইহা প্রত্যক্ষ করিবেন—ইহাতে কোনরূপ সংশয় নাই।

উক্তরূপ বোধ হইতে উদ্ভূত চিন্তা দ্বারা চালিত হইয়া আন্তর্জালিক (internet) সুবিধাকে ব্যবহার করিয়া যে নবাগত পারমার্থিক প্রকাশধারা সূচিত হইতে চলিয়াছে তাহাকে স্বাগতম। গভীর হৃদয়াবেগ মিশ্রিত অনুভব থেকে এই কর্মযজ্ঞের সহিত জড়িত সকলকে অভিনন্দন।

পুষ্পিতা

৪ মার্চ ২০২৬

কহিতে পারিব কি?

যত প্রশ্ন মনে উদিত হয় সব কি নির্ভয়ে বলিতে পারি আমরা? পারি না।

অনেক জিজ্ঞাসা মনে আসিলেও উচ্চারণ করি না! কিন্তু প্রশ্ন তো জাগে। জিজ্ঞাসা করিবো কাহার কাছে? করিলে উত্তর না পাইলেও ক্ষতি নাই কিন্তু বিপদে পড়িবার আশঙ্কা বিলক্ষণ!

যেমন, ছোটবেলায় অবুঝ মনের জিজ্ঞাসা ছিল,

  • আল্লাহ তো নিরাকার, তাহা হইলে মেরাজে গিয়া নবীজি আল্লাহর দিদার লাভ করিলেন কীভাবে?
  • কোরআনের প্রথম নাযিলকৃত আয়াত ‘ইকরা বে ইসমি রাব্বিকা..’ তাহা হইলে আমরা যে কোরআন পাঠ করি, তাহা কেন সূরা ফাতিহা দিয়া শুরু?
  • শবে বরাতের রাতে গাছপালা নাকি সেজদায় থাকে। শিশুকালে গভীর কৌতূহল লইয়া জানালা খুলিয়া দেখিয়াছি, বৃক্ষকুলের কেউ সেজদায় (নিচু হইয়া) নাই, সকলেই বহাল তবিয়তে দণ্ডায়মান!

শিশুমনের এইরূপ কতশত জিজ্ঞাসা! গ্রহণযোগ্য উত্তর না পাইয়া কেবল মনের মাঝে ঘুরিয়া বেড়াইত।

আমার বাবা-মা হাজি, নামাজি এবং রোজাদার ছিলেন। রক্ষণশীল ধর্মভীরু পরিবারে আমার জন্ম। ধর্মীয় আবহে বড় হইয়াছি। বড় বড় সূরা মুখস্ত করিয়াছি। প্রতি রমজানে কোরআন খতম। ইয়াসিন আর রহমান এরকম বড় সুরা মুখস্ত করিলে আম্মা নতুন জামা দিতেন। তিনি(আম্মা)খুব দ্রুত অর্থ বুঝিয়া, ব্যাকরণ জানিয়া আরবি পড়িতেন। এইসব কথা বলিয়া বুঝাইতে চাহিতেছি, আমি নাস্তিক কিংবা ধর্মবিদ্বেষী মানুষ না। পাঠক যেন শুরুতেই আমাকে ভুল বুঝিয়া না বসেন!

যাহা হউক, এইসব জিজ্ঞাসা মনে পুষিয়া রাখিয়া বড় হইয়াছি, বুড়ো হইয়াছি। জীবনে প্রথম বড়সড় ধাক্কা খাইলাম অধ্যাপক মোফাখখারুল ইসলামের ‘ইতিহাসগত বিভ্রান্তির রহস্য’ বইটি পাঠ করিয়া!

তাহার পর সুফিগুরু সদর উদ্দিন আহমেদ চিশতি(র.)র মাওলার অভিষেক, রমজান দর্শন, কোরআন দর্শন…। শ্রদ্ধেয় গুরুভাই লেখক, গবেষক হিলালুজ্‌জামান হেলাল রচিত ‘কোরআনে মুমিনতত্ত্ব’, ‘কোরআনে মানুষতত্ত্ব’ ইত্যাদি নামের মহামূল্য গ্রন্থসমূহ অনেক জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়াছে! আল কোরআনের আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা পড়িয়া মনে হইয়াছে এই তো আমার ছোট এবং বড়বেলার ধর্মসংক্রান্ত সকল জিজ্ঞাসার সরল-উত্তর!

সত্যসন্ধানী মন এক সময় না একসময় ঠিক উত্তরের কাছে পৌঁছায় কিংবা উত্তরই তাহার কাছে আসিয়া হাজির হয় । সহজ,সুন্দর,শুদ্ধ বোধ হইতে উৎসারিত অনুভব নিয়া সত্যানুসন্ধানী কিছু মানুষ পারমার্থিক প্রকাশনার আলো জ্বালাইবার প্রয়াস লইয়াছে।

মহতি এই উদ্যোগের আলোয় আলোকিত হউক অন্ধকার।

আমার মতো অনকেরেই মনে হয়তো আছে অনেক জিজ্ঞাসা। খোলামন লইয়া জিজ্ঞাসা করিলে পারমার্থিকের এই ধারাবাহিক প্রকাশনা অনুসন্ধিৎসু মনের পিপাসা অনেকখানি মিটাইতে পারিবে বলিয়া বিশ্বাস করি।

পহেলা বৈশাখ, ঢাকা।

আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই (পর্ব – ১)

সূর্য মন্দির : বাইরে ভোগ, ভেতরে শূন্যতা

আমার মনে হয়, যারা ভ্রমণ করেন না, তাদের আত্মা শুকিয়ে যায়; শুঁটকি আত্মায় আর যাই হোক, আনন্দ থাকে না। সাধকের কাছে বহির্বিশ্বের চেয়ে অন্তর্বিশ্বে ভ্রমণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমি সাধারণ মানুষ, অন্তর্লোকে পরিভ্রমণের সামর্থ্য কম। তাই, বাইরে বাইরে  ঘুরে বেড়াই, আনন্দ কুড়াই। আনন্দ পাওয়া মানে নিজেকে পাওয়া, নিজের কাছে ফেরা। আমার বেড়ানোর ভাণ্ডার যে খুব বেশি সমৃদ্ধ, এমন নয়, মোটামুটি। কিছু কিছু জায়গাকে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে জানি, চিনি। কিছু জায়গা সম্পর্কে আগে জেনে যাই(লোকমুখে শুনি কিংবা বই পড়ে)।

পুরী(ওড়িশা) যাচ্ছি শুনে পরম শ্রদ্ধেয় মহিদুর রহমানভাই ‘সূর্য মন্দির’ সম্পর্কে বলেছিলেন, ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোনার্ক সূর্য মন্দির শুধু একটি স্থাপত্য নয়—এটি গভীর দার্শনিক ভাবনা ও প্রতীকের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এর বাইরের দেয়ালে প্রেম, কামনা-বাসনার চিত্র অর্থাৎ ভোগবাসনার জগতের ছবি

ভেতরে অন্ধকার, শূন্য।

স্থাপত্য ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমন্বয়ে মন্দির এমনভাবে তৈরি যে, সূর্যের আলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে(মন্দিরের ভেতরে অন্ধকার গর্ভগৃহে) পড়ে। এর দার্শনিক ব্যাখ্যাটি এমন যে, মানুষ যখন বাহ্যিক কামনা-বাসনা (বাইরের ভোগ বাসনার স্তর) অতিক্রম করে ভেতরের শূন্যতায় পৌঁছায়—আর তখনই তার ভেতরে আলো(জ্ঞানের উদয়) আসে।

এই ব্যাখ্যাটি এতো ভালোলাগলো যে, কোনার্কের সূর্য মন্দির দর্শনের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে বিখ্যাত পুরী হোটেল, সেখানেই ছিলাম আমরা। সকালে সূর্য মন্দির দেখার আগ্রহ প্রকাশ করতেই ড্রাইভার নিরুৎসাহিত করে বললেন, ‘‘ওখানে গিয়ে কী করবেন? ঐ মন্দিরে তো ভগবান নেই! জগন্নাথ জীবন্ত, এই মন্দিরে ভগবান আছেন’’।

বললাম, ‘‘জগন্নাথে যাবো, কোনার্কেও যাবো’’।

ভিড়-বিধ্বস্ত জগন্নাথ দর্শন শেষে গেলাম ‘ভগবানশূন্য’ সূর্য মন্দিরে। নিরিবিলি পরিবেশ, মোটামুটি ফাঁকা।

শুনলাম, মন্দিরের চূড়ায় এক সময় বিশাল এক চুম্বক বসানো ছিলো। নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করলে এই চুম্বক নাকি সমুদ্রগামী বিশাল জাহাজকেও টেনে নিয়ে আসতো! এই গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা আছে কিনা জানি না, তবুও শুনলাম, গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে!

রাজা নরসিংহদেব মন্দিরটি খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দীতে, আনুমানিক ১২৫০ সালের দিকে নির্মাণ করেন। ১২০০ কারিগর ১০-১২ বছরে এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত। এর নির্মাণ শৈলীর দার্শনিক ভিত্তি চমৎকৃত করে!

  • সূর্য ও সময়ের প্রতীক মন্দিরটি সূর্যদেবের রথের আকারে নির্মিত—যেন সূর্য আকাশে চলমান।
  • ২৪টি চাকা>  দিনের ২৪ ঘণ্টা
  • ৭টি ঘোড়া = সপ্তাহের ৭ দিন….

ঘুরে ঘুরে দেখছি, মুগ্ধ হচ্ছি, ছবি তুলছি আর মনে মনে  মেলাচ্ছি —

ভোগ থেকে যোগ….

বাইরে → কাম, ভোগ, জীবন

ভেতরে → শূন্যতা, ধ্যান

শেষে → আলো (জ্ঞান)

দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, শুধু নির্মাণশৈলী নয়, বাকি দর্শনার্থীরা কি একই বিষয় দেখছেন? বোধ করছেন? এই দেখা এবং বোঝার জন্য বারবার মন শ্রদ্ধেয় মহিদুর রহমান ভাইয়ে প্রতি কৃতজ্ঞতায় আর্দ্র হয়ে যাচ্ছিলো?

বারবার ভাবছিলাম,  বাইরের কামনা-বাসনার স্তর পার হয়ে শূন্যতায় পৌঁছতে পারবো কি? সূর্যের পবিত্র আলো এসে ভেতরের আঁধার দূর করবে কি?

জীবন-মৃত্যুর অন্তর্লোক: তিব্বতি দর্শন (পর্ব – ১)

The Tibetan Book of Living and Dying এর এবং বই পরিচিতি:

Sogyal Rinpoche ছিলেন একজন তিব্বতি বৌদ্ধ আধ্যাত্মিক শিক্ষক, যিনি পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের কাছে তিব্বতি বৌদ্ধ দর্শনকে সহজভাবে তুলে ধরার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি তিব্বতের প্রাচীন জ্ঞানকে আধুনিক জীবনের সাথে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন। তার শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো—মৃত্যুকে বুঝে জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা।

বইটির সারকথা
“The Tibetan Book of Living and Dying”  একটি গভীর আধ্যাত্মিক গ্রন্থ, যেখানে জীবন ও মৃত্যুকে একই ধারার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।  এই বইটি তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন জ্ঞান, ধ্যানপদ্ধতি এবং মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থার (বর্দো) ধারণাকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে।

এখানে লেখক দেখাতে চেয়েছেন—

আমরা কীভাবে বাঁচি, সেটাই নির্ধারণ করে আমরা কীভাবে মরবো।
মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে, বরং তাকে বুঝে জীবনকে আরও অর্থবহ করা যায়।
বইটির একটি বড় শক্তি হলো—এটি শুধু একক কোন ধর্মীয় আলোচনা নয়, বরং বাস্তব জীবনের দুঃখ, ভয়, ভালোবাসা এবং মানবিকতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত যেটা সর্বজনীন। আধুনিক মানুষের জন্য এটি এক ধরনের পথনির্দেশ, যা শেখায়—
সচেতনভাবে বাঁচা।

মৃত্যুকে গ্রহণ করা।

অন্তরের শান্তি খুঁজে পাওয়া।

এই বইটি কেবল মৃত্যু নিয়ে নয়, বরং কীভাবে সত্যিকারের বাঁচা যায়—সেই শিক্ষা দেয়।

এক অর্থে, এটি জীবনকে ধীরে, সচেতনভাবে এবং ভালোবাসায় স্পর্শ করার এক আমন্ত্রণ।  

.

.

অধ্যায় এক: মৃত্যুর আয়নায়

মৃত্যু সম্পর্কে আমার নিজের প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল যখন আমার বয়স প্রায় সাত বছর। তখন আমরা পূর্ব তিব্বতের পাহাড়ি অঞ্চল ছেড়ে মধ্য তিব্বতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার গুরুর ব্যক্তিগত সহকারীদের একজন, সামতেন, ছিলেন এক অসাধারণ সন্ন্যাসী, যিনি আমার শৈশবে আমার প্রতি খুবই স্নেহশীল ছিলেন। তার উজ্জ্বল, গোলগাল মুখ ছিল, আর সবসময় যেন মুখে হাসি ফুটে উঠতে প্রস্তুত থাকত। তার স্বভাব এতই ভালো ছিল যে মঠের সবার কাছেই তিনি প্রিয় ছিলেন।

প্রতিদিন আমার গুরু শিক্ষা ও দীক্ষা দিতেন এবং বিভিন্ন সাধনা ও আচার পরিচালনা করতেন। দিনের শেষ দিকে আমি আমার বন্ধুদের জড়ো করতাম এবং সকালে যা ঘটেছিল তা অভিনয় করে ছোট একটি নাটক করতাম। সেই সময় আমার গুরু সকালে যে পোশাকগুলো পরতেন, সেগুলো আমাকে প্রায়ই ধার দিত সামতেন। কিন্তু সেই দিন তিনি আমাকে তা দিতে অস্বীকার করলেন।

তারপর হঠাৎই সামতেন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, এবং স্পষ্ট হয়ে গেল যে তিনি আর বাঁচবেন না। আমাদের যাত্রা স্থগিত করতে হলো। এরপরের দুই সপ্তাহ আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। মৃত্যুর তীব্র গন্ধ যেন চারদিকে মেঘের মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল, এবং যখনই আমি সেই সময়টার কথা ভাবি, সেই গন্ধ আবার যেন মনে ফিরে আসে। ঠজুড়ে মৃত্যুর ব্যাপারে এক গভীর সচেতনতা ছড়িয়ে পড়েছিল।

তবে এটি ভীতিকর বা বিষণ্ণ ছিল না। বরং আমার গুরুর উপস্থিতিতে সামতেনের মৃত্যু এক বিশেষ তাৎপর্য ধারণ করেছিল। এটি আমাদের সবার জন্য একটি শিক্ষা হয়ে উঠেছিল।

সামতেন আমার গুরুর বাসস্থানের পাশে একটি ছোট মন্দিরে জানালার ধারে একটি বিছানায় শুয়ে ছিলেন। আমি জানতাম তিনি মারা যাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে আমি গিয়ে তার পাশে বসতাম। তিনি কথা বলতে পারতেন না, আর তার মুখের পরিবর্তন দেখে আমি হতবাক হয়ে যেতাম—এখন তার মুখ খুবই ক্লান্ত ও শুকনো দেখাত। আমি বুঝতে পারলাম তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন এবং আমরা তাকে আর কখনো দেখব না। এতে আমি গভীরভাবে দুঃখ ও একাকী বোধ করছিলাম।

সামতেনের মৃত্যু সহজ ছিল না। তার কষ্টকর শ্বাসের শব্দ সব জায়গায় শোনা যেত, এবং আমরা তার দেহ পচতে থাকার গন্ধও অনুভব করতে পারতাম। সেই শ্বাসের শব্দ ছাড়া মঠজুড়ে যেন গভীর নীরবতা নেমে এসেছিল। সবকিছু যেন সামতেনকে ঘিরেই কেন্দ্রীভূত ছিল।

যদিও সামতেনের দীর্ঘ মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে অনেক কষ্ট ছিল, তবুও আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছিলাম যে গভীরভাবে তার মধ্যে এক ধরনের শান্তি এবং অন্তর্নিহিত আত্মবিশ্বাস ছিল। প্রথমে আমি এর ব্যাখ্যা করতে পারিনি। পরে বুঝলাম এটি কোথা থেকে এসেছে—তার বিশ্বাস, তার সাধনা-প্রশিক্ষণ এবং আমাদের গুরুর উপস্থিতি থেকে। যদিও আমি দুঃখ অনুভব করছিলাম, তবুও জানতাম যে আমাদের গুরু সেখানে থাকলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, কারণ তিনি সামতেনকে মুক্তির পথে সাহায্য করতে পারবেন। পরে আমি জানতে পারি, অনেক সাধকের স্বপ্নই হলো নিজের গুরুর আগে মারা যাওয়া এবং মৃত্যুর সময় গুরুর দ্বারা পথনির্দেশ পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করা।

যখন জামইয়াং খিয়েন্তসে শান্তভাবে সামতেনকে তার মৃত্যুর পথে পরিচালিত করছিলেন, তখন তিনি তাকে মৃত্যুর প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তর একে একে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।  আমার গুরুর জ্ঞানের সূক্ষ্মতা এবং তার আত্মবিশ্বাস ও শান্তি আমাকে বিস্মিত করেছিল। আমার গুরু যখন উপস্থিত থাকতেন, তার সেই শান্ত আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে উদ্বিগ্ন মানুষকেও আশ্বস্ত করত। এখন জামইয়াং খিয়েন্তসে আমাদের সামনে মৃত্যুভয়ের ঊর্ধ্বে থাকার এক উদাহরণ তুলে ধরছিলেন।

তবে তিনি কখনো মৃত্যুকে হালকাভাবে নেননি। তিনি প্রায়ই বলতেন যে তিনিও মৃত্যুকে ভয় পান, এবং আমাদের সতর্ক করতেন যেন আমরা মৃত্যুকে সরলভাবে বা উদাসীনভাবে না দেখি। তবুও কী এমন ছিল যা আমার গুরুকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে দিত একই সঙ্গে এতটা গম্ভীর অথচ হালকা মনে, এতটা বাস্তবসম্মত অথচ রহস্যময়ভাবে নির্ভার ভঙ্গিতে? এই প্রশ্ন আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং চিন্তায় ডুবিয়ে রেখেছিল।

সামতেনের মৃত্যু আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সাত বছর বয়সে আমি প্রথমবারের মতো সেই বিশাল ঐতিহ্যের শক্তির ঝলক দেখেছিলাম যার অংশ হয়ে আমি বড় হচ্ছিলাম, এবং আমি আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্য বুঝতে শুরু করলাম। সাধনা সামতেনকে মৃত্যুকে গ্রহণ করার ক্ষমতা দিয়েছিল, এবং একই সঙ্গে এই পরিষ্কার উপলব্ধিও দিয়েছিল যে কষ্ট ও যন্ত্রণা কখনো কখনো গভীর, স্বাভাবিক শুদ্ধির একটি প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। সাধনা আমার গুরুকেও মৃত্যুর প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান দিয়েছিল এবং মানুষকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত করার একটি সুস্পষ্ট পদ্ধতি দিয়েছিল।

চলবে… …

পর্ব ২

গুর্জিয়েফের সাথে কথোকপথন: মানবীয় জীবনের যান্ত্রিকতা ও পরিবর্তন

Views from the Real World এই বইটি মূলত George Ivanovich Gurdjieff-এর বক্তৃতা, আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের সংকলন। এখানে মানুষের চেতনা, আত্মজ্ঞান, যান্ত্রিক জীবনধারা এবং আত্ম-উন্নয়নের পথ নিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বইটির মূল ধারণা হলো—মানুষ সচেতন নয়, বরং “যান্ত্রিকভাবে” জীবন যাপন করে। নিজের ভিতরের বহুসত্তা (multiple ‘I’) বুঝে, পর্যবেক্ষণ করে, ধীরে ধীরে উচ্চতর চেতনার দিকে অগ্রসর হওয়াই এই শিক্ষার উদ্দেশ্য। এটি সরল কোনো ধর্মীয় বই নয়; বরং আত্ম-অনুসন্ধান ও বাস্তব আধ্যাত্মিক অনুশীলনের একটি গাইড।

George Ivanovich Gurdjieff

গুর্জিয়েফ ছিলেন একজন আর্মেনীয়-গ্রিক আধ্যাত্মিক গুরু, দার্শনিক ও শিক্ষক (১৮৬৬–১৯৪৯)। তিনি “Fourth Way” বা চতুর্থ পথের ধারণা দেন—যেখানে দৈনন্দিন জীবনযাপন করেই আত্ম-উন্নয়ন সম্ভব, আলাদা সন্ন্যাস বা নির্জনতা ছাড়াই। তার শিক্ষা মানুষের ভিতরের ঘুমন্ত অবস্থাকে জাগ্রত করার উপর জোর দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—সচেতনতা (consciousness) বাড়ানো এবং নিজের উপর কাজ (self-work) করাই মানুষের প্রকৃত বিকাশের পথ।


এই বইটি শুধু পড়ার জন্য নয়—নিজেকে জানার, নিজের ভেতরের সত্য খুঁজে পাওয়ার একটি “অভ্যন্তরীণ যাত্রা”-র সূচনা। Glimpses of Truth হলো ১৯১৪ সালে মস্কোর একজন শিষ্য কর্তৃক লেখা গুর্জিয়েফের সঙ্গে একটি কথোপকথনের বিবরণ। P. D. Ouspensky তাঁর In Search of the Miraculous বইয়ে এই লেখাটির উল্লেখ করেছেন। এটি সেই সময় গুর্জিয়েফ যে ধারাবাহিক প্রবন্ধগুলোর পরিকল্পনা করেছিলেন, তার প্রথম—এবং সম্ভবত একমাত্র—উদাহরণ। তবে এর লেখক কে, তা জানা যায় না।

এই আলোচনাগুলোকে তুলনা করে পুনরায় বিন্যস্ত করা হয়েছে Madame Thomas de Hartmann-এর সহায়তায়। তিনি ১৯১৭ সালে এসেনতুকিতে (Essentuki) এই সমস্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং তাই এগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। দেখা যাবে, এই আলোচনার কয়েকটি অংশ—যেমন “For an exact study,” “To all my questions” এবং “The two rivers” দিয়ে শুরু হওয়া অংশগুলো—আসলে সেই উপাদানেরই প্রকাশ, যা গুর্জিয়েফ পরে সামান্য পরিবর্তিত রূপে ব্যবহার করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Beelzebub’s Tales to His Grandson-এর শেষ অধ্যায় লেখার সময়।

কিছু নীতিবাক্য (Aphorisms) এর আগে প্রিয়োরে (Prieuré)-তে জীবনযাপনের বিবরণে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলো একটি বিশেষ বর্ণমালায় লেখা ছিল, যা কেবল শিষ্যদেরই জানা ছিল, এবং যেখানে তার আলোচনা হতো সেই স্টাডি হাউসের দেয়ালের উপরে সেগুলো খোদাই করা ছিল।

এই কথোপকথনের পর্বগুলো মূলত Views from the Real World এই বইটির মাঝে থাকা প্রশ্নোত্তর অংশ। এই অংশগুলো পাঠককে বিষয়বস্তু সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা না দিলেও তার মগ্নচৈতন্যে শিষ বাজাবে বলে আমার মনে হয়েছে। এবং এখান থেকে পাঠকের পরবর্তী পাঠ অন্বেষণ জারি থাকবে সে আশা থেকেই এই অংশগুলোর ধারাবাহিক অনুবাদ করার প্রয়াস। দয়াল চাইলে পরবর্তীতে সম্পূর্ণ বইটা অনুবাদ হবে বা হবে না। তবে পাঠের পর পাঠকের/সাধকের হৃদয়ে সামান্যতম অনুরণন হলেই আমার কাজ সার্থক হয়েছে বলে মনে করবো। জয় হোক!  

লন্ডন, ১৯২২

মানুষ একক কোনো সত্তা নয়; বরং অসংখ্য ছোট ছোট সত্তার সমষ্টি। আমরা সাধারণত নিজেদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে “আমি” শব্দটি ব্যবহার করি—বলতে অভ্যস্ত, “আমি এটা করেছি”, “আমি এটা ভাবি”, “আমি এটা করতে চাই”—কিন্তু বাস্তবে এই একক ‘আমি’ বলে কিছু নেই। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে শত শত, হাজার হাজার ছোট ছোট ‘আমি’ রয়েছে। আমরা নিজের ভেতরেই বিভক্ত, অথচ এই বহুসত্তার সত্যটি আমরা বুঝতে পারি না, যতক্ষণ না আমরা সচেতনভাবে নিজের ওপর পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন করি।

এক মুহূর্তে এক ‘আমি’ কাজ করে, পরের মুহূর্তে অন্য আরেক ‘আমি’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই ভিন্ন ভিন্ন ‘আমি’-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকার কারণেই আমাদের জীবন ও কাজ কখনো সুষম হয় না। আমরা আমাদের শক্তি ও সামর্থ্যের খুব সামান্য অংশ ব্যবহার করে বাঁচি, কারণ আমরা বুঝতে পারি না যে আমরা অনেকটাই যন্ত্রের মতো কাজ করি। নিজের এই ‘যন্ত্রসত্তা’র প্রকৃতি ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আমাদের কোনো সচেতন জ্ঞান নেই।

বাস্তবে আমরা এক ধরনের যন্ত্রের মতোই পরিচালিত হই, যেখানে বাইরের পরিস্থিতিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের কাজগুলো বাইরের চাপের মুখে সবচেয়ে সহজ পথ ধরে এগিয়ে যায়। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে—আমরা নিজের আবেগকে সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা হয়তো কোনো আবেগকে দমন করার চেষ্টা করি, বা এক আবেগকে অন্য দিয়ে ঢাকতে চাই, কিন্তু আসলে আবেগই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে, আমরা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।

একইভাবে, আমরা কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারি—আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ‘আমি’ সেই সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যখন কাজটি করার সময় আসে, তখন দেখা যায় আমরা ঠিক উল্টোটা করে ফেলছি। যদি বাইরের পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে, তাহলে হয়তো আমরা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতে পারি; কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমরা পরিস্থিতির দিকেই ঝুঁকে পড়ি। অর্থাৎ, আমাদের কাজের ওপর আমাদের নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই—আমরা যন্ত্রের মতোই বাইরের প্রভাবের অধীন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের পক্ষে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা অসম্ভব। বরং সমস্যা হলো, আমরা এখনো সেই অবস্থায় পৌঁছাইনি, কারণ আমরা নিজের ভেতরেই বিভক্ত। আমাদের ভেতরে একদিকে শক্তিশালী অংশ, অন্যদিকে দুর্বল অংশ কাজ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের শক্তি যত বাড়ে, দুর্বলতাও ততই বাড়তে পারে—এবং আমরা যদি তা থামাতে না শিখি, তাহলে সেই দুর্বলতাই একসময় নেতিবাচক শক্তিতে পরিণত হয়।

যখন মানুষ নিজের কাজ ও সত্তাকে সত্যিকারভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, তখন চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। অস্তিত্বের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছালে মানুষ নিজের প্রতিটি অংশকে সচেতনভাবে পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাইনি—এমনকি আমরা যা করার সিদ্ধান্ত নিই, সেটুকুও ধারাবাহিকভাবে করতে পারি না।

একজন থিওসফিস্ট প্রশ্ন করলেন যে আমরা কি পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারি?

উত্তর: পরিস্থিতি কখনোই বদলায় না—সবসময় একই থাকে। কোনো প্রকৃত পরিবর্তন নেই, শুধু পরিস্থিতির রূপান্তর বা পরিবর্তিত অবস্থা (modification) ঘটে।

প্রশ্ন: একজন মানুষ যদি ভালো হয়ে ওঠে, সেটাকে কি পরিবর্তন বলা যায় না?

উত্তর: একজন মানুষ মানবজাতির জন্য কিছুই না। একজন ভালো হলে আরেকজন খারাপ হয়—শেষ পর্যন্ত সব একই থাকে।

প্রশ্ন: কিন্তু একজন মিথ্যাবাদী যদি সত্যবাদী হয়ে ওঠে, সেটাকে কি উন্নতি বলা যায় না?

উত্তর: না, সেটাও একই বিষয়। আগে সে যান্ত্রিকভাবে মিথ্যা বলত, কারণ সে সত্য বলতে পারত না; পরে সে যান্ত্রিকভাবে সত্য বলবে, কারণ তখন সেটাই তার জন্য সহজ হয়ে যাবে। সত্য ও মিথ্যার মূল্য তখনই, যখন আমরা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমাদের বর্তমান অবস্থায় আমরা নৈতিক হতে পারি না, কারণ আমরা যান্ত্রিক। নৈতিকতা আপেক্ষিক—এটি ব্যক্তিনির্ভর, বিরোধপূর্ণ এবং যান্ত্রিক।

আমাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য—শারীরিক মানুষ, আবেগীয় মানুষ, বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ—প্রত্যেকেরই নিজস্ব আলাদা নৈতিকতা আছে, যা তার প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই। প্রত্যেক মানুষের এই ‘যন্ত্রসত্তা’ তিনটি মৌলিক অংশ বা কেন্দ্র (center) দিয়ে গঠিত। যেকোনো মুহূর্তে নিজেকে দেখুন এবং প্রশ্ন করুন: “এই মুহূর্তে কোন ‘আমি’ কাজ করছে? এটি কি আমার বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রের, আবেগীয় কেন্দ্রের, না কি গতিশীল (moving) কেন্দ্রের?” আপনি হয়তো দেখবেন, এটি আপনার কল্পনার থেকে ভিন্ন—কিন্তু এই তিনটির মধ্যেই একটি।

প্রশ্ন: এমন কোনো চূড়ান্ত নৈতিক বিধান কি নেই, যা সব মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?

উত্তর: আছে। যখন আমরা আমাদের সব কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণকারী সব শক্তিকে ব্যবহার করতে পারব, তখন আমরা সত্যিকারের নৈতিক হতে পারব। কিন্তু ততদিন, যতদিন আমরা আমাদের সামর্থ্যের কেবল একটি অংশ ব্যবহার করি, আমরা নৈতিক হতে পারি না। আমরা যা কিছু করি, তা যান্ত্রিকভাবে করি—আর যন্ত্র কখনো নৈতিক হতে পারে না।

প্রশ্ন: তাহলে তো অবস্থাটা খুবই হতাশাজনক মনে হচ্ছে?

উত্তর: একদম ঠিক—এটা হতাশাজনকই।

প্রশ্ন: তাহলে আমরা কীভাবে নিজেদের পরিবর্তন করব এবং আমাদের সব শক্তি ব্যবহার করতে শিখব?

উত্তর: সেটা আরেকটি বিষয়। আমাদের দুর্বলতার প্রধান কারণ হলো—আমরা আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে (will) একসাথে তিনটি কেন্দ্রেই প্রয়োগ করতে পারি না।

প্রশ্ন: আমরা কি কোনো একটিতেও ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে পারি?

উত্তর: অবশ্যই, কখনো কখনো পারি। কখনো কখনো আমরা সাময়িকভাবে একটি কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারি, এবং তখন আশ্চর্য ফল দেখা যায়। (তিনি একটি গল্প বলেন—একজন বন্দি তার স্ত্রীর কাছে বার্তা পৌঁছাতে একটি কাগজের বল একটি উঁচু ও কঠিন জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দেয়।)

এটাই তার মুক্ত হওয়ার একমাত্র উপায়। যদি সে প্রথমবার ব্যর্থ হয়, তবে আর কোনো সুযোগ পাবে না। সেই মুহূর্তে সে তার শারীরিক কেন্দ্রের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে সক্ষম হয়—এবং এমন একটি কাজ সম্পন্ন করে, যা অন্যথায় তার পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না।

প্রশ্ন: আপনি কি এমন কাউকে চেনেন, যিনি এই উচ্চতর অস্তিত্বের স্তরে পৌঁছেছেন?

উত্তর: আমি যদি হ্যাঁ বা না বলি, তাতে কোনো অর্থ নেই। যদি বলি হ্যাঁ—আপনি তা যাচাই করতে পারবেন না; আর যদি বলি না—তাতেও আপনার কোনো লাভ হবে না। আপনাকে আমার কথা বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে বলি—যা আপনি নিজে যাচাই করতে পারবেন না, তা বিশ্বাস করবেন না।

প্রশ্ন: যদি আমরা পুরোপুরি যান্ত্রিক হই, তাহলে আমরা কীভাবে নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাব? একটি যন্ত্র কি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?

উত্তর: একদম ঠিক—পারে না। আমরা নিজেরা নিজেদের বদলাতে পারি না। আমরা কেবল সামান্য পরিবর্তন (modify) করতে পারি। কিন্তু বাইরের সাহায্যে আমরা পরিবর্তিত হতে পারি। গুপ্তবিদ্যার (esotericism) মতে, মানবজাতি দুইটি বৃত্তে বিভক্ত—একটি বৃহৎ বাইরের বৃত্ত, যেখানে সব মানুষ আছে; আর একটি ছোট, কেন্দ্রীয় বৃত্ত, যেখানে আছে জ্ঞানপ্রাপ্ত ও বোঝাপড়াসম্পন্ন মানুষরা। সত্যিকারের শিক্ষা, যা আমাদের পরিবর্তন করতে পারে, কেবল এই কেন্দ্র থেকেই আসে। এই শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো—আমাদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে আমরা সেই শিক্ষাকে গ্রহণ করতে পারি। আমরা নিজেরা নিজেদের পরিবর্তন করতে পারি না—এটি কেবল বাইরের সাহায্য থেকেই সম্ভব।

প্রত্যেক ধর্মই এক ধরনের সাধারণ জ্ঞানের কেন্দ্রের অস্তিত্বের কথা বলে। প্রতিটি পবিত্র গ্রন্থেই সেই জ্ঞান রয়েছে, কিন্তু মানুষ তা জানতে চায় না।

প্রশ্ন: কিন্তু আমাদের কাছে তো ইতিমধ্যেই অনেক জ্ঞান আছে, তাই না?

উত্তর: হ্যাঁ—অত্যধিক রকমের জ্ঞান আছে। আমাদের বর্তমান জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে—যেমন ছোট শিশুদের জ্ঞান। যদি আমরা সঠিক ধরনের জ্ঞান অর্জন করতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের সত্তার বিকাশ ঘটলে আমরা উচ্চতর চেতনার স্তরে পৌঁছাতে পারি। জ্ঞানের পরিবর্তন আসে সত্তার পরিবর্তনের মাধ্যমে। জ্ঞান নিজে কিছুই না। প্রথমে আমাদের আত্মজ্ঞান অর্জন করতে হবে, এবং সেই আত্মজ্ঞানই আমাদের শেখাবে কীভাবে নিজেদের পরিবর্তন করতে হয়—যদি আমরা সত্যিই পরিবর্তিত হতে চাই।

প্রশ্ন: তাহলে কি এই পরিবর্তনও বাইরে থেকেই আসতে হবে?

উত্তর: হ্যাঁ। যখন আমরা নতুন জ্ঞানের জন্য প্রস্তুত হব, তখন তা আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবে।

প্রশ্ন: আমরা কি বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে (judgment) আমাদের আবেগ পরিবর্তন করতে পারি?

উত্তর: আমাদের এই যন্ত্রসত্তার একটি কেন্দ্র আরেকটি কেন্দ্রকে পরিবর্তন করতে পারে না। যেমন—লন্ডনে আমি বিরক্ত ও খিটখিটে হয়ে যাই, কারণ আবহাওয়া ও পরিবেশ আমাকে নিরুৎসাহিত করে; কিন্তু ভারতে আমি শান্ত ও ভালো মেজাজে থাকি। তখন আমার বিচারবুদ্ধি বলে—ভারতে গেলে আমি এই বিরক্তি থেকে মুক্ত হতে পারি। কিন্তু আবার লন্ডনে আমি কাজ ভালোভাবে করতে পারি, আর উষ্ণ অঞ্চলে (tropics) ততটা পারি না। ফলে সেখানে গিয়ে আমি অন্য কারণে বিরক্ত হয়ে উঠব। দেখতেই পাচ্ছেন—আবেগ বিচারবুদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; একটিকে অন্যটির মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় না।

অবশেষে প্রতিষ্ঠিত হলো পারমার্থিক স্কুল – ০১

জয়গুরু

শুরুর সময়টা ছিল ২০১১ খ্রি:, তখন গুরুজী  মাঝে মাঝে তেঁতুলিয়া তার নিজ পিতৃগৃহে আসতেন । আর আমরা সে খবর পেলে সকলে মিলে দেখা করার জন্য যেতাম । তেমনি একদিন তিনি এসেছিলেন খুব সম্ভবত এপ্রিল মাসে। আমি গিয়েছিলাম তার সাথে দেখা করতে। আরও অনেকে ছিলেন। তাঁর একজন বন্ধুও ছিলেন সেখানে। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের কথা বলছিলেন তাঁর বন্ধুর সাথে। সেখানে কার্যক্রম কেমন হবে সে বিষয়ে তেমন কোন কথা না বললেও তিনি বলছিলেন কোথায় জায়গা পাবো, কিভাবে কিনবো?

সেদিনের কথা যেন আজও চোখে ভাসে। তার পরনে ঝকঝকে সাদা একটি ফতুয়া। সেটির কলারে এবং সামনের ২ পকেটে ছিল চিকন করে এম্ব্রয়ডারি কাজ করা খয়েরি রং এর সুতা। তার মাথার চুলের অগ্রভাগ কালো হলেও গোড়ার দিক যেন সাদা সেটা মাঝে মাঝে উকি দিচ্ছিল। সে কম্বিনেশন ছিল অসাধারন মনোমুগ্ধকর। সেদিন কোন এক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খুব বেশি আলাপ হয়নি তবে, তার বন্ধু কথা দিয়েছিলেন যে, তিনি ভাল কোন জমির সন্ধান পেলে জানাবেন। তখন কোন প্রতিষ্ঠান বা স্কুল বিষয়টি সেভাবে আমার মাথায় আসেনি এবং আমি খুব একটা বুঝতেও পারিনি ।

এরপর কথাগুলো মাঝে মাঝে আলোচনা হতেই থাকত। কেটে যায় অনেকগুলো দিন। ২০১২ সালের জুন মাসের একবার তিনি শালঘরিয়া(আমাদের বাড়ি) এসেছিলেন। সে সময় মোখলেস চাচা কিছু কাগজপত্র নিয়ে আমাদের বাড়িতে হাজির হন। বিষয়গুলো তখন আমার কাছে স্বপ্নের মত লাগত এবং আনন্দ হতো। আসলে আমি তখন নিজের মত করে স্বপ্নে কোন প্রতিষ্ঠানের ছবি আঁকছিলাম আর সেখানে আমার পছন্দের রং দিয়ে সব কিছু রাঙ্গিয়ে দিচ্ছিলাম। সত্যি যদি আমার কল্পনার সেই স্কুল বাস্তবায়িত হত যেটা আমি তাঁর মুখ থেকে শুনেছিলাম। তবে সেই স্কুল বা প্রতিষ্ঠানের নামেই সারাবিশ্ব বাংলাদেশকে চিনত। এমন কথা বলা বোধহয় দুঃসাহসেরই সামিল ।

আর এমন প্রতিষ্ঠান বোধহয় কল্পনাতেই সম্ভব , বাস্তবে কোনদিন হবে কিনা তা জানিনা তবে, সেই কল্পনার প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা করলেও কয়েক হাজার পৃষ্ঠা লেখা যায়। তবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান কোনদিন হবে সেই দাবি সমাজের তথা আত্মিক উন্নতি করতে যারা আগ্রহী, যারা ইতিমধ্যে করেছেন, যারা সেই পথে হাঁটছেন, যাদের ইচ্ছা আছে, সেইসব উত্তরসূরির কাছে। যেন জীবনে যতবার ফিরে আসি না কেন সেইখানে যেন হাশর হয়।

যাইহোক মূল কথায়  আসি। মোখলেস চাচা যখন কাগজপত্রগুলো গুরুজীর হাতে দিলেন তিনি, খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। আমি প্রথমবার যখন গুরুজীকে দেখি ,তখন থেকেই দেখি তিনি চশমা পরেন। তো স্বাভাবত সেদিনও তিনি চশমা পরেছিলেন এবং কাগজগুলো দেখার সময় বামহাত দিয়ে চশমাটা একটু ঠিক করে নিলেন। এরপর যখন চাচার সাথে কাগজপত্র নিয়ে কথা বলছিলেন তাকে বেশ খুশি খুশি লাগছিল। এরপর জমি কিভাবে কিনতে পারবো সে বিষয়ে কথা হচ্ছিলো।

টাকা কীভাবে আসবে –সেখানে কে্‌উ একজন বলেছিলেন যে, গুরুজী যদি সেখানে যায় তবে দাম অনেক বেশি চাইবে । কারণ তাকে অনেক বড় মাপের অফিসার গোছের লোক মনে হয়, এবং তার অনেক অর্থবিত্ত আছে সেটাও মনে হয়। তাই তিনি যদি জমি দেখতে যান তাহলে যেন কাউকে না বলে শুধু দেখে আসেন এমন প্রস্তাব দেয়া হলো। তখন তিনি হাসতে হাসতে বললেন, কেন লুঙ্গি পরে খালি পায়ে ঘাড়ে একটা গামছা নিয়ে গেলে হবে না! সেই কথা শুনে সেখানে উপস্থিত সবাই খুব হাসাহাসি করলেন। এই সমস্যার সম্মুখীন তিনি এর আগেও হয়েছেন সে কথাও তিনি বললেন।

পরে আলাপ হলো সে জমিটা যদি হয় তবে আমাদের অর্থের যোগান আসবে কোথা থেকে? সাথে সাথে অনেকে বলে ফেলল আমি ১০, ১৫, ৫ হাজার করে দিবে। এক ভাই তো সেখানে কথা দিয়ে দিলেন তার কিছু জমি আছে যেটা বন্ধক দিয়ে তিনি ৫০ হাজার টাকা দিবেন! এভাবেই সেদিন সবাই খুব আনন্দের সাথে আলোচনায় আংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই জানতে পারি যে ঐ জমি কোনো আদিবাসী পরিবারের, এবং সেগুলোর কাগজপত্র সব ঠিক নয়। পরবর্তীতে আর সেই জমির কথা এগোলনা। আবার সবকিছু থেমে গেল।

তবে তিনি বলতেন, প্রতিষ্ঠানটি যেন হয় নদীর কাছাকাছি কোথাও। যেন সেখানে সাতার কাটা যায়। তখন একবারও তিনি স্কুল কথাটি বলেননি । আর যে ভাইটি জমি বন্ধক রেখে টাকা দিতে চাইলেন তিনি জানিয়ে গেলেন যে,তার স্ত্রীকে না জানিয়েই তিনি কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী এ বিষয়ে রাজি নয়। তাই তিনি এত টাকা দিতে পারবেন না।

সৈয়দপুর

০৮/০৪/২০২৬ খ্রি: